মার্সেলো বিয়েলসা : গার্দিওলাদেরও গুরু যিনি

::: আবু হেনা তসলিম অর্পন :::

গেম অফ থ্রোন্সের কোনো চরিত্রের সাথে তুলনা করলে তাঁর চরিত্রের নাম হবে দারিও নাহারিস। “আই এম দ্যা সিমপ্লেস্ট ম্যান ইউ উইল এভার মিট। আই ডু হোয়াট আই ওয়ান্ট টু ডু।” তাঁর কাছ থেকে গার্দিওলা, পচেত্তিনো, ডিয়েগো সিমিওনের মতো বর্তমান বিশ্বের নাম করা কোচরাও শিখে থাকেন। তাঁর নতুন কিছু করার আকাঙ্ক্ষা এবং সৃজনশীল পদ্ধতি তার ডাক নামটি এনে দেয়। আক্রমণাত্মক পজেশন ফুটবল খেলার ব্র্যান্ড হিসেবে তিনি পরিচিত । তাঁর ডাক নাম ‘এল লোকো’ যার অর্থ পাগল এবং সবার কাছে তাঁর জন্য ভালবাসা অনেক বেশিই। তাঁর নাম মার্সেলো বিয়েলসা । আজকে উনার ফুটবল পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করবো, ম্যানেজারিয়াল ইতিহাস হয়তো অনেকেই জানেন। তিনি কিন্তু প্রথমে কোচ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক।

মার্সেলো বিয়েলসা এর সবচেয়ে পছন্দের ফর্মেশন হল, ৩-৩-১-৩ ফর্মেশন। মাঝে মাঝে যা ৪-২-৩-১ এ পরিবর্তিত হয়। এই ফর্মেশনের কিছু ফিলোসোফি রয়েছে, যেমন, এমন ভাবে ডিফেন্স লাইন সাজানো যেনো প্রতিপক্ষের আক্রমণের খেলোয়াড় থেকে সবসময় একজন ডিফেন্ডার বেশি থাকে। যেনো একজন স্পেয়ার/অতিরিক্ত ডিফেন্ডার এর কারণে, উইংব্যাক বা ওয়াইড মিডফিল্ডাররা সব সময় সামনে এগিয়ে যেতে পারে। যে কারণে তাদের খেলায় স্বাভাবিক ভাবেই প্রেসিং চলে আসে এবং তাদের ডিফেন্স লাইন অনেক উপরে থাকে, যাকে বলা হয়ে থাকে হাই লাইন।

মার্সেলো বিয়েলসা : গার্দিওলাদেরও গুরু যিনি
লিলে থাকার সময় বিয়েলসার ট্যাকটিকস

বিয়েলসা তাঁর দলকে অসম্ভব গতিতে খেলতে যেমন উৎসাহিত করে ঠিক তেমনি পজেশন ফুটবল খেলতেও শর্ত দিয়ে দেয়। এই ধরনের খেলার জন্য অনেক বেশি টেকনিকাল অ্যাবিলিটি প্রয়োজন। বিয়েলসা যার জন্য গ্যারি মেডেল কিংবা লিলে তে ইব্রাহিম আমাদুকে সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ রোলে খেলিয়েছেন যেন যেন পেছন থেকে খেলা বানানোর ক্ষমতা তাদের থাকে এবং ভালো পাস দিতে পারে। বিয়েলসা ফুলব্যাকদের সেন্টার ব্যাক হিসেবে খেলান, কারণ তিনি বিশ্বাস করেন যে, সেন্টার ব্যাকদের থেকে ফুল ব্যাকরা সামনে বেশি ভালোভাবে বল নিয়ে যেতে পারে। যার কারণে, চিলিতে থাকা অবস্থায় আর্তুরো ভিদালকেও উইংব্যাক হিসেবে খেলিয়েছিলেন। বল সামনে নিয়ে যাওয়ার আগে তিনি চান তাঁর ডিফেন্ডার এবং গোলকিপারদের মাঝে পাস আদান-প্রদান হোক এবং পরে যেন পাশে থাকা ওয়াইড খেলোয়াড়দের পাস দেওয়া হয়।

বিয়েলসার সবচেয়ে পছন্দের সিস্টেম ৩-৩-১-৩ তে ডিফেন্সে এক ধরণের নতুন চাঁদের আকৃতির সৃষ্টি হয়। তিন জন সেন্টার ব্যাক এবং দুই জন উইংব্যাক একই লাইনে না থেকে উইং ব্যাক গুলো একটু সামনে যান এবং মাঝখানের ডিফেন্ডার একটু পিছনে থাকেন, ফুটবলে এই ধরণের ডিফেন্ডাররা অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছেন। এ ধরণের ডিফেন্ডারদের বলা হয়ে থাকে, লিবেরো। সর্বকালের সবচেয়ে সেরা লিবেরোর নাম হলো ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। বিয়েলসা এই ছকে একজন লিবেরোকে খেলিয়ে থাকেন, সাধারণ ডিফেন্ডার এবং লিবেরোর মধ্যে পার্থক্য হলো, লিবেরো ডিফেন্স কন্ট্রোলার। অর্থাৎ লিবেরো ডিফেন্স লাইনকে নেতৃত্ব দেয়, নিজে অফসাইড নিয়ন্ত্রণ করে। এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসলে বল নিয়ে সামনে যেতে দ্বিধাবোধ করেন না। এই ফর্মেশনে একজন মিডফিল্ডার সেই চাঁদ আকৃতির মাঝে গিয়ে বল নিয়ে খেলা গড়তে থাকে এবং সেন্টার ব্যাকদের সাহায্য করতে থাকেন, ফুটবলে যাকে বলা হয়ে থাকে ডিপ স্ক্রিনিং মিডিফিল্ডার। লিলে তে থিয়াগো মেন্ডেস বা থিয়াগো মাইয়া এই কাজটি করে থাকতো।

