যেভাবে ব্রাজিলকে রুখতে পারে বেলজিয়াম

যেভাবে ব্রাজিলকে রুখতে পারে বেলজিয়াম

গতকালকের খেলায় মেক্সিকোকে ২-০ গোলে ও জাপানকে ৩-২ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গিয়েছে যথাক্রমে ব্রাজিল ও বেলজিয়াম। কোয়ার্টার ফাইনালে এই দুই দলই মুখোমুখি হবে একে অপরের সাথে। প্রথম রাউন্ডে খানিক নড়বড়ে থাকা ব্রাজিল দ্বিতীয় রাউন্ডে যেন তাদেরকে ঘিরে থাকা শঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দিয়েছে। ওদিকে ফর্মে ফিরেছেন নেইমারও। ফলে ব্রাজিল কে হারাতে বেলজিয়ামকে যে বিশেষ পন্থার কথা ভাবতে হবে, এটা মোটামুটি নিশ্চিত। প্রশ্ন হল, বেলজিয়াম কোচ রবার্তো মার্টিনেজ কি আসলেই তাঁর ট্যাকটিকসে কোন পরিবর্তন আনবেন কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলকে বধ করার জন্য? বেলজিয়াম-জাপান ম্যাচটা মোটামুটি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বলেছে – হ্যাঁ, উচিত।

যেভাবে ব্রাজিলকে রুখতে পারে বেলজিয়াম

এই পর্যন্ত বেলজিয়াম এর ম্যাচগুলোতে দলকে ৩-৪-৩ ফর্মেশনে খেলিয়ে গেছেন নিয়মিত কোচ রবার্তো মার্টিনেজ। মূল কারণ একটাই। দলে বিশ্বমানের তিনজন সেন্টারব্যাক টোবি অল্ডারওয়াইরেল্ড, ইয়ান ভার্টঙ্ঘেন ও ভিনসেন্ট কম্পানিকে একসাথে ব্যবহার করতে পারা। বেলজিয়াম দলে কোন প্রতিষ্ঠিত লেফটব্যাক না থাকাটাও একটা অনেক বড় কারণ। আর সাথে নিকট বর্তমানে চেলসি, জুভেন্টাসের মত দলগুলো ৩-৪-৩ ফর্মেশনে সফলতা লাভ করার কারণে মার্টিনেজও নিজের দলকে এই ছকে খেলানো শুরু করেন। এই ফর্মেশনে রাইটব্যাক বা লেফটব্যাক থাকেন না, যা থাকেন তা হল লেফট উইংব্যাক ও রাইট উইংব্যাক। অর্থাৎ এরা প্রথাগত ফুলব্যাক পজিশনের থেকে আরেকটু উপরে খেলবেন। আবার উইঙ্গারদের মত বেশী উপরেও না। বেলজিয়ামে লেফট উইংব্যাক হিসেবে খেলছেন ইয়ানিক ফেরেইরা কারাসকো, আর ডানদিকে রাইট উইংব্যাক হিসেবে থমাস মিউনিয়ের। মিউনিয়ের একজন প্রথাগত রাইটব্যাক ও খানিক আক্রমণাত্মক হবার কারণে এই পজিশনে নিজেকে মানিয়ে নিতে পেরেছেন বেশ। সমস্যাটা হয়েছে কারাসকোকে নিয়েই। অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ, মোনাকোর মত ক্লাবে আগে লেফট উইঙ্গার হিসেবে খেলা কারাসকো এই পজিশনের সাথে নিজেকে এখনো ঠিকমত মানিয়েই নিতে পারলেন না। যে সমস্যাটা কালকের ম্যাচেও প্রকটভাবে দেখা গিয়েছে। দেখা গেল ইডেন হ্যাজার্ড, কেভিন ডি ব্রুইনিয়া, ড্রিয়েস মার্টেন্স ও থমাস মিউনিয়েররা বেশ আয়োজন করে একটা আক্রমণ রচনা করছেন, কারাসকো সেই আক্রমণে যোগ দিতে গিয়েই সব ভজঘট পাকিয়ে ফেলছেন, সময়মত বল রিসিভ করতে পারছেন না, বা সময়মত বল পাস দিতে পারছেন না, ইত্যাদি। ব্রাজিলের সাথে যদি মার্টিনেজ ৩-৪-৩ ফর্মেশনেই দলকে খেলানোর পরিকল্পনা করেন তবে সেক্ষেত্রে কারাসকো-সমস্যার সমাধান করতে হবে অতিসত্বর। কারাসকো কে খেলাবেন, নাকি কারাসকোর জায়গায় থরগান হ্যাজার্ড বা নাসের চ্যাডলির মত খেলোয়াড়কে খেলাবেন, না এই সমস্যা সমাধানের জন্য পুরো ফর্মেশনটাই বদলে ফেলবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়। শেষ ম্যাচে এই কারাসকোর জায়গাতেই চ্যাডলি নেমেছিলেন। নেমেই ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে গোল করে বাঁচিয়ে রেখেছেন বেলজিয়াম এর স্বপ্ন। তাই পরের ম্যাচ থেকে মূল একাদশে থাকার আশা করতেই পারেন চ্যাডলি।

