ম্যাথিয়াস সিন্ডলার – যিনি নাজিদের অস্বীকার করেছিলেন

ম্যাথিয়াস সিন্ডলার - যিনি নাজিদের অস্বীকার করেছিলেন

আশা করি ফলস নাইন কি সেটা সবাই জানেন। ফলস নাইনের কথা আসলেই প্রথমে যার কথা আসে সেটা হল লিওনেল মেসি। এই অবস্থানে কালে কালে সেরাদের সেরা খেলে গেছেন। ফেরেঙ্ক পুস্কাস, ফ্রান্সিসকো টট্টি এর মত কিংবদন্তিরা এই মহিমান্বিত অবস্থানে খেলেছেন। তবে কার চোখে প্রথম ফলস নাইন ধরা পরে? উত্তর হবে অস্ট্রিয়ান ফুটবলার ম্যাথিয়াস সিন্ডলার। তবে আজ ফলস নাইন নিয়ে আলোচনা করতে আসি নি। আজকে এসেছি এমন এক ফুটবল কিংবদন্তির কথা বলতে যার কাছে ফুটবলের গৌরব ছিল অন্যসব কিছু থেকে এগিয়ে। তবে সে সময়কালের পরিপেক্ষিতে ফলস নাইনের ধারণা ধরা ছোঁয়ার অনেক বাইরে ছিল। তাকে স্মরণ করা হয় সেই বিখ্যাত ফুটবলার হিসেবে যিনি হিটলার বাহিনী, নাজিদের প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

তার জন্ম হয় তৎকালীন অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি একত্রিত সম্রাজ্যের কজলভে, ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯০৩ এ। তার বাবা ছিলেন একজন কামার। তার শৈশব এতটা সহজ ছিল না। ১৯০৫ সালে oiসিন্ডেলার পরিবার ভিয়েনায় (অস্ট্রিয়ার রাজধানী) চলে আসে। ভিয়েনার রাস্তায় ফুটবল খেলে খেলে শৈশব কাটে সিন্ডেলারের। অনেকে ধারণা করেন যে, সিন্ডেলারের মূল ইহুদি থেকে। কিন্তু তিনি আসলে ছিলেন একজন ক্যাথলিক। সিন্ডেলারের ফুটবল ক্যারিয়ারের সূচনা ঘটে ১৫ বছর বয়সে হার্থা ভিয়েনার সাথে। প্রথম বিশ্বকাপে তার বাবাকে হারিয়ে ফুটবলের প্রতি আরো বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠেন সিন্ডেলার। তারপর ১৯২৪ সালে তিনি যোগ দেন, এফ কে অস্ট্রিয়াতে যেখানে তিনি ৫ টি অস্ট্রিয়ান কাপ, ১ টি লীগ টাইটেল, ২ টি মিত্রোপা কাপ জেতেন।

অস্ট্রিয়ার ফুটবল বিশেষজ্ঞদের আলোচনার সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা ছিল কফিহাউজগুলো যেখানে প্রতিদিনই তাদের কফির কাপ শেষ হতো সিন্ডেলার নিয়ে কথা বলে। তারা এর আগে কাউকে এমন দেখেনি। “সে এমন ভাবে ফুটবল খেলবে যেন একজন গ্রান্ড মাস্টার যেভাবে দাবা খেলেন যেন আর পায়ে আরেকটি মস্তিস্ক রয়েছে” – আলফ্রেড পলগার বলেন, “সিন্ডেলারের শট এমনভাবে জেলে জোড়াত যেন মনে হতো এটা একটি নির্ভুল অন্ত, যেভাবে একটি গল্পের শেষ হয় যেখানে পুরো গল্পটি বুঝে ওঠা যায় এবং সেটাকে বাহবা দেয়া যায়।”

তার খেলায় ছিল অসাধারণ মনোমুগধকর ড্রিবলিং, এবং পাসিং। তার প্রদর্শনের জন্য ইউরোপ থেকে অনেক বড় বড় অফার পেতে শুরু করেন সিন্ডেলার। প্রথম কাটারেই ছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড যারা তাকে অনেক বড় পরিমানের বেতনের সিন্ডেলারকে প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সিন্ডেলার তার দেখ ছেড়ে অন্য কোনো জায়গায় যেতে চান নি। তাই তিনি অস্ট্রিয়াতে থেকে গেলেন, একটি বাড়িতে তার মার সাথে এবং প্রতি সপ্তাহে ভিয়েনায় ফুটবলের কারুকাজ দেখতেন।

