রাজ্জাক-কাপালি: তাদেরকে বিদায় বলে দেয়ার সময় আসেনি

রফিকুল ইসলাম কামাল :: বাংলাদেশের ক্রিকেটে এটা আসলেই একটি খারাপ সংস্কৃতি। আমরা কোনো এক সময় কোনোও ক্রিকেটারকে তার খানিক খারাপ ফর্মের জন্য দল থেকে বাদ দিলে পরবর্তীতে তার কথা অনায়াসেই ভুলে যাই! এমনকি ওই বাদ পড়া ক্রিকেটারটি যদি ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্দান্ত পারফর্মও করেন, তবু তাকে দলে ফেরাতে আমাদের যেন ‘ইগো’তে লাগে! যেন বাদ পড়া ক্রিকেটারটিকে দলে ফেরালে আমাদের ইজ্জত চলে যাবে! উদাহরণ অসংখ্য দেয়া যাবে। অনেক বোলার, ব্যাটসম্যানকে আমাদের নির্বাচকরা দল থেকে বাদ দেয়ার পর ভুলে গেছেন তাদের কথা। কয়েকজনের কথাই যদি বলি, আফতাব আহমেদ, নাফিস ইকবাল, শাহরিয়ার নাফিস, নাজিমউদ্দিন, এনামুল হক জুনিয়র, অলোক কাপালি প্রমুখ ক্রিকেটারদের দল থেকে বাদ দেয়ার পর তাদের দিকে ফিরেও তাকাননি আমাদের নির্বাচকরা। এই খারাপ সংস্কৃতির সর্বশেষ বলি হচ্ছেন আবদুর রাজ্জাক!

বাংলাদেশের ক্রিকেটে সময়ে সময়ে একজন আবদুর রাজ্জাকের জন্ম কিন্তু হবে না। তার মতো স্পিন বোলার আর কবে বাংলাদেশ পাবে, তার কোনো ঠিক নেই। অসংখ্যবার আবদুর রাজ্জাক নিরবেই কাজের কাজটুকু করে গেছেন। কিন্তু তেমন করে মিডিয়ার ফোকাসটা তিনি পাননি। তাতে কি, আবদুর রাজ্জাক দমে যাননি কখনো। নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে দলের জন্য খেলে গেছেন তিনি। সেই আবদুর রাজ্জাককে সাময়িক ফর্ম খারাপের অজুহাতে দল থেকে বাদ দিয়ে ফারুক, আকরাম খানরা তাকে ফিরিয়ে আনার কথাই যেন ভুলে গেছেন! এমনকি ঘরোয়া ক্রিকেটে অসাধারণ পারফর্ম করার পরও আবদুর রাজ্জাকের ঠাঁই হচ্ছে না জাতীয় দলে! তারচেয়েও বড় বিস্ময়কর হচ্ছে, কয়েকদিন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড স্পিনারদের যে এলিট প্রোগ্রাম ঘোষণা করেছে, তাতেও ঠাঁই হয়নি রাজ্জাকের!! এতোটাই ব্রাত্য হয়ে গেছেন রাজ্জাক?! এখনই তার শেষ দেখে ফেললেন নির্বাচকরা?!

এমন নয় যে, আবদুর রাজ্জাক বাদ পড়ার পর আরো খারাপ পারফর্ম করেছেন। বাংলাদেশে জাতীয় দলে ঢুকার যে মঞ্চ, সেই ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিতভাবে সাফল্য পাচ্ছেন তিনি। সর্বশেষ জাতীয় লিগে ৭ ম্যাচে ৪১ উইকেট নিয়ে দ্বিতীয় সেরা বোলার রাজ্জাক! সর্বশেষ বিসিএল-এ ৩ ম্যাচে ১৮ উইকেট নিয়ে সেরা বোলার রাজ্জাক! তারপরও তিনি ব্রাত্য, অবহেলিত, উপেক্ষিত!!! এ কি রাজ্জাকের প্রতি অন্যায় নয়? তার মতো অভিজ্ঞ, দক্ষ আর পারফর্ম করা বোলারকে এতো সহজেই বিদায় বলে ফেলাটা কি ঠিক হচ্ছে?

