যে লড়াইয়ে জেতা কাটার দেওয়ার চাইতেও কঠিন

ক্রিকেটার বা ফুটবলার না স্প্রিন্টার – এথলেট হিসেবে একেক খেলার খেলোয়াড়দের চ্যালেঞ্জ একেক রকম। তাদের টু ডু লিস্টে আলাদা আলাদা কাজ থাকে। তবে একটা জায়গা মনে হয় সবাইকে এক জায়গায় মিলিয়ে দেয়। সে জায়গাটা হলো চোটে বা ফর্মহীনতায় পড়ে গেলে বাইরের সারা দুনিয়ার সাথে তাদের ইন্টারএকশনের ব্যাপারটা।
মুস্তাফিজের ক্যারিয়ারটা যেভাবে শুরু হয়েছে, গত ১০ বছরে এভাবে ক্যারিয়ার শুরু করতে পেরেছেন খুব কম ফাস্ট বোলারই। যারা কিছুটা হলেও এই খেলাটার সাথে আগে থেকে আছেন, তারা জানেন সবার মনেই একটা প্রচ্ছন্ন ভয় আর আশঙ্কার জায়গা ছিলো, “রোজ রোজ ওয়ানডেতে ৪ উইকেট আর টোয়েন্টিতে ৪ ওভারে ২৫ রান দেওয়া বোলারটা একদিন আস্তে আস্তে নিজের তাপ হারানো শুরু করবে!”
সাথে এই শুভকামনাটাও ছিলো, এই তাপ হারানোটা যাতে অজন্থা মেন্ডিস বা ফুটবলের ফার্নান্দো তরেস বা রোনালদিনহোর মত না হয়। নিজেদের জায়গায় সেরা হবার স্বাদ নেবার পরে নিজেকে দলের একাদশেই খুঁজে না পাবার তিক্ততা সেই নিচের দিকে নামতে থাকা খেলোয়াড়টাকে অনেক নিচে নামিয়ে দেয়! আরো অনেক নিচে! এ সময়টায় নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখাটা অনেক কঠিন বলেই আসল চ্যালেঞ্জটা লুকিয়ে থাকে ওখানেই ।
দারুন লিমিটেড ওভার বোলার হিসাবে ভয়ের জায়গা ছিলো স্টক ডেলিভারিগুলোর কার্যকারিতা হারানোর ব্যাপারটা। আজ অথবা কাল যেভাবে মেন্ডিসের ক্যারম বল টাচ লাইনে আঁছড়ে পড়েছে সেভাবে হয়তো মুস্তাফিজের কাটারও আঁছড়ে পড়বে। আর তখন নিজের গোঁড়াটা শক্ত রেখে নিজেকে বদলে ফেলতে পারলেই না মুস্তাফিজ গ্রেট! মুস্তাফিজের চাইতে এই চ্যালেঞ্জটা নিয়ে বেশি শঙ্কায় ছিলাম আমরা। কারণ, মানুষ মুস্তাফিজকে মানুষ যতটা চেনে, সে অনুযায়ী তার ক্রিকেটীয় দর্শনে খুব জটিল ভাবনা নেই। শুধু মাঠে গিয়ে চ্যাম্পিয়নের মত পারফর্ম করে দিতে জানেন।
তিনি কবিতার সেই ছেলে,
” আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে?
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে!”
তবে টিটোয়েন্টি বিশ্বকাপটার সময় থেকেই এই কাঁধের চোটের সাথে লড়াই। ম্যাচ মিস গেলো কয়েকটা। তারপরেও পারফর্ম করে গেছেন। আইপিএলেও ছিলেন সেরা পারফর্মারদের একজন। এদেশের মিডিয়া ওদেশের মিডিয়া নেচেছে। সোশ্যাল সাইটে #fizz হ্যাশট্যাগ দিয়ে ভরে গেছে। লাখে লাখে স্ট্যাটাস আর টুইট প্রসব হয়েছে।
তারপরে বিরতি দিয়ে গেলেন ইংল্যান্ডে খেলতে। সেখানেও একটা ম্যাচে দেখা গেলো সেই মুস্তাফিজকে। তবে প্রদীপের পাশে প্রদীপ নিভিয়ে দেওয়ার মত ইনজুরি নামের দমকা বাতাস ছিল সে কথা ভুলে যায় সবাই। মুস্তাফিজের ক্যারিয়ারে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ও গ্রেট হয়ে উঠুক চেয়েছিলাম। তবে ইনজুরি নামের চ্যালেঞ্জ অবশ্যই না। এই সময়টাতে বাইরের দুনিয়া বদলে যায়। মানুষ অন্য কিছু নিয়ে কথা বলা শুরু করবে। যেই মুস্তাফিজকে সবাই ফিজ ডাকা শুরু করেছিলো, সেখান থেকেই আবার ঠান্ডাভাবে মুস্তাফিজ ডাকা হবে। এই ধাপটায় খেলোয়াড়ের সবচেয়ে বড় লড়াইটা নিজের সাথে। বাইরের দুনিয়ার বদলে যাওয়া দেখেও নিজের ভিতর আগুন পুষে রাখার লড়াই। পাশের সতীর্থটাকে এগিয়ে যেতে দেখেও নিজের সেরাটা অনেক বড় মঞ্চের জন্যে পুষে রাখার লড়াই। আর সবচেয়ে বড় জায়গাটা হলো নিজেকে বিশ্বাস করার লড়াই।
১৯৯৮ এর ফাইনালের গ্লানির চার বছর পরে ওভাবে ফিরতে পেরেছিলেন বলেই রোনালদো নাজারিও হিস্ট্রিতে একজন। সব যুগের সেরা চ্যাম্পিয়নদের একজন। অন্য অনেক তরুণ প্রডিজি পারেন না বলেই তারা এবিসিডি। এই জায়গাটা ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই জায়গাটাই নির্ধারণ করে দেয় এথলেট প্রডিজি থেকে সব সময়ের চ্যাম্পিয়ন হয়ে আলো ছড়াবে নাকি এবিসিডি হয়ে হারিয়ে যাবে। পরের দলটা অনেক ভারি। তবে মুস্তাফিজ কিন্তু ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই প্রতিজ্ঞা নিয়েছেন চ্যাম্পিয়ন হবার।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

20 + 2 =