লিখে ফেলা উচিত লামেলার এপিটাফ?

গ্যারেথ বেল যখন টটেনহ্যাম হটস্পার ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি জমালেন, রেডিমেইড রিপ্লেইসমেন্ট পেতে গরুখোঁজা করা লাগেনি স্পার্সের। রোমার হয়ে দুর্দান্ত খেলছিলেন তখন আর্জেন্টিনার উদীয়মান ‘নতুন মেসি’ ; এরিক ল্যামেলা। স্পার্সের ধুরন্ধর চেয়ারম্যান ড্যানিয়েল লেভি রত্ন চিনতে ভুল করেননি – আর হাতে ত গ্যারেথ বেল বাবদ বিশ্বরেকর্ড ট্রান্সফার ফি ছিলই। ট্রান্সফার ফি তাই কোন ব্যাপার ছিল না। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, লিভারপুল, ইন্টার মিলানের মত বাঘা বাঘা ক্লাবকে হারিয়ে গ্যারেথ বেলের ‘লাইক-ফর-লাইক’ রিপ্লেসমেন্টকে ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল ট্রান্সফার ফি দিয়ে দলে ভেড়ায় টটেনহ্যাম।

bleacherreport
টটেনহ্যামের এককালের রক্ষাকর্তা – গ্যারেথ বেল

hi-res-179355244_crop_north

কিন্তু আসলেই কি স্পার্স সমর্থকদের চাহিদা মেটাতে পেরেছেন ল্যামেলা এই দেড় মৌসুমে? পেরেছেন কি বেলের মত হোয়াইট হার্ট লেইনে প্রভাব বিস্তার করতে? পেরেছেন কি নিজের ৩০ মিলিয়ন পাউন্ড প্রাইস-ট্যাগের যথার্থতা প্রমাণ করতে? দেড় মৌসুমে এই ২২ বছর বয়সী উইঙ্গারের ক্যারিয়ারের বিভিন্ন চড়াই-উৎরাই পর্যালোচনা করলে প্রশ্নগুলোর উত্তর হয় – না।

নতুন বেলের তকমা লাগিয়ে স্পার্সে আসেন লামেলা
নতুন বেলের তকমা লাগিয়ে স্পার্সে আসেন লামেলা

Roma-Erik-Manuel-Lamela-celeb_2742911

প্রতিভা নিয়ে সংশয় ছিল না কখনই। কিন্তু সেই চিরাচরিত ইতালিয়ান ফুটবল-ইংলিশ ফুটবল দ্বৈততায় খাপ খাওয়ার জন্য শুধুমাত্র প্রতিভাটাই যথেষ্ট ছিলনা বোধহয় লামেলার ক্ষেত্রে। ইতালিয়ান লিগের তুলনায় ইংলিশ লিগ অনেক বেশী দ্রুত, অনেক বেশী শারীরিক ও অনেক বেশীমাত্রায় ‘কম্পিটিটিভ’। সাথে ভাষার গোলযোগটা ত ছিলই, অনেকের মতে সেটাই সবচে বড় সমস্যা ছিল লামেলার স্পার্সে আসার পর – যোগাযোগ। অন্যান্য খেলোয়াড়ের সাথে যোগাযোগ, মাঠে খেলোয়াড়ের সাথে যোগাযোগ, কোচের সাথে যোগাযোগ। প্রথমে আন্দ্রে ভিয়াস-বোয়াস, পরে কড়া হেডমাস্টার টিম শেরউড। ভাষাগত দূরত্বটা তাই সবসময় ছিলই। যে দেশের ক্লাবে রেকর্ড ট্রান্সফার ফি তে যোগ দিলেন, সেই ইংরেজি ভাষাটা একেবারেই পারতেন না লামেলা। রিভারপ্লেট হোক বা এএস রোমা কিংবা আর্জেন্টিনার বয়সভিত্তিক বিভিন্ন জাতীয় দল – স্প্যানিশ বলে গেছেন অনর্গল, সমস্যা হয়নি কোন। কিন্তু টটেনহ্যামে সে সুযোগটা তিনি পাননি। যস্মিন দেশে যদাচারে অভ্যস্ত হতে হতেই তাই কেটে গেছে এক মৌসুম। ততদিনে স্পার্স ভক্তরাও হয়ে পড়েছেন তাঁর উপর বিরক্ত। টটেনহ্যামের ‘গেইম চেইঞ্জার’, ‘ম্যাচ উইনার’ তাই এখন পর্যন্ত কখনই হওয়া উঠেনি লামেলার। অনেকটা নীরবে-নিভৃতেই সেই স্থানটা চলে গেছে তাঁর সাথে একই ট্রান্সফার উইন্ডোতে দলে আসা ক্রিস্টিয়ান এরিকসেনের কাছে, কখনওবা গোলরক্ষক ফরাসী অধিনায়ক হুগো লিওরিসের কাছে। ফলে গ্যারেথ বেল যেরকম টটেনহ্যামের আক্রমণের মূল অস্ত্র ছিলেন, ‘ফোকাল পয়েন্ট’ ছিলেন, বেলের রিপ্লেইসমেন্ট হওয়া সত্বেও লামেলা সেই ‘ফোকাল পয়েন্ট’ হবার বিলাসিতাটা পাননি।

