লিওনেল মেসি আর পাওলো ডিবালা : একসাথে খেললে সমস্যা যেখানে

লিওনেল মেসি আর পাওলো ডিবালা : একসাথে খেললে সমস্যা যেখানে

ম্যারাডোনা যুগ শেষ হবার পর থেকে প্রত্যেকটা প্রতিশ্রুতিশীল আর্জেন্টাইন আক্রমণভাগের খেলোয়াড়কে একটা অবশ্যম্ভাবী তুলনার মধ্যে দিয়ে যেতে হত। পাবলো আইমার থেকে শুরু করে আরিয়েল ওর্তেগা, হুয়ান রোমান রিকেলমে থেকে শুরু করে কার্লোস তেভেজ, ডিয়েগো ল্যাতোরে থেকে শুরু করে অ্যান্দ্রেস ডি’অ্যালেসান্দ্রো, মার্সেলো গ্যালার্দো থেকে শুরু করে হ্যাভিয়ের সাভিওলা, কার্লোস ম্যারিনেয়ি থেকে শুরু করে মাউরো জারাতে, সার্জিও অ্যাগুয়েরো থেকে শুরু করে ইজেক্যিয়েল লাভেজ্জি – সবাইকেই কখনো না কখনো “নতুন ম্যারাডোনা” বলে অভিহিত করেছে আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা। কেউ কেউ শুরুর সেই প্রতিশ্রুতিকে সফলতায় রূপান্তরিত করতে পেরেছেন, কেউ পারেননি। তবে লিওনেল মেসি আসার পর থেকে এই বিড়ম্বনার অবসান হয়েছে। সবাই মোটামুটি একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছেন লিওনেল মেসি ই হচ্ছেন আসল “নতুন ম্যারাডোনা” – কিংবা কে জানে, অনেকের মতে ম্যারাডোনার চাইতেও বেশী কিছু! ফলে আপাতত এই যত্রতত্র “নতুন ম্যারাডোনা” বলে অভিহিত করার সংস্কৃতিটা থেমেছে। কিন্তু থামার সাথে সাথে একই রকম আরেকটা নতুন সংস্কৃতি চালু হয়েছে – এখন নতুন কোন প্রতিশ্রুতিশীল আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়ের নাম শোনা গেলেই তাকে “নতুন মেসি” বলে আখ্যা দেওয়া হয় যে! শুধু আর্জেন্টাইন হলেই যে নতুন লিওনেল মেসি বলা হয় তা কিন্তু না। আজকাল প্রায় প্রত্যেকটা দেশের সমর্থকই তাদের সবচাইতে প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড়টিকে “নতুন লিওনেল মেসি” বলে আখ্যা দিচ্ছে। যেমন –

  • মোহামেদ সালাহ হল “মিশরীয় মেসি”
  • জের্দান শাকিরি হল “আল্পস এর মেসি”
  • হুয়ান ম্যানুয়েল ইতুর্বে হল “প্যারাগুইয়ান মেসি”
  • রায়ান গোল্ড হলেন “স্কটিশ মেসি”
  • সর্দার আজমৌ হলেন “ইরানিয়ান মেসি”
  • লরেঞ্জো ইনসিনিয়া আর পিয়েত্রো পেলেগ্রি হলেন “ইতালিয়ান মেসি”
  • অ্যালান জাগোয়েভ হলেন “রাশিয়ান মেসি”
  • মারিও গতসা হলেন “জার্মান মেসি”
  • ইকার মুনিয়াইন হলেন “স্প্যানিশ মেসি” ইত্যাদি

আর্জেন্টিনায় বর্তমানে এই “নতুন লিওনেল মেসি” এর তকমা বেশ কয়েকবছর ধরেই গায়ে লাগিয়ে বসে আছেন জুভেন্টাসের অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার/স্ট্রাইকার পাওলো ডিবালা। এবং এ পর্যন্ত যতগুলো নতুন লিওনেল মেসি ফুটবল বিশ্বে এসেছেন, মোটামুটি এই পাওলো ডিবালাকেই বলা চলে “নতুন লিওনেল মেসি” হবার সবচাইতে যোগ্য খেলোয়াড়। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ২০১০ সালে “ইন্সটিটিউটো অ্যাটলেটিকো সেন্ট্রাল কর্দোবা” এর হয়ে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করা পাওলো ডিবালা ইতালিয়ান ক্লাব পালেরমো হয়ে এখন জুভেন্টাস মাতাচ্ছেন। জুভেন্টাসের হয়ে দু’বার করে লিগ আর কোপা ইতালিয়া জিতেছেন, একবার জিতেছেন সুপারকোপা।

লিওনেল মেসি আর পাওলো ডিবালা : একসাথে খেললে সমস্যা যেখানে
নতুন “লিওনেল মেসি”

তবে এই নতুন লিওনেল মেসি তকমাটা তাঁর জন্য যতটা না সম্মানের, তাঁর থেকেও বেশী স্বপ্নভঙ্গের। অন্তত এখন সেটাই মনে হচ্ছে। আর এটার পেছনে দায়ী তাঁর খেলার স্টাইল। পাওলো ডিবালা যে একদম লিওনেল মেসি এর মত খেলেন!

