বোকা জুনিয়র্স বনাম রিভার প্লেট : আগুনে দ্বৈরথের উপ্যাখ্যান

বোকা জুনিয়র্স বনাম রিভার প্লেট : আগুনে দ্বৈরথের উপ্যাখ্যান

কয়েকটা উদাহরণ দিয়ে শুরু করা যাক। কয়েকদিন আগেই আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসের এক লোক তাঁর শ্যালকের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে পালিয়ে গেছে। কেন? কারণ তাঁর শ্যালক ছিল রিভার প্লেটের সমর্থক, আর সে নিজে বোকা জুনিয়র্স এর! ২০১৫ সালের কোপা লিবার্তোদোরেসের নকআউট রাউণ্ডে মুখোমুখি হয়েছিল এই দুই দল। বোকা সমর্থকদের ‘পেপার স্প্রে’ এর আক্রমণে বেশ কয়েকজন রিভার প্লেট খেলোয়াড়কে হাসপাতালে নিতে হয়েছিল। সে ম্যাচ পরে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়, পরের রাউণ্ডে উঠে রিভার প্লেট। সে আসরে লিবার্তোদোরেসের শিরোপা জিতেই বোকা জুনিয়র্স কে জবাব দেয় রিভার প্লেট। নিজের ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়েছেন রিভার প্লেট কিংবদন্তি ড্যানিয়েল প্যাসারেলা, এই ম্যাচে খেলতে নেমেই। রিভারপ্লেটের আরেক খেলোয়াড় আলেহান্দ্রো ডমিঙ্গুয়েজ মারামারি করতে ২০১২ সালের এক ম্যাচে লাল কার্ড দেখেন, লাল কার্ড পাওয়ার পর আবার সেই অফিসিয়ালকেই মারতে উদ্যত হয়েছিলেন তিনি! গত বছরেই রিভার প্লেটের স্ট্রাইকার সেবাস্তিয়েন দ্রুইসিকে মারতে গিয়ে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন বোকা জুনিয়র্সের চার খেলোয়াড় – পাবলো পেরেজ, হুয়ান ইনসরালদে, দারিও বেনেদেত্তো ও রিকার্ডো সেঞ্চুরিয়ন। দুই দলের দুই কোচকেও লাল কার্ড দেখিয়ে বের করে দেওয়া হয় ডাগআউট থেকে। ২০০৪ সালে কোপা লিবার্তো লিবার্তোদোরেসের সেমিফাইনালে বোকা জুনিয়র্স এর হয়ে গোল করে মুরগির মত নেচে নেচে উদযাপন করেন স্ট্রাইকার কার্লোস তেভেজ, যা তাতিয়ে দেয় রিভার প্লেট সমর্থকদের ; তাদের বোকা সমর্থকেরা মুরগি বলেই ক্ষ্যাপায় কি না!

এগুলো ছিল বোকা জুনিয়র্স আর রিভার প্লেটের শত্রুতার কিছু চিত্র। শতবর্ষী এই দ্বৈরথে প্রতি বছরই এরকম মারামারি, হানাহানি হয়েই থাকে। বোকা-রিভার প্লেট দ্বৈরথে এত বেশি সংঘর্ষ হয় যে এখন বোকা জুনিয়র্সের মাঠে খেলা হলে রিভার প্লেটের সমর্থকেরা দেখতে যেতে পারেন না। রিভার প্লেটের মাঠে খেলা হলে একই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হয় বোকা জুনিয়র্স–সমর্থকদের ক্ষেত্রেও। দুই দলের সমর্থকের সহিংস মনোভাবের কারণেই বিরক্ত হয়ে ২০১৩ সাল থেকে এই নিয়ম চালু করেছে আর্জেন্টাইন ফেডারেশন। এখন আমাকে বলুন, এমন কোন দ্বৈরথ কি দেখেছেন যেখানে উত্তেজনার স্ফুলিঙ্গ এরকম ভীষণভাবে ছড়ায়?

