মরিনহোর উত্থান : পোর্তোর গল্প – ৩

বার্সেলোনার কর্তাব্যক্তিরা রবসনের সাথে একহারা গড়নের মধ্যবয়সী পর্তুগিজ এক লোকের বার্সেলোনায় আসার কারণ ঠিকমত ঠাওর করতে পারলেন না। পরে জানতে পারলেন, রবসন এই বহুভাষী লোকটাকেই চান তাঁর সহকারী হিসেবে। বার্সার ম্যানেজমেন্ট খুব করে চেয়েছিল ক্লাবের সাবেক অধিনায়ক, ক্রুইফের ড্রিম টিমের অংশ ডিফেন্ডার হোসে র‍্যামন অ্যালেক্সাঙ্কো রবসনের সহকারী হোক, কিন্তু রবসন সেটা হতে দেননি। যদিও বার্সেলোনায় থাকাকালীন পুরোটা সময় জুড়েই প্রেসিডেন্ট হোসে লুইস নুনেজের কাছে “অনুবাদক” ডাকনামটাই শুনতে হয়েছে, যে ডাকনামটা দিয়েই মূলত কাতালান প্রেসও মরিনহোকে সম্বোধন করত, কিন্তু তা সত্বেও মরিনহোর ভূমিকা বার্সেলোনাতে অনুবাদকের চেয়েও অনেক বেশী ছিল। এবং সেটা আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে উঠতে থাকল ম্যাচের পূর্বাপর প্রেস কনফারেন্সগুলোতে ববি রবসনের পাশে বসে মরিনহো যখন অনুবাদকের কাজ করতে থাকতেন, তখন।

স্পেনের সাংবাদিকরা আবিষ্কার করলেন, মরিনহো শুধুমাত্র রবসনের কথার অনুবাদই করছেন না, বরং তিনি নিজের দৃষ্টিভঙ্গী, মতামত, পর্যালোচনারও প্রকাশ ঘটাচ্ছেন, আর রবসনের কথাগুলোর মধ্য থেকে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু কিছু শব্দ অনুবাদ করে সাংবাদিকদের শোনাচ্ছেন। সাংবাদিকরা রবসনকে আক্রমণ করে প্রশ্ন করলেও মরিনহো নিজের মত করেই সেই প্রশ্নগুলো ভালোই মোকাবিলা করতেন, এভাবেই রবসনের অনেক কাছের মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন মরিনহো। অনেকসময় দেখা যেত রবসনের উত্তরগুলো হত অনেক খাপছাড়া ধরণের, সেগুলোকে সুন্দরভাবে সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন তখন এই মরিনহোই করতেন। এমনকি স্পেইন বা পর্তুগালে থাকার সময় মরিনহোর স্ত্রী মাতিলদে ফারিয়া মরিনহোও রবসনের স্ত্রী এলসিয়ের অনেক ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলেন, রবসনের পরিবারের জন্য অনেকসময় রান্নাবান্না করে খাবারদাবারও পাঠাতেন মাতিলদে মারিয়া।

বার্সার খেলোয়াড়দের সাথে মরিনহোর সখ্যতা ছিল যথেষ্ট
বার্সার খেলোয়াড়দের সাথে মরিনহোর সখ্যতা ছিল যথেষ্ট

