রামোস এর সালাহ ট্যাকল : একজন লিভারপুল ভক্তের চোখ দিয়ে

রামোস এর সালাহ ট্যাকল : একজন লিভারপুল ভক্তের চোখ দিয়ে

খেলা নিয়ে কিছু বলতে চাইনাই। বলে লাভ নাই কোন। যা হওয়ার সেটা হয়েই গেসে। নিজেদের দোষে হারসি। এটা এমন একটা স্টেজ যেখানে জিতার জন্য পিকচার পারফেক্ট, ফ্ল-লেস ম্যাচ খেলা লাগে – কেননা প্রতিপক্ষ এমন একটা দল যারা জাত চ্যাম্পিয়ন, আর যারা খারাপ খেললেও ম্যাচ কিভাবে বের করে আনতে হয় সেটা খুবই ভালোভাবে জানে, জানে বলাটা ভুল হবে, তারা এটায় ওস্তাদ। পাঁচ বছরের মধ্যে চারবার, সব মিলায়ে তের বার চ্যাম্পিয়ন তারা এমনি এমনি হয়নাই। এদের বিপক্ষে ৮৯ মিনিট ৫৯ সেকেন্ড ভালো খেলে বাকী ১ সেকেন্ড খারাপ খেললেও ও এক সেকেন্ডের ভুলেই ক্যাপিটালাইজ করে ম্যাচ বের করে ফেলবে, এমনই দল রিয়াল মাদ্রিদ। সেখানে নিজেদের গোলকিপারের দুইটা শিশুতোষ ভুলের মাশুল রিয়াল মাদ্রিদ কড়ায়-গণ্ডায় দিয়ে দিবে, এটা জানা কথা। নিজেদের দুটা দোষে দুটা গোল না থাকলে হয়তো স্কোরটা ১-১ থেকে এক্সট্রা টাইমে যাইতো অন্তত, তাতেও মাদ্রিদই জিতত, কিন্তু তাও কষ্টটা কম হত আরকি। তাই এইখানে রামোসের ট্যাকল, সালাহর ইনজুরি নিয়ে তর্ক করার পক্ষপাতী আমি নই। শুধু রামোস এর ট্যাকলেই যদি জিতা ম্যাচ হেরে যেতাম, তাহলে হয়তোবা ভিন্ন কথা ছিল। ফুল ক্রেডিট রিয়াল মাদ্রিদের।

তবে হ্যাঁ, সালাহ এর চলে যাওয়ার পর দল ডিমোরালাইজ অবশ্যই হইসে। লিভারপুল সালাহ এর উপর কিরকম ডিপেন্ডেবল সেটা হয়তোবা আপনারা ম্যাক্সিমামই জানেন না, ৮০ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে এগিয়ে থাকার পরে সালাহ কে সাবস্টিটিউট করার পর ২ গোল খেয়ে ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়ার দল লিভারপুল। তাই এই লিভারপুলকে থামানোর একটাই উপায়, যেভাবে হোক সালাহকে থামাও। সেটা অধিনায়ক হিসেবে রামোস দায়িত্ব নিয়েই করসে। এবং এটাই স্বাভাবিক। প্রতিপক্ষ দলের বেস্ট প্লেয়ারকে থামাতেই হবে যে করে হোক, এটা কোন টিমই করবে, রিয়াল মাদ্রিদ বা রামোসও তার ব্যতিক্রম না।

রামোস এর সালাহ ট্যাকল : একজন লিভারপুল ভক্তের চোখ দিয়ে
gollachhut.com

ট্যাকলটার সময় সালাহই প্রথমে রামোসের হাতের মধ্যে নিজের হাত জড়াইসিলো, ঠিক। রামোসের নিজের দোষ ছিল না, অন্তত এই হাত জড়ানোর সময়টায়, শুরুর সময়টায়। অ্যাক্সিডেন্টাল বলেন আর যাই বলেন, ঐ কথাটা ঠিক শুরুর সময়টার জন্যই প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

কালকে থেকে যা যা শুনলাম, তা হল, রামোস আর সালাহ দুইজনই দৌড়ের উপর ছিল, হাত আটকে যাওয়ার পরে তাই রামোস সালাহ দুইজনই চলিত বাংলায় সামনের দিকে উষ্ঠা খাইয়া পড়সে, হুমড়ি খেয়ে পড়সে।

ফেয়ার এনাফ। সেটাও মানলাম। ঐ ফ্র্যাকশান অফ সেকেন্ডে অনেক কিছুই সম্ভব।

উষ্ঠা খাইয়া পড়লে আপনি আমি হলে কি করি? পতনের সময় যাতে একদম বেকায়দা হয়ে বুকের উপরে যাতে না পড়তে হয় তাই যেকোন একটা হাত দিয়ে মেঝেতে/মাঠে ঠ্যাক দেওয়ার চেষ্টা করি, হাত দিয়ে ভর দেওয়ার চেষ্টা করি, যেটা কিনা রামোস ডান হাতের তালু দিয়ে করসেও। যে কেউই করবে সেটা। মানুষের বেসিক ইন্সটিঙ্কট এগুলা।

