মরিনহোর উত্থান : পোর্তোর গল্প – ৫

তো, অক্টাভিও মাচাদোকে হটিয়ে পোর্তোর কর্তাব্যক্তিরা মরিনহোকে নিয়ে আসলেন ডাগআউটে। পোর্তোর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বেনফিকায় কিছু না করতে পারার ফলে মরিনহোর মনেও বোধকরি পোর্তোয় ভালো কিছু একটা করে বেনফিকাকে দেখিয়ে দেওয়ার একটা প্রত্যয় কাজ করছিলই। তাই এসেই মোটামুটি নতুন স্কোয়াড নিয়েই কাজ করা শুরু করলেন তিনি। দলে থাকা খেলোয়াড়দের মধ্যে কয়েকজনকে তাঁর নিজস্ব পোর্তো দলের মেরুদন্ড হিসেবে ঠিক করলেন হোসে মরিনহো। এদের মধ্যে ছিলেন গোলরক্ষক ভিতর বাইয়া, সেন্টারব্যাক রিকার্ডো কারভালহো, মিডফিল্ডার ডেকো ও কস্টিনহা, রাশিয়ান উইঙ্গার দিমিত্রি আলিনিচেভ ও স্ট্রাইকার হেলদের পোস্টিগা। বলে রাখা ভালো, মরিনহো যখন পোর্তোর হাল ধরলেন, দলের তখন তথৈবচ অবস্থা। লিগে পোর্তোর অবস্থান ছিল তখন পঞ্চমে – বেনফিকা, উনাইও দি লেইরিয়া, বোয়াভিস্তা ও স্পোর্টিং এর পিছে, ইউয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে নিজেদের গ্রুপে সবার শেষে ছিল পোর্তো, আর পর্তুগিজ কাপ থেকে বাদ পড়ে গিয়েছিল তারা। সেখান থেকে দলকে একরকম টেনে তোলেন মরিনহো। পরের ১৫ ম্যাচের মধ্যে ১১ ম্যাচ জিতিয়ে ও দুই ম্যাচ ড্র করিয়ে পোর্তোকে তিনি নিয়ে আসেন লিগের তৃতীয় স্থানে, আর সমর্থকদের কথা দেন পরের বছরেই পোর্তো চ্যাম্পিয়ন হবে।

game-changers-jos-mourinhos-porto-and-their-champions-league-triumph-body-image-1464187165

পরের মৌসুম থেকে শুরু হল মরিনহোর আসল দল গড়ার কাজ। গোলরক্ষক হোসে এদুয়ার্দো, পাওলো সান্তোস, পেদ্রো এস্পিনহা সবাইকে বেচে দিয়ে ভিতর বাইয়াকে বানালেন নিজের ক্লাবের এক নম্বর গোলরক্ষক। ডিফেন্সে কাঁচি চালালেন ক্যান্ডিডো কস্টা, রাইটব্যাক হুগো ইবারা, হোর্হে আন্দ্রাদে দের বিক্রি করে দিয়ে। মিডফিল্ডার ও স্ট্রাইকারদের মধ্যে বেচে দিলেন কার্লোস পারেদেস, মিলান পাভলিনদের। নিজের সাবেক ক্লাব উনাইও দে লেরেইয়া থেকে আনলেন লেফটব্যাক নুনো ভ্যালেন্তে ও স্ট্রাইকার দার্লেইকে। চার্লটন অ্যাথলেটিকের কাছে ধার দেওয়া সেন্টারব্যাক হোর্হে কস্টাকে ফিরিয়ে নিয়ে এসে দলের অধিনায়ক বানালেন তিনি, ভিতোরিয়া ডে সেতুবাল থেকে রাইট মিডফিল্ডার পাওলো ফেরেইরাকে নিয়ে রাইটব্যাকে রূপান্তরিত করলেন তিনি। ফলে পোর্তোর ডিফেন্স সম্পূর্ণ নতুন রুপ নিলো – রাইটব্যাকে পাওলো ফেরেইরা, লেফটব্যাকে নুনো ভ্যালেন্তে, আর দুই সেন্টারব্যাক হিসেবে রিকার্ডো কারভালহো আর হোর্হে কস্টা। সেন্টারব্যাক পজিশানে ব্যাকআপ হিসাবে বোয়াভিস্তা থেকে উড়িয়ে আনা হল সেন্টারব্যাক পেদ্রো ইম্যানুয়েলকে। ব্যাকআপ হিসেবে আরও ছিলেন সেন্টারব্যাক রিকার্ডো কস্টা – যিনি পরবর্তীতে ভ্যালেন্সিয়া, ভলফসবুর্গের মত ক্লাবে খেলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

