রিয়াল মাদ্রিদের যদি এবং কিন্তু

এপ্রিলের শক্ত শিডিউল উতরেছেন ভালমতই । বায়ার্ন , এতলেটিকো , বার্সা – বাঘা বাঘা সব প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলে , দুর্ঘটনা বলতে একটাই , স্যান্তিয়াগো বার্নাবিউতে মর্যাদার এল ক্লাসিকোতে হার । কিন্তু জিনেদিন জিদানের ট্যাকটিকস এরপরেও সমালোচক বিশ্লেষকদের  আতস কাঁচের নিচে । না , দলকে তিনি ঢেলে সাজান নি । বড় কোন চমকও দেন নি । বরং , মাদ্রিদ বহুল ব্যবহৃত আর বহুল আলোচিত “তারকা” খেলোয়াড় দের দলে “স্থায়ী”  সুযোগ দিতে যেয়েই যেন জিদান প্রশ্নের সম্মুখীন । স্বয়ং মাদ্রিদ ফ্যানবেজের কাছেই ।

রিয়াল মাদ্রিদের ম্যানেজার হিসেবে জিনেদিন জিদানের প্রিয় একাদশ সবারই মুখস্ত । বার্সেলোনার আক্রমনত্রয়ী এমএসএন এর মত নামকরনে বিবিসি ( বেল , বেনজেমা , ক্রিস্টিয়ানো ) – যার তিনজনের তিনজনই ফিট থাকলে তারা সবাইই “অটো চয়েস” । দিনের পর দিন যাচ্ছেতাই পার্ফর্ম করেও বেনজেমা , রিয়াল মাদ্রিদের মত একটা বিশ্বসেরা ক্লাবের নাম্বার নাইন । হান্ড্রেড মিলিয়ন ম্যান গ্যারেথ বেল মৌসুমের অর্ধেকটা সময় থাকেন হাসপাতালে , ইনজুরির সাথে যুদ্ধে ব্যস্ত । এরপরেও ঘুরেফিরে ওই বিবিসিতেই ভরসা জিদানের । কালেভদ্রে সুযোগ পাওয়া স্প্যানিশ স্ট্রাইকার মোরাতা , এরইমধ্যে স্ট্যাটিস্টিকালি এবং মাঠের খেলা দিয়ে নিজেকে বেনজেমার থেকে প্রথম একাদশের অনেক বড় দাবীদার প্রমান করেছেন । এরপরেও সেই বেনজেমাই ফার্স্ট চয়েস স্ট্রাইকার জিনেদিন জিদানের ।

বার্সেলোনার বিপক্ষে ভাবা হচ্ছিল , সদ্য ইনজুরি থেকে ফেরা গ্যারেথ বেলের বদলে হয়তো অন্যকিছু দেখব আমরা  । কিসের কি ! বেল নামলেন , আঘাত পেলেন , এবং হাসপাতালে গেলেন ! আর যাই হোক , আন্তর্জাতিক ফুটবলে আপনি এমন একটি “সেট ট্রায়ো” এর উপর ভরসা করতে পারেন না , যার মধ্যে একজন থাকে মৌসুমের অর্ধেকের বেশি সময় হাসপাতালে , আর আরেকজন থাকে মৌসুমজুড়ে অফফর্মে ।

আক্রমণভাগে কিছু পরিবর্তন তাই একদম অনিবার্য ছিল । দলে নিয়মিত সুযোগ না পাওয়া জেমস , সুযোগ পেলেই নিয়মিত ভাল পারফর্ম করা ইস্কো , রিয়ালের সুপার সাব হয়ে ওঠা মোরাতা , মৌসুমের শুরুতে বেশ ঘনঘন সুযোগ পেয়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করা স্প্যানিশ তরুণ এসেন্সিও , আর মদ্রিচের ক্লোন – কোভাচিচ –  একসাথে  এই ৫ জন কে নামিয়ে দিলে দেপোর্তিভো লা করুনার সাথে একদম বাঁচা মরার মত একটা ম্যাচে ।  প্রায় বি টিম নিয়ে দেপোর্তিভোর মাঠে তাদের সাথে খেলা , অনেকেই ভয় পেলেন । কি হবে শেষ পর্যন্ত ?

