মারিও কেম্পেস : এল ম্যাটাডোরের জন্মদিনে

১৯৭৪ বিশ্বকাপ:
 
জার্মানী। একনায়কতন্ত্রের দেশ জার্মানী,সমাজতন্ত্রের দেশ জার্মানী। হিটলারের দেশ জার্মানী। সেই জার্মানীতেই বসল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ। হ্যাঁ, ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ।
 
১৯৭০ সাল পর্যন্ত সেটির নাম ছিল জুলেরিমে ট্রফি। পেলে,ভাভা,গ্যরিঞ্চা এই ত্রিরত্নের ত্রিভুজ মিলে সেই ট্রফি টি চিরতরের মত ব্রাজিলের করে নিয়েছিলেন। তারপর থেকেই টুর্নামেন্ট টির নাম রাখা হল বিশ্বকাপ। জার্মানীতে তখন বেকেনবাওয়ারের যুগ। ‘৭৪ বিশ্বকাপের জন্মটাই সম্ভবত হয়েছিল বেকেনবাওয়ারের ইতিহাস টা সম্পূর্ণ করার জন্য। সমগ্র জার্মানী সবুজ গালিচায় পসরা সাজিয়ে বসে আছে বেকেনবাওয়ারের জন্য। স্বয়ং বিশ্বকাপ টিও যেন অপেক্ষায় আছে বেকেনবাওয়ারের ইতিহাস সৃষ্টির সাক্ষী হওয়ার জন্য। ববি চালটর্ন যুগের ততদিন অবসান ঘটেছে,অবসান ঘটেছে ইউএসবিও যুগের এমনকি অবসান ঘটেছে পেলে সম্রাজ্যেরও। সেই বেকেনবাওয়ারের বিশ্বকাপে একদল অপিরিচিত ফুটবলার নিয়ে গড়া আর্জেন্টিনা দল কিইবা করতে পারে। তারপর ও গ্রুপটা যখন হয় নেদারল্যান্ড, পশ্চিম জার্মানী,আর ব্রাজিল কে নিয়ে। নিজের খুনে স্বভাব টা ততদিনে জাগিয়ে তুলেছেন কেম্পেস। রোজারিও সেন্ট্রাল থেকে তার ভ্যলেন্সিয়াই ট্রান্সফার কেবল সময়ের অপেক্ষা।রোজারিও সেন্ট্রালের হয়ে ১০৭ ম্যাচ খেলে করে ফেলেছেন ৮৫ গোল। কিন্তু একদল অপিরিচিত ফুটবলার নিয়ে গড়া ভুতুড়ে দলটিকে নিয়ে কতদূর যেতে পারবেন তিনি। নাহ।পারলেন না। কিছুই করতে পারলেন না। মাঠে নিজের অস্তিত্বই প্রমান করতে পারলেন না। নেদারলল্যান্ডের টোটাল ফুটবল আর ব্রাজিল পরাশক্তির কাছে মুখ থুবড়ে পড়ল আর্জেন্টিনা। বেকেনবাওয়ারের জার্মানীর সাথে সান্ত্বনার ড্র নিয়েই সেবার বিশ্বকাপ মিশন শেষ।একটুও কাঁদলেন না কেম্পেস। শোক টা কে নিজেত ভেতরেই রাখলেন। এক অনুভূতি শূন্য মানুষের ন্যায় ক্রুইফ আর বেকেনবাওয়ারের স্বচক্ষে দর্শনের একটুকরো সুখের স্মৃতি নিয়েই বিশ্বকাপের মঞ্চ ত্যাগ করলেন। শূন্য হাতেই রেকর্ড হাফ মিলিয়ন ফিতে সেন্ট্রাল রোজারিও থেকে ভ্যালেন্সিয়া পাড়ি জমালেন কেম্পেস।ক্রুইফের টোটাল ফুটবল কে পথে বসিয়ে ইতিহাস গড়লেন বেকেনবাওয়ার। লাতিন ফুটবল কে আরো এক বোঝালেন ইউরোপিয়ান ফুটবল শিল্পের ক্ষমতা।
 
