রাহিম স্টার্লিং – আসলেই কি £৪৯ মিলিয়নের যোগ্য?

কালকে রাত থেকে ফুটবল ফলোয়ারদের আলোচনার বিষয়বস্তু মূলত একটাই। লিভারপুলের ইংলিশ উইঙ্গার রাহিম স্টার্লিং এর ম্যানচেস্টার সিটিতে গমন। বিশ বছর বয়সী এই উইঙ্গারের দলবদল যতটা না আলোচিত হচ্ছে সরাসরি লিভারপুলের শত্রুশিবিরে যোগ দেওয়ার জন্য, তাঁর থেকেও বেশী আলোচিত হচ্ছে ট্রান্সফার ফি এর জন্য। তরুণ এই উইঙ্গারের জন্য আগে থেকেই ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড চাচ্ছিল লিভারপুল, ম্যানচেস্টার সিটিও কমবেশী সেই ৫০ মিলিয়ন পাউন্ডই (৪৯ মিলিয়ন পাউন্ড) দিতে রাজী হয়ে গেল।

এর ফলে কম বয়সেই তারকাখ্যাতি পেয়ে যাওয়া এই উইঙ্গার অনেকগুলা রেকর্ডও করে ফেলছেন। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামী অনুর্ধ্ব-২১ খেলোয়াড়, ফুটবল ইতিহাসের ১৩ তম সবচেয়ে দামী খেলোয়াড়, সবচেয়ে দামী ইংলিশ খেলোয়াড়, গ্যারেথ বেলের পর সবচেয়ে দামী ব্রিটিশ খেলোয়াড়, সুয়ারেজ ও টরেসের পর লিভারপুলের সবচেয়ে বেশী দামে বিক্রিত খেলোয়াড়, ম্যানচেস্টার সিটির সবচেয়ে দামী সাইনিং – সব এখন স্টার্লিং। রাফায়েল বেনিতেজের আমলে কুইন্স পার্ক রেইঞ্জার্স থেকে মাত্র ০.৬ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে লিভারপুলে আসা স্টার্লিং দেড়বছর আগে যেখানে মূল একাদশেই জায়গা পেতেন না তাঁর জন্য দেড়বছর পর ৪৯ মিলিয়ন পাউন্ড পাওয়া – লিভারপুল সমর্থকদের খুশি না হবার কোন কারণ নেই।

28ca75cce01c74f372d9bf057dadb895_crop_north

এখন প্রশ্ন হল দেড়বছরে স্টার্লিং এমন কিছু কি করে ফেলেছেন যার জন্য ম্যানচেস্টার সিটিকে ৪৯ পাউন্ড খসাতে হচ্ছে? একজন লিভারপুল সমর্থক হয়েও আমি বলব, না। যে ট্রান্সফার ফি এর জন্য স্টার্লিং এর নাম জিদান, টরেস, সুয়ারেজ, বেল, ইব্রা, ওজিল, ডি মারিয়া – এদের সাথে এক কাতারে বসতে যাচ্ছে, উপরোক্ত খেলোয়াড়দের তুলনায় স্টার্লিং এমন কিছুই করেনি। হয়তবা আমি যদি সিটির কর্তাব্যক্তিদের জায়গায় থাকতাম স্টার্লিং এর জন্য ১৫ মিলিয়ন পাউন্ডও খরচ করতাম না। তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে সিটি এতশত জেনেও কেন স্টার্লিং এর জন্য অতিরিক্ত খরচ করছে? যেখানে তাদের অ্যাটাকে খেলার জন্য যথারীতি ইয়োভেটিচ, নাসরি, নাভাস, বোনি, অ্যাগুয়েরো, সিলভা – ইত্যাদি খেলোয়াড় আছে? আবার যেহেতু ম্যানচেস্টার সিটির উপর ফিফা ফেয়ার প্লে এর খড়্গ উঠে গেছে তাই বলা যেতে পারে স্টার্লিং ছাড়াও বুন্দেসলিগায় গত মৌসুমের সেরা খেলোয়াড় কেভিন ডে ব্রুইনিয়াও আসতে পারেন সিটিতে। ধরে নিলাম এই মৌসুমে সিটি থেকে ইয়োভেটিচ, জেকো চলে যাবেন। তারপরেও কি স্টার্লিং এর জন্য মূল একাদশে জায়গাটা নিশ্চিত হচ্ছে? সিটির দীর্ঘদিনের সেনানি ডেভিড সিলভা, সার্জিও অ্যাগুয়েরো, সামির নাসরি এদের সরিয়ে কি রাহিম স্টার্লিং জায়গা করে নিতে পারবেন মূল একাদশে? উত্তরটা তোলা থাক সময়ের কাছে।

