মেসি হওয়ার দায়…

বল আর সে, মানিকজোড়! রোজারিওর বহতা স্রোতস্বিনীর মতো তাদের গতিপথ , যার বাঁকে বাঁকে বৈচিত্র । ফুটবল ও লিওনেল মেসি !
কিংবা তার পুর্বসূরী, দিয়াগো ম্যারাডোনা। আরেক জোড়া জাদুকরী বাঁ পা। তার সঙ্গে টাচলাইনের বাইরের পৃথিবীর এপিঠ-ওপিঠ দেখেছে ফুটবল। ফিদেল কাস্ত্রো-শাভেজ…ড্রাগ…..নারীসঙ্গ। কিন্তু টাচলাইনের ভেতরে, আর্জেন্টাইন ‘ঈশ্বর’! মেক্সিকো বিশ্বকাপের আলো-আঁধার-দুইই ম্যারাডোনার। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সাক্ষাৎ জোচ্চুরিকে রুপান্তর করেছেন গোলে ! ভক্তদের চোখে সে কলঙ্ক চাঁদের যেমন থেকে থাকে,`হ্যান্ড অব গড’!


সেই ম্যারাডোনাই দেশাত্নবোধের জালে গোল করেছেন। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধচলাকালিন তার সাক্ষাতকার চেয়েছিল কতিপয় ব্রিটিশ সাংবাদিক। জবাব এসেছিল-‌’গিভ অাস ব্যাক মালভিনাস (ফকল্যান্ডের স্প্যানিশ নাম)। ইউ…..ব্রিটিশার। ন্যাপোলিতে খেলাকালিন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট কার্লোস মেনেম একবার ইতালিতে ছুটে যান। ম্যারাডোনাকে ক্রীড়াদূতের বরমাল্য পড়িয়ে তবেই দেশে ফিরিছিলেন মেনেম।

বছরখানেক পরের কথা।

ড্রাগে আসক্ত ম্যারাডোনা। মেনেম এবং তার ক্রীড়া সচিব ভিক্টর লুপো দারুন চিন্তিত। বুয়েন্স এইরসে এক সাক্ষাতকারে তাদের আর্তি,‌’ আমাদের ছেলেটাকে ড্রাগ থেকে রক্ষা করতেই হবে ।’ ভাবিকালের কথা ভেবে আর্জেন্টিনার কিশোর ফুটবলারদের দেশের বাইরে ট্রান্সফার বন্ধ করার জন্য একটি আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কঁচি-কাঁচারা পোক্ত হয়ে ওঠার আগেই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তো। কিন্তু মেনেমের বাকিসব রাজণ্য ‘দেশের বাইরে ট্রান্সফার মানেই পরিবার সচ্ছল’ নীতির পক্ষে থাকায় সিদ্ধান্তটি সিদ্ধান্তই থেকে যায়।

এবার উত্তরসূরীর গল্প…

গত দশ বছরে বার্সেলোনার হয়ে ছোটবড় সব মিলিয়ে মেসির জেতা শিরোপার সংখ্যা মোট ২১টি। ব্যক্তিগত পুরষ্কারের ঝাঁপি না খোলাই ভাল। স্রেফ অতলের আহবান ! ‘ফ্রিক শো’-ও বলা যায় । তারপরও সবচেয়ে আজগুবি কথাটা হলো, আর্জেন্টিনা থেকে মেসির জনপ্রিয়তা স্পেনে বেশি! আর্জেন্টাইনদের বিশ্বাস, মেসি তার মন থেকে এখনো পুরোপুরি আর্জেন্টাইন হয়ে উঠতে পারেননি !


