বেয়েরিনের উত্থান!

মূল লেখা – আহসানুল হক

হেক্টর বেয়েরিন
পজিশন: রাইট ব্যাক (রাইট উইঙ্গার, লেফট ব্যাক এবং ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে ও খেলতে পারেন)
বয়স: ২০ বছর
উচ্চতা: ১৭৭ সেঃমিঃ (৫ ফুট সাড়ে নয় ইঞ্চি)
ওজন: ৭৪ কেজি
ম্যাচ: প্রিমিয়ার লিগ- ১০(৩)
চ্যাম্পিয়ন্স লিগ- ৪
এফএ কাপ- ২
লিগ কাপ- ১
মোট: ২০ টি (৩ টি বদলি হিসেবে)
গোল: ২ টি
অ্যাসিস্ট: ১ টি

কালকেও লিভারপুলের বিপক্ষে অসাধারণ এক গোল করে বেয়েরিন রেখেছেন নিজের যোগ্যতার প্রমাণ
পরশুও লিভারপুলের বিপক্ষে অসাধারণ এক গোল করে বেয়েরিন রেখেছেন নিজের যোগ্যতার প্রমাণ

চার বছর আগে স্পেনের ক্লাব বার্সেলোনার একাডেমি থেকে আর্সেনালে আসেন হেক্টর বেয়েরিন। বয়স তখনো ১৬র কোঠা পেরোয়নি। আর্সেনাল যখন বার্সেলোনার সাথে কথা বার্তা চালাচ্ছিল তখন আর্সেনে ওয়েঙ্গার তার সাথে ব্যাক্তিগতভাবে দেখা করে বেয়েরিনকে নিয়ে তার পরিকল্পনা বলেন। আত্মবিশ্বাসী তরুণ কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে চলে আসেন উত্তর লন্ডনে। যেখানে আর্সেনের পরিকল্পনা মোতাবেক পজিশন চেঞ্জ করে রাইট উইঙ্গার থেকে রাইট ব্যাক এ শিফট হন বেলেরিন। অ-১৮ এবং অ-২১ দলের হয়ে নিয়মিত মাঠে নামতে থাকেন।

বার্সা থেকে আর্সেনালে আসেন বেয়েরিন
বার্সা থেকে আর্সেনালে আসেন বেয়েরিন

২০১২-১৩ মৌসুমের NextGen সিরিজে নজর কাড়েন। একই মৌসুমে প্রফেশনাল ম্যাচে অভিষেক হয় লিগ কাপে ওয়েস্ট ব্রমের বিপক্ষে। মিকেল আরটেটার বদলি হিসেবে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলেন ম্যাচের কিছু সময়। গত মৌসুমে ধারে খেলতে যান ওয়াটফোর্ড এ। কিন্তু মাত্র ৮ ম্যাচে অংশ গ্রহনের সুযোগ পান।

২০১৪-১৫ এর প্রাক মৌসুমে লাইম লাইটে আসেন আর্সেনালের ইতিহাসের দ্রুততম খেলোয়ার হয়ে, থিও ওয়ালকটের ৪০ মিটার স্প্রিন্ট এ ৪.৪ সেকেন্ডের রেকর্ড ভেঙ্গে দেন তিনি। তারই কিছুদিন পর প্রদর্শনী টুনার্মেন্ট এমিরেটস কাপে অসাধারন খেলে বার্তা দেন যে তিনি সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলার জন্য প্রস্তুত।

হেক্টর বেয়েরিন
হেক্টর বেয়েরিন

ওই টুনার্মেন্টে বেনফিকার সাথে ম্যাচে প্রথম বারের মত প্রথম একাদশে ৯০ মিনিট খেলেন তিনি। আর্সেনে ওয়েঙ্গার চেয়েছিলেন সব খেলোয়াড়কেই বাজিয়ে দেখতে। বেয়েরিন ও নিরাশ করেন নি। ডান প্রান্ত সীমা জুড়ে তার গতি, ট্রিকি ফুটওয়ার্ক দিয়ে বেনফিকার ডিফেন্স কে বারংবারই তটস্থ করে দিচ্ছিলেন। জোয়েল ক্যাম্পবেল এবং সানোগোর গোলে অ্যাসিস্ট ছাড়াও বেলেরিনের বিস্ফোরক ওভারল্যাপিং, রক্ষণাত্মক সতর্কতা এবং পাসিং অ্যাবিলিটি নজর কাড়ে।

