যত্তসব আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল ভাবনা!

যত্তসব আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল ভাবনা!

::: সামিউল আজিজ সিয়াম :::

আমরা সবাই, কোনো না কোনোভাবে সেই দলকেই সাপোর্ট করি, যেই দলকে ভালো মনে হয়, অথবা, যে দলের প্রতি কোনো কারণে ভালোবাসা জড়িয়ে গেছে। যে কোনো কারণে, ছোটবেলায় কেউ জার্সি গিফট করেছিল, ছোটবেলায় এই দেশের রাজধানীর নাম বা পতাকা ভালো লাগতো, বা, যেকোনো কারণ! ভালোবাসা জন্মে যেতেই পারে, সিম্পল ব্যাপার।

আমরা যারা ফুটবলে আর্জেন্টিনাকে সাপোর্ট করি, তাদের মধ্যে বেশিরভাগেরই কোনো না কোনো কারণে এই দলের প্রতি ভালোবাসা জন্মে গেছে। অনেকের ম্যারাডোনার কারণে, অনেকের প্রথম কোনো বিশ্বকাপে কোনো দলকে জিততে বা ফাইনালে উঠতে দেখায়, অনেকের মা-বাবার আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসা দেখে, কিংবা অনেকের হয়তো, আশা জাগিয়েও বারবার হারতে দেখে! আমরা কিছু মানুষ, এই হারতে দেখার যন্ত্রণাকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছি।

বাতিস্তুতার কান্নার কথা আমার বেশ পরিষ্কার মনে আছে। আরো ছোটবেলায় টিভিতে দেখেছি, বাতিস্তুতা হ্যাটট্রিক করছে! ওমা, কিন্তু কাপ জিতছে না কেন? ম্যারাডোনা না অনেক বড় প্লেয়ার, মা তো তাই বলে আসছে! আর্জেন্টিনা খেলেও তো ভালো, কিন্তু কই, আর্জেন্টিনা তো বিশ্বকাপে বারবার আশা জাগিয়েও হেরে যাচ্ছে! একেকটা হারও কী বেদনার!

আমরা এই হারতে থাকাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আমরা তবু বিশ্বাস করি, আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ পাবে। রবার্ট ব্রুস সপ্তমবার যুদ্ধে হেরে গেছেন, তা আমরা কখনো বিশ্বাস করতে চাই না। প্রতিবারই আমরা সেই সপ্তমবার ধরে নিই। বুঝেনই তো ভাই, ভালোবাসলে এমন হয়!

আমরা সবাই কি আসলে এরকমই না? বাংলাদেশ হারবে জানি, তবু ১ বলে যখন ২৬ রান দরকার তবুও হিসাব করি, এইতো, চারটা নো বলে ছয় মেরে একটা দু রান নিলেই জেতা যাবে! আমরা বাংলাদেশি, এজন্য মোটেও না। আমরা দলটাকে ভালোবাসি, হয়তো বাংলাদেশি বলেই ভালোবাসি। তবু, ভালোবাসাটাই মূল সমস্যা!

মন খারাপ হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। যে খেলায় যার দলই হারে, তার মন খারাপ হয়। ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচে বাংলাদেশ জিতলে আনন্দ পায় মাত্র ১৬ কোটির মতো মানুষ, অথচ মন খারাপ হয় অন্তত ১৩০ কোটি মানুষের! তাতে কী আসে যায়!

ব্রাজিল সাপোর্টাররা যে খেলা বুঝে আর আর্জেন্টিনা সাপোর্টাররা বুঝে না, তা না। বিষয় হলো, খেলা বোঝা আর কোনো দলকে ভালোবাসা এক কথা না। ব্রাজিলের সমর্থকরাও তো গতবারের অতি দুর্বল ব্রাজিল দলকেই সমর্থন করেছেন, ভালোবাসেন বলেই তো! আমাদের দেশে ব্রাজিল সমর্থকদের কেউ কেউ ব্রাজিল সমর্থন করেন ব্রাজিল আসলেই ভালো খেলে, এজন্য। ঐতিহ্যগত কারণেও করেন কেউ। আবার, আর্জেন্টিনা এবং আর্জেন্টিনা সাপোর্টারদের অসহ্য লাগে, এ কারণে ব্রাজিল সাপোর্ট করা মানুষজনও আছে। (যে কারণে অন্যান্য দেশের মানুষ ক্রিকেটে আমাদের সমর্থন করেন না!)

তবে আমি আমাদের কিছু মানুষদের আর্জেন্টিনা সমর্থকদের সেই চোখে দেখতে দেখি, যেই চোখে ভারতের ক্রিকেট সমর্থকরা বাংলাদেশিদের দেখে! বাংলাদেশি ক্রিকেট সমর্থকরা এমনই তো আমাদের অনেক আর্জেন্টিনা সাপোর্টারদের মতো, ‘কিছু পারে না আবার অন্যের ব্যর্থতা নিয়ে মশকরা করে, হুদাই গলাবাজি করে, নিজেরা ফাজলামো করে কিন্তু অন্যেরা করলে নিতে পারে না…’ আমরা এমনই তো! ফুটবলে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলে না, এজন্য এই ভালোবাসা আর্জেন্টিনার প্রতি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপ খেললেও এই সমর্থকরা এমনই করতো, ৮-০ গোলে হেরেও এক মেক্সিকানের সাথে মারামারি করে আসতো যে ‘আমরাই বস, তোরা বুঝোস কিছু?’