ফুটবলের স্বর্গ আর্জেন্টিনা। সে দেশের মানুষের কাছে ঈশ্বর গোলাকার। কারণ ফুটবল টিই যে তাদের কাছে ঈশ্বর। সে দেশের মানুষের ফুটবল টি পেশা নয়,সে এক নেশা। যে দেশের মানুষের কাছে ফুটবলের স্থান কেবল পায়ের পাতায় নয়, রক্তকণিকাই, হৃদস্পন্দনে। যে দেশের ফুটবল সম্পূর্ণ রুপে লাতিন ঘরানার সেই ফুটবল অহংকার কে ধারণ করে নিজেদের বহিংপ্রকাশ করেছে ফুটবলের এক অনন্য সৌন্দর্যের পূজারী হিসেবে। আর তাদের সেই সৌন্দর্যের পসরাগুলোকে প্রথমবারের মত সমগ্র বিশ্বের সামনে যত্ন করে যিনি তুলে ধরলেন তার নাম মারিও কেম্পেস। তার সেই গোলের উগ্রক্ষুধা দেখেই তো ভ্যলেন্সিয়ার কোচ বলেছিলেন-
“Don’t tell him Mario Kampes. tell him goal”
 
পরিবারের আরেকটি সদস্যের মুখে অন্ন যোগান দেয়ার চিন্তা তখন পরিবারে নতুন সদস্য আগমনের চিন্তাকে ছাপিয়ে উঠছে। বাবা মা নাম রাখলেন মারিও আলবার্তো কেম্পেস ছিয়োডি। যে ছেলেটার মুখে অন্ন যোগান দেয়ার চিন্তায় পিতামাতাকে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছিল, সে ছেলেটাকেই ডিবক্সের ভেতর আটকে রাখার উপায় খুঁজতে প্রতিপক্ষের কোচকে কাটাতে হয়েছে বহু দুঃস্বপ্নের রাত,সে ছেলেটাই তার খুনে গোল স্বভাবের জন্য সতীর্থ কাছ থেকে লাভ করেছিল ‘এল ম্যাটাডোর’ উপাধি।বাংলায় যার অর্থ খুনী।
 
 
স্পেনের প্রিমেরা ডিভেশনে মোটামুটি নামকরা একটি ক্লাব ভ্যলেন্সিয়া ফুটবল ক্লাব।কিন্তু গ্যলাকটিকো রিয়াল মাদ্রিদ কিংবা ডাচ রাজপুত্র ক্রুইফের বার্সেলোনার সাথে কোন দিক থেকেই তুলনা করা যায় না ক্লাবটির। কিন্তু কেম্পেস যে এসেছেন খুনী হয়ে। তিনি তো তোয়াক্কা করবেন না কোন প্রতিপক্ষ।ইউরোপে তখন গ্রীস্মকাল। প্রিসিজনের ম্যাচ গুলোতে তাই বেশ ভোগান্তিই পেতে হয়েছিল কেম্পেস কে।বাজে ফিনিশিং,নিম্নমানের বল কন্ট্রোল,পেনাল্টি মিস।সব মিলিয়ে দর্শকদের সমালোচনার তীরে কম বিদ্ধ হননি কেম্পেস।কিন্তু সীজন শুরু হতেই কেম্পেস ফিরলেন তারা রৌদ্রদাহ রুপে।সীজন টা ভ্যালেন্সিয়ার জন্য খুব সুখকর ছিল না।লীগ শেষ করল ৭ম হয়ে।তবে কেম্পেসের খুনে স্বভাবে কিন্তু এতটুকু পরিবর্তন আসল না।৩৪ ম্যাচে করলেন ২৪ গোল।লা লীগায় নিজের প্রথম সীজনেই জিতলেন সর্বোচ্চ গোলদাতার পিচিচি ট্রফি।পরবর্তী সিজনে তিনি আবির্ভূত হলেন আরো ভয়ংকর রুপে।বার্সালোনা,রিয়াল মাদ্রিদের আভিজাত্য কে তুচ্ছজ্ঞান করে ভ্যলেন্সিয়া কে জেতালেন কোপা ডেলরে।রিয়াল কিংবা বার্সার বাঘা বাঘা স্ট্রাইকারের গালে থাবা বসিয়ে লালীগায় ২৮ গোল করে টানা দ্বিতীয়বারের মত জিতলেন পিচিচি ট্রফি।কে জানত হয়ত তার মনে হয়ত ছিল অন্য কোন সুদূর প্রসারী উদ্দেশ্য।১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ টা যে নিজের দেশে। তাতো আর তিনি ভুলে যাননি।’৭৪ বিশ্বকাপের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে না?