রোজারিওর ট্যাক্সিচালক থেকে ফুটবল কোচ পর্যন্ত সবার অভিযোগ, মেসি খুব ছোট থাকতেই দেশ ছাড়েন। তার গায়ে ঘরোয়া ক্লাব ফুটবলের সুবাস নেই । আর্জেন্টিনার প্রখম বিভাগ থেকে যেভাবে উঠে এসেছেন ম্যারাডোনা-তেভেজরা, মেসির আর্বিভাব মোটেও সেরকম নয়। জাতীয় সঙ্গীত পর্যন্ত গান না ! দেশের জন্য তার কোন প্যাশন নেই….ইত্যাদি, ইত্যাদি।


কিন্তু মেসির উচ্চারণে রোজারিওর আঞ্চলিক টানটা আজও স্পষ্ট। দেশের সঙ্গে এটাই বোধহয় তার একমাত্র অদৃশ্য যোগসুত্র? আর্জেন্টিনার সাংবাদিক মার্টিন ম্যাজুরের মন্তব্য,‌’শেষ ক’বছরে মেসির জন্য সেরা উপহার হলো সে তার মাটির উচ্চারনটা এখনো ভোলেনি। ভাবতে পারেন, ভুলে গেলে কি ঘটতো ! স্রেফ খুন হয়ে যেত ‘!


এজেইজা বিমানবন্দরের কাঁচের দেয়ালে মেসির পোষ্টার। থেকে বুয়েন্স এইরস পর্যন্ত বেশিরভাগ বিজ্ঞাপনি বিলবোর্ডগুলোর দখল মেসির। মেসি আর্জেন্টিনার সবখানে ! কিন্তু, হৃদমাঝারে কতটুকু?


রোজারিওর এক ট্যাক্সিচালকের কথা,‌’মেসির খেলা আমাদের ভাল লাগে, যদিও সে আমাদের অজানা। আমেরিকায় (লাতিন) সবাই দিয়াগোকে ভালবাসে। মেসির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা পুরোপুরি খাটেনা।’


অার্জেন্টাইন ফুটবলে তুলনা অবশ্যপাঠ্য। ম্যারাডোনা সর্বকালের সেরাদের একজন। তার বাঁ পায়েই নাপোলির স্বর্ণযুগ। বিশ্বের কাছে ম্যারাডোনা আর ৮৬’ বিশ্বকাপ সমার্থক । দেশকে একাই বিশ্বচ্যাম্পিয়নের খেতাব এনে দেয়া এক জীবন্ত ‌‌কিংবদন্তি।


মেক্সিকোর ওই আসরে আর্জেন্টিনার মাত্র তিনজন খেলোয়াড়ের ইউরোপিয়ান লিগে খেলার অভিজ্ঞতা ছিল। গত বিশ্বকাপে আর্জেন্টাইন লিগ থেকে সাবেলার ২৩ জনে জায়গা পান মাত্র একজন ফুটবলার।


কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার ওই গোল দুটি খেলাধূলার ইতিহাসে নানা অাঙ্গিক থেকে বিখ্যাত। প্রথমটি- শঠতার চুড়ান্ত উদাহারন। পরেরটা বৈপ্লবিক । মিডফিল্ড থেকে সলো রানে গোল। একক প্রচেষ্টার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহারন।


এই যে অতিমানব থেকে সাধারন,চুড়া থেকে অতল,বন্ধুর কিন্তু ভেতরে কোমল-এসব মিলিয়েই দিয়াগো ম্যারাডোনা। যিনি পার্টি-ড্রাগ-বিতর্ক-বিপ্লব, সর্বোপরি কাগজের শিরোনামে পরিচিত মুখ। আর্জেন্টাইনদের চোখের মণি।


আর তাই হয়তো, মিতভাষীরা হয়তো এক কথায় সেরে দেন-‌’মেসি তো দৌড় শুরুর আগেই হেরে বসে আছেন’!


