মামুনুলকে খোলা চিঠি

শরত বাবু, খোলা চিঠি দিলাম তোমার কাছে,
জানিনা গফুর মহেশ এখন কোথায় কেমন আছে…

কালজয়ী এই গানের মাধ্যমে এই উপমহাদেশে খোলা চিঠির প্রচলন করে যান এক বিখ্যাত শিল্পী, ভুপেন হাজারিকা। সাম্প্রতিককালে এদেশে খোলা চিঠি আদান-প্রদানের বেশ একটা হুজুগ এসেছে। এরই মধ্যে জাতীয় ফুটবল দলের নিয়ম শৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করে ক্যাম্প থেকে বের হয়ে সার্ভিসেস দলে “খ্যাপ” খেলতে গিয়ে দল থেকে বাদ পড়ে অবসর নিয়েছেন বাংলাদেশ ফুটবল দলের অধিনায়ক (সাবেক) মামুনুল ইসলাম মামুন। আমার আজকে খোলা চিঠি লিখার উদ্দেশ্য লোকটার সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া হিসাবেই, জীবনের প্রথম খোলা চিঠি লিখছি এই অপ্রিয় লোকটাকেই। অপ্রিয় বলাটা হয়তোবা একটু রূঢ়ই হবে, কিন্তু যে লোককে দেশের জাতীয় দলের কাণ্ডারি হিসেবে ভেবেছিলাম, একের পর এক লজ্জাজনক ঘটনার কুশীলব এই লোকটা আমার প্রিয়ভাজন থেকে অপ্রিয় লোক হয়েছেন নিজের কর্মগুণেই, ক্রমাণ্বয়ে।

(অ)প্রিয় মামুনুল,

সংবাদপত্র মারফত জানলাম, আপনি অভিমানে অবসর নিয়েছেন। এর আগে আপনিই বিশাল ঢাকঢোল পিটিয়ে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে একটা খোলা চিঠি লিখেছিলেন অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে, খেলার উপর মনোযোগ না দিয়ে এই কাজ করার জন্য তখনই আপনার কঠিন শাস্তি হতে পারতো। ফুটবল আজ থেকে দেখছি না বিশ্বাস করুন মামুন ভাই, কিন্তু খেলায় হারের কারণে হোক, কিংবা ফেডারেশান বা অন্যান্য কারণে অসন্তুষ্টির জন্যই হোক, এ পর্যন্ত কখনো কোন আন্তর্জাতিক দলের ফুটবলারকে দেখিনি এরকম বলা নেই কওয়া নেই খোলা চিঠি লিখতে বসে গেছেন। যা বললাম, সে জন্য তখনি আপনার শাস্তি হতে পারত, কিন্তু আমাদের বাফুফে সভাপতি মহামতি কাজী সালাউদ্দিন সেই শাস্তি দেননি। এবার ত আপনি আরও এককাঠি সরেস। আপনি জাতীয় দলের ক্যাম্প থেকে কারো অনুমতি না নিয়ে সার্ভিসেস দলে খেলতে গিয়ে কোচ টম সেন্টফিটের শাস্তির খড়গ এড়াতে পারেননি। সেন্টফিট তো আর সালাউদ্দিন নন, বার বার মাফ করবেন! তিনি বাঙ্গালী বা বাংলাদেশীও না যে আমাদের এইসব শৃংখলাভঙ্গের ইতিহাস সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল থাকবেন। পেশাদার কোচের কাছে শৃঙ্খলা ভঙ্গের শাস্তি খুবই কঠিন। তা আপনি তার জবাবে কি করলেন? ক্ষমা, অনুতপ্ত হওয়া তো দূরের কথা, নিয়ে নিলেন অবসর। দেশের কথা চিন্তাও করলেন না। লক্ষ লক্ষ ভক্তের কথা মাথাতেও আনলেন না। যে সব ছেলেরা গ্রামের মাঠে-প্রান্তরে আপনাকে আইডল মেনে দিনের পর দিন বল পায়ে ছুটে যাচ্ছে – তাদের কথা একবার তোয়াক্কাও করলেন না।