কিন্তু মাদ্রিদ এর তরুণরা দেখালো আসলে ফুটবলটা কিভাবে খেলতে হয় । রিয়াল মাদ্রিদের টিপিকাল ক্রসিং বেজড ফুটবল থেকে বের হয়ে , আরো অনেক ক্রিয়েটিভ বিল্ড আপ প্লে , ইস্কো-কোভাচিচ-এসেন্সিওর দুর্দান্ত ড্রিবলিং , কোভাচিচের ক্রিয়েটিভ পাসিং ,  সামনে  মোরাতার গতিশীল মুভমেন্ট এবং ডান প্রান্ত থেকে কলোম্বিয়ান প্লেমেকার জেমসের সাপোর্টিং স্ট্রাইকার রোল প্লে – সব মিলিয়ে মাদ্রিদ কে লাগল ভয়ংকর । রিয়াল মাদ্রিদ গোল হজম করল ২ টি । গোল দিল ৬ টি ।

তখন থেকেই শুরু হলো একদম অনিবার্য আলোচনাটি  । তবে কি জিদানের ট্যাকটিকসে ভুল ? তার দল সিলেকশনে ভুল ? মাদ্রিদের প্রথম একাদশ হওয়া উচিত কেমন ?

হবেই । এটাই ফুটবল । কোনোকিছু শিওর না ।

সাধারণত রিয়াল মাদ্রিদ খেলে থাকে , ক্রসিং বেজড উইং প্লে । দলে রোনালদো , বেল , রামোসের মত ভাল হেডার এবং ক্রুস – মদ্রিচের – মার্সেলো – কারভাহাল এর  মত ভাল ক্রসার থাকায় , মাদ্রিদের মুল লক্ষ্য থাকে ক্রস করা । ১৫ টি ক্রস করলে দুইটি গোল হবেই । আর শেষ ১৫ মিনিট , প্রতিপক্ষ যখন ক্লান্ত পরিশ্রান্ত – রিয়াল মাদ্রিদ তখন খেলে অল আউট এটাকে । একদম অন্তিম মুহুর্তে রিয়াল মাদ্রিদের অনেক অনেক গোল দেয়ার মুল কারন এটিই ।

কিন্তু এই ক্রসিং সিস্টেম মাঝেমধ্যে একদমই কাজ করেনা । ক্রস ঠেকানোর উপায়ও যেমন কারো জানা নেই , একইভাবে মাদ্রিদের সেরা একাদশের “নেক্সট মুভ” কি হতে পারে – সেটাও সবারই জানা । ডিফেন্ড করাও তাই সহজ । কম্প্যাক্ট ডিফেন্সের সামনে তাই রিয়াল মাদ্রিদ আক্রমনভাগ মাঝে মধ্যে বড় বেশি মলীন ।

দুনিয়ার অন্যতম সেরা দুইজন সেন্টার মিডফিল্ডার খেলেন মাদ্রিদের “ডিফল্ট একাদশ” এ । টনি ক্রুস আর লুকা মদ্রিচ । টনি ক্রুস , স্ট্যাটিস্টিকালি বিশ্বের সেরা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার । কিন্তু তিনি “স্ট্যাটিস্টিকালি” যতখানি ভাল , ক্রিয়েটিভ এস্পেক্টে ততখানি নন । টনি বল হারান কম , মিসপাস দেনই না বলতে গেলে , মাঝেমধ্যে ড্রপ ব্যাক করে , দুই সেন্টার ব্যাকের সমান্তরালে অবস্থান করে সামনে পাস স্প্রে করেন আর মাদ্রিদের সেট পিস গুলি নেন – তার পাসিং একিউরেসি , পাস কমপ্লিশন রেট আর এসিস্ট এর স্ট্যাট গুলি হয় একদম টপক্লাস  । কিন্তু টনি ক্রুস একজন ইনিয়েস্তা কিংবা ওজিলের মত “ক্রিয়েটিভ” নন । তাই কম্প্যাক্ট ডিফেন্স এর বিরুদ্ধে , সেরকম পেনেট্রেটিং কি পাস , কিংবা লং বল আসে না । মদ্রিচের ধার বেশ খানিকটা কমে এসেছে । স্বাভাবিক । বয়সের ভার ।

