মেসিবিহীন বার্সার সাফল্যের নেপথ্যে……

যদি জিজ্ঞেস করা হয় বার্সার এই ইঞ্জুরড স্কোয়াড নিয়ে যেখানে স্ট্রাগল করার সেখানে বার্সা কিভাবে এত কম্ফোর্টেবলি ম্যাচ জিতে আসছে? উত্তর সহজ, নেইমার আর সুয়ারেজ দলকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটু জটিল ও মারপ্যাচ লাগানো উত্তরও আছে। প্লেয়িং স্টাইলের চেঞ্জ কি এই ক্ষেত্রে এফেক্ট ফেলে নাই? বার্সা যদি তাদের ঐতিহ্যগত টিকিটাকা খেলত এতটা সাফল্য কি পেতে পারত?

উত্তরটা না। কারণ টিকিটাকার প্লেয়ার কই? টিকিটাকা খেলাতে হলে আপনার মিডফিল্ডে দরকার জাভির মত একজন হোল্ডার, মেসি-আলভেজের লিংকআপ ও পাসে দক্ষ এমন দুইজন ফরোয়ার্ড। জাভির কোন রিপ্লেসমেন্ট হয় না, আলভেজ তার সেরা ফর্মের ধারেকাছে নাই, মেসি ইঞ্জুরড। আর আমাদের যে দুই মেইন ফরোয়ার্ড নেইমার আর সুয়ারেজ পাসিং গেমে কম্ফোর্টেবল না, বল রিটেনশনেও অত ভাল না। তাদের দিয়ে পসেশন গেম হবে, কিন্তু টিকিটাকা হবে না। তাই এনরিকে খেলার ধরনটা চেঞ্জ করলেন।

যেহেতু জাভি নাই, তাই মিডফিল্ড হোল্ডিংয়ের প্রশ্ন আসে না। তাই এনরিকে খেলান ডিরেক্ট এপ্রোচে। বল পেয়েই সামনে বাড়ানোর পায়তারা করা। এই ক্ষেত্রে নেইমার বা ইনিয়েস্তার ক্রিয়েটিভিটি কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয় কিন্তু জমাট বাধা ডিফেন্স সেই চেষ্টা পণ্ড করে দেয় বেশিরভাগ সময়। আবার মিডফিল্ড হোল্ডের ব্যাপার যখন আসছে না, তখন প্রতিপক্ষ বার্সার হাফে পেনেট্রেশন করার সুযোগ পাচ্ছে বেশি। এখানেই বার্সার স্টাইলে চেঞ্জ আসছে। প্রতিপক্ষের এই পেনেট্রশনের সুযোগ নিয়ে বার্সা কাউন্টার এটাক করার সুযোগ পায় যেখানে কাউন্টার এটাকের প্রোভাইডার ভুমিকায় থাকে মিডফিল্ডাররা আর ফাইনাল পাস আর ফিনিশিংয়ের দায়িত্ব থাক দুই ফরোয়ার্ড নেইমার আর সুয়ারেজের উপর।

যেমন কালকের ৩টা গোলের দিকেই যদি তাকায় প্রতিটা গোল কিন্তু কাউন্টার এটাকের ফসল। প্রথম গোলটায় মাঝমাঠে বল কেড়ে নিয়ে ইনিয়েস্তা যখন সুয়ারেজের দিকে বাড়ায় তখন বাতের ডিফেন্স পুরা আনঅরগানাইজড। সুয়ারেজ থেকে মুনির পাস পেয়ে স্কিল দিয়ে বাতের প্লেয়ারকে বিট করে সুয়ারেজের সাথে ওয়ান টু ওয়ান খেলে এগুতে গেলে তাকে ফাউল করে পেনাল্টি আদায় করে বার্সা। পরের গোলটাও কাউন্টার এটাকে, বাতের কর্ণার থেকে বল পেয়ে বাম দিকে দিয়ে কাউন্টার এটাকে যায় নেইমার, পাস করে সুয়ারেজকে আর সুয়ারেজের ক্লিনিকাল ফিনিশ। তিন নম্বর গোলেও কাউন্টার এটাকের মাধ্যমে। বাতে এটাক করছে, বার্সা বল কেড়ে নিছে। এরপর মুনির আর রবার্তোর পা ঘুরে বল পেয়ে গেল ডানদিকে থাকা সুয়ারেজ, বাতের হাফে মাত্র ৩ জন ডিফেন্ডার। সুয়ারেজের দারুণ রান ও বাম পাশ থেকে নেইমারের অফ দ্যা বলের রানে সুয়ারেজের পাসে ইজি ট্যাপ ইনে স্কোরলাইন করে ফেলে ৩-০। এ ছাড়া আরো বেশ কয়েকটা কাউন্টার এটাক দেখার মত ছিল যেগুলা গোল হতে হতে হয় নি।

