মাশরাফি বাহিনী, ফিরে দেখা ২০১৫

২০১৪’র মোটামুটি শেষভাগ থেকে শুরু হলো এক অকল্পনীয় উত্থানগাথা। এমনটি নয় যে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের এর পূর্বে কোন সাফল্য ছিলোনা তবে এবারের এই উত্থান আসলেই অন্যরকম। টোটাল প্রফেশনালিজমের বহিঃপ্রকাশ এবারের এই সাফল্যে। প্রোফেশনালিজমের ছড়াছড়ি দেখা যায় মূলত যে দলগুলির মধ্যে তাদের মধ্যে অন্যতম গুণ হলো, ব্যাটিং ধসে পরলো তো কি হয়েছে! বোলিং দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করে ফেলা অথবা বোলারেরা বেদম মার খেলো, আরে ধুরর, আমাদের ব্যাটসম্যানরা তো আছেই। এইতো চাই। প্রাপ্তির হিসাব অনেক বড়, ম্যাশের মতো এক নির্ভীক, কৌশলী এবং সাহসী নেতা, মুস্তাফিজের মতো তুরুপের তাস, তাসকিন, সৌম্য, সাব্বির, রুবেলরা আর আগে থেকেই দলকে সার্ভিস দিয়ে যাওয়া সাকিব, তামিম, মুশফিক, রিয়াদ. নাসিররা তো আছেই। শুরুটা হয়েছিলো বিশ্বকাপের আগে ৫ম্যাচ এর সিরিজে জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে। আত্মবিশ্বাস নিয়ে শুরু হলো বিশ্বকাপ অভিযান। গ্রুপ পর্ব থেকে বেশিরভাগই প্রাপ্তি এবং কিছু অপ্রাপ্তির সাথে সাথেই চলছিলো টাইগাররা, ধীরে ধীরে উঠে আসা নকআউট স্টেজে। অতঃপর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়, রুবেলের বলে যখন স্ট্যাম্প ভেঙ্গে চুরমার বাংলাদেশে বয়ে যাচ্ছে তখন এক উল্লাসের বন্যা। প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনাল, স্বপ্ন আরো অনেক বড় তখন। স্বপ্নটা ছিলো ফাইনালকে ঘিরে কেননা আমাদের জন্য তখন আর তা কোন স্পর্ধা নয়, সেই শিখরে আরোহণে আমরা ছিলাম সক্ষম। কিন্তু মার্কেটিং আর পণ্যে পরিণত হতে থাকা ক্রিকেটের চরম মূল্য দিতে হলো কোয়ার্টার ফাইনালে ‘টিম ইন্ডিয়া’র বিপক্ষে। গোটা বিশ্ব দেখলো এক ন্যাক্কারজনক প্রশ্নবিদ্ধ ম্যাচ যে ম্যাচে মাঠের দুই দলের চেয়েও বড় হয়ে উঠলো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপে ফলাফল নির্ধারন। হেরে গেলো বাংলাদেশ। তবে এবার যেনো কথার কথা নয়, সত্যিই গোটা পৃথিবীর হৃদয় জিতে নিয়ে গেলো। বিশ্বকাপের পর জয়যাত্রা অব্যাহত থাকে পাকিস্তানকেও হোয়াইটওয়াশের লজ্জায় ডুবিয়ে। অনেক শোরগোল তুলে, মাশরাফিদের বাঁকা চোখে দেখার ঔদ্ধত্য দেখালেও পূর্ণশক্তির ‘টিম ইন্ডিয়া’ও নতজানু হয় বাংলাদেশের পরাক্রমের কাছে। পাকিস্তানের পর ভারতের বিপক্ষেও বাংলাদেশ পায় প্রথমবারের মতো সিরিজ জয়ের মধুর অভিজ্ঞতা। প্রথম দুই ম্যাচ জিতেই সিরিজ নিশ্চিত করে ফেলে মাশরাফির দল। সিরিজের শেষ ম্যাচ জিতে ভারত একটা সান্ত্বনা পুরস্কার পেয়েছিল। তাই ঘরের মাঠে টানা ১০ ম্যাচ অপরাজিত থাকার পর বাংলাদেশকে হারের তিক্ত স্বাদ পেতে হয়েছে। একটা বোলিং ফিগার অর্থাৎ – মুস্তাফিজুর রহমান (৬/৪৩)…. বিপক্ষ- ভারত….. মিরপুর,২০১৫ বহুদিন পর্যন্ত একটা তৃপ্তি দিয়ে যাবে আমাদের। পাকিস্তান-ভারতের পর প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা, প্রোফেশনালিজম ও ধারাবাহিকতার বিচারে ক্রিকেট-বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি প্রোটিয়াদের বিপক্ষে বাংলাদেশ কেমন করে, তা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলো দেশবাসী তথা বাংলাদেশ সমালোচনায় মেতে থাকা অনেকেই। দুটি টি-টোয়েন্টি আর ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচ হেরে যাওয়ায় কিছুটা হতোদ্যম হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গন। কিন্তু ঘরের মাটিতে এখন বাংলাদেশের হারই যে অপ্রত্যাশিত, সেটা মাশরাফিরা দেখালেন দ্বিতীয় ওয়ানডে দাপটের সঙ্গে জিতে। সৌম্য সরকারের দৃষ্টিনন্দন ব্যাটিংয়ে ৭ উইকেটের জয় দিয়ে সিরিজে সমতা ফেরায় লাল-সবুজের দল। সিরিজ নির্ধারণী তৃতীয় ম্যাচে বাংলাদেশ দক্ষিণ আফ্রিকাকে আরো ভালো করে চেনায় নিজেদেরকে। ব্যাটে-বলে সমান দাপট দেখিয়ে জিতে নেয় ৯ উইকেটে। এ বছর শেষে নভেম্বরে আবার সেই জিম্বাবুয়েকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পেলো বাংলাদেশ। ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ এবং টি২০তে সমতা নিয়ে বছর শেষ করলো ব্যাঘ্রসেনারা। এর মাঝে যদিও অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশ সফরে আসা না আসা নিয়ে বেশ জলঘোলা হয়েছে। দেখা যাক আগামী বছর কি হয়। তবে সবমিলিয়ে ২০১৫’কে বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য উল্লেখ করতে হলে তবে বলতেই হবে- এটি ছিলো আকাশ-ছোঁয়া দম্ভ নিয়ে চলা দলগুলোকে টেনে মাটিতে নামিয়ে তাদের ঘাড়ে পা তুলে ছড়ি ঘোরানোর বছর।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

nineteen − three =