লজ্জাজনক হারে শুরু বাংলাদেশের

শিরোপা জয়ের স্বপ্ন চোখে নিয়ে এসে প্রথম ম্যাচেই এভাবে বাস্তবতার কঠিন জমিনে অবতরণ করতে হবে, এ কথা বোধহয় মামুনুল বা মারুফুল, বাংলাদেশের কোচ বা অধিনায়কের কেউই স্বপ্নেও কল্পনা করেননি। সাফ সুজুকি কাপের প্রথম ম্যাচেই হোঁচট খেল বাংলাদেশ, উৎরাতে পারল না আফগান পরীক্ষা। ভারতের কেরালায় আফগানিস্তানের কাছে ৪–০ গোলে হেরে শুরু হলো বাংলাদেশের এবারের সাফ অভিযান।

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে আফগানিরাই বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে, কিন্তু ঐ যে বলে, মিথ্যা হল তিন প্রকার – মিথ্যা, ডাঁহা মিথ্যা ও পরিসংখ্যান। র‍্যাঙ্কিংও কিন্তু সেই পরিসংখ্যানেরই ফসল। তাই টুর্নামেন্টের সাত দলের শক্তিমত্তার মধ্যে ইতরবিশেষ কোন পার্থক্য নেই বলতে গেলে। কিন্তু বাংলাদেশের খেলা দেখে সেটা বোঝা গেল কই?

আফগানিরা র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশীদের চেয়ে ৩২ ধাপ এগিয়ে। তারা ১৫০, আমরা ১৮২। কিন্তু এই ৩২ ধাপের দূরত্বই খেলা শুরু হবার সাথে সাথে মনে হতে লাগলো সমুদ্রসমান। কোচ মারুফুল হকের একাদশ নির্বাচনে সমস্যার পাশাপাশি খেলোয়াড়দের ক্লান্তি ও স্ট্রাইকারদের ব্যর্থতা আফগানিদের সুবিধা করে দিল আরও।

৪-৩-৩ ফর্মেশানে খেলা শুরু করা বাংলাদেশের গোলবারে ছিলেন শহীদুল ইউসুফ সোহেল। সেন্টারব্যাক দুইজন ছিলেন শেখ জামালের নাসিরউদ্দিন ও আবাহনীর নাসিরুল, দুই ফুলব্যাক ইয়ামিন ও ইয়াসিন। মিডফিল্ডে পাওয়ারহাউস জামাল ভূঁইয়ার অনুপস্থিতির কারণে সুযোগ পান মোনায়েম রাজু, তাঁর সাথে মাঝমাঠের বাকি দুইজন ছিলেন অধিনায়ক মামুনুল ও হেমন্ত। দুই উইঙ্গার সোহেল ও জাহিদের মাঝে স্ট্রাইকার শাখাওয়াত রনি। ইনজুরিগ্রস্থ থাকা সত্বেও নাসিরউদ্দিনকে কেন নামানো হল সে কারণ অজানা, এমনকি কিছুদিন আগে নেপালের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে খেলা ঢাকা মোহামেডানের গোলরক্ষক রানা কে না নামিয়ে কেন শেখ জামালের শহীদুলকে নামানো হল সে কারণটাও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। একই কথা বলা যেতে পারে মোনায়েম রাজুর ক্ষেত্রেও। নেপালের বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচে ছিলেন না তিনি, খেলেছিলেন মিশু। কিন্তু আজকে ফর্মেশানের কারণেই কি না, নামানো হল রাজুকে।

1173721_946929368721465_4327018617612901815_n

এদিকে আফগানিরা ম্যাচ শুরু করে ৪-২-৩-১ ফর্মেশানে। গোলরক্ষক ওভাইস আইজিজের সামনে দুই সেন্টারব্যাক মোহাম্মদ হাশেমি ও মাসিহ সাইগানি, রাইটব্যাক মুস্তফা হাদিদ ও লেফটব্যাক হাসান আমিন। সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে দুজন ছিলেন আবাসসিন আলিখিল ও কানিশকা তাহের। দুই উইঙ্গার ছিলেন অধিনায়ক ফয়সাল শায়েসতেহ ও মুস্তফা জাজাই, সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার নুরল্লা আমিনির সামনে স্ট্রাইকার জুবাইর আমিরি।

12391937_946912862056449_86190775108167307_n

তবে ম্যাচের প্রথম আক্রমণ ছিল কিন্তু বাংলাদেশেরই। আফগানি ডিফেন্সের ভুলের সুযোগ নিয়েও বাংলাদেশকে এগিয়ে দিতে পারেননি শেখ জামালের স্ট্রাইকার শাখাওয়াত রনি। তাঁর কিছুক্ষণ পরে হেমন্ত ভিনসেন্টের ক্রসে গোল করতে পারেননি উইঙ্গার জাহিদ।

কিন্তু আফগানিরাই বা বসে থাকবে কেন? আক্রমণ শানাতে লাগল তারাও, দুর্দান্ত এক কাউন্টার অ্যাটাকে প্রায় গোল হয়েই যাচ্ছিল, ইয়াসিন খানের কৃতিত্বে হয়নি। ১৮ মিনিটে সেন্টারব্যাক নাসিরুল হলুদ কার্ড দেখেন। তাঁর কিছুক্ষণ পর অধিনায়ক শায়েসতেহের এক ক্রস পৌঁছাতে পারেনি গন্তব্যে, ফলে ২০ মিনিট পর্যন্ত গোলশূণ্য থাকে খেলা।