আমার প্রশ্ন হল, সেইম কাজটা কি সে বাম হাত দিয়ে করতে পারতো না? নাকি ও যাতে ওর বামহাতটা দিয়ে সোজা করে মেঝেতে ঠ্যাক দিতে না পারে সে জন্য সালাহ আটকায় রাখসিলো? রিপ্লে দেখে কি
সেটা মনে মনে হয় আপনার? রামোস কি চাইলেই বাম কনুইটা সোজা করতে পারতো না? সালাহ এর হাতের ভেতর থেকে ওর নিজের হাতটা হয়তো বের করতে পারতো না, কিন্তু কনুই সোজা করে ডান হাতের মত তালুর উপরে ল্যান্ড তো করতেই পারত, নাকি? যেখানে ওর বামহাতটাই সালাহ এর হাতের সাথে আটকায় আসে সেটা ছাড়ানোর জন্যে হলেও তো ঐ হাতের রিঅ্যাকশানই সবার ফার্স্টে আসার কথা। তাই নয় কি? অন্তত তার যদি সালাহকে লজিক্যাল ভাবে থামানোর ইচ্ছা থাকত, সালাহ এর গুডউইল নিয়ে চিন্তা থাকত (যেটা কিনা কাল থেকেই অনেক মাদ্রিদ ফ্যান ইনিয়ে বিনিয়ে বলতেসেন) তাহলে আমার অন্তত মনে হয় বাম হাত আগেই সে সোজা করতে পারতো। সে করেনাই। তালুতে ভর না দিয়ে সালাহ এর হাতকে টেনে এনে নিয়ে বাম কনুই তে ভর দিয়ে ল্যান্ড করল। আর এটা করসে দেখেই আপনি বা আমি রামোস না, রামোস নিজেই রামোস। এক ও অদ্বিতীয়।

আপনি এখন বলতে আসবেন ঐ ফ্র্যাকশান অফ সেকেন্ডে এতকিছু মাথায় থাকে নাকি ইত্যাদি ইত্যাদি। বললে বলতে পারেন। কিন্তু এটা মাথায় রেখেন রামোস তর্কযোগ্যভাবে বিশ্বের সেরা সেন্টারব্যাক, সে কিন্তু আপনার, বা আমি নিশাত আহমেদের মত কিবোর্ড ওয়ারিয়র না। ডিফেন্সের এইসব ডার্ক আর্ট ও গুলে খাইসে। যেমনটা তার আগে খাইসিলো পেপে, ক্লদিও জেন্টাইল, মার্কো মাতেরাজ্জি, ভিনি জোন্স। নব্বই মিনিটের একটা খেলায় রামোস লেভেলের যেকোন খেলোয়াড় প্রতি সেকেন্ডে কি করবে না করবে এগুলো তারা নিজেদের মধ্যেই ক্যালকুলেট করতে পারে। যেরকম এক মাইক্রোসেকেন্ডের ক্যালকুলেশনে ডিসিশান নিয়ে ওভারহেড কিক করে কালকেই গোল করসে গ্যারেথ বেল। মাই পয়েন্ট ইজ, এইগুলা বিশ্বসেরা খেলোয়াড়দের মজ্জাগত, ওদের নিজস্ব ইন্সটিঙ্কট, যেটা আপনার আমার নাই। কখন কি করবে কেন করবে। রামোসের এইসব ইন্সটিঙ্কট কোনকালে ভালো ছিল না। কোটি কোটি লাল কার্ডই তার প্রমাণ। লাল কার্ডের হিসাব বাদ দেন। কালকে সাদিও মানে কে সে যেভাবে ট্র্যাপে ফালায়ে হলুদ কার্ড খাওয়াইলো এগুলো শুধু ঐরকম নার্ভ-রেকিং মোমেন্টে সেই করতে পারবে, যা আপনার আমার কল্পনারও বাইরে। আর রামোসের অতীত ইতিহাসও বলে না যে সে অন্তত মাঠের মধ্যে প্রতিপক্ষের গুডউইল নিয়ে খুব একটা বদার করে।

যাই হোক, ম্যাচ হারার পর আসলে এত কথা বলা উচিত না। কিন্তু কালকের পর থেকে অনেক মাদ্রিদ ফ্যান প্রথমে ইনিয়ে বিনিয়ে, পরে বুক ফুলায়ে যেভাবে ব্যাপারটাকে “পার্ট অফ গেইম” এর চাদরে হালাল করার চেষ্টা করতেসেন, জিনিসটা এত ফালতুও না।