বেলজিয়াম মূল একাদশের আরেকটা বড় সমস্যা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার অ্যাক্সেল উইটসেল। স্কোয়াডে মুসা দেম্বেলে, ইউরি তিয়েলেমান্সের মত প্রতিভাবান সেন্ট্রাল মিডফিল্ডাররা এই উইটসেলের মত জায়গা পান না। যদিও মোটামুটি পুরো ক্যারিয়ারটাই জেনিত সেইন্ট পিটার্সবার্গ ও পরে চাইনিজ ক্লাব তিয়ানজিং কুয়ানজিয়াং এ খেলা এই মিডফিল্ডার প্রতিভার দিক দিয়ে এককালে অনেক পরিচিত ছিলেন, পরবর্তীতে বড় কোন ক্লাবে খেলতে আসেননি, পারেননি বলাটাই যুক্তিযুক্ত। তবুও কোন একটা বিচিত্র কারণে বেলজিয়ামের মিডফিল্ডে তাঁর উপস্থিতি থাকে সদাসর্বদা। তাঁর সাথে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে জুটি বাঁধেন ম্যানচেস্টার সিটিতে উইঙ্গার বা আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা কেভিন ডে ব্রুইনিয়া। তাঁকেও একটু পিছনে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে খেলতে বেশ কষ্টই হচ্ছে। কিন্তু তবুও সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে উইটসেল-ডি ব্রুইনিয়া এই জুটি থেকে বেরই হতে চাচ্ছেন না মার্টিনেজ।

সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে এই ছোটখাট সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে বেলজিয়ামকে, নাহয় ব্রাজিলের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

একটা সমাধান হতে পারে, কারাসকো ও উইটসেল, এই দুইজনের পরিবর্তে অন্য খেলোয়াড় নামাতে হবে মার্টিনেজকে। উইটসেলের পরিবর্তে খেলতে পারেন মারুয়ান ফেলাইনি। সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হলেও দুর্দান্ত হেড করতে পারেন বিধায় সেটপিসে ভয়ংকর এই মিডফিল্ডারকে বেশ দরকার বেলজিয়ামের, ব্রাজিলকে রুখতে হলে। এই পর্যন্ত ব্রাজিলের ডিফেন্স সেরকম বড় কোন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়নি, কিন্তু বেলজিয়াম এর বিপক্ষে ডি-বক্সে রোমেলু লুকাকু ও মারুয়ান ফেলাইনিকে আটকে রাখা খুব সমস্যার কারণ হতে পারেন থিয়াগো সিলভা ও মিরান্ডাদের জন্য। কেননা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হলেও মারুয়ান ফেলাইনি যখন তখন ডি-বক্সের মাঝে গিয়ে বসে থাকেন, সেটপিসে অত্যন্ত ভয়ংকর তিনি। আর ব্রাজিলের বিপক্ষে এই ভীতিটাকেই কাজে লাগাতে হবে বেলজিয়াম কে।

যেভাবে ব্রাজিলকে রুখতে পারে বেলজিয়াম

আরেকটা সমাধান হতে পারে, ৩-৪-৩ ছক থেকে সম্পূর্ণ বের হয়ে এসে ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে খেলা। সেক্ষেত্রে চোটজর্জর অধিনায়ক ভিনসেন্ট কম্পানিকে ডিফেন্স থেকে সরাতে হবে মার্টিনেজকে। সেন্ট্রাল ডিফেন্সে জুটি বাঁধবেন ক্লাব ক্যারিয়ারে টটেনহ্যামের হয়ে একসাথে জুটি বাঁধা দুই সেন্টারব্যাক অল্ডারওয়াইরেল্ড ও ভার্টঙ্ঘেন। ডিফেন্সের ডানে থাকবেন যথারীতি থমাস মিউনিয়ের। সামনে দুই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে ফেলানিনি আর দেম্বেলেকে রেখে আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার বা নাম্বার টেন হিসেবে খেলবেন কেভিন ডি ব্রুইনিয়া। ব্রুইনিয়ার দুইপাশে হ্যাজার্ড আর মার্টেন্স। আর সামনে রোমেলু লুকাকু।

এই ফর্মেশনে আবার লেফটব্যাক সমস্যাটা প্রকট হয়ে উঠতে পারে। কারণ দলে প্রথাগত কোন লেফটব্যাক নেই বেলজিয়াম এর। এক্ষেত্রে দুটো সমাধান –

১. সেই কারাসকোকেই খেলাতে হবে, যিনি কিনা উইঙ্গার

২. নাহয় ইয়ান ভার্টঙ্ঘেন কে সেন্টারব্যাক থেকে সরিয়ে এনে লেফটব্যাকে খেলাতে হবে, আর তাঁর জায়গায় সেন্ট্রাল ডিফেন্সে চলে আসবেন কম্পানি। ভার্টঙ্ঘেন লেফটব্যাক হিসেবে খেলতে পারলেও তিনি এই পজিশনে খেলতে চান না। আর এর আগেও বেলজিয়ামের এই দলে ভার্টঙ্ঘেন লেফটব্যাক হিসেবে খেলেছেন, দল কোন ভালো ফলাফল আনতে পারেনি।

উইটসেল আর কারাসকো – এই দুই জুজুর সমাধান করতে পারলেই কেবলমাত্র ব্রাজিলের সাথে জয়ের আশা করতে পারে বেলজিয়াম। নচেৎ নয়!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

four × four =