হাভিয়ের ম্যাশ্চেরানো : একজন অঘোষিত নেতার গল্প

হাভিয়ের ম্যাশ্চেরানো : একজন অঘোষিত নেতার গল্প

বীর দর্পে এগিয়ে চলেছেন বাহুবলী। তার ক্ষুরধার তলোয়ার আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থেকে বাদ পড়ছে না কোন শত্রু। একের পর এক ঘায়েল হয়ে ভূপাতিত হচ্ছে তারা, হৃদকম্পন ধরাচ্ছে তা শত্রু শিবিরে। নেই তার মধ্যে লেশমাত্র ভয়ের চিহ্ন। থাকবেই বা কেন? তার সাথে যে রয়েছে রক্ষাকবচ, পৃথিবীতে তার সবচেয়ে বড় ভরসার বস্তু- তার সেনাপতি – কাটাপ্পা। অসি হাতে তোলার সময়ই মহেশ্মতী রাজ্যের চেরাগ অমলেন্দ্র বাহুবলী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যতক্ষণ তার সাথে আছে কাটাপ্পার সঙ্গ তাকে মৃত্যু স্পর্শ করতে পারবে না। বাহুবলী হয়তো গল্পের নেপথ্যে নায়ক বনে যাওয়ায় আর তার আকর্ষণীয় শারীরিক গড়নের জন্য সবার দৃষ্টি কেড়ে থাকবেন। কিন্তু যুদ্ধের ময়দান থেকে তো আর একা জয় নিয়ে ফেরা সম্ভব না। বাহুবলী যখন তার বাহুর বল দেখিয়ে শত্রু হননের নেশায় মেতে উঠেন তখন ঐ কাটাপ্পাই সৈন্যদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে রণক্ষেত্রে আসল কাজটা সামলে নেন। কিন্তু ইতিহাস কাটাপ্পাদের কদাচিতই মনে রাখে। তাদের অবদান এক সময় হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। হার হোক আর জিত মানুষ ঐ বাহুবলীদের নিয়েই মেতে থাকে। এটাই বোধ হয় নিয়তির সবচেয়ে নির্মম খেলা। ফুটবলে ব্রাজিলিয়ান বা আর্জেন্টাইনরা সবসময়ই তারকাপ্রসবা দেশ। পেলে, জিকো, ম্যারাডোনা, মারিও ক্যাম্পেসরা তাদেরই মাঠ মাতানো ফুটবলের প্রতিনিধি। আর সাম্প্রতিক সময়ে যে কাজটা করে যাচ্ছেন মেসি – নেইমাররা। অর্জনের ঝুলিতে তাদের কি কি জমা পড়েছে তার চেয়ে বেশি কি কি পায় নি তা খুঁজে বের করাই নেহাত সহজ ব্যাপার। নান্দনিক ফুটবলের জন্য তারা সবসময়ই থেকে যাবেন ভক্তকুলের মন – মগজে। কিন্তু ফুটবলটা যে এখানেই শেষ নয়। গোল দিয়ে তা বাঁচাতে না পারলে দিনশেষে জয় নামক সোনার হরিণটা কপালে জুটে না। গোল দেওয়ার জন্যও চাই শক্তিশালী ও সৃজণশীল মাঝমাঠ। রক্ষণ আর মাঝমাঠ – এ দুইয়ে স্যান্ডউইচের পাউরুটির মাঝে চাপা খাওয়া বস্তুর মতো পড়ে থাকা খেলোয়াড়টাকে ধরে নেওয়া হয় ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বা রক্ষণাত্মক মাঝমাঠের কাণ্ডারী হিসেবে। রক্ষণের সাথে মাঝমাঠের সেতুবন্ধন তৈরি করার শক্ত কাজের ভার যার কাঁধে ন্যস্ত। মাঠে আসল কাজটা তারাই করে দেন। কিন্তু তাদের অবদানটা চাপা পড়ে যায় আক্রমণ ভাগের খেলোয়াড়দের কারিশমায়, হারিয়ে যান তারা কালের গর্ভে। মাশ্চেরানোর কথা নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন বার্সা আর আলবিসেলেস্তে ভক্তরা। এক সময়ের খাস মিডফিল্ডার তকমা ঝেড়ে ফেলে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বনে যান তিনি। ক্যারিয়ারের শুরুটা তার মাথায় চুলের অভাব নিয়ে আর শেষটা ঠিক টাকলা মাথায়। কিন্তু পারফরমেন্স? ঠিক তার উল্টো। সময়ের সাথে সাথে ক্লাব এবং জাতীয় দল উভয় জায়গায় হয়ে উঠেছেন প্রাণভোমরা। অন্য কিছুর জন্য না হলেও অন্তত ব্রাজিল বিশ্বকাপে আরিয়েন রোবেনকে তার করা দুর্ধর্ষ ট্যাকেলের জন্য অবশ্যই আলাদা করে চিনে থাকবেন। ক্লাবের হয়েও ঐরকম ঝলক দু-এক বার দেখা গিয়েছে। কিন্তু দিনশেষে ফুটবলটা