মিডফিল্ডে সেরকম কোন পরিবর্তনই আনতে হয়নি হোসে মরিনহোকে, কেননা ক্লাবে আগে থেকেই ডেকো, কস্টিনহা, দিমিত্রি আলিনিচেভরা ছিলেন। চিরশত্রু বেনফিকা থেকে ফ্রি তে নিয়ে আসলেন মিডফিল্ডার ম্যানিশকে। একইভাবে ফ্রি তে বেনফিকা থেকে আসলেন লিথুয়ানিয়ান স্ট্রাইকার এডগারাস ইয়ানকাউসকাস। স্ট্রাইকে মরিনহোর সাবেক ক্লাব থেকে আসলেন ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার দার্লেই। আর আগে থেকে হেলদের পোস্টিগা ত ছিলেনই। এই নিয়েই মরিনহোর নতুন দল গঠিত হল। মোটামুটি ৪-৩-১-২ ফর্মেশানে দলকে খেলাতে পছন্দ করা মরিনহোর প্রথম মৌসুমের দলে মূল এগারজন ছিলেন মূলত – ভিতর বাইয়া ; পাওলো ফেরেইরা, রিকার্ডো কারভালহো, হোর্হে কস্টা, নুনো ভ্যালেন্তে ; ম্যানিশ, কস্টিনহা, ডেকো ; দিমিত্রি আলিনিচেভ ; দার্লেই, হেলদের পোস্টিগা।

ডেকো
ডেকো

একেবারে অ্যাটাকিং থার্ড থেকে প্রেস করে দলকে খেলাতে পছন্দ করতেন মরিনহো। প্রেসিং শুরু হত স্ট্রাইকার দার্লেই বা পোস্টিগার মাধ্যমে। তিনজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার মূলত তিনজন ডেস্ট্রয়্যারের ভূমিকা পালন করতেন। ফলে দুই ফুলব্যাক নিশ্চিন্তে আক্রমণে উঠে যেতে পারতেন। ফুলব্যাক নুনো ভ্যালেন্তে ও পাওলো ফেরেইরা উপরে উঠে গেলে তাঁদের জায়গাটা কভার দেওয়ার জন্য সেই তিনজন ডেস্ট্রয়্যার মিডফিল্ডার ব্যবহৃত হতেন। এই কাজ মূলত করতেন কস্টিনহা আর ম্যানিশ, দ্বিতীয় মৌসুম থেকে তাঁদের সাথে যোগ দেন মিডফিল্ডার পেদ্রো মেন্ডেস। রিকার্ডো কারভালহো আর হোর্হে কস্টা বা পেদ্রো ইম্যানুয়েলের জুটির উপর এই তিনজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের পরত ভেঙ্গে প্রতিপক্ষের গোল দেওয়া প্রচণ্ড কঠিন কাজ ছিল। একেবারে অ্যাটাকিং থার্ড থেকেই প্রেসিং শুরু করার ফলে পুরো দলটাকেই যথেষ্ট হাই লাইন ডিফেন্সে খেলাতেন মরিনহো, ফলে প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকারদের প্রায়শই অফসাইডের ফাঁদে ফেলা যেত, নস্যাত করা যেত তাঁদের আক্রমণ।

২০০৩ এ ইউয়েফা কাপজয়ী পোর্তো
২০০৩ এ ইউয়েফা কাপজয়ী পোর্তো

কথা রাখলেন মরিনহো। দ্বিতীয় মৌসুমে এসে পোর্তোকে জেতালেন লিগ। জিতলেন ইউয়েফা কাপও। সেভিয়ায় অনুষ্ঠিত ফাইনালে কিংবদন্তী স্ট্রাইকার হেনরিক লারসনের বীরত্ব সত্বেও সেল্টিককে হারতে হয় মরিনহোর পোর্তোর কাছে…

(চলবে)

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

16 − six =