ম্যাড়মেড়ে ড্র অ্যানফিল্ডে

বরাবরই রক্ষণাত্মক ট্যাকটিক্সের জন্য আলোচিত-সমালোচিত হোসে মরিনহো। বিশেষত হাই ভোল্টেজ ম্যাচগুলোতে তাঁর ডিফেন্সিভ ট্যাকটিক্সগুলো চোখে পড়ার মত। ইন্টার মিলানের হয়ে যেবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতলেন, সেমিফাইনালে পরাক্রমশালী বার্সেলোনাকে হারানোর জন্য বলতে গেলে নিজ দলের এগারো জন খেলোয়াড়কেই ডি-বক্সের মধ্যে সেঁধিয়ে দিলেন, ইন্টারের দুই স্ট্রাইকার স্যামুয়েল এতো-ডিয়েগো মিলিতো মেসি-ইনিয়েস্তাদের সাথে হয়ে গেলেন ফুলব্যাক। আবার বার্সেলোনার বিপক্ষে এক এল ক্লাসিকোতে ত রিয়াল মাদ্রিদের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার পেপে কে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডেই খেলিয়ে দিয়েছিলেন। বছর দুয়েক আগে চেলসির ম্যানেজার থাকার সময় হাই ভোল্টেজ লিভারপুল-চেলসি ম্যাচে এতটাই রক্ষণাত্মক খেলেছিল চেলসি যে এখনো সেবার লিগ হারের জন্য অনেক লিভারপুল সমর্থক ঐ ম্যাচ হারকেই দোষারোপ করে থাকে। তবে ডিফেন্সিভ খেলান আর যাই খেলান, মানতেই হবে মরিনহোর এই ধরণের ট্যাকটিক্স যথেষ্টই পরীক্ষিত ও ফলপ্রসূ। এই সপ্তাহের লিভারপুল-ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ম্যাচেও সেই ট্যাকটিক্সকে ফলপ্রসূই বলা চলে। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা লিভারপুলকে তাদের মাঠেই ম্যাড়মেড়ে এক ম্যাচে 0-0 গোলে আটকিয়ে দিয়েছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্তার ইউনাইটেড।

এই সপ্তাহের লিভারপুল বনাম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের খেলাতেও মরিনহোর সেই রক্ষণাত্মক ট্যাকটিক্সেরই পুনরাবৃত্তি দেখলো ফুটবল বিশ্ব। ম্যাচের মূল একাদশ হুয়ান মাতা, ওয়েইন রুনি, হেসে লিনগার্ডের মত আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়দের ছাড়াই সাজান তিনি। তাদের জায়গায় মাঠে নামেন মারুয়ান ফালাইনি, অ্যাশলি ইয়াংয়ের মত রক্ষণাত্মক চিন্তাধারার খেলোয়াড়েরা। গোলবারে ডেভিড ডা হেয়ার সামনে সেন্ট্রাল ডিফেন্সে জুটি বাঁধেন ইংলিশ সেন্টারব্যাক ক্রিস স্মলিং আর নবাগত আইভোরিয়ান সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার এরিক বাইয়ি। দুই ফুলব্যাকে ছিলেন অ্যান্তোনিও ভ্যালেন্সিয়া আর ডেলেই ব্লিন্ড। ৪-২-৩-১ ফর্মেশানে দুই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার পল পগবা আর মারুয়ান ফালাইনির সামনে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার অ্যান্ডার হেরেরা আর দুই উইংয়ে মার্কাস র‍্যাশফোর্ড আর অ্যাশলি ইয়াং, একমাত্র সেন্টার ফরোয়ার্ড জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ।