বার্সা হঠাত এত কাউন্টার নির্ভর হয়ে গেল কেন? কারণ সিম্পল, কাউন্টারে খেলার মত যথেষ্ট প্লেয়ার আমাদের আছে। সার্জি রবার্তো, রাকিটিচ এরা কিন্তু পাসিং গেম খেলার চেয়ে কাউন্টার এটাকে ও ডিরেক্ট এপ্রোচে খেলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তার চেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে থাকে বার্সার দুই ফরোয়ার্ড নেইমার ও সুয়ারেজ কারণ মুভমেন্টের জন্য তারা যথেষ্ট স্পেস পায় যা দিয়ে তারা এমন কিছু করে বসে যেটা ফলপ্রসূ কিছু এনে দেয়। যেমন কাল নেইমার থেকে পাস পেয়ে সুয়ারেজ যেভাবে তার মার্কারকে ডজ দিয়ে শট নেওয়ার মত জায়গা করে নিল এটা সে পারত না যদি তাকে তিনজন ঘিরে ধরত। আবার নেইমারও বলটা পাস করতে পারত না যদি তাকেও কড়া মার্কিংয়ে থাকতে হত। এইভাবে কাউন্টার এটাকে খেলে আমরা ঠিকই সমস্যা নিয়ে ফ্লাইং কালারসে বেরিয়ে আসছি।

এত ভাল খেলার মূলে তাই শুধু নেইমার বা সুয়ারেজ না, এনরিকে উন্নত মস্তিষ্কও কাজ করছে। সে জানে তার প্লেয়ারদের থেকে সেরাটা বার করতে কোন ট্যাক্টিক্সে খেলাতে হবে, তাই নেইমার আর সুয়ারেজ ভালভাবে লিংকআপ করছে। এনরিকের উন্নত মস্তিষ্কের আরেকটা উদাহরণ হচ্ছে রাকির ইঞ্জুরি। আমি যদি বলি রাকির এই ইঞ্জুরি পুরোটাই সেটাপ যাতে তাকে ক্লাসিকোর আগে ফ্রেন্ডলি খেলতে না হয় তাহলে কি খুব ভুল বলা হবে? মনে হয় না।

আদ্রিয়ানোর কন্ট্রাক রিনিউর কোন যুক্তি আমি দেখি না, সে বার্সার কোয়ালিটির ধারেকাছে বাই। খারাপ লাগে যখন দেখি তার জন্য গ্রিমালদোকে দল ছাড়তে হবে। স্টেগান যদি মাঝমাঠ থেকে আরো কয়েকটা গোল খায় তাও আমি রাগ করব না। সে যেমনে খেলে জাস্ট মুগ্ধ হয়ে গেছি। ভারমালেন অস্থির, আরো বেশি চান্স ডিজার্ভ করে। আলভেজের খেলা আর তেমন ভাল লাগে না, কেমন যেন নিরস হয়ে গেছে। ইনিয়েস্তা মোটামুটি ভাল খেলছে, সার্জি রবার্তোর খেলাও চলে। আর মুনিরের খেলা কোনরকম, নেইমার আর সুয়ারেজের সাথে লিংকআপ করতে পারে না, তাই ডানপাশ পুরা অকেজো হয়ে আছে।

যাই হোক, নেইমার আর সুয়ারেজের ফর্ম ও এনরিকের ট্যাক্টিক্স এতদুর আনছে, জানুয়ারি পর্যন্ত পার করে দিবে বলেই বিশ্বাস আছে। 🙂

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

1 × five =