মামাদু সাখো – ক্লপের নতুন ডিফেন্সিভ লিডার

ব্রেন্ডান রজার্স যাওয়ার পর লিভারপুলের খেলোয়াড়দের মধ্যে কেউ যদি খুশি হয়ে থাকেন তার মধ্যে অবশ্যই মামাদু সাখোও ছিলেন। থাকবেন না কেন? সাউদাম্পটন থেকে ২০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে লিভারপুলে আনার পর দেয়ান লভরেনে যে মজেছিলেন রজার্স – তারপর থেকে স্কার্টেল বা লভরেনের ইনজুরি না হলে সেরকম মূল একাদশে জায়গা পেতেন না তিনি। ফ্রান্সের বর্তমান খণ্ডকালীন অধিনায়ক ক্লাবের মূল একাদশে জায়গা পাচ্ছেন না, কয়েকদিন আগে ফ্রান্স দল থেকে সাখোকে বাদই দিয়েছিলেন কোচ দিদিয়ের দেশম। যদিও গত সপ্তাহেই আবার ফ্রান্স দলে ফিরেছেন সাখো, তবুও প্রমাণ করার অনেক কিছুই ছিল। অপেক্ষা করছিলেন সুযোগের।

রজার্স চলে যাওয়ার পর সেই সুযোগটাও আসলো, আবার আসলোও না। ক্লাবের ম্যানেজার হবার দৌড়ে যে ইয়ুর্গেন ক্লপের সাথে ছিলেন সাখোর সাবেক ক্লাব কোচ কার্লো অ্যানচেলত্তিও! সাখোর সাবেক ক্লাব পিএসজির কোচ ছিলেন এই অ্যানচেলত্তি। তিনিও তখন সাখোর উপর অতটা ভরসা করতে পারতেন না, পিএসজির ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ অধিনায়ক সাখোকে বসিয়ে রেখে প্রায়ই মূল একাদশে খেলাতেন দুই ব্রাজিলিয়ান সেন্টারব্যাক অ্যালেক্স ও থিয়াগো সিলভাকে। সাথে ব্যাকআপ ছিলেন আরেক ব্রাজিলিয়ান মারক্যুইনহোস। ব্রাজিলিয়ানদের মধ্যে ভাষাগত ব্যবধানটা ছিল না, অ্যালেক্স-সিলভা জুটি, ও সাথে মারক্যুইনহোস – সেন্ট্রাল ডিফেন্সে এই তিনজনের রসায়নে পিএসজি ফরাসী লিগে বেশ ভালোই দাপট দেখায়, লিগ জেতে – ফলে সাখো সেরকম পিএসজির মূল একাদশে জায়গা পেতেন না, যেটা ছিল তার পিএসজি ছেড়ে লিভারপুলে আসার পেছনের মূল কারণ।

যাইহোক, অ্যানচেলত্তি আসেননি। লিভারপুলে এখন ক্লপ-রাজত্ব। আর প্রথম ম্যাচেই সাখো বুঝিয়ে দিয়েছেন বেশ বয়স যেরকম বেড়ে ২৬ হয়েছে, পরিপক্কতাটাও সমানতালে বেড়েছে। টটেনহ্যামের সাথে ক্লপ-যুগের প্রারম্ভিক ম্যাচেই সাখো দেখিয়েছেন লিভারপুলে তাঁর উপর ক্লপ আস্থা করতেই পারেন।

খেলা শুরু হবার পর যথারীতি বল পায়ে সাখোকে প্রথম কিছুক্ষণ নড়বড়ে মনে হলেও, খেলার সময় গড়ানোর সাথে সাথে আস্তে আস্তে যেন প্রাচীর হয়ে উঠলেন। মাঝমাঠ থেকে আসা টটেনহ্যামের প্রত্যেকটা লংবল ঠেকিয়েছেন, সেটা বুক দিয়ে হোক, বা পা দিয়ে – ইন্টারসেপ্ট করেছেন যথেষ্ট। ইন্টারসেপ্ট করে পাকা বল-প্লেয়িং ডিফেন্ডারের মত অ্যাটাক বিল্ডআপে সাহায্য করেছেন, লিভারপুলের অনেক অ্যাটাকই ঐদিন শুরু হয়েছে সাখোর পাস থেকে।

P151017-034-Tottenham_Liverpool-522x420

ডর্টমুন্ডের খেলা যারা দেখেছেন নিয়মিত ক্লপের আমলে, তারা জানবেন, ক্লপের সাফল্যের অন্যতম হাতিয়ার ছিলেন নো-ননসেন্স দুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার – ম্যাটস হামেলস ও নেভেন সুবোটিচ। রাফ অ্যান্ড টাফ সুবোটিচের পাশে বলপ্লেয়ার হামেলস, দুইজনের কেউই ওয়ান-অন-ওয়ান সিচুয়েশানে বলতে গেলে পরাস্তই হতেন না। বরং আরও এগিয়ে এসে বিপক্ষ দলের অ্যাটাকারকে চূড়ান্ত প্রেস করে বল দখলে নিয়ে নিজেদের কাউন্টার অ্যাটাকের সূচনা করতেন। ক্লপের এই বহুচর্চিত ট্যাকটিক্সের নামই হয়ে গেছে “জেজেনপ্রেসিং”। অন্তত টটেনহ্যামের বিপক্ষে সাখোর খেলা দেখে মনে হয়েছে – এখন পর্যন্ত যে দুই-একজন ক্লপের সিস্টেমের সাথে তাল মেলাতে পেরেছেন, তাদের মধ্যে অবশ্যই সাখো একজন। সাখোর খেলায় সেই জেজেনপ্রেসিং-এর নমুনাই দেখা গেছে। সাবেক আর্সেনাল কিংবদন্তী স্ট্রাইকার ইয়ান রাইট ত আর এমনি এমনিই টুইটারে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেননি, টটেনহ্যামের বিপক্ষে সাখোই ম্যান অফ দ্য ম্যাচ!

আপাতদৃষ্টিতে বল পায়ে চূড়ান্তরকমের নড়বড়ে মনে হলেও পরিসংখ্যান কিন্তু সে কথা বিন্দুমাত্রও বলবে না। টটেনহ্যামের সাথে সাখোর পাস কমপ্লিশান রেট ৮৯ শতাংশ। বল পায়ে নড়বড়ে কোন এক ডিফেন্ডারের সঠিক পাস দেওয়ার হার অবশ্যই এত বেশী হবে না! বোঝাই যাচ্ছে, ‘ফিজিক্যাল’, ‘টাফ-ট্যাকলার’ ডিফেন্ডার – এসব তকমার পাশাপাশি একজন ভালো বল-প্লেয়িং ডিফেন্ডারের তকমাটাও এবার গায়ে লাগাতে চাচ্ছেন সাখো, সন্তুষ্ট করতে চাচ্ছেন ক্লপকে।

ক্লপের প্রথম ম্যাচে সাখো যে ঝলক দেখালেন, সামনে একই খেলা দেখালে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় – ক্লপের নতুন ডিফেন্সিভ নেতা হতে যাচ্ছেন এই সাখোই।

গত দুইমাসের মধ্যে এই প্রথম কোন ম্যাচে গোল খায়নি লিভারপুল – সাখোর পারফরম্যান্স বোঝাতে ত এই একটা তথ্যই যথেষ্ট!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

two × one =