২০ মিনিট পর্যন্ত ঝিমোতে থাকার পর এবার গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে আফগানরা। মুহুর্মুহু আক্রমণে দিশেহারা করে ফেলে বাংলাদেশকে। মূলত কাউন্টারেই খেলতে থাকে আফগানিরা, এর মধ্যে আরও ২-১টা সুযোগ নষ্ট করে তারা। অবশেষে ৩১ মিনিটে বাংলাদেশের গোলমুখ খুলতে সফল হয় আফগানিরা। কর্নার থেকে আসা বলে গোলরক্ষক শহীদুলের ভুল পজিশনিংয়ের সুবিধা নিয়ে দুর্দান্ত এক হেডে আফগানিদের এগিয়ে দেন সেন্টারব্যাক মাসিহ সাইগানি।

মাসিহ সাইগানির প্রথম গোল
মাসিহ সাইগানির প্রথম গোল

এরপর বাংলাদেশের বুঝে ওঠার আগেই আরেকটা দুর্দান্ত কাউন্টার অ্যাটাকে অধিনায়ক ফয়সাল শায়েসতেহ গোল করে ব্যবধান দ্বিগুণ করে ফেলেন। এখানে বাংলাদেশের উইঙ্গার জাহিদের হেলায় হারানো পজেশনকেই দায়ী করা যেতে পারে। মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আসে সেন্টারব্যাক নাসিরউদ্দিনের ইনজুরি। উনি আগে থেকেই ইঞ্জুরড ছিলেন, ৩৮ মিনিট এর বেশী তাই আর খেলতেও পারলেন না, তাঁর জায়গায় কোচ মারুফুল নামালেন শেখ রাসেলের তপু বর্মণকে। ৪১ মিনিটে তৃতীয় গোল খায় বাংলাদেশ। এবারের গোলদাতা জুবাইর আমিরি। প্রথমার্ধ শেষে এই তিন গোলের লিড নিয়েই বিরতিতে যায় আফগানিরা।

saff-suzuki-cup_14872

প্রথমার্ধে যেখান থেকে শেষ করেছিল, দ্বিতীয়ার্ধে ঠিক যেন সেখান থেকেই শুরু করল আফগানিরা। বাংলাদেশও। জঘন্য ম্যান মার্কিং, পজেশান হারানো, দুর্বলতা, ক্লান্তি, সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশকে আবার জেঁকে ধরল আফগানিরা। এরইমধ্যে ৫৪ মিনিটে ৪ নাম্বার গোল খেতে খেতেও রক্ষা পায় বাংলাদেশ, দুর্দান্ত এক হেডার শহীদুলের বারে লেগে ফিরে যায়। ৫৯ মিনিটে এক রানার পরিবর্তে আরেক রানা মাঠে নামে, সোহেল রানার পরিবর্তে মাঠে নামেন জুয়েল রানা। আফগান অধিনায়ক শায়েসতেহও নেমে যান এই সময়ে, মাঠে আসেন আরাশ হাতিফি।

৭০ মিনিটে ৪ নাম্বার গোল করে ফেলে আফগানিরা। খাইবার আমানির শট একবার আটকিয়েও পার পাননি শহীদুল, দ্বিতীয় শটে গোল করতে আর ভুল হয়নি তাঁর।

প্রথম ১৫ মিনিট বাদ দিলে পুরো ম্যাচজুড়েই ছিল এরকম আফগানিদের আধিপত্য, তাও হয়তবা ব্যবধানটা এতটাও বাড়ত না যদি স্ট্রাইকার শাখাওয়াত রনি বা জাহিদুল এরকম গণ্ডায় গণ্ডায় সুযোগ মিস না করতেন। টুর্নামেন্ট শুরু আগেই মনে হয়েছিল সেই চিরন্তন স্ট্রাইকার সমস্যা বাগড়া দিতে পারে এবারও, সেটাই হচ্ছে। প্রত্যেকটা খেলোয়াড়কে মনে হয়েছে ক্লান্ত, আফগানিদের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে অর্থবহ কোন আক্রমণ করার কোন ইচ্ছা ছিল তাঁদের বলে মনে হয় না।

এই বিশাল পরাজয় বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে দিল কি না কে জানে। যে হার হয়তো টানা তৃতীয়বারের মতো সাফের প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নেওয়ার রাস্তাটাও দেখিয়ে দিল। এই গ্রুপে আছে মালদ্বীপ, ২০০৮ সালের চ্যাম্পিয়ন। আফগানরা তো এক পা দিয়েই রাখল সেমিফাইনালে। মালদ্বীপের হিসাবটাও সহজ হয়ে গেল বাংলাদেশ গোল ব্যবধানের খাতায় মাইনাস ফোর দিয়ে শুরু করায়। দিনের প্রথম ম্যাচে মালদ্বীপ ভুটানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে শুভসূচনাও করেছে। আগামী শনিবার এই মালদ্বীপের সঙ্গেই খেলা।

হয় জিতো, নাহয় বাড়ি ফেরো – সহজ হিসাব মামুনুল-মারুফুলদের!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

eight − five =