বিশ্বকাপ ১৯৭৮ :কেম্পেসের বিশ্বকাপ,ইতিহাসের সবচাইতে কুখ্যাত আর বিতর্কিত বিশ্বকাপ। সামরিক অভুথ্যান ঘটিয়ে ভিদেলার তখন ক্ষমতায়।নন্দিত ফুটবল স্বর্গ আর্জেন্টিনা ততদিনে রাজনৈতিক সহিংসতায় হয়ে ঊঠেছে এক নিন্দিত নরক।সিংহাসনের লোভে আর্জেন্টিনার ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ দের জেলে পুরে,হাজার হাজার মানুষ গুম করে,নোংরা যুদ্ধে অগণিত মানুষের প্রাণ নিয়ে আর্জেন্টিনার মাটি তখন ভিদেলার দ্বারা কলুষিত।সমগ্র আর্জেন্টিনা জুড়ে তখন ধ্বনিত হচ্ছে একটাই বাক্য “ভিদেলারের পতন চাই!! “এমনই এক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে বিশ্বকাপের আসর বসার সিদ্ধান্ত হল আর্জেন্টিনায়।এটিকে অবশ্য কেউ কেউ ভিদেলার বিরোধী আন্দোলনে পানি ঢালার একটি উপায় হিসেবেও দেখে থাকেন।পৃথিবীর বহুপ্রান্ত থেকে সমালোচনার তীর বিধতে থাকে ফিফার গায়ে।বিশ্বকাপ বয়কটের প্রস্তাব আসতে থাকে হল্যান্ড সহ পৃথিবীর বহু প্রান্ত থেকে।সমগ্র লাতিন আমেরিকা জুড়েই চলছে সামরিক শাসন,খুন,গুম,হত্যা।প্রতিটি দিনকেই মানুষ বিবেচনা করছে নিজেদের শেষ দিন হিসেবে,ক্লান্ত দেহে গুনছে মৃত্যুর প্রহর,কেউবা শেষ আশ্রয় খুজছে ঈশ্বরের কাছে।এমনই এক পরস্থিতিতে সকল সমালোচনাকে তুচ্ছজ্ঞান করে আর জল্পনা,কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপের আসর বসল আর্জেন্টিনায়।মেনেত্তির অধীনে দল।সিদ্ধান্ত নিলেন প্লেয়ার গড়বেন জাতীয় লীগে খেলা ফুটবলার নিয়ে।তবে উপেক্ষা করতে পারেননি ভ্যালেন্সিয়ার সেই ‘এল ম্যাটাডোর’ কে।ইউরোপিয়ান লীগে খেলা একমাত্র ফুটবলার হিসেবে স্কোয়াডে জায়গা পেলেন তিনি।দেশ তখন মেনেত্তির সমালোচনায় মুখর।কারণ তিনি উপেক্ষা করেছেন ১৮ বছরের এক ফুটবল বিস্ময় কে।যে ছেলেটিকে করতে পারেন যা ইচ্ছে তাই।নাম ডিয়াগো ম্যারাডোনা।কম বয়সের আজুহাতে তাকে উপেক্ষা করে গেছেন মেনেত্তি।এমনকি কেম্পেস বাদে ‘৭৪ বিশ্বকাপে খেলা কোন ফুটবলার জায়গা পাননি দলে।পুরো দলটিকে মেনেত্তি সাজিয়েছেন নতুনভাবে।