আর্জেন্টিনার ক্লাব পরিমণ্ডলে সবচেয়ে বড় দুই ক্লাব বোকা জুনিয়র্স আর রিভার প্লেটের কথাই ধরুন। রাজধানী বুয়েনস এইরসের এ দুই ক্লাবের মধ্যে খেলা হলে পুরো দেশটাই যেন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। ঝগড়াঝাঁটি, মারামারি, তর্ক-বিতর্ক, বৈরী সমর্থকদের হামলা—এসব তো স্বাভাবিক ঘটনা। এই দুই দল দক্ষিণ আমেরিকান ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্টে কোপা লিবার্তোদোরেসের ফাইনালে মুখোমুখি হলে অবস্থাটা কী হবে, কল্পনা করতে পারছেন তো?

হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, এ বছর দক্ষিণ আমেরিকার ‘চ্যাম্পিয়নস লিগ’ খ্যাত এই টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠেছে বোকা জুনিয়র্স আর রিভার প্লেট। আজ বাংলাদেশ সময় রাত একটায় এই দ্বৈরথই মাঠে গড়াবে। কোপা লিবার্তোদোরেসের ফাইনালে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব—বোকা জুনিয়র্স ও রিভার প্লেট। দুই লেগের এই ফাইনালে গোটা আর্জেন্টিনা স্থবির হয়ে যাবে ১৮০ মিনিটের জন্য। রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় কাটবে ম্যাচের প্রতিটি ক্ষণ। ফাইনালের প্রথম লেগ গড়াবে বোকা জুনিয়র্সের মাঠ লা বোম্বানেরায়, ফিরতি লেগ ২৫ নভেম্বর রিভার প্লেটের স্টেডিয়াম লা মনুমেন্টালে। এক জরিপে দেখা গেছে, আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বেশি সমর্থনপুষ্ট দল এই দুই ক্লাব। পুরো জনসংখ্যার ৪৬ শতাংশ সমর্থন করে বোকা জুনিয়র্সকে আর ২৪ শতাংশ রিভার প্লেটকে। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশই এই দুই দলের কাউকে না কাউকে সমর্থন করে। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ঘরোয়া লিগের সবচেয়ে বেশি শিরোপা এই দুই দলেরই। রিভার প্লেট আর্জেন্টিনার ঘরোয়া লিগ জিতেছে ৩৬ বার, বোকা জুনিয়র্স জিতেছে ৩৩ বার। কোপা আর্জেন্টিনায় বোকার জয় ৩ বার, রিভারের ২ বার। ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ বোকা জিতেছে ৩ বার, রিভার প্লেট ১ বার। কোপা লিবার্তোদোরেস জিতেছে বোকা ৬ বার, রিভার ৩ বার।

ইউরোপের সবচেয়ে বড় দ্বৈরথ নিঃসন্দেহে রিয়াল মাদ্রিদ আর বার্সেলোনার ম্যাচ। কিন্তু এই ক্লাব দুটি আলাদা শহরে হওয়ার কারণে এদের মধ্যে ম্যাচ হলে উত্তেজনার মাত্রাটা একটু কম হওয়ার অবকাশ থেকেই যায়। এসি মিলান-ইন্টার মিলানের সেই আগের জৌলুশ আর নেই। জুভেন্টাস এই দলের চেয়ে সাম্প্রতিককালে অনেক বেশী সফলতা পাওয়ার কারণে জুভেন্টাস-এসি মিলান, জুভেন্টাস-ইন্টার মিলান ম্যাচগুলোরও আর সেই বৈশ্বিক আবেদনটা নেই। গত দুই দশকে লিভারপুলের লিগ শিরোপা জিততে না পারার ব্যর্থতাও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড-লিভারপুল দ্বৈরথের রং কেড়ে নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ধনকুবেরদের অর্থে ফুলেফেঁপে ওঠা চেলসি ও ম্যানচেস্টার সিটি সেরা সময় কাটলেও ঐতিহাসিকভাবে সফল দল না হওয়ার কারণে ইউনাইটেড বা লিভারপুলের সঙ্গে ম্যাচে দলটির সমর্থকদের পাগলামো অতটা দেখা যায় না। একই কথা বলা যায় আর্সেনাল-চেলসি, আর্সেনাল-লিভারপুল, আর্সেনাল-ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ম্যাচগুলোকে নিয়েও। বায়ার্ন মিউনিখের অপ্রতিরোধ্য জয়যাত্রা ফিকে করে দিয়েছে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের সাথে তাদের লড়াইয়ের আবেদনও।

