‘ম্যাচ কা বাপ’ এর আগে

‘আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে’- বিশ্বকবির এই রচনার রুপান্তর কাল দেখা যাবে আসলেই। অ্যাডিলেড নামের নগরী তো উত্তেজনায় কাঁপবেই, তার থেকেও বোধহয় বেশি কাঁপবে চিরবৈরী দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তান। কাল যে এই দু দলের লড়াই ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে।

‘রঙ যেন মোর মর্মে লাগে,
আমার সকল কর্মে লাগে’

এদিন ভারত পাকিস্তানের প্রায় ১৩০ কোটি মানুষের চোখ থাকবে টেলিভিশনের পর্দায়, কাজ যাক গোল্লায়, আগে ম্যাচ দেখা চাই। রবিবার বলে লাগছে না, অন্য দিন হলে ছুটি হয়ে যেত দু দেশের অনেক অফিস। এমন ম্যাচের প্রিভিউ করতে বসা মানে অনেক হিসাব নিকাশের ব্যাপার।

দুদলের জন্যই কন্ডিশন বৈরি, ঘূর্ণির মায়াজালে একে অন্যকে ঘায়েল করতে অভ্যস্ত দল দুটিকে খেলতে হবে গতির খেলা। তা দুই দল যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছে কে কার থেকে খারাপ খেলা যায় সে ব্যাপারে, এই কন্ডিশনে এদের যা অবস্থা, তাতে ট্রফি হাতে তেরঙ্গার বা চাঁদতারার- কোন সেনাপতিকেই দেখার আশা স্বপ্নবিলাসি মানুষ করতে পারে, বাস্তববাদীরা নয়।

অভিজ্ঞ আজমল আর হাফিজের না থাকা বড় ধাক্কা পাকিস্তানের জন্যে
অভিজ্ঞ আজমল আর হাফিজের না থাকা বড় ধাক্কা পাকিস্তানের জন্যে

বরাবরই এই ম্যাচের তৃতীয় খেলোয়াড় চাপ, মানসিক সক্ষমতার চূড়ান্ত পরীক্ষা নেয় এই দ্বৈরথ। ভারতীয় শক্ত ব্যাটিং আর পাকিস্তানি বোলিং এর লড়াই হয় মূলত। সে ক্ষেত্রে পাকিস্তান অবশ্যই অনুভব করবে তাদের সেরা স্পিন জাদুকর সাইদ আজমলের অভাব, যিনি নিজেই সরে গেছেন আসর থেকে, পরে তার অ্যাকসন বৈধ প্রমানিত হলেও আর সময় নেই দলে আসার। হাফিজকে ফেরত পাঠানো আরেক ধাক্কা, যদিও তিনি বলছেন সেরে ওঠার সুযোগ ছিল, তবে সত্য হচ্ছে কালকে তিনি থাকবেন না। উমর গুল- পাকিস্তানি গতিতারকা যিনি এই গতিবান্ধব পিচে গতি, সুইং আর বাউন্সের ছোবলে কাঁপন ধরাতে পারতেন ভারতীয় দুর্গে, তার ইনজুরি জনিত অনুপস্থিতি ভারতীয়দের স্বস্তি দেবে-এটা বলাই বাহুল্য। অন্যদিকে মিসবাহ বাহিনীর স্বস্তি হচ্ছে ২২ বছর পর শচীনের না থাকা। বিশ্বকাপের বর্তমান শুভেচ্ছাদূত একাই ঘুরিয়ে দিতে পারতেন পাশার দান- ২০০৩ এ তার ৭৩ বলে ৯৮ রানের ঐ ইনিংসের কথা কে ভুলতে পারে?