অনেকের কাছেই ব্যাপারটা উল্টো। অন্তত, ক্লাব রেকর্ডের ক্ষেত্রে ? আর্জেন্টাইন লেখক মার্টিণ ক্যাপারোসের মতে, ‘ম্যারাডোনার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো- কাউকে অনুসরন করতে হয়নি। কিন্তু মেসির ক্ষেত্রে ম্যারাডোনাই শেষ সীমানা।’


বুয়েন্স এইরসের ফুটবল ক্লাব হারক্যান। সেখানকার জিমনেসিয়ামে রোজ বক্সিং শেখান পাবলো রদ্রিগুয়েজ। একসময় বক্সার ছিলেন। ফুটবলে প্রচন্ড অরুচি। কিন্ত পালসটা বুঝিয়ে দেন,‌’ম্যারাডোনা তার প্রতিভাকে রাস্তার ধূলা থেকে তুলে এনেছে। কিন্তু মেসির জন্ম তুলনামুলক উঁচু ঘরে। তেভেজ বড় হয়েছে বুয়েন্স এইরসের বস্তিতে। সে পর্যন্ত আমাদের পরিচয় বহন করে।’


ব্রাজিলের মাটিতে সাবেলার দলে তেভেজ ছিলেন না। রদ্রিগুয়েজের মুখে তাই বিরাশি সিক্কার পাঞ্চ ,‌’পরিচয় মুখ্য হলে আমি কিন্তু তেভেজকেই বেছে নিতাম’।


‘milanesa a la napolitana’. রুটির বিফ কাটলেট, টমোটো সস এবং তারওপর গলানো মাখন। ব্যস হয়ে গেল ‘মিলানেসা এ লা নাপোলিতানা্’ । শৈশবে মেসির প্রিয় খাবার। একবার তার কোচ মার্কনি আবিষ্কার করলেন, ‘alfajores’-এর (চকোলেট বিস্কিট) প্রতি মেসির দুর্বলতা। পরবর্তিতে এক টিভি সাক্ষাৎকারে মার্কনি জানান,মেসির সঙ্গে একটি চুক্তি করেন তিনি। গোল প্রতি একটি করে ‘alfajores’। লোভে পরেই কিনা কে জানে, নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে ম্যাচ প্রতি ৪/৫ গোল করতে শুরু মেসি। তৃপ্ত মার্কনি বিষ্ময়ের পাশাপাশি এটাও খেয়াল করেছিলেন তার দলের সেরা খেলোয়াড়টি উচ্চতায় বাকিদের থেকে ছোট। পাল্টে যায় চুক্তির শর্ত । হেডে গোল প্রতি দুটি ‘alfajores’। পরের ম্যাচে, গোলকিপার সহ সবাইকে কাটিয়ে পোষ্টের সামনে এসে থেমে যান মেসি। বাঁ পা দিয়ে বলটা ‘ফ্লিক’ করে শূন্যে তুলে হেড করেন। গোল। মার্কনি খুব অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন, সতীর্থদের সঙ্গে উদযাপন ছেড়ে মেসি তাকে খুঁজছেন !


রোজারিওতে মেসির এমন আরো অনেক গল্প সবার মুখে মুখে। এই যেমন ধরুন, একবার এক ম্যাচে গোটা প্রথমার্ধ তাকে বাথরুমে আটকে রেখেছিল প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়েরা। মেসি দরজা ভেঙ্গে মাঠে নেমে হ্যাটট্রিক করেছিলেন ।বয়স বেড়ে চলার সঙ্গে তার এসব গল্পগুলোও আরও প্রগাঢ় হয়েছে। গেটাফের বিপক্ষে একক প্রচেষ্টায় সেই গোল । বিলবাওয়ের বিপক্ষে ইঞ্চিপরিমান জায়গার ভেতর টাচ এন্ড মুভ। সবরকম জহরতই মজুদ আছে।


টেকনিক্যালি,বলকে পায়ে নিয়ে দুর্দান্ত গতিটাই মেসির সবচেয়ে বড় অস্ত্র।আর্জেন্টাইনদের মুখে বিদ্যেটি-la pelota atada । অর্থাৎ, বল দখলে রাখার সঙ্গে গতির ফুলকি। এতে করে প্রতিপক্ষ এলোমেলো হয়ে পড়ে।সতীর্থরাও জায়গা পেয়ে যায় দৌড়ানোর। এক ঢিলে দুই পাখি আর কি !