মার্সেলো বিয়েলসা : গার্দিওলাদেরও গুরু যিনি
চিলিতে থাকার সময় বিয়েলসার ট্যাকটিকস

উইংব্যাকরা সবসময় উপরে চলে যেতো যেখানে আক্রমণের খেলটা শুরু হতো, সামনে থাকতো ১-৩। আনোয়ার এলগাহজি এবং লুইজ এরাউজো – লিলের দুইজন ওয়াইড এট্যাকার যতোটা পারে মাঠের ওয়াইডে চলে যায়। এখানে ধারণাটা হলো, ওয়াইড অঞ্চলে গিয়ে ফুল ব্যাকদের তাদের সাথে টেনে নেওয়া এবং যখন উইংব্যাকরা সামনে যাবে, তখন সেই অঞ্চলে বেশী খেলোয়াড়ের চাপ সৃষ্টি করা। আক্রমণ লাইন, ১ জন স্ট্রাইকার যাকে আর্জেন্টিনায় বলা হয়ে থাকে ‘এনগানশে’, লিলেতে নিকোলাস ডি প্রেইভো এই কাজটি করতেন দক্ষতার সাথে। যার রক্ষণাত্মক কাজ খুবই সীমিত এবং যে আক্রমণের ক্যাটালিস্ট বা প্রভাবক হিসেবে কাজ করে থাকেন। ইয়াসিন বেনযিয়া, সাবেক লিলে খেলোয়াড় লিলেতে সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড হিসেবে বিয়েলসার অধীনে খেলেছিলেন। আক্রমণের সময় ওয়াইড খেলোয়াড়, স্ট্রাইকার এবং এনগানশে মিলে ত্রিভুজ গঠন করে থাকে যার ফলে তাদের পাসিং এর জন্য সবসময় অপশন থাকে।

এথেলেটিক বিলবাও এ তাঁর ৩-৩-১-৩ ফর্মেশন না খেলিয়ে ৪-২-১-৩ ফর্মেশন এ খেলাতে বাধ্য হয়েছিলেন। ৪ জনের ডিফেন্সিভ লাইন ২ জন হোল্ডিং মিডফিল্ডার, ১ জন এনগানশে, ২ জন ওয়াইড উইঙ্গার এবং ১ জন স্ট্রাইকার। এখানে যে ধারণা তা ছিল সেটা হল, আক্রমণগুলো যেন গতি ও প্রশস্থতা পায়, নিজেদের মধ্যে ত্রিভুজ গড়ে তাঁর মধ্যে পাস দেওয়া, এবং আক্রমণের ফোকাস পরিবর্তন করা (নিজেদের মধ্যে ঘন ঘন জায়গা পরিবর্তন করা, যেন অ্যাটাকারদের মার্ক করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। এটা একধরণের টোটাল ফুটবলের আকার), ভার্টিকাল খেলা খেলা, হাই লাইন ধরে রাখা যেন প্রতিপক্ষরা খেলা বানানোর জায়গা না পায়। বিয়েলসা এক খেলায় আলাদা কোনো আক্রমণ কিংবা রক্ষণ এর ভাগ নেই। তিনি চান, তাঁর সব খেলোয়াড়রাই দৌড়াক এবং খেলা গড়তে সাহায্য করুক।

বিয়েলসার কাছে তাঁর খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতার দরকার হলেও তিনি যেটাতে বেশি গুরুত্ব দেন সেটা হল, আগে থেকে নির্ধারণ করে রাখা পাসিং খেলা। অর্থাৎ, সতীর্থদের মুভমেন্ট দেখে সঠিক পাস দেওয়ার চিন্তাধারা। তিনি আরো একটি কাজ খুব করে থাকেন, সেটার হল, ভিডিও ফুটেজ দিয়ে তার খেলোয়াড়দের প্রতিপক্ষের ট্যাক্টিকস ভেঙ্গে বুঝান। প্রতিপক্ষের কৌশল হাজারো ভিডিও দিয়ে কাটাছেঁড়া করার ‘রোগ’ আছে মার্সেলো বিয়েলসার। মার্সেলো বিয়েলসা যতটুকু পাগলই হোক না কেন, তিনি একজন ফুটবলের জিনিয়াস ট্যাকটিশিয়ান। এই সিজনে লিডস ইউনাইটেডের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। সময় হলে লিডসের খেলা দেখেন, কিছু না কিছু শিখতে পারবেন।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

sixteen + thirteen =