ভলফদবুর্গের কেভিন ডে ব্রুইনিয়াও আসতে পারেন সিটিতে
ভলফদবুর্গের কেভিন ডে ব্রুইনিয়াও আসতে পারেন সিটিতে

তাহলে যার সিটির মূল একাদশে জায়গা পাওয়া নিয়েই মোটামুটি টানাটানি, তাকে ম্যানচেস্টার সিটি নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে দামী খেলোয়াড় বানাচ্ছে কেন? কারণ ত আছে নিশ্চয়ই।

আর সে কারণটাই এখন ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব একটু।

কারণটা আর কিছুই নয় – কারণটা হল ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের “হোম গ্রোউন কোটা (Home Grown Quota/HG Quota)”। ইংলিশ লিগের এই নিয়মটা হল অনেকটা এরকম – প্রত্যেকটা প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবেরই ২৫ জনের স্কোয়াডে অন্ততপক্ষে ৮ জন করে Home Grown খেলোয়াড় থাকা লাগবে। Home Grown বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে সেই খেলোয়াড়কে, যে কিনা ২১ বছর বয়সে পদার্পণের পূর্বেই ইংল্যান্ড ও ওয়েলশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশানের তালিকাভুক্ত যেকোন ক্লাবে অন্ততপক্ষে তিন মৌসুম (৩৬ মাস) ধরে রেজিস্ট্রিকৃত থাকবেন/থেকেছেন ; সেই খেলোয়াড়ের জাতীয়তা বা বয়স যাই হোক না কেন। এখন ব্রিটিশ খেলোয়াড় বলতেই যে Home Grown তার কিন্তু কোন মানে নেই। আবার বিদেশী খেলোয়াড় হলেই যে তিনি হোম গ্রোউন হতে পারবেন না এটাই কিন্তু নয়। উদাহরণস্বরূপ টটেনহ্যামের ইংলিশ ফুলব্যাক এরিক ডায়ার ও বার্সেলোনার ক্যামেরুনিয়ান মিডফিল্ডার অ্যালেক্সান্দার সং এর কথা ধরা যাক। ২৭ বছর বয়সী মিডফিল্ডার অ্যালেক্স সং ২১ বছর বয়সের আগেই তিন মৌসুম আর্সেনালের রেজিস্ট্রিকৃত খেলোয়াড় ছিলেন – তাই তিনি ইংলিশ লিগের একজন Home Grown খেলোয়াড়। আবার ইংলিশ হলেও ২১ বছরের এরিক ডায়ার কিন্তু Home Grown খেলোয়াড় নন। কারণ দশ বছর বয়স থেকেই ডায়ার পর্তুগালে বসবাস করতেন, ছিলেন স্পোর্টিং লিসবনের তালিকাভুক্ত খেলোয়াড়। গত মৌসুমে টটেনহ্যামে যোগ দেওয়া ডায়ার ২১ বছরে পদার্পণ করার পূর্বে কোন এফএ তালিকাভুক্ত ক্লাবের রেজিস্ট্রিকৃত খেলোয়াড় ছিলেন না তিন মৌসুম ধরে। তাই তিনি Home Grown খেলোয়াড় না।

এখন, ফুটবল অ্যাসোসিয়েশান (এফএ) এই Home Grown Quota নিয়ে বেশ ভালোই কড়াকড়ি শুরু করেছে। নূন্যতম আটজন Home Grown খেলোয়াড় থাকা লাগবে প্রত্যেকটা প্রিমিয়ারশিপ ক্লাবের। ফলে অন্য দেশের খেলোয়াড়দের পিছনে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালা চেলসি-সিটির মত ক্লাব মূলত পড়েছে বিপাকে। নূন্যতম আটজন Home Grown খেলোয়াড় স্কোয়াডে রাখার জন্য তারা মোটামুটি মাঝারি মানের Home Grown খেলোয়াড়ের জন্যেও চূড়ান্তপরিমাণে টাকা ঢালার জন্য রাজী হচ্ছে, শুধুমাত্র এফএ’র রোষানলে না পড়ার জন্য। যেসব Home Grown খেলোয়াড়কে চাচ্ছে এসব Home Grown Player হীন ক্লাবগুলো, তাদের ক্লাব এই সুযোগে Home Grown খেলোয়াড়দের দামও বাড়িয়ে করে দিচ্ছে আকাশচুম্বী। এবং সিটির মত যেসব ক্লাবের Home Grown খেলোয়াড় নেই, তাদের ঐ inflated দামেই কিনতে হচ্ছে Home Grown খেলোয়াড়দের। যারই জ্বলন্ত উদাহরণ এই রাহিম স্টার্লিং।