ওদিকে যথেষ্ট আক্রমণাত্মক একাদশ সাজান লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ। জার্মান গোলরক্ষক লরিস ক্যারিয়াসের সামনে সেন্ট্রাল ডিফেন্সে ক্রোয়েশিয়ান দেয়ান লভরেন আর ক্যামেরুনিয়ান সেন্টারব্যাক জ্যোল মাতিপের জুটি, দুই ফুলব্যাক হিসেবে যথারীতি ছিলেন ন্যাথানিয়েল ক্লাইন আর জেইমস মিলনার। ক্লপের পরীক্ষিত ৪-২-৩-১ ফর্মেশানে দুই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার ছিলেন অধিনায়ক জর্ডান হেন্ডারসন আর জার্মান মিডফিল্ডার এমরে চ্যান, একটু সামনে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলেছেন ব্রাজিলিয়ান ফিলিপ্পে ক্যুটিনিও। বাম উইংয়ে রবার্টো ফার্মিনিও আর ডানপ্রান্তে সেনেগালিজ উইঙ্গার সাদিও মানের মাঝে একমাত্র স্ট্রাইকার হিসেবে ছিলেন ইংলিশ ফ্রন্টম্যান ড্যানিয়েল স্টারিজ।

বাজে খেলেছেন পগবাও
বাজে খেলেছেন পগবাও

স্কোয়াড রক্ষণাত্মক হলেও প্রথম থেকেই মোটামুটি প্রেস করে খেলতে থাকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। এবং আগের ম্যাচগুলোতে চূড়ান্ত ফর্মে থাকা লিভারপুলের খেলায় সেই প্রেসারের জন্যই কি না, সেরকম সৃষ্টিশীলতা দেখা যায়নি। মিডফিল্ডে পগবা হেরেরা কিংবা ফালাইনিদের আক্রমণ শানানোর চেয়ে বল কেড়ে নেওয়ার দিকেই মনযোগ ছিল বেশী। সেন্ট্রাল ডিফেন্স থেকে প্রায়ই মাঝমাঠে উঠে আসছিলেন ইউনাইটেড সেন্টারব্যাক এরিক বাইয়ি, লিভারপুলের মিডফিল্ড থেকে বল কেড়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু বল কেড়ে নিলেই ত আর হয় না, প্রতিআক্রমণও করতে হয়। এবং সে জায়গাটাতেই বারবার মার খেয়ে যাচ্ছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। সেরকম সৃষ্টিশীল এক খেলোয়াড়ের অভাব ভালোই ভোগাচ্ছিল ইউনাইটেডকে, ফলে মিডফিল্ড থেকে বল ঠিক স্ট্রাইকে ইব্রাহিমোভিচের পায়ে এসে পৌঁছাচ্ছিল না। এদিকে লিভারপুলও বল পেলেই বরাবরের মত একেবারে ডিফেন্স থেকে আক্রমণ করার দিকে মনোযোগী ছিল, ফলে প্রথমার্ধের প্রায় পুরোটা সময়েই দেখা গেছে বল মাঝমাঠেই ঘোরাফেরা করছে। লিভারপুলের সাদিও মানে, এমরে চ্যান কিংবা ড্যানিয়েল স্টারিজের মত খেলোয়াড়েরা সেরকম সৃষ্টিশীলতা দেখানোর সুযোগ পাননি।

দ্বিতীয়ার্ধের ৫৫ মিনিটের মাথায় স্ট্রাইকার স্টারিজকে তুলে নিয়ে মাঠে নামানো হয় ইংলিশ ওয়াইড মিডফিল্ডার অ্যাডাম লালানাকে। মাঠ থেকে উঠে যাওয়ার ফলে এই নিয়ে প্রিমিয়ার লিগে সর্বশেষ ৬১৫ মিনিট ধরে গোলহীন আছেন এই ইংলিশ স্ট্রাইকার। এর মাধ্যমে লিভারপুল ৪-২-৩-১ ফর্মেশান থেকে ৪-৩-৩ ফর্মেশানে খেলা শুরু করে, ও সামনের তিনজন অ্যাটাকার হিসেবে খেলা শুরু করেন মানে, ফার্মিনিও ও ক্যুটিনিও। এবং এই ট্যাকটিক্যাল চেঞ্জের মাধ্যমের যেন লিভারপুলের খেলায় একটু হলেও প্রাণ ফিরে আসে। লিভারপুলও ইউনাইটেডকে উলটো প্রেস করা শুরু করতে থাকে। লালানা ও ক্যুটিনিওর মধ্যকার একধরণের টেলিপ্যাথিক সংযোগের সুফল পেতে থাকে লিভারপুল, গোলমুখে করা ক্যুটিনিওর দূরপাল্লার একটা শটও এইসময়ে সেইভ করতে হয় ইউনাইটেড গোলরক্ষক ডেভিড ডা হেয়াকে। এই সেইভের মাধ্যমেই যেন ডা হেয়া নিঃশব্দে আরেকবার প্রমাণ করেন কেন তাঁকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গোলরক্ষক বলা হয়।

