মিথটাকেও মনে হয় সত্যি!

“মুস্তাফিজকে যতবার দেখবেন, পরমুহূর্তেই সে আরও দারুণ কিছু নিয়ে সে আপনার সামনে হাজির হবে। অনেকটা সের্গেই বুবকার মত, যে নিজের রেকর্ড প্রতিনিয়ত ছাড়িয়ে যেত নিজেই”–আজকে ধারাভাষ্যে কথাগুলো বলছিলেন অ্যালান উইলকিন্স। ভাবতে গিয়ে মনে পড়ল ওয়াকার ইউনিসেকে!

সেই ১৯৯১ সালের কথা। ওয়াকার তখন খেলেন ইংলিশ কাউন্টি সারেতে। মাত্র ১৪ গড়ে নিয়েছিলেন ১১৩ উইকেট। তার চেয়েও বড় কথা, তুমুল গতিতে নাভিশ্বাস তুলে ছাড়ছিলেন ব্যাটসম্যানদের। বিশ্বের দ্রুততম বোলার নি:শংসয়ে। ওয়াকারকে নিয়ে তখন ছড়িয়ে গেল নানা কিংবদন্তী। কোনো ফিল্ডার মিসফিল্ড করলে অধিনায়ক নাকি তাকে বলতেন, “এরপর এরকম হলে কিন্তু ওয়াকারের বলে স্লিপে দাঁড় করিয়ে দেব!” শোনা যেত, সারের মায়েরা নাকি বাচ্চাদের ঘুম পাড়াতেন এই ভয় দেখিয়ে যে, “ওয়াকার কিন্তু বল করতে আসছে…!”

অবশ্যই এসব সত্যি নয়। তবে এমন কিংবদন্তী কখন ছড়ায়? যখন সত্যিই কেউ সেই উচ্চতায় উঠে যায়। কল্পনা-বাস্তব মিলেমিশে সে একটা মিথ হয়ে যায়। ওয়াকারের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছিল। মুস্তাফিজ কি সেই উচ্চতায় উঠে গেছে!

বুবকার সঙ্গে তুলনা মানে প্রায় আল্টিমেট কিছু। সর্বকালের সেরা অ্যাথলেটদের একজন বললেও কম বলা হয়। ইনডোর-আউটডোর মিলে পোল ভোল্টের বিশ্বরেকর্ড ভেঙেছেন ৩৫ বার। এর মধ্যে নিজের রেকর্ড নিজেই ভেঙেছেন ১৪ বার! বুবকার সঙ্গে তুলনা তাই বাড়াবাড়িই। ওয়াকারের মত মিথও হয়ত নয় মুস্তাফিজ। ধারাভাষ্যকারা তো অনেক সময় অতি উত্তেজনায়, অতি রোমাঞ্চে হুটহাট এমন বাড়িয়ে অনেক কিছুই বলেন।

তবু উইলকিন্সের কথা কেমন সত্যি মনে হয়! বিশেষ করে যে পয়েন্টে উইলকিন্স বলেছেন। মুস্তাফিজের বৈচিত্রের সমাহার! এক কাটারেই এত ভেরিয়েশন, আমরা ওকে চিনি-জানি-দেখি, তার পরও প্রতি ম্যাচে চোয়াল ঝুলে যায়।

মাশরাফি একটি কথা প্রায়ই বলেন, “হাজার হাজার রান করে আসা, দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ও ছন্দে থাকা কোনো ব্যাটসম্যানও যখন মুস্তাফিজকে প্রথম খেলবে, ওকে পড়তে হিমশিম খাবে।” এর মধ্যেই সেটা অনেকবার প্রমাণ হয়েছে, প্রথমবার ওকে ফেস করে বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানরাও বিভ্রান্ত হয়েছে। আজকে ব্রেন্ডন ম্যাককালামকে দেখুন। মাত্র ৪টা বল খেলেই মুস্তাফিজের বৈচিত্রের একটা প্রামাণ্য চিত্র পেয়ে গেছে।

বলছিলাম বৈচিত্রের কথা। দ্রুত শেখার কথা। আইপিএলে ওর আগের ম্যাচের কথাই ধরুণ। উইকেটে হালকা ঘাসের ছোঁয়া ছিল, গ্রিপ করছিল না। হোল্ড করছিল না বল। সেটা দ্রুতই বুঝে কাটারের থেকে বেশি মন দিল ফুল লেংথ বলে। কী দারুণ সব ইয়র্কার! আমরা তো অবাক বটেই, সেদিন মাশরাফিও বলছিলেন, ‘ছেলেটা কত দ্রুত এত ভালো ইয়র্কার শিখে গেল!’

ইয়র্কারও কত ভাবে করছে! মিডল স্টাম্পে করছে, লেগ মিডলে, অফ স্টাম্পে করছে। রান ঠেকানোর জন্য অফ স্টাম্পের বাইরে ইয়র্কার। স্লোয়ার ইয়র্কার। সব করছে। কত রকম গতিতে, কত রকম লেংথেই না কাটার করছে! আর ব্যাটসম্যানকে দ্রুত পড়তে পারার ক্ষমতাটা ঐশ্বরিক। বয়স মোটে ২০, আপাত সহজ-সরল, কিন্তু ক্রিকেট ব্রেইন দারুণ ক্ষুরধার। স্রেফ ভেতরে ঢোকা বলটা নিয়ে একটু কাজ করতে হবে। তাহলেই মোটামুটি পরিপূর্ণ বোলার।

নিজেকে যদি পথে রাখতে পারে, উন্নতি ধরে রাখতে পারে, ফিট রাখতে পারে, আ্‌ইপিএল-সিপিএল-বিপিএল-ইংলিশ টি-টোয়েন্টি-বিগ ব্যাশ-পিএসএল, এসব যদি বেছে বেছে খেলতে পারে, ফ্যাটিগ থেকে মুক্ত থাকতে পারে, প্রলোভনের সামনে নিজেকে সামলে যদি দূর ভবিষ্যত ভাবতে পারে, সর্বোপরি ওর পরিবার ও বাংলাদেশ যদি ওকে ঠিক ভাবে ম্যানেজ করতে পারে, আমরা হয়ত একদিন বলতে পারব, ‘আমাদের একজন বোলার সর্বকালের সেরাদের মধ্যে আছে!’

ব্যাটসম্যানরা অলরেডি ওকে খুব সাবধানে খেলছে, উইকেট দেয় না। তবু উইকেট আদায়ের পথ সে নিত্যই বের করে ফেলছে। একদিন শত শত উইকেট থাকবে ওর নামের পাশে। তবে উইকেটের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ব্যাপার, যেটির হিসাব নেই, থাকবে না। ব্যাটসম্যানদের ভোগানোর হিসাব। একদম টপ ক্লাস ব্যাটসম্যানদেরও রীতিমত বিব্রত করে ছাড়ছে সে। করবেও ভবিষ্যতে! উইকেট, বোলিং ফিগার ভূলে যান।গ্রেটনেসের ইঙ্গিত সেখানেই।

এত দ্রুত শিখছে, প্রতি নিয়ত এত উন্নতি করছে, নিত্য নিজেকে এভাবে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, বুবকার সঙ্গে তুলনার বাড়াবাড়িটাও কেমন যেন বাড়াবাড়ি মনে হয় না। ওয়াকারের মতোই, মিথটাকেও মনে হয় সত্যি!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

twenty − fourteen =