মরক্কোর বিশ্বকাপ ইতিহাস

::: জুয়েল আহমেদ লিপু :::
১৯৮৬ বিশ্বকাপে মরক্কোর অংশগ্রহনের মাধ্যমে বদলে যায় পুরো আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাস :-
১৯৭০ সালের আগ পর্যন্ত আফ্রিকান ফুটবলের সাথে ফিফার সম্পর্ক তেমন ভালো ছিল না। তখনকার সময়ে বিশ্বকাপ ফুটবলে ইউরোপিয়ান এবং লাতিন দলগুলাই বেশি সুবিধা পেত। বিশ্বকাপের মত মঞ্চে ৩২ দলের মধ্যে ৩১ টি দল ছিল ইউরোপিয়ান এবং লাতিন আমেরিকার। আর মাত্র ১ টি স্পটের জন্য এশিয়া এবং আফ্রিকার দলগুলোর লড়াই করতে হতো। সেই শোচন থেকে মুক্তির জন্য ১৯৬৬ বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব থেকে ৩১ টি আফ্রিকান ফুটবল দল তাদের নাম প্রত্যহার করে।
১৯৩৪ বিশ্বকাপে মিশর প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে বিশ্বকাপের মত মঞ্চে জায়গা করে নেয়। যদি সে বিশ্বকাপে কোন জয় চারাই বাদ পরতে হয় মিশরকে। এই বিশ্বকাপ পরেই আফ্রিকান ফুটবলে নেমে আসে কালো ছায়া। ইউরোপিয়ান এবং লাতিন ফুটবলের প্রতি ফিফার স্বজনপ্রিতি কারনে টানা ৩৬ বছর কোন আফ্রিকান দল বিশ্বকাপের মত মঞ্চে জায়গা করে নিতে পারেনি।
১৯৭০ বিশ্বকাপে আফ্রিকান দ্বিতীয় দল হিসেবে মেক্সিকো বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় মরক্কো।বুলগেরিয়ার সাথে ২-২ গোল ড্র করে আফ্রিকান ইতিহাসের প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপে প্রথম পয়েন্ট কুড়িয়ে নেয় মরক্কো। এর পরের বিশ্বকাপ অর্থাৎ ১৯৭৪ বিশ্বকাপে মেক্সিকোকে ৩-১  হারিয়ে আফ্রিকানদের উল্লাসে ভাসায় তিউনিসিয়া। এর এটাই ছিল আফ্রিকানদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম জয়।
১৯৮২ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মত দুটি আফ্রিকান দল একসাথে বিশ্বকাপের সুযোগ পায়। ক্যামেরুন তাদের গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই অপরাজিত থাকে যদি ও কোন জয় ছাড়াই তাদের গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পরতে হয়। তবে সে বিশ্বকাপে চমক দেখিয়েছিল আরেক আফ্রিকান দল আলজেরিয়া।
প্রথম ম্যাচে পশ্চিম জার্মানির সাথে ২-১ গোলে হারলে পরের ম্যাচে চিলিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে পরের রাউন্ডে খেলার আশা বাচিয়ে রাখে আলজেরিয়া। তবে তাদের আশা ঘোলা করে দেয় দুই প্রতিবেশী দেশ পশ্চিম জার্মানি এবং অস্ট্রিয়া। জার্মানদের পরের রাউন্ডে যেতে যেকোন ভাবে অস্ট্রিয়ায় সাথে জিততে হতো।সে ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে জার্মানরা জায়গা করে নেয় পরের রাউন্ডে। এ জয়ের ফলে জার্মান এবং অস্ট্রিয়া দু-দলেই পরের রাউন্ডে জায়গা করে নেয়।
১৯৮৬ বিশ্বকাপে আফ্রিকান ফুটবলের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ৮৬ বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার সাথে কোচ জোসে ফারিয়ার হাত ধরে নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপে খেলতে নামে মরক্কো। অভিজ্ঞ জোসে ফারিয়া একটানা ১১ বছর ব্রাজিলিয়ান ক্লাব ফ্লুমিন্সের বয়সভিত্তিক দলের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালে মরক্কো ফুটবল ফেডারেশন ফারিয়াকে তাদের নতুন কোচ হিসবে নিয়োগ দেয়। তখনকার সময় এক মরক্কোর খেলোয়ার ফারিয়াকে বিশ্লেষণ করেছিলেন : “তিনি একজন চালাক লোক, একজন বিদ্যাভীমানী এবং তিনি এমন একজন লোক যে কি না আপনার রুমে যেভাবে না আপনে কি করছেন দেখার জন্য “।
ফারিয়ার অধিনে ১৯৮৩ সালেই প্রথম সাফল্যলাভ করে মরক্কো। তারা মিডিটারেন গেমে প্রথমবারের মত স্বর্ণ জিতে নেয়। এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯৮৪ সালে মরক্কো অলম্পিকে খেলার সুযোগ পেয়ে যায় যদিও তারা ব্রাজিল এবং জার্মানির কাছে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয়।
অলম্পিকের দু মাস পরে মরক্কো বিশ্বকাপের বাছাই মিশনে নেমে পরে। মেরী স্টার্কের হেট্রিকে সিরিয়া লিওনকে ৬-০ গোলে হারায় মরক্কো।  দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে মালির সাথে নিজেদের মাঠে ২-০ গোলে জিতে আওয়ে ম্যাচে ০-০ গোলে ড্র করে ৩য় রাউন্ডে জায়গা করে নেয় মরক্কো।