গোলক্ষুধাও আশ্চর্যকর !।চকোলিট বাজির অভ্যেসটা এখনো ছাড়তে পারেননি। এটাকে কি বলবেন ? সহজাত প্রবৃত্তি ?


বার্সায় আসার গল্পটা সবাই জানে। ১৩ বছর বয়সি মেসি অনুশীলনে একাই চার-পাঁচজনকে কাটিয়ে গোল করতেন। তারপর ভাবলেশহীন মুখে এমনভাবে পজিশনে ফিরতেন, যেন কিছুই ঘটেনি ! বহু বছর পর তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, নিজের খেলার ষ্টাইল বিচারে কোন দলকে বেছে নেবেন-আর্জেন্টিনা নাকি স্পেন (প্রস্তাব এসেছিল) ? মেসির জবাব,’আর্জেন্টিনা। হ্যাঁ, স্পেনে হয়তো আমি বেড়ে উঠেছি। সেখানকার অনেককিছু আমার জীবনকে গঠন করেছে। কিন্তু খুব ছোটবেলায় শেখা খেলাটা আমি এখনো ভুলিনি।’


আর্জেন্টিনার রাজধানি বুয়েন্স এইরস থেকে ১৮০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে বসে আছে রোজারিও। রিও পারনা নদীর কাছাকাছি শহরটা বেশ মোচড় নিয়েছে। ‌’এল চে’র জন্মস্থান বলেই হয়তো, কে জানে! চে গুয়েভেরার জন্মস্থান ছাড়াও আর্জেন্টিনার জন্য রোজারিও ঐতিহাসিক। ১৮১২ সালে এখানেই প্রথম ওড়ানো হয়েছিল আকাশি-সাদার তেরঙ্গা। আরও আছে। একটি আনঅফিসিয়াল জরিপ অনুযায়ী দেশটির বেশিরভাগ পুরুষদের বিশ্বাস, রোজারিওই সর্বোত্তম নারীদের প্রজননের তীর্থস্থান!


সে যাক গে, রোজারিও থেকে মোট দুটি ক্লাব প্রিমিয়ার ডিভিশনে প্রতিদ্বন্দিতা করে থাকে। নিউওয়েলস ওল্ডবয়েজ এবং রোজারিও সেন্ট্রাল। সাপে-নেউলে সম্পর্ক। শহরটারই এক রেষ্টুরেন্ট মালিক হুয়ান জ্যাকব। প্রিয় ক্লাবের সঙ্গে মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানের নাম রেখেছেন কমোডোর সেন্ট্রাল। মেসির প্রসঙ্গ উঠতেই চোখমুখ কুঁচকে বসলেন ! তার এক দফা এক দাবী-‘মেসি ইউরোপে বড় হয়েছে।’ একপর্যায়ে বোঝাতে শুরু করলেন, ‘গত বছর সেন্ট্রালের মাঠের জায়ান্টস্ক্রিনে মেসির ছবি ভেসে উঠতেই কিনা সবাই কি দুয়ো দিল ! তার যোগ্যতা নিয়ে কোন প্রশ্ন চলেনা। কিন্তু তাকে সঙ্গে নিয়ে অাপনি কখনোই কোন, সেন্ট্রাল সমর্থকের মন জয় করতে পারবেন না’।


মেসির শৈশবের একটা বৃহৎ অংশ কেটেছে নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজে। তাই জ্যাকবের কথাই ঠিক। যদিও নিউওয়েলস ক্লাবের অনুভূতিটাও কুসুম কুসুম গরম। সেখানকার বুড়ো বুড়ো সমর্থকদের ভাবভঙ্গি এমন যে,মেসিকে নিয়ে তাদের গর্ব হলেও,জাতীয় দলের থেকে রোজারিওর ম্যাচ দেখাই তাদের বেশি পছন্দের !


