লাতসিও : ইতালির অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ/ডর্টমুণ্ড?

গত মৌসুমে ইতালির থেকে কে কে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ খেলবে, এই প্রশ্ন করলে প্রায় সবারই উত্তর মিলতঃ জুভেন্টাস, নাপোলি, রোমা, দুই মিলান, ফিওরেন্তিনা এসব। কিন্তু সবার এক্সপেকটেশন ভেঙ্গে, অনেকের আশাকে গুঁড়েবালি দেখিয়ে, লাতসিও অনেককে চমকে দিয়ে সিরি আ তে ৩য় স্থান অধিকার করে।

মিরোস্লাভ ক্লোজাঃ এই বয়সেও লাতসিওর আশা ভরসা
মিরোস্লাভ ক্লোজাঃ এই বয়সেও লাতসিওর আশা ভরসা

না ট্রান্সফার মার্কেটে এক গাদা টাকা উড়ানো নয়, বরং কম খরচে কিভাবে একটি শক্তিশালী, গুছানো দল গড়ে তুলা যায়, লাতসিও সেটার এক অসাধারণ উদাহরণ।

তাঁদের এই সাফল্য অঢেল টাকা খরচের মাধ্যমে নয়, বরং এর পিছে দায়ী কিছু ভালো সস্তা ট্রান্সফার ও শক্তিশালী ম্যান ম্যানেজমেন্ট।

বিগত কয়েক বছরে লাতসিও বেশ কিছু খেলোয়ারকে বেশ ভালো দামে বেচতে সক্ষম হয়েছে, যেমন এলেকজান্ডার কোলারোভ(২০ মিলিয়ন পাউন্ড), স্তেফেন লিচস্তেইনার(৯ মিলিয়ন পাউন্ড)। কিন্তু রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে কাদের আনা হবে সে ব্যাপারে ক্লাবের কোন লক্ষ্য বা দর্শন ছিল না। ফলাফলঃ আবদোউলাই কোনকো, জিব্রিল সিসে, জিউসেপ্পে স্কুল্লি এরকম কিছু ফ্লপ সাইনিং।

তবে শেষ ২ মৌসুমে লাতসিও দলবদল মৌসুমে তুলনামূলক অনেক ভালো সময় কাটিয়েছে। ইন্টারের কাছে হার্নানেসকে হারানোও অতটা বড় সমস্যা সৃষ্টি করেনি।

লাতসিওর হঠাৎ এমন সাফল্যের পিছে প্রধান ব্যাক্তি ক্লাবটির স্পোর্টিং ডিরেক্টর ইগলি তারে। আলবেনিয়ার এই ভদ্রলোক নিজের খেলোয়াড় ক্যারিয়ারের শেষ ২ মৌসুম লাতসিওতে কাটানোর পরে ক্লাবের এই পদে বসেন। বর্তমানে ক্লাবটির বেশ কিছু মূল খেলোয়াড়, ডা ভ্রিজ, লুকাস বিগ্লিয়া, মার্কো পেরোলো, ফিলিপে অ্যান্ডারসন, এই সব সাইনিং তাঁরই করা। তাঁর থেকেও আশ্চর্য ব্যাপার, এই প্রত্যেকটি খেলোয়াড়ের দাম ১০ মিলিয়নের থেকেও কম পড়েছে।

ইগ্লি তারে
ইগ্লি তারে

ওয়ার্ল্ড কাপে তাঁর ভালো পারফরমেন্স কোন ফ্লুক ছিল না, ডা ভ্রিজ লাতসিওতে এসে ভালমতই বুঝিয়ে দিয়েছেন। সিরি এ তে নিজের প্রথম মৌসুমেই নিজেকে লিগের অন্যতম সেরা সেন্ট্রাল ব্যাকে পরিণত করা এই ডাচ ডিফেন্ডারের দাম? মাত্র ৬.৫ মিলিয়ন ইউরো। এইখানে উল্লেখ্য, জুভেন্টাস ও রোমা এই ২টি ক্লাবই শুধুমাত্র লাতসিওর থেকে কম গোল খেয়েছে গত মৌসুমে।

ডা ভ্রিজঃ সিরি এ এর অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার
ডা ভ্রিজঃ সিরি এ এর অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার
লুকাস বিগ্লিয়া
লুকাস বিগ্লিয়া

নিজেকে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের পরিচিত মুখে পরিণত করা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার লুকাস বিগ্লিয়া। দাম? মাত্র ৮ মিলিয়ন।