গ্রুপ পর্বেই আর্জেন্টিনা বাদ পড়তে যাচ্ছে, এমন আরো একবার দেখা হয়েছে আমার, ১৬ বছর আগে। সেবার আর্জেন্টিনা বাদ পড়ার পর ব্রাজিল সমর্থন করেছিলাম! রোনালদো, রবার্তো কার্লোস, পরে রোনালদিনহোদের সেই দলটাকে আমি বেশ ভালোবাসি! ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের একে অপরকে টিপ্পনি আর রসিকতার ব্যাপারটা ভালো লাগে বলেই ব্রাজিলকে নিয়ে এক-আধটা মশকরা করা! আমি ব্রাজিল জেতায় বেশ আনন্দ পেলাম, রোনালদোর আরো কিছু স্টিকার জমানোর সুযোগ পাওয়া গেলো। তখন আমি রিয়াল মাদ্রিদ করি, রোনালদোকে আমি রিয়াল মাদ্রিদে পেয়ে বেশ আনন্দিত! সেই একবারই অন্তত গ্রুপ পর্বের পর ব্রাজিলকে সাপোর্ট করে আমার বিশ্বকাপ জেতা! তবে জার্মানিকেও ভালো লাগছিল, রোনালদো দুই গোল দিয়ে শিশু আমাকে মুগ্ধ করে দিলো!

যত্তসব আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল ভাবনা!

বড় হওয়ার ফাঁকে এক সময় খেয়াল করলাম, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকরা পাল্লাও দেয়া শুরু করেছে! অথচ ভালোবাসা নিয়ে আবার পাল্লা কিসের! খেয়াল করলাম, প্রচুর রসিকতা করলেও ব্রাজিলের হারে আমি কখনো খুশি হতে পারি না! ২০১০ সালে আমার ব্রাজিল সাপোর্টার বন্ধু আমার বাসায় খেলা দেখে কান্নাকাটি করে ঘরে ফিরলো, আমার বেশ কষ্ট লাগলো। বাইরে দেখি ব্রাজিল হারায় উল্লাস মিছিল শুরু হয়েছে (এরাই সম্ভবত ওয়েস্ট ইন্ডিজের গাড়িতে ঢিল মারে!)। অথচ আমার নিজেকে খুবই অপরাধী মনে হচ্ছে, কাছের মানুষরা কষ্ট পাচ্ছে, সে জন্য মনে হচ্ছে আমিই দায়ী!

লিওনেল মেসি ভদ্রলোক আর্জেন্টিনার প্রতি আমার ভালোবাসা বাড়িয়েছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে আর্জেন্টিনার এই হারতে থাকাটাই বোধহয় সেই আগুনে ফুঁ দিয়েছে। ব্রাজিল জিতবে কি জিতবে না, তা নিয়ে কখনো মাথাব্যথা ছিলও না, থাকবেও না। আর্জেন্টিনা জিতলো কিনা, সেটা আমার কাছে বিষয়। এছাড়া কে জিতলো, সেটা ব্যাপারে আমার বিশেষ চিন্তা নেই!

গতবারের সেভেন আপের ম্যাচে দুই গোল পর্যন্ত আমি বেশ রসিকতা করছিলাম। তৃতীয় গোলের পর আমি মোটামুটি শকড, কিছু বুঝে ওঠার আগেই যখন চতুর্থটা হলো, আমি বেশ ভেঙে পড়েছিলাম। আমি ওই ম্যাচেও আমি ব্রাজিল জিতলেই খুশি হতাম, আর্জেন্টিনার জন্য ফাইনালে জার্মানির চেয়ে গত বছরের ব্রাজিল দুর্বল প্রতিপক্ষ। ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও আমি কখনোই বিশেষ খুশি হতে পারিনি। রসিকতা করেছি, রসিকতা তো আমি আমার দুঃখ নিয়েও করি!

ব্রাজিল এবার জিতবে কিনা, আমি জানি না। না জিতলে সেটা নিয়েও আমার বিশেষ আপত্তি নেই। তবে ব্রাজিল হারলে কখনো আমি বিশেষ খুশি হতে পারি না। কাছের মানুষদের জন্য বেশ খারাপ লাগে।

এবারও খারাপ লাগবে।

আমরা যারা আর্জেন্টিনা কে ভালোবাসি, আমাদের লজ্জাশরম বিশেষ নেই! খারাপ লাগা আমাদের বদভ্যাস হয়ে গেছে!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

thirteen + two =