কিন্তু এই শান্ত সরল জীবন বেশিদিন টিকে নি। ইউরোপে তখন ক্ষমতালোভী নাজিদের উৎপাত শুরু হচ্ছিল। অস্ট্রিয়া ফুটবল দল সদ্য ইতিহাসে তাদের নাম উঠতে যাচ্ছিলো। তাদের বলা হত উন্ডারটিম বা ওয়ান্ডার টিম। পৃথিবীতে আসা অন্যতম সেবা জাতীয় দলের মধ্যে একটা ছিল এই অস্ট্রিয়ান জাতীয় দল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রতারণার শিকার হয়ে হিটলারের নেতৃত্বে ইউরোপে ইহুদি ধ্বংসের পরিকল্পনা চালায় জার্মানি। জার কারণে সে দলের প্রায় অর্ধেকের বেশি খেলোয়াড়রা দল ত্যাগ করেন। এমনকি ফেডারেশনের প্রেসিডেন্টও ছিলেন ইহুদি। “আমাদের হুমলকি দেওয়া হয়েছে যেন আপনাদের সাথে কথা না বলি, কিন্তু আমি সবসময় বলব” – সিন্ডেলার বলেন।

১২ মার্চ, ১৯৩৮ সালে জার্মানি বনাম অস্ট্রিয়া একটি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়। অনেকে একে বলে থাকেন সমন্বয়সাধন বা মিটমাট করার ম্যাচ। জার্মানি আগেই অস্ট্রিয়ার ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করছিল এবং একটি ভালো সম্পর্কের জন্য একটি ফুটবল ম্যাচ আয়োজন করেন। ম্যাচটি ০-০ গোলশূন্য ড্র হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সিন্ডেলারের চিন্তা অন্যরকম ছিল। ম্যাচের প্রথম অর্ধের সিন্ডেলার অনেক সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু সেকেন্ড অর্ধের ৭০ তম মিনিটে জার্মানির গোলে একটি শট ফায়ার করেন। জার সুবাদে অস্ট্রিয়া এগিয়ে যায়। এবং গোলদাতা সিন্ডেলার গ্যালারির ভিআইপি বক্সে বসে থাকা উচ্চ পদস্থ নাজিদের সামনে গিয়ে উদযাপন করেন। অস্ট্রিয়ার খেলোয়াড়দের আগে থেকেই সাবধান করে দেওয়া ছিল যেন ম্যাচে কোনো গোল না করে। কিন্তু যখন সিন্ডেলার গোল করলেন এবং নাজিদের সামনে গিয়ে উদযাপন করলেন সেটা তাদেরকে খুশি করলো না। ম্যাচটি ২-০ গোলে শেষ হয়। সিন্ডেলারের বন্ধু সাস্তি সেসটা ফ্রি কিকে আরো একটি বল জালে জড়িয়েছিলেন।

জার্মানির ফুটবল ফেডারেশন সিন্ডেলারকে জার্মানিতে খেলার প্রস্তাব দেন এবং বলেন জার্মানি জাতীয় দলে ফুটবল খেললে তাকে তার আগের কর্মের জন্য ক্ষমা করে দেওয়া হবে। কিন্তু সিন্ডেলার ক্রমাগত ভাবে তাদের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৩৮ সালের আগস্টে সইন্ডেলার একটি ক্যাফে কেনন। ২৩ জানুয়ারি, ১৯৩৯ সালে তার বন্ধু গুস্তাভ হার্টম্যান তার খোঁজে সেই ক্যাফে যে যায়। এবং ক্যাফের উপরের তোলার রুমের দরজা ভেঙ্গে সিন্ডেলারকে পান, উলঙ্গ এবং মৃত অবস্থায়। তার সাথে ছিলেন তার গার্লফ্রেন্ড কামিনা কস্তিগনলা অজ্ঞান অবস্থায়। পরে হাসপাতালে তিনিও মারা যায়।

পুলিশের কাছে তদন্ত চাওয়া হলে জানানো হয় যে, গ্যাস লিকের কারণে কার্বন মনোক্সাইডের জন্য মারা যায় সিন্ডেলার। বিচার বিভাগ এই ব্যাখ্যাতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। কিন্তু নাজিরা জোর করে ২ দিনেই কেসের ফাইল বন্ধ করে দেন। এবং ৬ মাস পর কেসটি আজীবনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। সিন্ডেলারের মৃত্য কখনোই সমাধান করা হয় নি। অধিকাংশ মনে করেন নাজিরা তাকে হত্যা করেছেন। এবং হিটলারের বন্ধ ঘরে বিষাক্ত গ্যাস দিয়ে মানুষ মারার উপায় এখন কারো অজানা নয়।

সিন্ডেলার ছিলেন একজন জন্মগত ফুটবলার। তিনি পৃথিবীতে তার চিন্হ রেখে গেছেন ফুটবলের মাধ্যমে। ২০০০ সালে তাকে অস্ট্রিয়ার সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় ঘোষণা করা হয় এবং সর্বকালের সর্বসেরা অস্ট্রিয়া একাদশে তাকে রাখা হয়। তাকে স্মরণ করা হয় সেই ফুটবলার হিসেবে যিনি নাজিদের অস্বীকার করেছেন।

::: আবু হেনা তসলিম আর্পণ :::

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

one × two =