মরিনহোর উত্থান : পোর্তোর গল্প – ৪

লুই ভ্যান হাল মরিনহোর যোগ্যতা সম্বন্ধে ভালই জানতেন আগে থেকেই, তাই বার্সার কোচ হিসেবে যখন তিনি আসলেন, মরিনহোকে সহকারী পদে বহাল রাখলেন তিনি সানন্দেই। ডাগআউটে নিজের পাশেই বসতে দিতেন তিনি মরিনহোকে, ম্যাচ চলাকালীন সময়ে মরিনহো ম্যাচের খুঁটিনাটি সবকিছু শ্যেনদৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতেন, হাফটাইমে এসে সেগুলো বলতেন ভ্যান হাল কে, ভ্যান হালও নিজের পর্যালোচনা ও মরিনহোর মতামত মিলিয়ে খেলোয়াড়দের পরামর্শ দিতেন কিভাবে কি করতে হবে।

লুই ভ্যান হালের সাথে মরিনহো
লুই ভ্যান হালের সাথে মরিনহো

এদিকে বার্সাতে ভ্যান হালের সময়ও দীর্ঘস্থায়ী হল না, টানা দুইবার লিগ জেতার পরেও ২০০০ সালে ছাঁটাই হতে হয় ভ্যান হাল কে। কারণ একটাই, বার্সেলোনার শতবর্ষপূর্তিতে চ্যাম্পিয়ন লিগ জিততে না পারার ব্যর্থতা। ১৯৯৯ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগের সময় বার্সেলোনার শতবর্ষ চলে, এমনকি সেবারের চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালও হয় বার্সেলোনার মাঠ ন্যু ক্যাম্পে। বার্সার ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে সমর্থক সবাই একরকম ভেবেই নিয়েছিলেন যে সেবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জয় করাটাই তাঁদের নিয়তি। কিন্তু সেবার গ্রুপপর্বে বায়ার্ন মিউনিখ ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, দুইদলের নিচে থেকে বাদ পড়ে বার্সা। কাকতালীয়ভাবে সেবারের ফাইনালও হয় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড আর বায়ার্ন মিউনিখের মধ্যে, যেখানে চ্যাম্পিয়নস লিগের অন্যতম শ্বাসরুদ্ধকর এক ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখকে হারিয়ে বার্সার ক্যাম্প ন্যু তে বিজয় কেতন ওড়ায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।

এদিকে মরিনহোও আস্তে আস্তে বুঝতে পারলেন, সহকারী হিসেবে পর্দার আড়ালে থাকার দিন শেষ হচ্ছে তাঁর, সময় এখন পুরোপুরি ম্যানেজার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার। যদিও এর কিছুদিন আগেই পর্তুগিজ ক্লাব ব্রাগার কোচ হবার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি, কারণ – বার্সাতে সহকারী হিসেবেই তার থেকে ঢের বেশী কামাচ্ছিলেন, পরিবারও বার্সাতে খুশিই ছিল। কিন্তু ২০০০ সালে লুই ভ্যান হালের বিদায়ের সাথে সাথে মরিনহোও বুঝতে পারলেন, যাওয়ার সময় হয়েছে তাঁরও। এর মধ্যে বলে রাখা ভালো, গুরু ববি রবসন এরই মধ্যে বার্সার জেনারেল ম্যানেজারের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে ডাচ ক্লাব পিএসভি আইন্দহোভেনে ফিরে গেছেন কোচিং করাতে।

এরই মধ্যে আসলো বেনফিকার প্রস্তাবটা। লুই ভ্যান হাল সতর্ক করে দিলেন, “যদি তাঁরা তোমাকে সহকারী হিসাবে চায়, তাহলে তাদেরকে বলে দাও তুমি সহকারী হিসেবে যেতে ইচ্ছুক নও। কিন্তু তাঁরা যদি তোমাকে প্রধান কোচ হিসেবে চায় তাহলে বেনফিকায় যাওয়াটা তোমার জন্য শ্রেয় হবে”। বেনফিকার প্রস্তাবটা ছিল মূল কোচ হবারই। ২০০০ সালে জার্মান কোচ ইয়াপ হেংকেসকে ছাঁটাই করে মরিনহোকে মূল কোচ করে নিয়ে আসে তাঁরা, শুরু হয় মরিনহোর প্রধান কোচ হবার অধ্যায়।