গোলের খেলাই। গোল দিতে পারা খেলোয়াড়েরাই কবি-সাহিত্যিকদের মুখে খৈ ফুটান, রক্ষণদুর্গ আগলে রেখে আক্রমণে শান দেওয়া লৌহমানবেরা না। আমার চোখে ঐ মাশ্চেই আর্জেন্টাইনদের কাটাপ্পা। দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড় হয়েও করেছেন মাত্র ৩ গোল। ২০১০ থেকে সদ্য সমাপ্ত সিজন পর্যন্ত বার্সার হয়ে খেলে করেছেন মাত্র গোল। এসব দিয়ে হিসেব কষলে সে মূলত মামুলি এক খেলোয়াড়ই বটে। কিন্তু খুব গভীরের খবর রাখা ক্রীড়ামোদীরাই কেবল জানে যে ইতিহাসের বাঘা – বাঘা খেলোয়াড়েরা নয় নিরবে-নিভৃতে আলবিসেলেস্তেদের জন্য পুরোটা ক্যারিয়ার উৎসর্গ করে যাওয়া ঐ মাশ্চেই খেলেছেন সবচেয়ে মেজর টুর্নামেন্টের ফাইনাল। মেসিময় বার্সা যুগে মেসিকেও ছাপিয়ে বার্সার বর্ষসেরার খেতাব পাওয়া একমাত্র খেলোয়াড়ও যে ঐ মাশ্চেরানোই। তাই “Unsung Hero” ট্যাগটা বোধহয় তার গায়েই সবচেয়ে বেশি মানায়। বিশ্বকাপ এবারের মতো এখানেই শেষ আর্জেন্টিনার। সবাই ব্যথিত মেসি-রোনালদোর বিদায় ঘণ্টা বেজে যাওয়াও। কেউ কেউ হয়তো বা সামাজিক যোগাযোগের এখনও হতাশা ঝেড়ে মেসির সোনালি ট্রফিটা না ছুতে পারা নিয়ে। অথচ এই লোকটাও কতবার ঐ ট্রফিটার আশপাশ দিয়ে ঘুরে গেছেন তা বরাবরই সবার ভাবনাচিন্তার বাইরে। হাজারো তারকার উজ্জ্বলতার এখানেও কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন দলের জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়া এই লোকটা। ২৪ বছর আর্জেন্টাইনদের বিশ্বকাপ ফাইনালে তোলা কোচ আলেহান্দ্রো সাবেয়া বলেছিলেন, “আমার দলে একটা মাশ্চেরানো আছে, আর আছে বাকি দশটা খেলোয়াড়।” দলে পাঁচ-পাঁচবার ব্যালন ডি অর জেতা এবং কারও কারও মতে ভিনগ্রহের প্রাণীটা আর ক্লাব ফুটবল কাপিয়ে আসা এত শত খেলোয়াড়ের মাঝেও হীরা চিনতে ভুল করেননি সাবেয়া। দলের ক্রান্তিকালে সবসময় সতীর্থদের সাহস যুগিয়ে যান, নেতা না হয়েও দিয়ে যান নের্তৃত্ব। দলের জন্য এই ব্যক্তির ত্যাগ কতটা তা বোঝা যায় মাঠে তার শরীরী ভাষার। ২০১৪ তে ব্রাজিলে বসেছিল ২০ তম বিশ্বকাপের আসর। সেমিতে আর্জেন্টাইনদের দেখা ৭৪ আর ৭৮ এর ফাইনালিস্ট আর ঠিক তার আগের বিশ্বকাপে আবারও ফাইনাল খেলে আসা ডাচদের সাথে। বাতাসে বল দখলের লড়াইয়ে পেলেন মাথায় চোট। বিশেষজ্ঞদের মতে এ ধরণের চোটে সাধারণত ৯-১৩ মিনিট মাঠের বাইরে থাকা লাগে চোটের কার্যকারীতা কমে আসতে। অথচ সবাইকে অবাক করে তিনি মাঠে ফিরে এলেন মাত্র ৩ মিনিটের মাথায়। এই বিশ্বকাপের কথাই ধরুন না। ট্রফি জেতা তো দূরের কথা ক্রোয়েটদের কাছ থেকে লজ্জাজনক জারে অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল আলবিসেলেস্তেদের রাউন্ড অফ সিক্সটিনে যাওয়া। এহেন মুহূর্তে নাইজেরিয়ার সাথে বাঁচা – মরার লড়াইয়ে পেলেন কপালে চোট। চোখের খানিকটা পাশ দিয়ে কেটে বেরোল রক্ত। কিন্তু তাতে তোয়াক্কা না করে চালিয়ে গেলেন খেলা। শুধু তাই নয় বিশ্বকাপের মাঝখানে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের মাঝে দানাবাঁধা বিদ্রোহের যে গুঞ্জন উঠেছিল তাতেও নাকি সবাইকে এক সুতায় গেঁথে রেখেছিলেন ঐ মাশ্চে। বিশ্বকাপের দৌড় থেকে ছিটকে পড়ল আলবিসেলেস্তেরা। মাশ্চের ক্যারিয়ারের শেষটা হল সোনালি ট্রফিটা হাতে না তুলেই। বিদায় বেলায়ও প্রশংসায় ভাসাতে ভুললেন না ক্লাব এবং জাতীয় দলের সতীর্থ মেসিকে।

