মাশরাফি চ্যালেঞ্জে হারে না

মাশরাফির ওই চেহারাটা হয়ত আজীবনই চোখে লেগে থাকবে। ওর সঙ্গে যখন নড়াইল গেলাম, রাতে ওদের বাড়ির পাশে ব্যাডমিন্টন খেলা চলছে। আমরা আড্ডা দিচ্ছি তুমুল। লুঙ্গি পড়া ম্যাশ হঠাৎ নেমে গেল ব্যাডমিন্টন খেলতে। মজা করেই। আরেক পাশে ওরই এক বন্ধু। ম্যাশ এক হাতে লুঙ্গি ধরে, আরেক হাতে র‌্যাকেট নিয়ে খেলছিল। ওর বন্ধু পয়েন্ট নিচ্ছিল টপাটপ, চোখে পলকে পয়েন্ট হয়ে গেল ১২-৪, বা এইরকমই কিছু।

আচমকা দেখি ম্যাশের চোখ-মুখ বদলে গেছে। চোয়াল শক্ত, মজা জাতীয় কোনো কিছুর ছাপ সেখানে নেই। এই ম্যাচটাও সে হারতে চায় না! লড়াই ছাড়া হার, সেটা এমন ম্যাচেও, সে স্রেফ ঘৃণা করে। ঠিকই পরে ম্যাচটা জিতল এবং হাসতে হাসতে কোর্ট ছাড়ল। সে হাঁটছে, পেছনে ওর বিশাল বাহিনী। আমিও পেছনে। ওরই এক ছোট্টবেলার বন্ধু আমাকে আস্তে করে বলছিল, ‘কৌশিক ছোট থেকেই এইরকম, কোনো জায়গাতেই হারতে চায় না।”

ওর সেই চেহারা মুহূর্তের জন্য আবার দেখলাম গত ২৪ ফেব্রুয়ারি, এশিয়া কাপে ভারতের কাছে হারার পর। প্রেস কনফারেন্স শেষে ড্রেসিং রুমের সামনে আড্ডা মতো হচ্ছিলো। আমি বললাম, ‘ভালোই হইছে, ফাইনাল খেলতে হবে না। আপনারা ধর্মশালায় গিয়ে আগেভাগে একটু মানিয়ে নিতে পারবেন।’ ম্যাশ বলে, ‘ফাইনাল খেলতি পারব না ক্যান? ভাই, আপনি একই কথা কলেন ক্যান!’
আমি রীতিমত অট্টহাসি দিলাম, ‘ফাইনাল খেলার আশা করেন!’ আমারটা স্রেফ ফাজলামোই ছিল। মাশরাফির প্রচণ্ড ঘা লাগল, দেখি মুহূর্তের জন্য চোখমুখ শক্ত। ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘ফাইনালে তো খেলমুই, তারপরে দ্যাহেন আপনেরে কি করি! আপনের খবর আছে।” আমি বললাম, ‘দেখা যাবে, চ্যালেঞ্জ থাকল।’

এরপর গত কদিনে এটা নিয়ে খুনসুটি হয়েছে দেদার। আমিরাতের বিপক্ষে জয় এলো। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয়ের পর খুনসুটি আরও বাড়ল। অফিসিয়াল প্রেস কনফারেন্সেও এটা নিয়ে মজা, হাসাহাসি। পাকিস্তান ম্যাচের আগের দিন, শের-ই-বাংলার ইনডোরে আড্ডা চলছিল। কি একটা প্রসঙ্গে মাশরাফি বলছিল, “ফাইনালটা খেললে তার পর…”। আমি চট করে বললাম, ‘কি খেললে?’ ম্যাশ বলে, ‘ক্যান, ফাইনাল!’ বললাম, ‘ওইটার আশা এহনও বাদ দ্যান নাই!’ দুই হাত মোনাজাতের মত করে ওপরে ধরে মাশরাফি বলল, ‘আল্লাহ, তুমি দেইখো। জীবনে আর কোনো কিছু অ্যাতো করে চাই নাই…।’ আমি বলছিলাম, ‘আল্লাহ অ্যাতো দ্যাখে না। ভালো খেইলা দেখাইয়া দিতে হয়।’

মাশরাফি দেখিয়েছে, মাশরাফিরা দেখিয়েছে। মাশরাফি চ্যালেঞ্জে হারে না। মাশরাফির বাংলাদেশও নিত্য নতুন চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে জানে।

এই চ্যালেঞ্জ হারায় আমার যে কী আনন্দ, কত তৃপ্তি, কতটা ভালো লাগা, কতটা গর্ব, সেটা যে কিভাবে বোঝাই!

(আপাতত মাশরাফি ‘খবর’ করে নাই। ম্যাচ শেষে গিয়ে এমন ভাবে জড়িয়ে ধরছি, খবর করার সুযোগ দেই নাই! যদিও জানি, সে এটা ভুলবে না এবং ছাড়বেও না। নানা ভাবে ‘খবর’ করতে চাইবে। সমস্যা নেই, হলাম নাহয় খবরের শিকার। এই ‘খবর’ হওয়াতেও অনেক সুখ!)

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

nine − six =