39780cfb00000578-3845428-image-a-94_1476738111608

ম্যাচ শেষ হবার ১৫ মিনিট আগে মার্কাস র‍্যাশফোর্ডকে নামিয়ে ওয়েইন রুনিকে মাঠে নামান হোসে মরিনহো। ওদিকে ইউনাইটেডের একমাত্র স্ট্রাইকার জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচও বিগ ম্যাচে ফ্লপ হবার তকমাটা আরও ভালোভাবে গায়ে সাঁটালেন। পুরো ম্যাচে লিভারপুলের সেন্টারব্যাক দেয়ান লভরেনের পকেটের মধ্যেই যেন আটকা পড়ে থাকলেন প্রায়শই বড় বড় কথা বলে পত্রিকার খবর হতে পছন্দ করা এই স্ট্রাইকার। ফর্মহীনতার ষোলকলা পূর্ণ হয় তাঁর শেষদিকে এসে একটা হলুদ কার্ড খাওয়ার মাধ্যমে। এর মাধ্যমে পুরো ক্যারিয়ারে লিভারপুলের বিপক্ষে ৫ ম্যাচ খেলে একটাও গোল করতে পারলেন না ইব্রা, লিভারপুলের বিপক্ষে জয়টাও অধরাই থেকে গেল সাবেক এই ইন্টার মিলান, এসি মিলান, জুভেন্টাস ও প্যারিস সেইন্ট জার্মেই স্ট্রাইকারের।

পুরো ম্যাচ জঘন্য খেলেছেন ইব্রা
পুরো ম্যাচ জঘন্য খেলেছেন ইব্রা

জঘন্য খেলেছেন বিশ্বের সবচেয়ে দামী খেলোয়াড় পল পগবাও। বহুদিন খেলা না দেখে কেউ যদি আজকেই প্রথম খেলা দেখতে বসতেন আর তাঁকে যদি পগবার খেলা দেখিয়ে বলা হত এই খেলোয়াড়ই বর্তমানে সবচেয়ে দামী খেলোয়াড় বিশ্বের, বোধকরি ঠাট্টা ভেবে উড়িয়েই দিতেন সে কথা।

বরং পুরো ইউনাইটেড দলে কেউ ভালো খেলে থাকলে তাঁরা হলেন দুই স্প্যানিশ অ্যান্ডার হেরেরা ও ডেভিড ডা হেয়া। ডা হেয়ার ঐ দুর্দান্ত সেইভটা না থাকলে আজকে লিভারপুল হয়ত জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ত, আর ওদিকে মিডফিল্ডে নিখুঁত পারফরম্যান্স দিয়েছেন হেরেরা, পুরো ম্যাচে এগারোবার বল ইন্টারসেপ্ট করেছেন এই তরুণ স্প্যানিয়ার্ড। শেষদিকে রবার্টো ফার্মিনিওকে করা অ্যান্তোনিও ভ্যালেন্সিয়ার ম্যাচ বাঁচানো ট্যাকলটাও যথেষ্ট প্রশংসার দাবিদার।

 

 

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

5 × 2 =