কেম্পেসের সাথে সাথে দলে ছিলেন প্যাসারেল,আরদিলেস,লিওপালদো কিংবা ফিলোল এর মত স্বমহিমায় উজ্জ্বল তারকারাও। প্রত্যাশার এক পাহাড় সমান চাপ নিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু হয় আর্জেন্টিনার।সে সময় বিশ্বকাপ মাতাতে আসেননি ক্রুইফ।জার্মানী দলে নেই বেকেনবাওয়ার।বিশ্বকাপে সুযোগ পায়নি ইংল্যান্ড।অর্থাৎ আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের পরিস্কার ফেভারিট।১৬ টি দল।চার গ্রুপে বিভক্ত।আর্জেন্টিনার গ্রুপে আছে ফ্রান্স,ইতালি আর হাংগেরী।দামামা বাজল ফুটবল যুদ্ধের।কিন্তু হায়!!!কোথায় সেই যুদ্ধ ক্ষেত্রের সবচাইতে খুনে সৈনিকটি।তাকে তো মাঠেই খুজেই পাওয়া যাচ্ছে না মাঠে।যেই কেম্পেস কে ঘিরে আর্জেন্টাইন রা আজ মৃত্যুপ্রহর না গুনে বিশ্বজয়ের প্রহর গুনছে কোথাই সেই বীর সেনাটি।ফ্রান্স, হাংগেরীর সাথে দুটি ম্যাচ হয়ে গেল।কিন্তু স্কোরশীটে খুজেই পাওয়া গেল না কেম্পেসের নাম।ফ্রান্স আর হাংগেরীর বিরুদ্ধে খুড়িয়ে খুড়িয়ে ২-১ গোলে জয়লাভ করে ২য় রাউন্ড নিশ্চিত করল আর্জেন্টিনা।এবার গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াই।ইতালির বিরুদ্ধে।কিন্তু,কই? সেদিনও তো নিষ্প্রভ ইউরোপ কাপানো সেই মহারথী।এ তো সেই ‘৭৪ এরই পুনরাবৃত্তি।
 
স্কোরশীট: আর্জেন্টিনা ০-১ ইতালি।
নিজেদের মাঠে হেরে বসল আর্জেন্টিনা।গ্রুপ পার হয়ে ২য় পর্বে উঠল গ্রুপ রানারাপ হয়ে।তখন ২য় পর্বে ৮ টি দলকে ২ টি গ্রুপে ভাগ করা হত।প্রতি গ্রপের চ্যাম্পিয়ন দল টিকিট পেত ফাইনালের।কোয়ার্টার কিংবা সেমিফাইনাল হত না।আর্জেন্টিনার গ্রুপে ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিল,ততকালীন সময়ের লাতিনের তৃতীয় ক্ষমতাধর দেশ পেরু আর পোল্যান্ড।স্কোরশীটে তখন ও সেই খুনে ফুটবলার টির নামই উঠিনি।
শুরু হল ২য় পর্ব।
প্রথম প্রতিপক্ষ পোল্যান্ড।হাফ টাইম শেষ। নিষ্প্রভ কেম্পেস।২য় হাফ এসেই কেম্পেস ঘটালেন সেই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন। শুরু হল কেম্পেস ম্যাজিক।সেকেন্ড হাফের প্রথম ১০ মিনিটের মাথাই প্যাসারেলের মাইনাস থেকে সিংহের মত মাথা ছুয়ে বল জড়ালেন জালে।সমগ্র মাঠ ফেটে পড়ল উচ্ছাসে।মাঠ জুড়ে ধ্বনিত হতে লাগল একটিই নাম কেম্পেস!!!!কেম্পেস!!!!
