রেগিস্তা কথন

প্রথমে আমাদের রেগিস্তা কি এবং কেন এই রোলটা ইমপ্লিমেন্ট করা হইসিলো তা জানা লাগবে । রেগিস্তা হলো সেই বহুকাল পুরোনো একটি মিডফিল্ড অপশন , যা সাধারণত খুবই ডীপ লায়িং পজিশনে ইমপ্লিমেন্টেড হয় । এমনও নজির আছে , যে পুরানো দিনের ২-৩-৫ ফর্মেশনে সেন্ট্রাল সিবি একটু সামনে উঠে রেগিস্তা রোল প্লে করে এবং উইঙ পজিশনে অ্যাটাকের দুই প্লেয়ার রেগিস্তার অ্যাকুরেট লং বলগুলা রিসিভ করে ( যেমন ১৯০৮ এবং ১৯১১ এর লীগ জেতা ম্যানচেস্তার উইনাইটেডের চার্লি রবার্টস ) , তবে সেই পজিশনটা ঠিক প্রথাগত রেগিস্তা রোল ছিল না , তৎকালীল সময়ে ঐ রোলের নাম ছিল সেন্টার হাফ ( CH ) {চিত্র- ১} । এই রোলের প্রথাগত এস্টাবলিশমেন্ট হয় প্রখ্যাত ইতালিয়ান কোচ ভিত্তোরিও পযসো ( Vittorio Pozzo) এর আমলে ( ১৯২৯-১৯৪৮ ) সালে । তিনি লুইসিতো মন্তিকে রেগিস্তা রোলে খেলান , তাঁর ২-৩-২-৩ এর প্রাচীন ফর্মেশনে। তার মূল কাজ ছিল দুইটি , ১) বিপক্ষে দলের সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ডকে মার্ক করা অর্থাৎ থ্রি ম্যান ডীফেন্স এর সেন্ট্রাল সিবি হিসাবে খেলা, ২) চার্লি রবার্টস এর রোল অর্থাৎ লং পাসের মাধ্যমে উইঙ ( এবং এই ফর্মেশনে রাইট ও লেফট মিডের ) কাছে লং বল সাপ্লাই দেওয়া {চিত্র-২} । ইন্তার মিলানে হেলেনিও হেরেরার আমলে ( ১৯৬০-১৯৬৮) লুইজ সুয়ারেজ ( এইজন স্পানিশ কিন্তু!!) ৪ জন ডিফেন্সিভ প্লেয়ারের সামনে সেন্ট্রাল মিড হিসেবে খেলতেন কিন্তু ফল ব্যাকের সময় তার পজিশন হয়ে যেত একজন “কোয়ার্টার-ব্যাক” এর মত ।

 

 

রেগিস্তা হলো একটি ইতালিয়ান শব্দ , যার মানে হলো “Dictator” অর্থাৎ রেগিস্তার কাজ হলো ডিফেন্সিভ কাভার এনসিওর করে টিমের অফেন্সিভ গেমপ্লে পরিচালনা করা । পুরো মাঠ দৌড়ানো ( বক্স টু বক্স একটা উদাহরণ হতে পারে) রেগিস্তার কাজ নয় , বরং সেন্টার ব্যাকদের সাথে থেকে বল এমনভাবে চুলচেরা পজিশনিং এবং দক্ষতার মাধ্যমে পাস করা , যাতে টিভি ক্যামেরাও তাক লেগে যায় যে এই অ্যাঙ্গেল দিয়ে বল কিভাবে পাস দেওয়া সম্ভব । বুঝাই যাচ্ছে , রেগিস্তা হতে গেলে একটা সোলেলি ডিফেন্সিভ সিস্টেমের সাথে সাথে ডিপে থেকে ফরোয়ার্ডের খেলোয়াড়দের নিখুঁত বল পাস দেওয়ার কঠিন কাজটাকে দক্ষতার সাথে আয়ত্ত্ব করতে হয়। বুঝাই যাচ্ছে যে ওভারলি ডিফেন্সিভ ইতালীয়ান ফুটবলের পক্ষেই সম্ভব রেগিস্তার মত একটা কঠিন কিন্তু ডিফেন্সিভলি ইন্টারেস্টিং একটা রোলকে দিনের পর দিন নার্চার করা।