এই সমস্যার সমাধান জিদানের স্কোয়াডেই আছে । এট্রিবিউটস ওয়াইজ , কোভাচিচ – লুকা মদ্রিচকে একদম ক্লোনিং করেন । সাথে যোগ করুন তার গতি । একজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার এরকম গতশীল হবেন – কল্পনাই করা যায় না । সুতরাং মাঝেসাঝে , কিছু ম্যাচ থাকে – যেখানে ক্যাসেমিরোকে খেলানোর প্রয়োজন পড়েনা । সেখানে ক্রুসের পাসে কোভাচিচ কে ট্রাই করাই যায় । কিংবা ক্রুস-মদ্রিচ-কোভাচিচ-ক্যাসেমিরোর মাঝে রোটেট করে দুইজন কে নামানো যায় । এখন সময় এসেছে রিয়াল মাদ্রিদের “ফ্ল্যাট” ৩ ম্যান মিডফিল্ড কে চেইঞ্জ করা । আগপিছ করা । একটা ডাবল পিভোট বানানো । টনি ক্রুস এখন অনেক পরিনত , ডাবল পিভোট ফর্ম করার জন্য । ক্রুস/কোভাচিচ  -ক্যাসেমিরো মিলে চমৎকার একটা ডাবল পিভোট হয় । এই পিভোটের সামনেই থাকতে পারে ইস্কো অথবা জেমস এর কোন একজন – প্লেমেকার হিসেবে ।  মিডফিল্ডের ডেস্ট্রয়ার-ডিস্ট্রিবিউটর-ক্রিয়েটর থিওরি অনুযায়ী , পাস স্প্রেয়ার হিসেবে ক্রুস আর এংকর হিসেবে ক্যাসেমিরোর মত , ক্রিয়েটর হিসেবে  ইস্কো অথবা জেমসের দরকার আছে । দেপোর্তিভো আর গিওনের সাথে ইস্কোর কাছ থেকে আমরা যেরকম ড্রিবলিং , স্পেস মেকিং , প্লেমেকিং কিংবা ক্রিয়েটিভ বিল্ড আপ দেখেছি – তাকে নাম্বার ১০ রোল খেলানোর  থেকে বেটার অপশন আর হতে পারেনা । অথবা জেমস । ইস্কোর সাথে জেমসের পার্থক্য হলো , জেমস অনেক বেশি ডিরেক্ট । সে বল প্লে করে , নিজেও সামনে ধাবমান হয় , শট নেয় , গোলস্কোরিং  এটেম্পট করে – দিনশেষে নামের পাশে গোল থাকে । ইস্কো ড্রপ ব্যাক করা প্লেমেকার । এমনকি দুইজনকে একসাথেও প্লট করা সম্ভব , একজন সেন্টারে , আরেকজন উইং এ । উইং এ থাকলেও  , হালের টিপিক্যাল ফলস উইংগার দের মত সেন্ট্রাল ড্রিফটিং করে , ফর্মেশনটাকে আরো খানিকটা ফ্লুইড বানিয়ে দিবেন – ইস্কো কিংবা জেমস যেই থাকুন না কেন উইং এ ।  সাথে আরেক উইং এ এসেন্সিও খেলা মানে, ইঞ্চ পার্ফেক্ট ক্রসিং এর  সাথে , বেশ কিছু সলো রান , আর ইফেক্টিভ ড্রিবলিং ।

বাকি থাকে স্ট্রাইকার পজিশন । রোনালদো প্রথাগত স্ট্রাইকার নন । তিনি বক্সে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে পছন্দ করেন না । অফ দ্যা বলে , তার দুর্দান্ত পজিশনিং এর জন্য , লেফট উইংগার হিসেবে খেললেও , তিনি কোনাকুনি ভাবে রান নিয়ে , অফসাইড এড়িয়ে ঠিকই গোলস্কোরিং পজিশনে চলে যান । যার ফলাফল এত এত “ট্যাপ ইন” গোল । ট্যাপ ইন জিনিসটা সহজ মনে হলেও , ট্যাপ ইন পজিশনে যাওয়াটা এত সহজ নয় । রোনালদো যদি নিজেকে সেন্টারে মানিয়ে নিতে পারেন তাহলেও হয় । রিয়ালের সব সমস্যার সমাধান । আর তা নাহলেও তেমন সমস্যা নেই । দলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার জন্য একটা  উইংগার স্যাক্রিফাইস করাই যায় । সেক্ষেত্রে সেন্টারে মোরাতাই সবথেকে কার্যকরী  ।

নিচে দুইটি একাদশ দিচ্ছি , রিয়াল মাদ্রিদের “সম্ভাব্য”  একাদশ । কেবল সম্ভাবনা জিদান উড়িয়ে না দিলেই হয় !

       

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

14 − four =