কিন্তু এ তো সবে শুরু।2nd half এর মাঝামাঝি সময়ে তিনি করে বসেন এক অনন্য কীর্তি।আক্রমনে পোল্যান্ড।গোল পোস্ট ফাকা।গোল বারের সামনে মারিও কেম্পেস একা।প্রতিপক্ষের প্লেয়ারের হেড।নির্ঘাত গোল।বাঘের মত ক্ষিপ্রগতিতে লাফিয়ে নিজেই হাত দিয়ে বলটি ঠেকিয়ে দিলেন কেম্পেস।পেনাল্টি পেল পোল্যান্ড।আর অলৌকিক ভাবে পোল্যান্ডের পেনাল্টিটি অসাধারণ মহিমায় সেইভ করলেন ফিলোল।খেলা শেষের আগে আরদিলেসের সাথে অসাধারন ওয়ান টু খেলে নিখুত ফিনিশিং এ ২য় বার স্কোরশীটে নাম তুললেন কেম্পেস।ফলাফল ২-০।দুটোরই গোলদাতা কেম্পেস।
২য় ম্যাচে জিকোর ব্রাজিলের সাথে ড্র এবং পোল্যান্ডের সাথে ব্রাজিলের ৩-১ গোলে জয় আর্জেন্টিনা কে নিয়ে আসে এক কঠিন সমীকরনে।আর্জেন্টিনা ব্রাজিলের ম্যাচ গোল শূন্য ড্র হলে ২য় ম্যাচ শেষে উভয়েরই পয়েন্ট দাঁড়ায় ৩।ব্রাজিল ৩য় ম্যাচে পোল্যান্ড কে হারানোর পর ব্রাজিলের গোল গড় আর্জেন্টিনা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৩ গোল এ।অর্থাৎ ফাইনালে যেতে হলে আর্জেন্টিনার পেরুকে হারাতে হবে ৪-০ গোলে।স্বয়ং মেনেত্তিও আসা ছেড়ে দিয়েছে।আসা ছেড়েছে লক্ষ লক্ষ আর্জেন্টাইনও।ব্রাজিলে ফাইনালে ওঠার জয়োৎসব শুরুও হয়ে গেছে।সেই সময়কার পেরুকে ৪-০ গোলে হারানোর চেয়ে বোধ হয় ঈশ্বরের দেখা পাওয়াটা বেশি সহজ। শুধু আসা ছাড়েননি মারিও কেম্পেস।চোখের সেই অসম্ভবের স্বপ্ন টা আবারও জাগিয়ে তুলে মাঠে নামলেন কেম্পেস।পেরুর সামিনে আবির্ভূত হলেন এক বিধ্বংসী রুপে,নিজের সবচাইতে ধ্বংসাত্মক চেহারায়।তোয়াক্কা করলেন কোন কিছু।ম্যাচ শেষের ফলাফল টি জানেন।আর্জেন্টিনা৬-০ পেরু।দুই গোল আর দুই এসিস্টে ম্যাচ সেরা কেম্পেস।ব্রাজিলের আগাম জয়োৎসব মাটি করে ফাইনালে আর্জেন্টিনা।ম্যাচ টি ছিল ফুটবল ইতিহাসের এক অমীমাংসিত রহস্য।পরবর্তীতে অনেকেই এর বিরুদ্ধে ম্যাচ ফিক্সিং এর অভিযোগ তোলে তবে কেউই এটির সত্যতা প্রমাণ করতে পারেনি।
১৯৭৮,২৫ জুন।বুয়েন্স আয়ার্স। উপস্থিতি ৭১,৪৭৩।আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ২য় রাউন্ডে ইতালি সহ প্রতিটি প্রতিপক্ষ কে নাজেহাল করে দিয়ে আসা নেদারল্যান্ড,টোটাল ফুটবলের জনক নেদারল্যান্ড।ম্যাচের বাশি বাজল।ক্ষুরধার আক্রমনে বার বার আর্জেন্টিনার রক্ষন দুর্গে আঘাত হানতে থাকল নেদারল্যান্ড।কিন্তু গোলবারের নিচে যে ফিলোল দাঁড়িয়ে পুরো ২য় রাউন্ডে যে কিনা এক গোলও হজম করেননি।ফিলোলের সেই প্রাচীর ভেদ করে জালে জড়ালো না কোন বলই।কিন্তু সেই খুনে স্বভাবের মানুষ টা কই।প্রায় ৩৫ মিনিট হয়ে গেল।কিন্তু একটিবারের জন্যও সেই খুনে মানুষ টার দেখাই মিলল না।৩৮ মিনিট।ডিবক্সের থেকে বেশ কিছু দূরে বল পেলেন কেম্পেস।গতির ঝড় তুলে দুজন ডিফান্ডারের ফাক দিয়ে বল ড্রিবল করে ভয়ংকর ট্যাকেল উপেক্ষা করে গোলকির পায়ের ফাক দিয়ে বল ঢোকালেন জালে।৪৫ মিনিট শেষ।১-০গোলে এগিয়ে আর্জেন্টিনা। ২য় হাফে আবার শুরু হল ডাচ তান্ডব।