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের পক্ষে সবচেয়ে বেশি ওয়ানডে উইকেট আবদুর রাজ্জাকের। ১৫৩টি ওয়ানডে ম্যাচে তার উইকেট সংখ্যা ২০৭টি। রাজ্জাকই বাংলাদেশের ২০০ উইকেটশিকারি প্রথ এবং একমাত্র বোলার। ওয়ানডেতে ইনিংসে ৪ বার তিনি নিয়েছেন ৫ উইকেট। বাংলাদেশের আর কোনো বোলারের একবারের বেশি এই কীর্তি নেই। বাংলাদেশের হয়ে এক সিরিজে সর্বোচ্চ উইকেট রাজ্জাকের (২০০৯ সাল, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৫ উইকেট)। সাকলায়েন মুশতাকের পর ইতিহাসের দ্বিতীয় স্পিনার হিসেবে ওয়ানডে হ্যাটট্রিক রাজ্জকারে (২০১০ সাল, বিপক্ষ জিম্বাবুয়ে)। এসব ছাড়াও অসংখ্য ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া বোলিং আছে রাজ্জাকের। আছে কিপ্টেমি বোলিংয়ের খ্যাতি। তার এতোসব অর্জন, এতোসব সাফল্যকে এক নিমিষেই কি করে ভুলতে পারে বাংলাদেশের ক্রিকেট? কি করে তাকে ব্রাত্য করে দেয়া হয় দলে? এ তো অন্যায়।

আবদুর রাজ্জাকের মতোই উপেক্ষিত হয়ে আছেন অলোক কাপালিও। নিয়মিত ভালো খেলেও জাতীয় দলে ঠাঁই হচ্ছে না কাপালির! অজানা কোনো এক কারণে তাকে যেন চোখেই পড়ে না নির্বাচকদের! যার উদাহরণ, সর্বশেষ হাইপারফম্যান্স ইউনিটের জন্যও কাপালিকে বিবেচনা করেননি নির্বাচকরা!! অথচ সর্বশেষ জাতীয় লিগেও অলোক কাপালি করেছেন দুই দুইটি ডাবল সেঞ্চুরী। বাংলাদেশের ক্রিকেটে আর কেউ কিন্তু একই জাতীয় লিগে দুটি ডাবল করতে পারেননি! এখানেই থেমে যাননি কাপালি, সদ্য শেষ হওয়া বিসিএল-এ সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক তিনি! তিন ম্যাচের ৬ ইনিংসে তার রান ৪০৮। একটি ডাবল সেঞ্চুরী, দুইটি ফিফটি। গড় ১০২! তবু তিনি জাতীয় দলে ব্রাত্য, উপেক্ষিত! তবু তাকে চোখে পড়ে না নির্বাচকদের!

আবদুর রাজ্জাক, অলোক কাপালিদের মতোই হয়তো শাহরিয়ার নাফিস, এনামুল হক জুনিয়রদের ‘কপাল খারাপ’! আর না হয়, তাদেরকে সহজে উপেক্ষা করতে পারতেন না নির্বাচকরা। অথচ এদের কাউকেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একজন রাজ্জাক, একজন শাহরিয়ার খুঁজে পেতে বাংলাদেশের অনেক দিন লাগবে। হ্যাঁ, বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে ভালো করছে। কিন্তু পারফর্ম করছেন কারা? সেই পুরনোরাই। মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিকরাই তরী বেয়ে চলেছেন। তাহলে কেন রাজ্জাকদের এভাবে অবহেলা? উপেক্ষা? তাদের তো এখনো অনেক কিছু দেয়ার আছে দলকে।

পাকিস্তান দল তাদের সেই পুরনো সারথি শোয়েব মালিক, মোহাম্মদ সামিদের দলে ফিরিয়ে এনেছে। ফেরাটা কি দারুণই না হলো তাদের। সামি টি-টুয়েন্টিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দারুণ বোলিং করেছেন। শোয়েব তো প্রথম ওয়ানডে দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরী করেছেন। ভারতের উদাহরণও টানা যায়। তারা তাদের সবচেয়ে অভিজ্ঞ স্পিনার হরভজন সিংকে দলে ফিরিয়ে এনেচে। তাহলে আমাদের রাজ্জাক, কাপালিদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, ধারাবাহিকতার মূল্য তবে কেন দেয়া হবে না? এখনই যদি আমরা তাদেরকে বিদায় বলে দেই, তবে মহাঅন্যায় হবে।

# লেখক: নিজস্ব প্রতিবেদক
রাইজিংবিডি ডটকম ও সিলেটভিউ২৪ডটকম
kamal.rik@gmail.com

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

three × five =