ইরফানের উচ্চতা আর গতি ভোগাতে পারে ভারতকে
ইরফানের উচ্চতা আর গতি ভোগাতে পারে ভারতকে

শুধু নেই নেই এর কথা বলে ফেলেছি, এবার কুশীলবদের নিয়ে আলোচনায় আসি। যেহেতু গতির পুজারি উইকেট, ইরফানের বল পারে ভারতের ব্যাটিং স্তম্ভগুলো ধসিয়ে দিতে, তার উচ্চতার কারনে প্রাপ্য বাড়তি বাউন্স ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের অস্বস্তি বাড়াবে অনেক, এটা বলাই যায়। নজর রাখতে হবে অন্য পাক সিমারদের প্রতিও, রিয়াজ তুখোড় বোলার, ২০১১ তে মোহালির গ্যালারী স্তব্ধ করা যুবরাজের স্ট্যাম্প উপড়ানো বলটি এসেছিল রিয়াজের হাত থেকেই, সাধু সাবধান! ভারতীয় গতিতারকাদের মধ্যে ভুবনেশ্বর কুমার পারেন সুইং এর জাদু দেখাতে আর ইসান্ত শর্মাও কার্যকরী হতে পারেন তার শর্ট বল করার ক্ষমতার জন্য, তবে যদি লাইন লেংথ বিগড়ে যায়, তাহলে জাতীয় ভিলেনে পরিণত হবার আশঙ্কাও আছে এই সিমারের!

তার শেষ বিশ্বকাপ ফোকাস থাকবে আফ্রিদির উপরেও
তার শেষ বিশ্বকাপ ফোকাস থাকবে আফ্রিদির উপরেও

ঘূর্ণি জাদুর ক্ষেত্রে দুই দল দুই ধরনের। ভারত একজন লেগস্পিনার আর পাকিস্তান অফ স্পিনারের অভাব অনুভব করতেও পারে। শহীদ আফ্রিদি তার চাতুর্য আর গতির বৈচিত্র্য দিয়ে ধসিয়ে দিতে পারেন ভারতীয় ব্যাটিং-দুর্গ। ইয়াসির শাহ নতুনের কেতন উড়িয়ে লেগস্পিনে আব্দুল কাদির না হোক, মুস্তাক আহমদের  মতো তো হতে পারেন। অন্য দিকে পাকিস্তানি ব্যাটিং শক্তি ক্ষয় করার জন্য ভারতের আছে অক্ষয়, যার কিপটে বোলিং আইপিএলে আলোচিত ছিল। সাথে আশ্বিন আর জাদেজা তো আছেন ই।

কোহলি আর রোহিতের ব্যাটিংটা নিয়েই মাথাব্যাথা পাক বোলারদের
কোহলি আর রোহিতের ব্যাটিংটা নিয়েই মাথাব্যাথা পাক বোলারদের

ভারতীয় ব্যাটিঙের বড় বড় তারকা বিরাট, রোহিত শর্মা- যিনি দুই বার ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ডধারী, অভিজ্ঞ সৈনিক রায়না, ধোনি- ক্যাপ্টেন কুল, শিখর ধাওয়ান, রাহানে- শুনে অনেক বড় বড় নাম মনে হচ্ছে, কিন্তু মনে রাখতে হবে এই দলটার ‘সুনাম’ আছে দেশের মাটির বাঘ আর বিদেশের বিড়াল হিসাবে আর আউট করতে একটি ভালো বলই যথেষ্ট। পাকিস্তানের ব্যাটিং এর কাণ্ডারি মিসবাহ, যিনি নায়ক কিংবা খলনায়ক দুটোই হতে পারেন, গত বিশ্বকাপের হারের জন্য অনেকে তার অতি ধীরলয়ের ব্যাটিং কে দোষ দেন। ধুম ধাড়াক্কা ব্যাটিং এর রাজা শহীদ আফ্রিদি জ্বলে উঠলে ম্যাচের ভাগ্য হেলতে পারে পাকিস্তানের দিকে। মুলতানের নতুন সুলতান শোয়েব মাকসুদ হয়ে উঠতে পারেন নিয়ন্ত্রক, ধরে কিংবা মেরে- দুভাবেই খেলতে পারেন তিনি।

সব কথার শেষ কথা একটাই,
‘ যে দল ভালোভাবে সামলাতে পারবে চাপ,
সেই জিতবে ম্যাচ কা বাপ’

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

one × three =