hi-res-363cc64cac3687e4fc2d94144df0660e_crop_exact

সাথে শুরু হল ইনজুরির বাগাড়ম্বর। স্কোয়াডের সবচেয়ে ফিট প্লেয়ার কখনই ছিলেন না, স্পার্সের আসার পর ইনজুরির প্রকোপ যেন আরও বেড়ে গেল তাঁর। নতুন দেশ, নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি, নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর যুদ্ধের সাথে তাই যুক্ত হল পিঠ, কাফ মাসল, উরুর ইনজুরির সাথে যুদ্ধ।

টটেনহ্যামের পর্দার পেছনের ঘটনাপ্রবাহও লামেলাকে সহায়তা করেনি মোটেও। তাঁকে দলে এনেছিলেন টটেনহ্যামের তখনকার পর্তুগীজ কোচ অ্যান্দ্রে ভিয়াস-বোয়াস, লামেলার দলে আসার ২-৩ মাস পরেই যাকে বরখাস্ত হয়ে দল ছেড়ে চলে যেতে হয়।

অ্যান্দ্রে ভিয়াস-বোয়াসকে দলে বেশীদিন পাননি লামেলা
অ্যান্দ্রে ভিয়াস-বোয়াসকে দলে বেশীদিন পাননি লামেলা

দায়িত্বে আসেন সহকারী কোচ ও টেকনিক্যাল ডিরেক্টর টিম শেরউড। টটেনহ্যামের বেশ কিছু খেলোয়াড়ের অসন্তুষ্টিই ভিয়াস-বোয়াসের বরখাস্ত হবার অনেক কারণের মধ্যে একটা ছিল, ড্রেসিংরুমের অবস্থা লামেলার মত নতুন আসা খেলোয়াড়দের জন্য অতটা ইতিবাচক ছিল না। কারণ বেলকে বিক্রি করে দেওয়ার পর টটেনহ্যাম দলটাকে বলতে গেলে একরকম ঢেলে সাজান ড্যানিয়েল লেভি ; দলে আনেন লামেলা ছাড়াও রবার্তো সলদাদো, ক্রিস্টিয়ান এরিকসেন, পাওলিনিও, নাসের চ্যাডলি, এতিয়েঁ কাপৌ, ভ্লাদ চিরিচেস কে। ফলে সবার ক্ষেত্রেই খাপ খাওয়ানোর বিষয়টা ছিল, নতুনদের ক্লাবে সহযোগিতা করিয়ে দেওয়ার মত সেরকম দায়িত্ব নেওয়ার মত সিনিয়র খেলোয়াড়ও ছিল না। যার ফলাফল, প্রথম মৌসুমে লামেলার মাত্র একটি গোল। তাও ইউরোপা লিগে অখ্যাত শেরিফ তিরাসপলের সাথে। অবশ্য প্রথম মৌসুমে লীগে খেলেছিলেনও মাত্র নয় ম্যাচ।

বেল চলে যাওয়ার পর ঢেলে সাজানো হয় টটেনহ্যাম হটস্পারকে
বেল চলে যাওয়ার পর ঢেলে সাজানো হয় টটেনহ্যাম হটস্পারকে

আবার আরও একটা কারণ হতে পারে, এএস রোমায় থাকতে লামেলা খেলেছিলেন ফ্র্যান্সেসকো টট্টি-ড্যানিয়েলে ডি রসিদের মত মহারথীদের সাথে, এখন টটেনহ্যামে যতই নতুন প্রতিভার ছড়াছড়ি থাকুক না কেন টট্টি-রসিদের মত সাহচর্য্য দেবার মত সামর্থ্য নিশ্চয়ই ডেম্বেলে-পাওলিনিও-মেইসন-বেনতালেবদের নেই!

রোমার দুই কিংবদন্তী ফ্র্যান্সেসকো টট্টি ও ড্যানিয়েলে ডি রসি'র সাথে এরিক লামেলা
রোমার দুই কিংবদন্তী ফ্র্যান্সেসকো টট্টি ও ড্যানিয়েলে ডি রসি’র সাথে এরিক লামেলা

এরপর এলো নতুন মৌসুম, কোচ হয়ে এলেন স্বদেশী মরিসিও পচেত্তিনো। লামেলার উপর রাখলেন আস্থা। ভাষাগত যোগাযোগের সমস্যাটাও এখন আর নেই বললেই চলে, কারণ ঐ যে – দুজনই স্বদেশী! নতুন মৌসুমে এখন লামেলা তাই আগের থেকে যথেষ্ট বেশী সময় পাচ্ছেন খেলার, লিগে এরই মধ্যে ১৫টা মত ম্যাচ শুরু করেছেন, যদিও হোয়াইট হার্ট লেইনে নিজের ‘ওয়ান ম্যান শো’ এখনো চালু করতে পারেননি তিনি পূর্বসুরি গ্যারেথ বেলের মত। লীগে মাত্র একটা গোল এখন পর্যন্ত। তা আর যাই হোক লামেলার সামর্থ্যের কথাকে প্রকাশ করে না।

নতুন কোচ, নতুন লামেলা?
নতুন কোচ, নতুন লামেলা?

তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে এত চড়াই উৎরাই অভিজ্ঞতার পরেও লামেলার বয়স কিন্তু মাত্র ২২। আর অন্য লিগ থেকে যারা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে আসে, লিগের কম্পিটিটিভনেস ও ফিজিক্যালিটির জন্য তাদের এখানে প্রথম প্রথম খাপ খাওয়াতে ঝামেলা হয় যথেষ্টই, তা তিনি যত প্রতিভাধরই হোন না কেন। সেখানে গত মৌসুম লামেলার জন্য প্রথম মৌসুম ত ছিলই, সাথে ছিল ইনজুরির বাগাড়ম্বর। লুইস সুয়ারেজের লিভারপুলে থিতু হতে লেগেছিল মোটামুটি এক বছর, এখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়াও ফর্ম ওঠানামার মধ্যেই আছেন, রাদামেল ফ্যালকাওয়ের মত বিশ্বসেরা খেলোয়াড় খাবি খাচ্ছেন নিয়মিত, অতীত ঘাঁটলে দেখা যায় নিজ নিজ দেশের অন্যতম সুপারস্টার হওয়া সত্বেও ইংলিশ লিগে বলতে গেলে ‘ভাত’ই পাননি হুয়ান সেবাস্তিয়েন ভেরন, হার্নান ক্রেসপো, ডিয়েগো ফোরলান, অ্যান্দ্রেই শেভচেঙ্কোরা।

daily mail
চেলসিতে তৎকালীন বিশ্বসেরা স্ট্রাইকার আন্দ্রেই শেভচেঙ্কো’র অবস্থা ছিল হতাশাজর্জর
bleacherreport
ইংলিশ লিগে এসে এসেই কিন্তু অতটা জ্বলে উঠতে পারেননি ফ্যালকাও-ডি মারিয়ারাও

hi-res-76c513028da20fadb10d3d4cfc92641a_crop_north

লামেলার উপর ধৈর্য্য রেখে মরিসিও পচেত্তিনো যে বিশেষ কোন ভুল করেননি সেটা কিন্তু আস্তে আস্তে বোঝা যাচ্ছে। কয়েকদিন আগে বার্নলির বিপক্ষে লিগে করা তাঁর গোলটার কথা চিন্তা করে দেখুন, রাইট ফ্ল্যাঙ্ক থেকে দৌড়ে গিয়ে বামদিকে কাট-ইন করে বাম পায়ের জোরালো বাঁকানো শটে যেভাবে গোলরক্ষক টিম হিটন কে পরাস্ত করলেন, লামেলা স্পার্সে আসার আগে ঠিক এইধরণের গোলের ইউটিউব কম্পাইলেশান দেখেই স্পার্স সমর্থকরা উত্তেজিত হয়েছিলেন লামেলার প্রতি! কিংবা অ্যাসতেরাস ত্রিপলির সাথে সেই র‍্যাবোনা শটের গোলটা, নিজের প্রতিভা প্রমাণ করার আর বোধহয় বাকী নেই লামেলা, এখন বাকী শুধু সেটা পরিচর্যা করা!

hi-res-08a2afd55cec5bb0251f40c67854fd25_crop_north

এবার পরিসংখ্যানের আলোকে দেখে নেওয়া যাক লামেলা কি আদৌ ভালো করছেন কি না। গত মৌসুমে যেখানে প্রতিম্যাচে মাত্র ০.৭টা ‘কি পাস’ ছিল, এই মৌসুমে সেটা বেড়ে গিয়ে হয়েছে ১.৬। এই পর্যন্ত সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩৭ ম্যাচে ৪ গোলের পাশাপাশি অ্যাসিস্টও হয়ে গেছে আটটি, যদিও ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের প্রাইসট্যাগের তুলনায় খুবই নগণ্য পারফর্মেন্স, তবুও গত মৌসুমের কথা চিন্তা করলে বলতেই হয় লামেলা উন্নতি করছেন বেশ, যেখানে তাঁর বয়স মাত্র ২২, পড়ে আছে প্রায় পুরো ক্যারিয়ারটাই।

আর্জেন্টিনার হয়ে লামেলা
আর্জেন্টিনার হয়ে লামেলা

এখনই তাই লামেলার উপর আশা হারানোটা ভুল হবে টটেনহ্যাম-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের। কারণ ইংলিশ লিগে এসে খাবি খেতে খেতে শেখার ইতিহাসটা যে শুধু লামেলারই না!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

8 − 7 =