দলের নতুন কোচ টম সেন্টফিট
দলের নতুন কোচ টম সেন্টফিট

এক সময়ে এবং তর্কযোগ্যভাবে হয়তোবা এই সময়েরও, এই দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা মধ্যমাঠের ফুটবলার বলা হত আপনাকে। আপনার সেই যোগ্যতা নিয়ে কোন প্রশ্ন করবোনা, সে যোগ্যতা আমার নেই, ফর্ম ও ফিটনেস থাকলে আপনি কি এক অমূল্য রত্ন, সেই কথা আমাদের জানা আছে ভালোই। কিন্তু কিছু বিষয়ে ক্ষোভ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তা আর না বলে থাকতে পারছি না…

  • আপনি না দলের অধিনায়ক? তাও আবার তিন বছর ধরে? অধিনায়ক মানে জানেন? নেতা, যে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়। তাও না জানলে আমাদের ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফিকে দেখুন। এখন সেই নেতাই যদি নিয়ম শৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করে, তাহলে অন্যদের মনে কি আসবে? যে, যা খুশি তাই করবো, কিচ্ছুটি হবেনা! সেদিক থেকে টম সেন্টফিট সাহেব সঠিক কাজটি করেছেন। আপনি “সেন্ট” পার্সেন্ট “ফিট” থাকবেন না, আর ভাববেন অধিনায়ক হবার সুবাদে সেন্টফিটের দলে এভাবেই চান্স পেয়ে যাবেন, ভুল ভেবেছিলেন মামুনুল! বড় ভুল ভেবেছিলেন!

mamunul-a-1422887629

  • তিন বছরে আপনি দলের অধিনায়ক থাকা কালে সবথেকে বেশি যে কথাটি আলোচনায় এসেছে তা হল গ্রুপিং। কেন একটা দলের মধ্যে গ্রুপিং হবে? দলকে একতাবদ্ধ করা কি নেতার দায়িত্ব না? একতাবদ্ধ না করে খালি নিজের স্বার্থটাই দেখলেন? স্বার্থসিদ্ধি যখন হল না, দলে নিজের কর্তৃত্ব ও স্বেচ্ছাচারিতা যখন থাকলো না, তখন এভাবে অবসর নিয়ে নিলেন? এভাবে অবসর নেওয়াকে একজন পলায়নপর সেনাপতির কাজ হিসেবেই দেখবে সবাই।
  • সন্দেহ নেই, আপনি এদেশের সেরা সেট পিস নিতে পারেন। ফ্রিকিকগুলো হয় চোখজুড়ানো আপনার। আগেই বলেছি, আপনার খেলোয়াড়ি নৈপুণ্য নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। এমনকি আপনার প্রিয় ক্লাব বার্সেলোনার বিখ্যাত মিডফিল্ডার জাভি হার্নান্দেজের সাথে তুলনা করে “বাংলাদেশের জাভি” ডাকনামটা বড় আহ্লাদ করে আমরাই দিয়েছি আপনাকে – সেটা কিন্তু এমনি এমনি না। এখন ত মনে হচ্ছে সে ডাকনামটা দিয়ে বড় ভুল করেছি। কিন্তু আপনি একবার সাফে লজ্জাজনক পরাজয়ের পর নিজেকে দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে তুলনা করেছিলেন। একটু ইতিহাস পড়ে দেখবেন কি, যে কোন মুক্তিযোদ্ধা কখনও কমান্ডারের নির্দেশ অমান্য করেছেন কিনা কিংবা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়েছেন কিনা? কক্ষনো না। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তারা দেশের পক্ষে লড়েছেন, শহীদ হয়েছেন। আর আপনি? ক্যাম্প থেকে চলে গেলেন কোচের অনুমতি না নিয়ে! আবার কিছু বলাও যাবেনা আপনাকে! নিলেন অবসর। গুলির ভয়ে আমাদের কোন মুক্তিযোদ্ধা ঘরের কোণে লুকিয়ে ছিলেন? কিংবা সীমানা পার করে নিরাপদ জায়্যগায় চলে গিয়েছিলেন? হিসাব করে একটু বলতে পারবেন কি? জানি, পারবেন না। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা কাপুরুষ ছিলেন না। থাকলে নয় মাসে স্বাধীনতা পাওয়া এক দেশের জার্সি গায়ে এরকম হম্বিতম্বি করতে পারতেন না আপনারা, মামুনুল!