মেসি তার দাদী সেলিয়াকে হারান দশ বছর বয়সে। পিতামহির হাত ধরেই ফুটবলের সঙ্গে তার পরিচয়। অবাড়ন্ত মেসিকে তার থেকে বড়দের সঙ্গে খেলার সুযোগ করে দেয়ার জন্য কোচদের চাপ দিতেন সেলিয়া। তাকে এতটা পথ পেছ ফেলে এসেও মেসি কিন্তু সেইসব স্মৃতির প্রতি আজও শ্রদ্ধাশীল। এখনো গোল করলে বুকে ক্রস আঁকার পর ডান হাতে চুমু খেয়ে আকাশে তাকিয়ে দুটি হাত উঁচিয়ে ধরেন মেসি। ওটা তার দাদীমার জন্যই । বেঁচে থাকতে তো আর বংশপ্রদীপের রবি হয়ে জ্বলে ওঠা দেখে যেতে পারেননি। তাই ওভাবেই কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে চলছেন মেসি।


সেলিয়ার পরোলোকগমনের কিছুদিনের মধ্যেই নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজের কোচিং ষ্টাফ টের পান,তাদের সেরা খেলোয়াড়টির শরীরে কোথাও কোন একটা অসঙ্গতি আছে। এমনকিছু, যা তার শারীরিক বৃদ্ধিকে ব্যহত করে বেড়ে ওঠাকে বাধাগ্রস্থ করছে। ডাক্তারেরা ধরে ফেললেন। গ্রোথ হরমোন ডেফিয়েন্সি। সিদ্ধান্ত হলো, মেসির স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং খেলা চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিদিন একটি করে ইঞ্জেকশনের প্রয়োজন। যার মুল্য ৯০০ মার্কিন ডলার।


তার বাবা স্থানীয় একটি স্টিল ফ্যাক্টরির শ্রমিক। মা পার্টটাইম ক্লিনার। খরচের যুদ্ধে তারা দুইবছর টিকতে পেরেছিলেন। এরপর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় এক পারিবারিক বন্ধু। বার্সেলোনার সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। একদিন ট্রায়ালের ব্যবস্থা হয়ে গেল। বাকিটা সবাই জানে। হাতের কাছে আর কিছু না পেয়ে ন্যাপকিন পেপারে মেসির সঙ্গে চুক্তি সেরেছিলেন বার্সার তৎকালিন ক্রীড়া পরিচালক কার্লোস রেক্সাস। তারপর থেকেই মেসি লা মাসিয়ার। বার্সার। স্পেনেরও কি ?


মেসিকে কাতালান স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়। ছুটির পর সোজা অনুশীলনে। নিয়ম-শৃঙ্খলার জন্য স্পেনে লা মাসিয়ার একটা আলাদা সুনাম আছে। তাইবলে মেসির একাকিত্ব কেউ টের পায়নি। প্রতিদিন একটি করে ইঞ্জেকশন, স্কুল এবং ফুটবল-এই তিনে মিলে জীবন। বাবা দেখতে আসলে,মেসি দরজা বন্ধ করে প্রায়ই কাঁদতেন। পাছে, বাবা দেখে ফেলেন ! তাই মেসি বস্তি থেকে উঠে না আসলেও জীবন তাকে কম কশাঘাত করেনি।


হতে পারেন, চারবারের ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলার। কিন্তু তাতে অার্জেন্টাইনদের কিস্যু যায় আসেনা। তাই ‘ ২০১১ সালের পর থেকে আকাশি-সাদায় মেসির ধারাবাহিকতা থাকার পরও তাকে শুনতে হয়,‌’ও শুধুই ক্লাবের ফুটবলার।’