ভুল বললাম। বর্তমান সময়ে মেসির মত কেউই খেলতে পারেন না। কিন্তু খেলার স্টাইল বিবেচনা করলে বর্তমানে লিওনেল মেসি এর কপিবুক প্লেয়ার এখন একটাই আছেন – তিনি পাওলো ডিবালা (ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নাম আনতে চাই না। ক্রিস্টিয়ানো সম্পূর্ণ ভিন্ন স্টাইলের একজন খেলোয়াড়, এবং তিনি তাঁর নিজস্ব স্টাইলে সর্বসেরা)। আর এটাই এখন কাল হয়েছে পাওলো ডিবালার। আর্জেন্টিনা কোচ হোর্হে সাম্পাওলি যে ঠিক এই কারণেই ডিবালাকে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ স্কোয়াডে নিতে চাচ্ছেন না!

সাম্পাওলির হাই-প্রেসিং ট্যাকটিকসে প্রত্যেকটা খেলোয়াড়েরই একটা নিজস্ব ভূমিকা আছে। এটা শুধু সাম্পাওলির ট্যাকটিকস বলেই নয় শুধু, পৃথিবীর যেকোন ম্যানেজারেরই ট্যাকটিকস বা স্টাইলে প্রত্যেকটা খেলোয়াড়ের একেকটা ভূমিকা বা দায়িত্ব থাকে। তাও দলের সবচাইতে প্রতিভাবান, সবচেয়ে বেশী ম্যাচ জেতাতে পারা ফুটবলারটাকে “ফ্রি রোল” দেন আজকাল প্রায় প্রত্যেকটা ম্যানেজারই। অর্থাৎ সে ম্যানেজারের ট্যাকটিকস অনুযায়ী না খেলে মাঠের মধ্যে চাইলে প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের মত খেলতে পারেন, যা হুটহাট জাদুকরী কোন একটা মুহূর্তের সৃষ্টি করে দলকে কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দিতে পারে। আর্জেন্টিনা বা বার্সেলোনায় এ সুবিধাটা শুধুমাত্র মেসির জন্যই বরাদ্দ। যেমনটা জুভেন্টাসে এ সুবিধাটা পাওলো ডিবালার জন্য বরাদ্দ! প্যারিস সেইন্ট জার্মেই বা ব্রাজিলে এই সুবিধাভোগী হলেন নেইমার, আর রিয়াল মাদ্রিদ-পর্তুগালের হয়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। কিন্তু একজনের বেশী “ফ্রি রোল” এর সুবিধা কোন ম্যানেজার তাঁর দলের খেলোয়াড়দের দিলে তার ট্যাকটিকসের যেমন সার্থক প্রতিফলন দেখা যায়না মাঠে, দলও কাঙ্ক্ষিত ফলটা আনতে পারেনা।

সমস্যা হল, নিজ নিজ ক্লাব বার্সেলোনা ও জুভেন্টাসের হয়ে লিওনেল মেসি আর পাওলো ডিবালা এই “ফ্রি রোল” এ খেলে খেলে অভ্যস্ত। এদিকে হোর্হে সাম্পাওলিও তাঁর ট্যাকটিকস বিসর্জন দিয়ে আর্জেন্টিনায় দুইজনকে “ফ্রি রোল” এ খেলাবেন না। ফলে লিওনেল মেসি ও ডিবালা যখনই একসাথে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেছেন, অবধারিতভাবে লিওনেল মেসি “ফ্রি রোল” এ খেলার সুবিধা পেয়েছেন, ডিবালাকে নিজের খোলসের মধ্যেই আটকে থাকতে হয়েছে, ফলে ডিবালা তাঁর সহজাত প্রতিভা যেমন আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে দেখাতে পারেননি। এ কথা লিওনেল মেসি নিজেই স্বীকার করেছেন। দুজনই ছোটখাট আকারের, দুজনই বাম পায়ে জাদুকরী মুহূর্ত সৃষ্টি করতে সক্ষম, দুজনই আক্রমণভাগের ডানদিক থেকে ডিবক্সের ভিতরের দিকে কাট-ইন করে এসে দলের অন্যান্য খেলোয়াড়দের জন্য জায়গা সৃষ্টি করে আক্রমণ করতে ভালোবাসেন, গোল করতে/করাতে ভালোবাসেন। যে কাজটা মাঠের বামদিক থেকে তারা অতটা সফলভাবে করতে পারেন না। কারণ তারা বামপায়ের খেলোয়াড়। এ কারণেই পাওলো ডিবালাকে দলে আনার জন্য প্রথমে বার্সেলোনা আগ্রহী হলেও পরে আর তারা তাকে চায়নি, ডিবালাও পালেরমো থেকে জুভেন্টাসে চলে গেছেন। কারণ ঐ একটাই। কিভাবে লিওনেল মেসি আর পাওলো ডিবালাকে একই একাদশে খেলানো সম্ভব? এই একই সমস্যায় পড়েছেন হোর্হে সাম্পাওলি। যে কারণে এই মৌসুমে এখনো পর্যন্ত ৩৫ ম্যাচে ২১ করার পরেও সাম্পাওলি মোটামুটি জানিয়েই দিয়েছেন তাঁর বিশ্বকাপ একাদশে পাওলো ডিবালার থাকার সম্ভাবনা কম। যা পাওলো ডিবালার জন্য বিরাট এক স্বপ্নভঙ্গ!