বিগ্লিয়ার পাশাপাশি আরেক কম দামী মিডফিল্ডার হচ্ছেন মার্কো পেরোলো। পারমার থেকে ৫ মিলিয়ন দিয়ে কিনা এই মিডফিল্ডার ছিলেন পুরো মৌসুমে সিরি এ এর অন্যতম সেরা।

জুভেন্টাস, পারমা এইসব ক্লাবে বাজে সময় কাটানো আন্টোনিও কেন্ড্রেভা পুরো ক্যারিয়ার পরিবর্তন হয়ে যায় লাতসিওতে যোগ দেওয়ার পর। এই ইনভারটেড রাইট উইঙ্গারের পিছে খরচ? ৯ মিলিয়ন।

সান্তোস থেকে ৬.৫ মিলিয়নে কিনা ফিলিপে অ্যান্ডারসন শুরুতে মোটেও ইতালিতে মানিয়ে নিতে পারেননি। কিন্তু তাঁর ২য় সিজনে তাঁর আসল পটেনশিয়াল তিনি ঠিকই প্রদর্শন করতে সক্ষম হন। ১০ গোল, ৭ অ্যাসিস্ট তাঁর মার্কেট ভ্যালু এক লাফে ৩০ মিলিয়নে নিয়ে গিয়েছে।

আন্টোনিও কেন্ড্রেভা
আন্টোনিও কেন্ড্রেভা
ফেলিপে অ্যান্ডারসন
ফেলিপে অ্যান্ডারসন

তবে ভালো সাইনিং করলেই তো হয় না, এদের পিছে যথাসাধ্য শ্রম দেয়া লাগে। যে কাজটা সাফল্যের সাথে করেছেন বর্তমান ম্যানেজার স্তেফানো পিওলি।

স্তেফানো পিওলি ইতালিতে কোন বিখ্যাত নাম নন। তাঁর ম্যানেজার ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ সময় কেটেছে বিভিন্ন সিরি বি দলের অধীনে। সিরি বিতে তিনি বেশ খ্যাতি কুড়ালেও সিরি এ তে তিনি ছিলেন পুরোই ফ্লপ। পারমা ও চিয়েভো ২ ক্লাবেই তিনি স্ট্রাগল করেছেন। অন্যদিকে পারলেমোতে টিকতে পেরেছেন মাত্র ১ মাস!

তাঁর হারানো খ্যাতি কিছুটা হলেও ফিরে আনতে পারেন বোলোনিয়ার ম্যানেজার হিসেবে। রেলিগেশনের খাঁড়ার ভুক্তভোগী এই ক্লাবকে পর পর ২ মৌসুমে তিনি সমর্থ হন পয়েন্ট তালিকার মিড টেবিলে রাখতে। তবে ৩য় সিজনে এই সাফল্য আর ধরে রাখতে পারেননি তিনি। ফলাফলঃ জানুয়ারিতেই ছাঁটাই!

মাত্র ৬০০০০০ ইউরো/বছর, এই চুক্তিতে লাতসিওর ম্যানেজার হন পিওলি। বুঝাই যায়, ক্লাব বোর্ডের খুব বেশি আস্থা ছিল না তাঁকে নিয়ে। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে এই মানুষই লাতসিওকে নিয়ে যান চ্যাম্পিয়ন্স লিগ প্লে-অফে।

বর্তমান মৌসুমেও লাতসিও কোন বড় সাইনিং এর পিছে ছুটেনি। অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের ব্রোঞ্জ বল জয়ী সার্বিয়ান মিডফিল্ডার যোগ দিয়েছেন ৯ মিলিয়ন ইউরোতে। বেশ হাইলি রেটেড ডাচ ফরওয়ার্ড রিকারডো কিশনাকে লাতসিও কিনেছে মাত্র ৪ মিলিয়নে। ধারে কাটানো ২ ডিফেন্ডার মাউরিসিও ও ডুসান বাস্তা ভালো পারফরমেন্সের পর পাকাপাকিভাবে যোগ দিয়েছেন দলে যথাক্রমে ২.৭ ও ৫ মিলিয়ন ইউরোতে। ২ প্রমিসিং মিডফিল্ডার প্যাট্রিক(বার্সেলোনা বি) ও ওয়েসলি হডেত(টয়েন্টি) এদের তো ফ্রিতেই কিনে নিয়েছে লাতসিও।

তাঁদের এই সাফল্য দেখে বলা যায়, অঢেল টাকা ঢাললেই হয়না, বরং ভালো সস্তা ট্রান্সফার ও শক্তিশালী ম্যান ম্যানেজমেন্ট দিয়ে অনেক ক্লাবকে শক্তিশালী করে তোলা যায়, যা অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ বা বরুশিয়া ডর্টমুন্ড দেখিয়েছে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

three × 1 =