বেনফিকাতে এসে সবকিছু নিজের মনের মত করে পাননি মরিনহো, প্রথম থেকেই ম্যানেজমেন্টের রোষানলে পড়েন তিনি বেশ কিছু কারণে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণ ছিল বেনফিকা ম্যানেজমেন্ট চেয়েছিল তৎকালীন পর্তুগীজ অনুর্ধ্ব-২১ দলের কোচ (পরবর্তীতে বেনফিকা, পোর্তো ও স্পোর্টিং কোচ) জেসুয়াল্ডো ফেরেইরাকে মরিনহোর সহকারী হিসেবে, মরিনহো সেটা সরাসরি নাকচ করে দেন। তাঁর জায়গায় বেনফিকার সাবেক ডিফেন্ডার কার্লোস মোজের কে নিজের সহকারী বানান মরিনহো।

mourinho-benfica2

এর মধ্যেই ঘটলো আরেক ঘটনা। ওদিকে মরিনহোর গুরু ববি রবসন ইংলিশ ক্লাব নিউক্যাসল ইউনাইটেডের ম্যানেজার হিসেবে যোগ দিয়েছেন, যোগ দিয়েই এক রাতে ফোন করে বসলেন মরিনহোকে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার – মরিনহোকে আবার সহকারী হিসেবে চান তিনি। রবসন বুঝেছিলেন, মরিনহো আর আগের মত শুধুই কোন ক্লাবের সহকারী নেই, তিনি এখন নিজ দেশ পর্তুগালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটা ক্লাবের ম্যানেজার। তাই মরিনহোর সামনে রবসন টোপ ফেললেন একটা, “শোনো, আমার বয়স হয়েছে, এমনিতেই বেশীদিন ম্যানেজেরিয়াল ক্যারিয়ারটা আর দীর্ঘায়িত করতে পারব না। তুমি আপাতত আমার সহকারী হিসেবে এখানে নিউক্যাসল ইউনাইটেডে যোগ দাও, দুই বছর পর আমিই নিজে আমার পদ থেকে সরে গিয়ে তোমাকে নিউক্যাসলের ম্যানেজার বানাবো।”

যথেষ্টই লোভনীয় প্রস্তাব। মরিনহোও ভাবতে লাগলেন গুরুর সাথে আবার যোগ দেবেন না নিজেই নিজের গুরু হয়ে ক্যারিয়ারটাকে একটা দুর্দান্ত সূচনা দেবেন। পরে ভাবলেন, না। বেনফিকার ম্যানেজারই থাকবেন তিনি। কারণ ববি রবসন নিজে ছোটবেলা থেকে নিউক্যাসল ইউনাইটেডের অন্ধভক্ত ছিলেন, তাই মাত্র দুই বছর নিজের প্রিয় ক্লাবকে কোচিং করিয়ে রবসনের খায়েশ মিটবে – সেটা বিশ্বাস হয়নি মরিনহোর। ফলাফল, গুরুকে প্রত্যাখ্যান করে বেনফিকার দায়িত্বেই থাকলেন তিনি।

এদিকে বেনফিকাতেও মরিনহোর সময়টা যাচ্ছিল যথেষ্ট টালমাটাল। ম্যানেজমেন্টের সাথে ঝামেলা ত ছিলই, মাঝে হুট করে প্রেসিডেন্টও বদলে গেল ক্লাবের। যে হোয়াও ভালে দে আজেভাদোর সময়ে বেনফিকাতে এসেছিলেন মরিনহো, কিছুদিন পর সেই আজেভাদোর জায়গায় বেনফিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে আসলেন এক ব্যবসায়ী – নাম তাঁর ম্যানুয়েল ভিলারিনহো। মাঠে মরিনহোর বেনফিকা ভালোই পারফর্ম করছিল, স্পোর্টিংকে মাত্র হারিয়ে দিয়েছে তারা ৩-০ গোলের ব্যবধানে, মরিনহো রেজাল্ট দেখেই চললেন নতুন প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করতে। উদ্দেশ্য – বেনফিকার উজ্জ্বল পারফরম্যান্স দেখিয়ে কোচ হিসেবে আরও বেশী বেতনের চুক্তি আদায় করা। প্রেসিডেন্ট নতুন চুক্তি দিতে রাজী হলেন না মরিনহোকে, ফলাফল – বেনফিকা ছাড়লেন মরিনহো।

উনিয়াও দে লেইরিয়ার কোচ থাকার সময়
উনিয়াও দে লেইরিয়ার কোচ থাকার সময়

এবার মরিনহো দায়িত্ব নিলেন পর্তুগালেরই দুর্বল এক দল উনিয়াও দে লেইরার। সেখানে প্রথম মৌসুমে মাত্র সাত ম্যাচ দায়িত্বে থেকেই সেই মৌসুমে ক্লাবকে পঞ্চম স্থানে নিয়ে গেলেন তিনি, পরবর্তী মৌসুমে ত ফল হল আরও ভালো, এবার পোর্তো-বেনফিকাকে হটিয়ে তৃতীয় স্থানে উঠে এল লেইরা, যেটা কি না তাঁদের ইতিহাসেরই শ্রেষ্ঠতম ফলাফল।

ব্যাপারটা নজর এড়ালো না পর্তুগালের আরেক শ্রেষ্ঠ ক্লাব এফসি পোর্তোর, পরের মৌসুমেই নিজেদের কোচ করে হোসে মরিনহোকে নিয়ে আসলো তাঁরা। শুরু হল মরিনহোর ক্যারিয়ারের আসল সিনেম্যাটিক এক অধ্যায়…

কমেন্টস

কমেন্টস

One thought on “মরিনহোর উত্থান : পোর্তোর গল্প – ৪

মন্তব্য করুন

five × 3 =