10494618_746995665361473_7591182466606838851_n

  • সেই সাফ থেকেই একটা কথা শোনা যাচ্ছে দলের মধ্যে, জাতীয় দল আমাদের কি দেয়! আশ্চর্য তো! দেশের পতাকা বুকে ধারণ করাটা কি বড় না? আপনারা তো ক্লাব থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা পান প্রতি বছর। আপনি নিজেই তো এ বছর ৪০ লাখের বেশি পেয়েছেন। বলতে পারেন, ক্রিকেটাররা তো অনেক বেতন পায়। কিন্তু কেন্দ্রীয় চুক্তির বাইরের একজন মধ্যম মানের ক্রিকেটার আর ফুটবলারের আয়ের তুলনা করলে আপনারাই তো বেশি পান, অনেক বেশি! তার পরও আপনাদের পেশাদারিত্ব, দায়িত্বজ্ঞান কিছু আছে বলে তো মনে হয়না! আগে যেই মালদ্বীপকে আট-নয় গোলে হারাতাম নিয়মিত, সর্বশেষ সাফ ফুটবলের স্বর্ণজয় হয়েছিল যেই মালদ্বীপকে হারিয়ে (হ্যাঁ, আমাদের ভাগ্য খারাপ যে সর্বশেষ বলতে হচ্ছে, আপনি ও আপনার নেতৃত্বাধীন আমাদের ফুটবলারদের আরেকটু দায়িত্বজ্ঞান থাকলে সর্বশেষ বলা লাগতো না, স্বর্ণ আসত আরও), এখন সেই মালদ্বীপের কাছে এখন ৫ গোলে হারতে হয়! সালাউদ্দিন, কায়সার হামিদ, সালামের দেশ এ লজ্জা কোথায় রাখবে!?
এককালে এভাবেই মালদ্বীপকে নিয়ে ছেলেখেলা করতাম আমরা। ছবি - সংগৃহীত
এককালে এভাবেই মালদ্বীপকে নিয়ে ছেলেখেলা করতাম আমরা। ছবি – সংগৃহীত
  • আপনারা খেলেন হেলে দুলে, ৬০ মিনিটের পর দাঁড়িয়ে থাকেন। কিসের যে অভাব আপনাদের, সেটাই তো বোঝা যাচ্ছেনা। অনূর্ধ্ব ১৬ দলের মেয়েদের কাছ থেকে পেশাদারিত্ব আর হারার আগেই হেরে না যাওয়ার শিক্ষা নিতে পারেন।
  • কর্পোরেট সংস্কৃতিতে একটা কথা আছে, কেউ যখন নিজেকে অপরিহার্য মনে করে, তখনই তাকে বের করে দেওয়া উচিত প্রতিষ্ঠান থেকে, যদি সে নিয়মের তোয়াক্কা না করে। আপনি নিজেকে কি ভাবতেন? জিদান না মেসি? আপনি অবসর নেবেন আর সবাই হাতে পায়ে ধরে আপনাকে নিয়ে আসবে! আসলে আপনাদের মধ্যে এই বিরাট কিছু হবার ভাবটা আছে, আর প্রকৃত চিত্র হল,  আপনাদের দুলকি চালে খেলা দেখে মনে হয়, কয়দিন পর ভুটান ও আমাদের গুনে গুনে গোল দেবে! আজকে ভুটান যখন আমাদের দেশে খেলতে আসে, তাঁদের ঔদ্ধত্য দেখে স্তম্ভিত হই। তারাও আশা রাখে আমাদের হারানোর, আমাদের গোলে ভাসানোর। তাদেরই বা দোষ দিয়ে কি করবো, তাঁদের এই বামুন হয়ে আকাশের চাঁদ হাতে ধরার সুযোগটা ত আপনারাই করে দিয়েছেন, তাই না?

কি আর বলবো! নতুন খেলোয়াড় তৈরি হচ্ছেনা, তাই বাফুফে আপনাদের তোয়াজ করে। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে, যথেষ্ট হয়েছে, আর তোয়াজ করা ঠিক না। আপনারা নিজেদের ঐ কল্পিত ভাব নিয়েই থাকুন, আমরা নতুন যৌবনের দূত খোঁজা শুরু করি!

 

ইতি,

দেশের ফুটবল নিয়ে হতাশাগ্রস্থ লক্ষ লক্ষ ফ্যানের একজন

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

3 × 1 =