লিওনেল মেসি আর পাওলো ডিবালা : একসাথে খেললে সমস্যা যেখানে
বিশ্বকাপে একসাথে খেলা হবে তো মেসি-ডিবালার?

তবে একেবারেই কি পাওলো ডিবালাকে আর্জেন্টিনা দলে নেওয়া সম্ভব না? ২৩ জনের রাশিয়াগামী দলে ডিবালার মত প্রতিভাবান কারোর জায়গা পাওয়া অবশ্যই উচিৎ এবং সম্ভব। কিন্তু কিভাবে সেটা?

সাম্পাওলি বর্তমানে ৩-৪-২-১ বা ৪-৩-২-১ বা ৪-২-৩-১ এই তিন ফর্মেশানে দলকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খেলাচ্ছেন। বলা যায় না, বিশ্বকাপে গিয়ে লিওনেল মেসি কোন ইনজুরিতে পড়লে বা লাল কার্ড খেয়ে এক-দুই ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে গেলে তাঁর জায়গায় কে খেলবে? সেরকম অবস্থায় তাঁর জায়গায় খেলার মত এই বিশ্বের একজনই আছেন – পাওলো ডিবালা।

আর্জেন্টিনায় আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ের কখনই অভাব ছিল না। উপরে একজন স্ট্রাইকার হিসেবে খেলানোর জন্য এবারও সাম্পাওলির হাতে বিকল্প আছে অনেকগুলো – গঞ্জালো হিগুয়াইন, সার্জিও অ্যাগুয়েরো, দারিও বেনেদেত্তো, মারিও ইকার্দি, পাওলো ডিবালা, লওতারো মার্টিনেজ। স্পেইনের বিপক্ষে জঘন্য ম্যাচ খেলার পর এবং ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন টুর্নামেন্টের ফাইনালে জঘন্যতম পারফরম্যান্স দেওয়া গঞ্জালো হিগুয়াইন কোন এক বিচিত্র কারণে এখনো হোর্হে সাম্পাওলির মূল পছন্দ স্ট্রাইকার হিসেবে। সময় এসেছে তাকে মূল একাদশ থেকে বাদ দেওয়ার। তাকে বাদ দিলে উপরে মূল স্ট্রাইকার হিসেবে পাওলো ডিবালাকে একবার অন্তত খেলিয়ে দেখতে পারেন সাম্পাওলি বাকী থাকা প্রস্তুতি ম্যাচগুলোতে। তাঁর পিছে যথারীতি ফ্রি রোলে খেলবেন লিওনেল মেসি, নিচ থেকে বল বানিয়ে নিয়ে এসে উপরে স্ট্রাইকার হিসেবে পাওলো ডিবালাকে পাস দিতে পারবেন। পাওলো ডিবালাও তখন চাইলে “ফলস নাইন” হিসেবেও খেলতে পারবেন। যে ফলস নাইন হিসেবে খেলে লিওনেল মেসি নিজেকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে অধিষ্ঠিত করেছেন! যদিও এরকম হবার সম্ভাবনা বা এই সিস্টেম সফল হবার সম্ভাবনা খুব কম। কিন্তু তাও, আমার জানামতে সাম্পাওলি কখনো ডিবালাকে একক স্ট্রাইকার হিসেবে খেলাননি। একবার খেলিয়ে অন্তত দেখতে পারেন। আর তাতে সুফল না পেলে অন্তত মেসির ব্যাকআপ হিসেবে ২৩ জনের মধ্যে ডিবালা একটা আসন দাবী করতেই পারেন!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

2 × four =