কিন্তু ফিলোলের অতিমানবীর সেইভের সামনে টিকল না কোন তান্ডবই।ম্যাচের ৮২ মিনিট।ডাচ আক্রমন আর আর্জেন্টিনার রক্ষন যুদ্ধ তখন তুঙ্গে। বা দিক থেকে বল পেয়ে বল শূন্যে ভাসিয়ে দিলেন কিরকোফ।সেখান থেকে এক অসাধারণ হেডে বল জালে জড়ালেন নানিনজা।সমগ্র বুয়েন্স আয়ার্স নিস্তব্ধ।১-১।খেলা গড়ালো অতিরিক্ত সময়ে।১০৫ মিনিট।আর কিছুক্ষন পরই বাজবে অতিরিক্ত সময়ের প্রথম হাফ সমাপ্তির বাশি।আবারও ডি বক্সের বাইরে বল পেলেন কেম্পেস।আবার সেই কীর্তি।অসাধারন সোলো রানে তিন জনকে ড্রিবল করলেন।গোলকি সামনে এগিয়ে বল ক্লিয়ারের চেষ্টা করলেও পারলেন না।গোলকির হাতের কোনাই লেগে বল চলে গেল গোল পোস্টের সামনে।গোল বারের নিচে দুজন ডিফেন্ডার।বলে আলতো একটি ছোয়া দিয়ে দুজন ডিফেন্ডারের পায়ের ফাক দিয়ে বল জড়ালেন জালে।প্রাণ ফিরে পেল বুয়েন্স আয়ার্স।আবেগে কাদলেন কেম্পেস।কাদলেন কোটি কোটি আর্জেন্টাইন।১১৫ মিনিটে ডাচ দের স্বপ্নের কফিনে শেষ পেরেকটি পুতলেন বারটিনো।ম্যাচ শেষের বাশি বাজল।ফলাফল আর্জেন্টিনা ৩-১নেদারল্যান্ড ।আর্জেন্টিনা জিতল বিশ্বকাপ।ফুটবল ইতিহাসের ২য় ফুটবলার হিসেবে কেম্পেস জিতলেন গোল্ডেন বুট,গোল্ডেন বল সব।মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকা হাজার মানুষ কে ভাসালেন বিশ্বজয়ের আনন্দে।নরকে পরিণত হওয়া আর্জেন্টিনা কে পুনরায় পরিণত করলেন স্বর্গে।
স্বচক্ষে হয়ত তাকে দেখইনি।তার কীর্তির সাক্ষী হতে পারিনি।কিন্তু আপনিই বলুন তো এরকম অবিশ্বাস্য স্কোরিং এবিলিটিসম্পন্ন ফুটবলার ইতিহাসে আর কয়টি এসেছে ? কে বলতে পারে হয়ত তার জন্ম না হলে আজকের মেসি বা সেদিনকার ম্যারাডোনার জন্মই হত না।তিনি ১৯৭৮ বিশ্বকাপে যে কীর্তি সাধন করে গিয়েছিলেন তা ‘৮৬ এর ম্যারাডোনা থেকে কোন অংশেই কম না।তাই যতদিন পৃথিবীর মানচিত্রে আর্জেন্টিনা থাকবে,ততদিন থাকবে কেম্পেস।আজ থেকে ১০০ বছর পরও আর্জেন্টাইনরা তাদের ছেলে-মেয়ে দের গল্প শোনাবে।একজন ঝাকড়া চুলের বিপ্লবীর গল্প।
১৯৫৪।পৃথিবীর এক প্রান্তে তখন চলছে সমাজতন্ত্রের জয়রথ।হোচিমিনের সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনাম তখন ফরাসীর সাম্রাজ্যবাদ কে পায়ের নীচে পদলিত করে স্বাধীন হওয়ার পথে।সমগ্র এশিয়া জুড়েই তখন উচ্চারিত হচ্ছে একটি নাম “হো চি মিন! হো চি মিন!!”কে জানত সেই ১৯৫৪ সালেই পৃথিবীর অন্য প্রান্তে হোচিমইনেরই মিত আরেক বিপ্লবী নেতা চেগুয়েভারার দেশে জন্ম নেবে ইতিহাসের আরেক নায়ক।দিনটি ১৫ জুলাই।আর্জেন্টিনার মাটিতে সেদিন সূর্যোদয় হল দুবার।একবার প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে রোজ সকালে,আরেকবার যখন আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সেই বীর সৈনিক পৃথিবীর মুখ দেখে পৃথিবীকে এক পরজাগতিক আলোই উদ্ভাসিত করল।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

four + eleven =