 
মর্ডান ডে ফুটবল অনেকটাই অর্থোডক্স ৪-৪-২ অথবা ৪-২-৪ অথবা ৪-৩-৩ এর উপর নির্ভর । কিন্তু সেখানেই রেগিস্তার নতুন ইন্ট্রোডাকশন হয়েছে । ইদানিংকালে সিরি আ তে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ৪-৪-২ অথবা ৪-৩-৩ ফর্মেশন খেলার মাঝখানেই ভেঙে ৩-৫-২ হয়ে যায় ( ফ্লুইড ফর্মেশন , অবশ্য নাও হতে পারে এবং সলিড ফোর ম্যান ডিফেন্স থাকতে পারে, এই ফ্লুইড স্ট্রাকচারের ভালো উদাহরণ জুভেন্তাসে লিখস্টাইনার এর রোল ‘১৪-‘১৫ সালে ) এবং সেক্ষেত্রে কখনো কখনো ১) একজন সেন্ট্রাল মিড সেন্ট্রাল ব্যাক হয়ে, ২) দুইজন ডিফেন্সিভ মিডের মঝে একজন মিড থেকে {চিত্র-৩} , ৩) ফোর ম্যান ডিফেন্সের সামনে “শিল্ডিং অ্যান্ড শিল্ডেড ফর্মূলা” অ্যাপ্লাই করে (পিরলোর উদাহরণে একটু পরে যাচ্ছি) – রেগিস্তা রোল প্লে করে। আর জেনুইন ৩-৫-২ ( দুই উইংব্যাকের কাহিনী ) তে রেগিস্তা রোল তো একটু আগেই বললাম।

 

 
তাহলে রেগিস্তার প্রধানত দুই ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকাটা বাধ্যতামূলক –
১) ডিফেন্সিভ কাভার দেওয়া ( ৩-ম্যান অথবা ৪-ম্যান ডিফেন্সের সামনে অথবা সিবির অংশ হিসেবে ) । অর্থাৎ প্রতিপক্ষের প্লেয়ারদের কাছ থেকে নিজেদের মাঝমাঠে বল উইনিং , ট্যাকল এবং ইন্টারসেপশন , এফেক্টিভ লেস টাইম হোল্ডিং জরুরী বৈশিষ্ট্য।
২) লং বল পাসিং এ দক্ষতা । কেবল লং বল ই নয় , উপরে উঠে গেলে অথবা LCM অথবা RCM কিছুটা ফলব্যাক করলে তাদের এফেক্টিভ শর্ট পাস দেওয়াটাও রেগিস্তার দায়িত্ব বৈকী।

 
তর্কাতিতভাবে হালের জমানার সেরা রেগিস্তা হলো পিরলো । আনচেলত্তির মিলানে ৪-৩-২-১ অথবা ৪-৩-১-২ তে ডিফেন্সের ব্যাক ফোরের সামনেই ডিপ লায়িং পজিশনে পিরলো খেলতেন এবং তাঁর সতীর্থ গাত্তুসো এবং সীডর্ফের সাথে ( পরবর্তীতে আম্ব্রোসিনি যুক্ত হন ) একটা ন্যারো মিডফিন্ড তৈরী করেছিলেন । খুবই এফেক্টিভ এই মিডফিল্ড প্রত্যেকটা খেলায় ডিফেন্স লাইনের উপর চাপ কমিয়ে দিতো এবং অ্যাটাকে বিশেষ অবদান রাখতো। একটা কথা এখানে বলে রাখা ভালো , সীডর্ফ আর গাত্তুসোর রোটেটিং বল প্লেয়িং স্টাইল পিরলোকে বল লুজ করার হাত থেকে শিল্ডেড করতো {চিত্র-৪} । জুভেন্তাসে ঠিক একই শিল্ড তাঁকে দিতো মার্কিসিও , ভিদাল আর স্তুরারো {চিত্র-৫} ।

 

একজন ডিস্ট্রাকটিভ মিড যে রেগিস্তা হতে পারে , তার প্রমাণ হইলো বায়ার্নের এবং লিভারপুলের জাবি আলোনসো ( লিভারপুলের ব্যাপারটাতে আমি সিওর না অবশ্য , তবে খেলা দেখে আমার তাই মনে হয়েছে) {চিত্র-৬} ।

 

 

আধুনিক ফুটবলে রেগিস্তা রোলের সফলতার এতো ভুরি ভুরি নিদর্শন আছে যে , এর মধ্যে উদাহরণ খুঁজে পাওয়া কঠিন কিছু নয় । কেবল একটাই উদাহরণ দেই , ‘১২ ইউরোতে জার্মানীর সাথে দেই বিখ্যাত ম্যাচে পিরলোর ৬৬ টা পাসের মধ্যে ৬১ টি টাই অ্যাকুরেট ছিল {চিত্র-৭} । তবে সেই ম্যাচে পিরলো মোটামুটি ফ্রি রোলেই খেলেছে এবং অ্যাটাকিং থার্ডে তাঁর ব্রিলিয়ান্স চোখে পড়ার মত ।

 

প্রায় সকল ইতালিয়ান ক্লাবই এখন রেগিস্তা হান্ট এবং নার্চার করছে । কেবল ইতালিয়ান ক্লাবগুলোই নয় , বরং অন্যান্য অনেক ইংলিশ এবং ফ্রেঞ্চ ক্লাবই ( স্প্যানিশদের মধ্যে রেগিস্তা খেলানো সম্পর্কিত আগ্রহ বোধহয় একটু কমই) রেগিস্তা অনুসন্ধানে ব্যাস্ত।
( ইউটিউব এবং গুগলের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ)

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

three × four =