৩য় রাউন্ডে মরক্কোকে শক্তিশালি মিশরের মোকাবিলা করতে হয়। প্রথম লেগে গোলশূন্য ড্র করে দ্বিতীয় লেগে ২-০ গোলে জিতে ফাইনালে জায়গা করে নেয় মরক্কো। যদিও ফাইনালে আল- ফারজানির দেওয়া একমাত্র গোলে হেরে যায় মরক্কো। ফারিয়ার অধিনে মরক্কো দলের প্যারফরম্যান্স দিন -দিন ব্যাপক উন্নতি হয়।  ১৯৮৫ সালে অনুষ্টিত পান আরব গেমসের সিলভার মেডেল জয় করে মরক্কো। বিশ্বকাপের কয়েকমাস আগে মরক্কো আফ্রিকান নেশন্স কাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয়। যদিও মিশরের কাছে হেরে ফাইনালে যাওয়া হয়নি ফারিয়ার দলের।
১৯৮৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ এফ তে ইংল্যান্ড, পর্তুগাল, পোলেন্ডের সাথে জায়গা পায় মরক্কো। ববি রবসনের উপস্থিতিতে ইংল্যান্ড দল ছিল তখনকার সময়ের অন্যতম সেরা দল, সাথে ছিল ১৯৮২ বিশ্বকাপে ৩য় হওয়া পোলেন্ড, ৮৪ ইউরো কাপের সেমিফাইনাললিস্ট পর্তুগাল, আর সাথে অনভিজ্ঞ মরক্কোকে নিয়ে গ্রুপ অফ ডেথ ছিল এটি।
মরক্কোর ২২ সদস্যের দলে ছিল অভিজ্ঞ – অনভিজ্ঞের মিশ্রন। সে দলের বেশিরভাগ খেলোয়ার ছিল তাদের ঘরোয়া লিগের। মাত্র ৬ জন খেলোয়ারের ইউরোপে খেলার অভিজ্ঞতা ছিল। মরক্কোর শক্তিশালি জায়গা ছিল তাদের সেন্টাল ডিফেন্ডার মোস্তাফা এল বিয়াজ, লাবিদ খলিফা, ফুল ব্যাক আব্দুল মাজিদ এবং নরুদ্দিন।
ফারিয়ার দলের স্টাইকার হিসেবে ছিলেন দুই ভাই মোস্তাফা মেরি এবং আব্দুল মাজিদ মেরি।
২ জুন পোলেন্ডের সাথে ম্যাচ দিয়ে শুরু হয় মরক্কোর বিশ্বকাপ যাত্রা। শক্তিশালি পোলেন্ডের সাথে শুরু থেকেই রক্ষণাত্মক ভাবে খেলতে শুরু করে মরক্কো। পোলেন্ডের মিডফিল্ডের সাথে পেরে ঠক্কর দিতে না পারলেও, কাউন্টার এট্যাকে ভয়ংকর ছিল মরক্কো। প্রথম অর্ধ গোল শূণ্য ড্র হয়। দ্বিতীয় হাফে পোলেন্ড অনেকগুলা চান্স মিস করলে শেষ পর্যন্ত গোলশূন্য ড্র হয় ম্যাচটি। এ ম্যাচটি গ্যালারীতে বসে দেখেছিলেন ববি রবসন। প্রথম ম্যাচে পর্তুগালের সাথে হারা ইংল্যান্ডকে পরের রাউন্ডে যেতে হলে মরক্কোকে হারাতেই হতো। কিন্তু মরক্কো এবং ইংল্যান্ড ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হয়। এমতাবস্থায় গ্রুপের অবস্থা ধারায় পোলেন্ড ৩ পয়েন্ট, পর্তুগাল এবং মরক্কোর ২ পয়েন্ট এবং ইংল্যান্ডের ১ পয়েন্ট। সে হিসেবে পর্তুগালের সাথে শেষ ম্যাচ জিতলেই পরের রাউন্ডে জায়গা করে নেবে মরক্কো। পর্তুগালের সাথে ম্যাচের আগে মরক্কো কোচ ফারিয়া দেখা করেন ব্রাজিলায়ান তারকা সক্রেটিস, জিকোদের সাথে।
বাচা মরার ম্যাচে শক্তিশালি পর্তুগালকে ২-০ গোলে হারিয়ে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয় মরক্কো। এমনকি পোলেন্ডকে ইংল্যান্ড হারানোয় গ্রুপ চ্যাম্পিয়ান পরের রাউন্ডে পা রাখে। নকটআউট পর্বে শক্তিশালি পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে মরক্কোর ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হয়। ফারিয়ার দল
ফারিয়ার দল বীরের বেশে তাদের দেশে ফিরলে মরক্কোর এক লক্ষ মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাদের অভিবাদন জানায়। এ বিশ্বকাপের মাধ্যমে লাতিন এবং ইউরোপিয়ান দলগুলোর প্রতি ফিফার স্বজনপ্রীতি ভাব কেটে যায়। আর এই ঐতিহাসিক কাজটি করেছিল ৮৬ বিশ্বকাপের মরক্কো দলটি।
মেক্সিকো বিশ্বকাপে দারুন প্যারফরম্যান্স করায় সে বছর আফ্রিকান ফুটবলার অফ দ্যা ইয়ার জিতে নেয় জাকি। মরক্কোর ৮৬ বিশ্বকাপের আফ্রিকানদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল হিসেবে অভিহত করা হয়। ২০০৬ সালে সিএফ বিগত ৫০ বছরের সেরা ২০০ জন খেলোয়ারের তালিকা করে যেখানে ৮৬ বিশ্বকাপের ৬ জন মরক্কো তারকা জায়গা করে নেন।
মরক্কোর এ দলটি আফ্রিকান ফুটবলের জন্য আর্শিরবাদ। এ দলটির কারনেই আজ আফ্রিকান দলগুলো আজ বিশ্বকাপের মঞ্চে মাথা তুলে দাড়াতে পারছে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

4 + eleven =