৫২৫, এস্তাদো দে ইসরায়েল, রোজারিও।

ঠিকানাটা টুকে রাখতে পারেন। মেসির আঁতুরঘর। তার শৈশব কেটেছে ওই ঠিকানার বাড়িটায়। এখন কেউ থাকেনা। কাঁচা-পাকা বাড়িটি এখনো মেসিদের দখলে। তার পাশেই ৪০ বছর ধরে বসবাস করছেন হুয়ান লোপেজ। মেসির শৈশবের প্রসঙ্গ উঠতেই হাতটাকে কোমর অব্ধি নামিয়ে লোপেজ জানালেন,ওই বয়স থেকেই ফুটবল নিয়ে রাস্তায় ছুটতেন মেসি। তখন তাকে কেউ চিনতো না। আর্জেন্টিনায় অমন প্রতিভা এন্তার । মেসিকে সবাই চিনেছে স্পেনে থাকাকালিন। এখনকার সমীকরনটা তাই এরকম-‌আর্জেন্টিনার মেসিকে প্রয়োজন। মেসির প্রয়োজন দেশের সমর্থন। এই লেনাদেনায় মেসি এখনো পিছিয়ে আছেন। কারণ দেশ কিছু না দিলেও জাতীয়তাটুকুই সারাজীবনের প্রাপ্তিসম। শুধু একবার চোখ বুঁজে ভাবুন তো, ১৩ বছর বয়সি একটা ছেলে। যে কিনা অসুস্থ। বাবা-মাকে ছেড়ে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে সোজা বিদেশ-বিভুঁইয়ে। একসময় খ্যাতি ধরা দিল। স্প্যানিশ জাতীয় দলে খেলার প্রস্তাবও আসলো। কিন্ত ওই যে ১৩ বছরের শৈশব, তার টানেই কি আকাশি-সাদার জন্মভূমিকে বেছে নেন মেসি ?


গত মে মাসে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি নিতে দেশের মাটিতে পা রাখতেই বুয়েন্স এইরস বিমানবন্দরে তাকে অপমান করেছিল কিছু উন্মাদ ভক্ত। ‘আর্জেন্টিনা সমন্ধে কিছু জানো কি’-এমন প্রশ্নও করেছে কেউ কেউ। জবাব দেয়ার সেরা উপায় যদি হয় ফুটবল,তাহলে তার সেরা মঞ্চটা নিশচয়ই বিশ্বকাপ ? অর্থাৎ, মেসি নিজেও জানেন, এবার না হলে আর কখনোই নয় !


ম্যারাডোনা ‘৮৬ বিশ্বকাপ জিতেছিলেন ২৬ বছর বয়সে। মেসির বয়স এখন ঠিক তাই। সেই ম্যারাডেনা, যার ৩৮ তম জন্মদিনে উদ্ভব হয়েছিল নতুন একটি ধর্মের ! ‌’ইগলেসিয়া ম্যারাডোনা।’ ইংরেজিতে চার্চ অব ম্যারাডোনা। ১৯৯৮ সালের ৩০ অক্টোবর ম্যারাডোনার ভক্তদের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে এ নতুন মতবাদ। এখন যার অনুসারী সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। প্রশ্ন হলো-ধর্মটার পীঠস্থান কোথায়?


মেসির শেকড় যেখানে প্রোথিত, সেই রোজারিওতেই ‘ইগলেসিয়া ম্যারাডোনা’র জন্ম। তাহলে, মেসি কিভাবে ম্যারাডোনা হবেন?


রোজারিওতে সে ঘরের ছেলে। ম্যারাডোনা খেলা ছেড়ে দেয়ার ১৭ বছর পর, আজও সেখানকার ঈশ্বর !

লেখা : মেহেদী হাসান রোমেল

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

four + 13 =