এদিকে বার্সেলোনায় কোচ রবসনের সাথে খেলোয়াড়দের একটু পেশাগত দুরত্ব থাকলেও সহকারী মরিনহোর সাথে খেলোয়াড়েরা একেবারে মিশে গিয়েছিলেন নিজের মানুষের মতই। এখন শুনলে আশ্চর্য ঠেকবে, কিন্তু তখন বার্সার খেলোয়াড় পেপ গার্দিওলার সাথে হোসে মরিনহোর ছিল অসাধারণ সখ্যতা। দুজন ইংলিশ কিংবা কাতালান ভাষায় ঘন্টার পর ঘন্টা ফুটবল নিয়ে কথা বলতেন, নিজেদের ধ্যানধারণা, চিন্তাধারা আদানপ্রদান করতেন একে অপরের সাথে। শুধু গার্দিওলাই নয়, গোলরক্ষক ভিতর বাইয়া, ডাচ ডিফেন্ডার মাইকেল রেইজিগার, বর্তমান বার্সা কোচ লুইস এনরিকে, লরাঁ ব্লাঁ, রিভালদো, রোনালদো – সবার সাথেই ছিল মরিনহোর ঘনিষ্ঠতা। এমনকি বার্সেলোনাতে ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার রোনালদো যে এক মৌসুম খেলে গোলের বন্যা বইয়ে দিয়ে গেছেন, সেই এক মৌসুমেও রোনালদোকে বার্সার পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য সবচেয়ে বড় ভূমিকাটা রেখেছিলেন এই মরিনহোই। ব্রাজিলিয়ান হবার সুবাদে রোনালদোর মাতৃভাষা ছিল পর্তুগীজ, আর নিজের ভাষাতেই রবসনের চাইতে মরিনহোর সাথেই যোগাযোগ করতে পছন্দ করতেন তিনি বেশী। রবসনের অধীনে প্রতিপক্ষের ভিডিও অ্যানালাইসিসও করতেন মরিনহো, সেই অ্যানালাইসিস তৎকালীন বার্সা ডিফেন্ডার ও পরবর্তীতে ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী খেলোয়াড় লরাঁ ব্লাঁ নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে ভিডিওগুলোকে আত্মস্থ করতেন। সেই লঁরা ব্লাঁ ও এখন নামকরা কোচ।

গার্দিওলা-মরিনহো : তখন গলায় গলায় বন্ধুত্ব
গার্দিওলা-মরিনহো : তখন গলায় গলায় বন্ধুত্ব

ববি রবসন যথেষ্ট আক্রমণাত্মক কোচ ছিলেন, তাঁর কোচিংয়ের মূল ফোকাসটাই থাকত অ্যাটাকিং থার্ড তথা আক্রমণের দিকে, তাই মরিনহোকেই মূলত দলের ডিফেন্সিভ দিকটা খেয়াল রাখতে হত। কে জানে, ঐ অভ্যাসটাই মূলত মরিনহোকে মূলত পরবর্তী জীবনে একজন রক্ষণাত্মক কোচের স্বীকৃতি দিয়েছে, ”বাস পার্কের” মত বহুল আলোচিত জিনিসপত্রের জন্ম দিয়েছে!

রবসন যে এক মৌসুম বার্সাতে ছিলেন, জিতিয়েছিলেন স্প্যানিশ কাপ, স্প্যানিশ সুপার কাপ ও ইউরোপীয়ান কাপ উইনার্স কাপ। কিন্তু তাতেও সন্তুষ্ট হয়নি বার্সা ম্যানেজমেন্ট, লিগটাও যে দরকার ছিল তাঁদের! সাথে ক্রুইফের নিয়ে আসা টোটাল ফুটবলটাকে জিইয়ে রাখার জন্য বার্সা ম্যানেজমেন্ট ক্রমশই আগ্রহী হচ্ছিল ক্রুইফের স্বদেশী কোন এক কোচ আনার জন্য। ফলে রবসনকে বার্সার জেনারেল ম্যানেজার হয়ে সরে যেতে হল, ক্লাবের কোচ হয়ে আসলেন তৎকালীন আয়াক্স কোচ লুই ভ্যান হাল। কোচের দায়িত্ব থেকে রবসন চলে গেলেও রবসনের পরামর্শমতই মরিনহো সহকারী পদে থেকে যান লুই ভ্যান হালের…

(চলবে)

কমেন্টস

কমেন্টস

One thought on “মরিনহোর উত্থান : পোর্তোর গল্প – ৩

মন্তব্য করুন

one × four =