আর ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড, রিও ফার্ডিনান্ডের স্টেটমেন্ট দিতে আইসেন না দয়া করে। বিশ্বাস করেন, ল্যাম্পার্ড বা ফার্ডিনান্ড যেরকম প্রজ্ঞাবান খেলোয়াড়, জাভি হার্নান্দেজ ও ইয়োহান ক্রুইফও তার থেকেও বেশী প্রজ্ঞাবান। কিন্তু জাভি বা ক্রুইফ আপনাদের কাছে দুইপয়সারও দাম পায়না পণ্ডিত হিসেবে কেননা তারা আপনাদের পক্ষে কথা বলেনা। এটাই স্বাভাবিক। দুইদিন আগেও আমি নিজেই স্কোলসের একটা স্টেটমেন্ট শেয়ার দিয়ে সুখ পাইসি, কারণ আমাদের পক্ষে বলসে সে, না বললে অ্যাজ ইউজুয়াল ধুয়ে দিতাম। আমাদের এগেইন্সটে কথা বললে আমরাও গোনায় ধরিনা কাউরে, সে যত বড় ফুটবলারই হোক না কেন। আপনাদের দোষ দিচ্ছিনা। তবে আজকে আপনাদের এগেইন্সটে রিও বা ফ্র্যাঙ্কি স্টেটমেন্ট দিলে আপনারাই সবার আগে গালির বন্যায় ভাসাইতেন তাদেরকে। এখন আপনাদের পক্ষে তারা কথা বলসে দেখে তাদেরকে দেবদূত ভাবতেসেন। ভাবেন। তবে একটা জিনিস মাথায় রাইখেন, আপনাদের যেরকম জাভি বা ক্রুইফ আর্চ রাইভাল, আমাদের ক্ষেত্রেও ফার্ডিনান্ড-ল্যাম্পার্ড তাই। খুবই ঠ্যাকায় না পড়লে কখনই যথাক্রমে চেলসি বা ইউনাইটেডের পক্ষে কথা বলা ছাড়া তাদের মুখ থেকে লিভারপুলের পক্ষে, বা ফ্র্যাঙ্কির ক্ষেত্রে আর্সেনাল/স্পার্স/ইউনাইটেড, রিওর ক্ষেত্রে চেলসি/আর্সেনাল/স্পার্সের পক্ষের কথা আসবেনা। এটাই স্বাভাবিক। তাই উনাদের কথাকে বেদবাক্য মানার কিছু নাই। নিজেদের পক্ষে কথা বললে সবাই ভগবান, না বললে সবাই রাবণ। আপনাদের দোষ দিচ্ছিনা। আমরা সবাই-ই এরকম দিন শেষে।

রামোস এর সালাহ ট্যাকল : একজন লিভারপুল ভক্তের চোখ দিয়ে
gollachhut.com

লিভারপুল ফ্যানবেইজের কারোর করুণার দরকার নাই। লিভারপুলের নামের আড়ালে বার্সা ফ্যানদেরই গলাবাজি করতে দেখলাম অনেক মাদ্রিদ ফ্যানদের সাথে। দরকার নাই ভাই। মাফ চাই। আমাদের পক্ষ নিয়ে এসব কাদা ছুঁড়াছুঁড়ি বন্ধ করেন। যদিও আপনাদের সেন্টিমেন্ট আমি বুঝি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এগেইন্সটে যে দল খেলবে আমি তার পক্ষই নিব, এটাই স্বাভাবিক। আজকে যে রিয়াল মাদ্রিদ ফ্যানরা উদারপন্থী হয়ে ভাবছেন বার্সেলোনা সমর্থকেরা লিভারপুলের পক্ষ কেন নিচ্ছে, হিসাব করে দেখেন রোমা বা চেলসি ম্যাচগুলাতে আপনারা কিন্তু উদারতা দেখায়ে কেউই বার্সেলোনার পক্ষ নেন নাই। সবাই দিন শেষে একই।

এত বড় পোস্টের এটাই মানে, খারাপ কে খারাপ, ভালো কে ভালো বলতে শিখেন। রামোসের একানব্বই মিনিটের গোলের জন্য তাকে অবশ্যই আপনারা গ্ল্যাডিয়েটর ভাববেন, অবশ্যই তাকে বিশ্বের সেরা সেন্টারব্যাক ভাববেন। বাট কালকের মত ডার্ক আর্টের প্রদর্শনী যখনই সে দেখাবে, অন্তত সেটা ডিফেন্ড করতে আইসেন না। এতে রামোসের চ্যাম্পিয়নস লিগ দুই একটা কমে যাবেনা, বরঞ্চ ফ্যানবেজ হিসেবে আপনাদের সেন্সিবিলিটির একটা ইতিবাচক ধারণা যাবে অন্য সবার কাছে।

সবশেষে রিয়াল মাদ্রিদকে ত্রয়োদশ চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের জন্য অভিনন্দন। ইউ গাইজ ডিজার্ভড ইট।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

twenty − nineteen =