ভামোস আর্জেন্টিনা : আবেগ, ভালোবাসা নাকি নিছকই পাগলামি?

::: নওশাদ আইয়ুব ::: 
ফুটবলের খবর যারা নিয়মিত রাখেন বা বিশ্বকাপের সময় মোটামুটি পেপার – পত্রিকা নাড়াচাড়া করেছেন তারা প্রায় সবাই “ভামোস আর্হেন্তিনা” বা “ভামোস আর্জেন্টিনা” শব্দযুগলের সাথে পরিচিত। আর্জেন্টিনা বা আর্হেন্তিনা উচ্চারণের পার্থক্যটা মূলত স্প্যানিশ ও ইংলিশ উচ্চারণের সংঘর্ষে। ইংরেজি G বা J এর উচ্চারণ স্প্যানিশে খানিকটা বদলে হয় H এর মতো। অর্থাৎ, উচ্চারণটা বাংলা বর্গীয় “জ” এর মতো না হয়ে বরং খানিকটা “হ” এর মতো হয়। আবার “Z” এর ক্ষেত্রে ইংরেজি উচ্চারণটা বজায় থাকে। অপরদিকে “T” এর উচ্চারণটা বাংলা “ট” এর চেয়ে বেশি “ত” এর মতোই হতে দেখা যায়। “ভামোস” শব্দটার ইংরেজি অর্থ “Go ahead” বা “এগিয়ে যাও”। তাহলে “ভামোস আর্হেন্তিনা” র অর্থ দাঁড়ায় “এগিয়ে চল আর্জেন্টিনা”। যেকোনো ম্যাচের সময়ই এই হর্ষধ্বনিতেই মুখোরিত হয়ে থাকে আর্জেন্টাইন সমর্থকে ঠাসা গ্যালারি।
 
অবশ্য তারা যা বলেই গ্যালারি কাপাক না কেন তা যে ভাগ্যদেবীর মন গলাতে পারে নি তাতে নেই তিলমাত্র সন্দেহ। আর তার প্রমাণটাও মিলে ৩২ বছরের বিশ্বকাপ শিরোপা খড়ায়। শুধুই কি বিশ্বকাপ? যে কোন প্রকারের মেজর টুর্নামেন্টের শিরোপা আর্জেন্টাইনদের হাতে উঠার ব্যাপারটাও যে এখন অনেকটা রূপকথার সাজানো গল্পের মতো। সর্বশেষ ১৯৯৫ তে সেই সৌভাগ্য হয়েছিল বর্তমান এথলেটিকো মাদ্রিদ ম্যানেজার দিয়াগো সিমিওনের। সেবার হাতে তুলেছিলেন আর্জেন্টাইনদের হয়ে চতুর্দশ মহাদেশীয় শ্রেষ্টত্বের শিরোপা যা আমাদের কাছে “কোপা আমেরিকা” হিসেবেই পরিচিত। এরপর যে আর তাদের কোন মেজর টুর্নামেন্টের ফাইনাল হয়নি বিষয়টা তেমনও না। কিন্তু একবারের জন্যও যে ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন ছিলেন না তাদের প্রতি। বার বার তিনি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন কোন এক অজানা কারণে। ভাবতেই অবাক লাগে গ্র‍্যাবিয়েল বাতিস্তুতা, রবার্তো আয়ালা, হাভিয়ের জানেত্তি থেকে শুরু করে হার্নান ক্রেসপো- কেউই প্রচারণার জন্য বিজ্ঞাপনচিত্রে দু-একবার ট্রফিগুলো নাড়াচাড়া করে দেখার চেয়ে বেশি কিছু করে দেখাতে পারেন নি। পারেন নি প্রচণ্ড প্রতাপের সাথে শিরোপাগুলো তুলে ধরে তা নিজেদের করে নিতে। কেউ কি জানে যে আলবিসেলেস্তেদের হয়ে নিরবে – নিভৃতে খেলে যাওয়া হাভিয়ের মাশ্চেরানোই সবচেয়ে বেশি মেজর টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা ফুটবলার। জানবেই বা কিভাবে? ইতিহাস যে শুধু বিজয়দেরই মনে রাখে, বিজিতদের নয়। রের্কড বুক নামের বেরসিক জিনিসটা কখনও ভালো খেলা বা মন্দ খেলার দৃষ্টান্ত তুলে ধরে না। ওটাও ছেলেপেলেদের বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট কার্ডের মতো কিছু সংখ্যার আঁকিবুঁকি দিয়ে জানিয়ে দেয় অমুক বিজয়ী হয়েছে তো তমুক বিজিত হওয়ায়। কিন্তু বিজিতের ভেতরের চাপা কষ্ট আর তার ঘাম ঝরানোর অনুশীলনের ছাপটা তুলে ধরতে তা বরাবরই অপারগ। এখানেই এই রেকর্ডবুক জিনিসটার ব্যর্থতা।
 
এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্টাইনদের স্বপ্নের জাদুকর ঐ “লা পুলগা” ক্ষ্যাত পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি গড়নের লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। ক্যারিয়ারের ঊষালগ্ন থেকেই তার প্রতি আর্জেন্টাইন ভক্তকুলের প্রত্যাশার চাপটা ছিল পাহাড়সম। কবির ভাষায় ছন্দের দোলায় বলতে গেলে হয়তো বা ব্যাপারটা এরকম দাড়াত…
” কিসের আর এত ভাবনা?
আমাদের স্বপ্নের সারথি যখন ম্যারাডোনা থেকে মেসি ‘ডোনা’ “
কিন্তু সময়ের ভেলায় চড়ে তিনিও নিজের নাম লিখাতে বসেছিলেন ব্যর্থদের খাতায়। পরে অবশ্য স্বয়ং রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপে ভাঙলেন চরম হতাশার ফসল “অবসর”কে। আবারও জাগ্রত হল আলবিসেলেস্তেদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন। একাই ঘানি টানলেন দেশের। ১৬ বছর ধরে “পরাজয়” নামক ক্ষরায় ভোগা ইকুয়েডরের মাটিতে ফলালেন “জয়” নামক সোনালি ফসল। আলবিসেলেস্তেরা চলে গেল বিশ্বকাপে। আর মেসি? তিনি আবির্ভূত হলেন ধ্বংস্তূপ থেকে উঠে আসা রূপাকথার “ফিনিক্স পাখির” ভূমিকায়।
 
এলোমেলো ফরমেশান আর সঠিক খেলোয়াড় বাছাইয়ে ব্যর্থতা। এই দুইয়ে মিলিয়ে ধুলিস্যাত হতে বসল আর্জেন্টাইনদের ঐ সোনালি ট্রফি হাতে তোলার স্বপ্ন। সাথে অব্যবস্থাপনার পালে নতুন হাওয়া লাগাল “দলীয় অসংহতি” র গুঞ্জন। ক্রোয়েশিয়ার সামনে মাথা তুলেও দাড়াতে না পাড়ার বঞ্চনা সইতে পারল না অনেকেই। ক্ষণিকের মধ্যেই আবেগ, ভালোবাসা রূপ নিল পাগলামিতে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম থেকে শুরু করে অন্যান্য গণমাধ্যমে ভেসে বেড়ালো পাগলা সমর্থকের “আত্মাহুতি” দিয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচার খবর। তাদের ধৈর্য্য বাঁধ ভাঙল, আর্জেন্টিনা থেকে “মেসি এন্ড কোং” বনে যাওয়া দলটার না। ঘুরে দাড়াল তারা, জিইয়ে রাখল তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্ন। এখানে “আত্মাহুতি” দেওয়ার স্বার্থকতাটাই বা আর কই থাকল। এজন্যই বোধ করি জীবনের মূল্যটা সবার উপরেই থাকা উচিত। দিনশেষে আর্জেন্টিনা একটা ফুটবল দলই। মানুষের মনোরঞ্জন করার জন্য ফুটবলটাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া কতিপয় লোকের সমষ্টি মাত্র। আজ মেসি – মাশ্চেরানোরা এর ব্যাটন বহন করছেন। কাল হয়তো বা দেখা যাবে দিবালা – পাভনরা তাই করে যাবেন। সময়ের ভেলায় চড়ে প্রতিনিধিত্বে আসবে অন্য কেউ। কিন্তু সস্তায় বিলিয়ে দেওয়া জীবনটা ফেরত আসবে না আর কখনও। কথায় আছে “ভোগে নয়, ত্যাগেই সুখ”। প্রিয় দলের প্রতি যখন এতই ভালোবাসা ধরুন না আরও কয়েক বছর ধৈর্য। জীবন দিয়ে দেওয়ায় কারও স্বার্থ নিহিত নেই। “জাতে মাতাল, তালে ঠিক” হওয়াটাই এক্ষেত্রে যৌক্তিক। সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে কিছুটা পাগলামো করাটা হয়তো বা যৌক্তিক। কিন্তু ঐ পাগলামো মাত্রা ছাড়ালে তা দিনশেষে কারও কাজে আসে না।
 
দ্বিতীয় রাউন্ড – সামনে ফ্রান্স। ডিফেন্স – মিডফিল্ড – এটাক এই তিন দিক মিলিয়ে একেবারে বলতে গেলে ব্যালেন্সড একটা টিম। হয়তো হারবে, হয়তো বা দাঁতে দাঁত কামড়ে আরও একটা জয় নিয়ে ফিরবে মেসি-মাশ্চেরা। কিন্তু তাতে শিরোপাখড়ায় ভোগা দেশটার প্রতি ভালোবাসাটা তিলমাত্র কমবে না। সাম্পা তো বললই, “ফুটবলের লিও একটা বিশ্বকাপ পাওনা”। দেখা যাক ফুটবল সাম্পার কথা রাখে কি না। তবেও মেসিও ফুটবলের কাছে কোন অংশে কম ঋণী নয়-ফুটবলটাও যে তাকে কম দেয়নি। দেখা যাক, সময়ই বলে দিবে কে কার কথা রাখে। প্রশ্নটা হচ্ছে, মারিও আলবার্তো ক্যাম্পেস, তারপর হোর্হে বুরুচাগা, তারপর? তারপর কে জন্ম দিবে সে মহেন্দ্রক্ষণের?

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

three × three =