কিংবা গত মৌসুমে ইংলিশ স্ট্রাইকার ড্যানি ওয়েলবেকের ১৬ মিলিয়ন পাউন্ডে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে আর্সেনালে যাওয়া। কিংবা ক্যালাম চেইম্বার্সের মত সাউদাম্পটনের সেকেন্ড চয়েস রাইটব্যাকের জন্য আর্সেনালের ১৬ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করা। কখনো ভাবতে পেরেছিলেন ওয়েলবেকের মত ক্লাব পর্যায়ে সুপারফ্লপ একটা স্ট্রাইকারের জন্য আর্সেনাল ১৬ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করবে? আর্সেনাল করেছিল। এবং করেছিল বলেই Home Grown এর এই ঝঞ্ঝাট আর্সেনালের নেই। গোলরক্ষক ওজিয়েইক শোয়েসনি ও ডামিয়ান মার্টিনেজ, রাইটব্যাক হেক্টর বেয়েরিন ও ক্যালাম চেইম্বার্স, লেফটব্যাক কিয়েরান গিবস, মিডফিল্ডার অ্যারন র‍্যামসি, জ্যাক উইলশেয়ার, স্ট্রাইকার ড্যানি ওয়েলবেক – আর্সেনালের Home Grown খেলোয়াড় আছেন আটজনই।

ওয়েলবেকের ১৬ মিলিয়ন পাউন্ড দাম কি শুধুই তাঁর পারফরম্যান্স ও ট্যালেন্টের ছিল?
ওয়েলবেকের ১৬ মিলিয়ন পাউন্ড দাম কি শুধুই তাঁর পারফরম্যান্স ও ট্যালেন্টের ছিল?

ঝামেলায় নেই লিভারপুলও। Home Grown স্টিভেন জেরার্ড, গ্লেন জনসন, ব্র্যাড জোনস ও রাহিম স্টার্লিং ক্লাব ছাড়লেও তারা ক্লাবে পাচ্ছে জেইমস মিলনার, অধিনায়ক জর্ডান হেন্ডারসন, জর্ডন আইব, স্ট্রাইকার ড্যানিয়েল স্টারিজ-রিকি ল্যাম্বার্ট-ফাবিও বোরিনি ও ড্যানি ইংস, ফুলব্যাক ন্যাথানিয়েল ক্লাইন ও জন ফ্ল্যানাগান, সেন্টারব্যাক জ্যো গোমেজ – সবাই Home Grown খেলোয়াড়।

ঝামেলায় আছে ম্যানচেস্টার সিটি। গত মৌসুমে গোলরক্ষক জ্যো হার্ট ও রিচার্ড রাইট, লেফটব্যাক গায়েল ক্লিশি, মিডফিল্ডার ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড, জেইমস মিলনার ও স্কট সিনক্লেয়ার, সেন্টারব্যাক দেদ্রিক বোয়্যাটা, স্ট্রাইকার জন গুইডেট্টি – এদের নিয়ে আটজন পূরণ করলেও এবার ক্লাব ছেড়ে চলে গেছেন ল্যাম্পার্ড, সিনক্লেয়ার, মিলনার, গুইডেট্টি, বোয়্যাটা। ফলে ঐ পাঁচজনের জায়গা পূরণ করার জন্য নতুন Home Grown খেলোয়াড় লাগবে তাদের। রাহিম স্টার্লিংকে তাই এই অস্বাভাবিক দামে দলে নেওয়া, সাথে বার্সা থেকে অ্যালেক্স সং বা ফুলহ্যামের তরুণ স্ট্রাইকার প্যাট্রিক রবার্টস, অ্যাস্টন ভিলার মিডফিল্ডার ফ্যাবিয়ান ডেলফ কিংবা আর্সেনালের জ্যাক উইলশেয়ার, এভারটনের রস বার্কলি ও জন স্টোনস – এদের দিকেও নজর দিয়েছে তারা , দিতে চাচ্ছে আকাশচুম্বী দাম। প্যাট্রিক রবার্টস – ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় বিভাগে ফুলহ্যামের হয়ে খেলা এই তরুণ স্ট্রাইকার, গত মৌসুমে যে প্রিমিয়ার লিগে খেলেছিলই সাকল্যে ৪৪ মিনিট, তাঁর জন্য সিটি দিতে চাচ্ছে ১০ মিলিয়ন পাউন্ড! কিংবা এক মৌসুম এভারটনের হয়ে নিয়মিত খেলা ডিফেন্ডার জন স্টোনসের জন্য তারা দিয়ে চাচ্ছে ২০ মিলিয়ন পাউন্ড। ভাবা যায়?