বোকা জুনিয়র্স বনাম রিভার প্লেট : আগুনে দ্বৈরথের উপ্যাখ্যান
gollachhut.com

সব দিক দিয়েই তাই বলা যায় বোকা জুনিয়র্স আর রিভার প্লেট তাদের আবেদনটা কিন্তু এখনও ধরে রেখেছে। সেটা দুই দলের যুগপৎ সফলতা অর্জনের দিক দিয়ে হোক, একই শহরের ক্লাব হওয়া নিয়ে হোক, বা সহিংসতার দিক দিয়ে হোক!

আর্জেন্টিনার ফুটবলের অনেক মহাতারকাই এসেছেন এই দুই ক্লাব থেকে। আসুন দেখে নেওয়া যাক কোন কোন খেলোয়াড় এই দুই ক্লাবে কিংবদন্তির সম্মান পান, আর কোন কোন পরিচিত খেলোয়াড় এই দুই দলের হয়ে খেলে গিয়েছেন!

  • বোকা জুনিয়র্স – ডিয়েগো ম্যারাডোনা, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, ক্লদিও ক্যানিজিয়া, আন্তোনিও রাত্তিন, মার্টিন পালের্মো, হুয়ান রোমান রিকেলমে, ওয়াল্টার স্যামুয়েল, গ্যারি মেডেল, ফার্নান্দো গ্যাগো, রড্রিগো প্যালাসিও, নিকোলাস বুর্দিসো, অস্কার রুগেরি, রবার্তো আবোনদানজিয়েরি, এভার বানেগা
  • রিভার প্লেট – পাবলো আইমার, রবার্তো আয়ালা, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, এস্তেবান ক্যাম্বিয়াসো, ক্লদিও ক্যানিজিয়া, মার্সেলো গ্যালার্দো, গঞ্জালো হিগুয়াইন, মারিও কেম্পেস, আরিয়েল ওর্তেগা, ড্যানিয়েল প্যাসারেলা, মার্সেলো সালাস, ওমর সিভোরি, হাভিয়ের সাভিওলা, হুয়ান পাবলো সোরিন, ডেভিড ত্রেজেগে, এনজো পেরেজ
  • দুই দলের হয়েই খেলেছেন – গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, ক্লদিও ক্যানিজিয়া, রিকার্ডো গ্যারেকা, হুগো গাত্তি, অস্কার রুগেরি

আসুন দেখে নেওয়া যাক দুই দলের হয়ে উল্লেখযোগ্য কে কে খেলছেন এখন।

  • বোকা জুনিয়র্স – কার্লোস তেভেজ, ক্রিস্টিয়ান পাভন, দারিও বেনেদেত্তো, নাহিতান নান্দেজ, উইলমার ব্যারিওস, মাউরো জারাতে, ফার্নান্দো গ্যাগো, লিসান্দ্রো মাগালান, পাবলো পেরেজ, ইম্যানুয়েল মাস, জিনো পেরুজ্জি
  • রিভার প্লেট – ফ্রাঙ্কো আরমানি, জোনাথান মাইদানা, ব্রুনো জুকুলিনি, হুয়ান ফার্নান্দো কুইন্তেরো, এজেকিয়েল প্যালাসিওস, জার্মান লাক্স, মিল্টন ক্যাসকো, লিওনার্দো পনজিও, এনজো পেরেজ, লুকাস প্র্যাটো

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

16 + eleven =