হাভিয়ের ম্যাশ্চেরানো : একজন অঘোষিত নেতার গল্প

বলে গেলেন, “মেসি যেদিন থেকে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলবে না সেদিনই তারা বুঝবে আর্জেন্টিনার জন্য সে আসলে ছিল।” আসলেই কি? সময়টা যে বরং এখন তার অভাবোধ বোঝার। যদুতে মধু দিয়ে হোক কিংবা কেবল কল্পনায় হোক, এখনও টিকে আছে মেসির আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার স্বপ্ন। কিন্তু মাশ্চের আর সেই সুযোগটা নেই। যখন আক্রমণ মুখ থুবড়ে পড়বে বিপক্ষ দলের অর্ধে, যখন বিপরীত দিক থেকে হানিত আক্রমণ ভেদ করবে রক্ষণদুর্গ তখনই খেলোয়াড়েরা খেই হারিয়ে দিক্বিদিকজ্ঞানশুন্য হয়ে পড়বে, খুব করে অভাব বোধ করবে একজন নেতার। সেসময় বোধ আফসোসের সাথে মনে পড়বে এই নেতার কথা। না বলা কষ্টে বুকটা ফেটে যাবে। আর সময়টা চোখের পলকে অতিবাহিত হয়ে যাবে তার কথা ভাবতে ভাবতে। মাশ্চেরানো, পুরো নাম হাভিয়ের আলেহান্দ্রো মাশ্চেরানো- আমাদের স্বপ্নের নায়ক মাশ্চে। এই নায়ক অতিমানবীয় শক্তি দিয়ে অলৌকিক কিছু হয়তো বা কখনও করে নি। তবে কি জাদুমন্ত্র দিয়ে যেন দলটাকে এক সুতোয় গেঁথে রাখতেন। ফুটবলটাকে প্রথম প্রেম হিসেবে বেছে যুবকদের লৌহমানব – মাশ্চেরানো…

লিখেছেন – নওশাদ আইয়ুব

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

five × 1 =