চেলসিরও সেরকম ঝামেলা নেই। মূল একাদশের Home Grown খেলোয়াড় আছেন অধিনায়ক জন টেরি, সেন্টারব্যাক গ্যারি ক্যাহিল ও মিডফিল্ডার সেস ফ্যাব্রিগাস। তাদের যুবদল থেকে চাইলে তারা লুইস বেকার, ইসাহ ব্রাউন, ডমিনিক সোলাঙ্কি, রুবেন লফটাস-চিক, ন্যাথান আকে, প্যাট্রিক ব্যামফোর্ড – এসব Home Grown খেলোয়াড়কেও রেজিস্টার করতে পারে তারা।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের Home Grown খেলোয়াড় আছেন ওয়েইন রুনি, অ্যাশলি ইয়াং, ফিল জোনস, ক্রিস স্মলিং, জনি এভান্স, মাইকেল ক্যারিক, লুক শ, প্যাডি ম্যাকনেয়ার।

কেইন-ক্যারল ; টটেনহ্যামের HG খেলোয়াড়
কেইন-ক্যারল ; টটেনহ্যামের HG খেলোয়াড়

ঝামেলা নেই টটেনহ্যামেরও। হ্যারি কেইন, রায়ান মেইসন, বেন ডেভিস, ড্যানি রোজ, আন্দ্রোস টাউনসেন্ড, নাবিল বেনতালেব, টম ক্যারল, কাইল ওয়াকার – স্পার্সের হোম গ্রোউন খেলোয়াড় এরা। সাথে এই মৌসুমে যোগ হয়েছেন বার্নলি থেকে আসা রাইটব্যাক কিয়েরান ট্রিপিয়েরও।

নিচে দেখে নেওয়া যাক কোন ক্লাবে কয়জন করে Home Grown খেলোয়াড় আছেন –

home-grown-players-premier-league_3281316

স্টার্লিং এর জন্য আকাশচুম্বী ৪৯ মিলিয়ন পাউন্ড দাম মূলত ক্লাবের তরুণ খেলোয়াড় না পরিচর্যা করতে পারারই প্রতিফলন।  যেটা সিটি করেনা, যারা কিনা দাম দিয়ে শুধু খেলোয়াড় কিনতেই বিশ্বাসী। Home Grown – নামের সাথে এই ট্যাগটা যোগ হয়েই স্টার্লিংয়ের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে মোটামুটি ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের মত।  কয়েকদিন আগে তারা অ্যাস্টন ভিলায় home grown খেলোয়াড় ফ্যাবিয়ান ডেলফের জন্যেও ৮ মিলিয়ন পাউন্ড অফার করেছিল। আপনার কি মনে হয় ইয়ায়া ট্যুরে, ফার্নান্ডো, ফার্নান্ডিনিও এদের মিডফিল্ডে ডেলফ জীবনেও জায়গা পেতেন? কিংবা ফ্যাব্রিগাস, মাটিচ, রামিরেস, মিকেলদের মিডফিল্ডে জায়গা পাবেন সং? কিংবা অ্যাগুয়েরো, বোনি, জেকো, ইয়োভেটিচ এদের সাথে পেরে উঠে সিটির মূল একাদশে জায়গা পাবেন প্যাট্রিক রবার্টস? ক্লাবগুলোর HG কোটা পূরণ করার গুটি হিসেবেই ক্লাবগুলো এখন দেখছে ডেলফ-সং দের।

 

স্টার্লিংও যে সেরকম কোন গুটি না, তাঁর গ্যারান্টি কে দিতে পারে!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

nine + 1 =