তবে এর পরেও প্রথম একাদশে তার সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি ছিল না। কারন ব্যাক্যারি স্যানয়া এর দল ছাড়ার পর দলে আসেন দুই নতুন রাইটব্যাক ম্যাথিউ ডেবিউশি এবং ক্যালাম চেইম্বার্স। স্বাভাবিক ভাবেই প্রথম পছন্দ ছিলেন ডেবিউশি।

ম্যাথিউ ডেবিউশি
ম্যাথিউ ডেবিউশি

তবে অপ্রত্যাশিত সুযোগ আসে যখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইনজুরিতে পড়েন ডেবিউশি। অার্সেনালের হয়ে প্রফেশনাল ম্যাচে প্রথম একাদশে অভিষেক ঘটে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে। শুরুটা সুখকর ছিলোনা মোটেই। বরুশিয়া ডর্টমুন্ড এর কাছে ২-০ তে হেরে আসে গানার রা। বেয়েরিনও খুব একটা ভালো খেলতে পারেন নাই।

হাই প্রেসিং দ্রুতগামী ডর্টমুন্ড আর্সেনালের পাস দেওয়ার স্পেস ছোট করে আনছিল। তাই বেয়েরিন থেকে অনেক গুলো মিসপ্লেসড পাস দেখা যায়। আর কমপ্লিট হওয়া পাস গুলো বেশিরভাগই ওযিলকে দেওয়া। তাই বলা যায় পাস ডিস্ট্রিবিউশন এর ক্ষেত্রে আরো সৃষ্টিশীলতার দরকার ছিল তার।

11103009_856104691118383_8478381165426166222_n
তবে গতি দিয়ে অনেকবার নিজের সঠিক পজিশনে না থাকার ঘাটতি মিটিয়েছেন।
বল ক্লিয়ারেন্স এর ক্ষেত্রে তার দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতা দেখা যায় ম্যান সিটির সাথে ম্যাচে, তুলনামুলক কম বল দখলে রেখেও ম্যাচ জিতে আর্সেনাল। আর কাউন্টার অ্যাটাকের ক্ষেত্রেও বেয়েরিন ছিলেন অনেক বেশি তৎপর। যদিও নিশ্চিত গোল স্কোরিং পজিশনে থাকা জিরু কে একটা আপাত দৃষ্টিতে সহজ বল ক্রস করতে ব্যার্থ হন।

11133878_856104721118380_8862585996534675053_n
তবে যখনই বিপক্ষ দল হাই প্রেসিং এ যায় তখন বেয়েরিনের ক্লিয়ারেন্স এর অ্যাকুরেসি কমতে থাকে। এটাই দেখা যায় নিউ ক্যাসলের সাথে ৪-১ গোলে জয়ের ম্যাচে, একই ম্যাচে একাধিকবার তার ট্রেডমার্ক “Rampaging Run” দেখা গিয়েছে যার একটা থেকে নিজ অর্ধ থেকে বল টেনে বিপক্ষ বক্সের সামনে যেয়ে শট নেবার আগ মুহুর্তে বল হারান, একটা অ্যাসিস্টও করেন। অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ট্যাকল ও করেন তিনি।

10394524_856104757785043_5528674201599219810_n
তবে এরিয়াল ডুয়েল এ জেতার হার ছিল খুবই কম যা থেকে নিউক্যাসলের একমাত্র গোলটি হয়। এই এরিয়াল ডুয়েলের ব্যর্থতা আরো বেশি করে চোখে পড়ে টটেনহ্যাম এর সাথে। কোনো এরিয়াল ডুয়েলেই জিততে পারেন নাই তাছাড়াও পজিশনিং সেন্স এর ঘাটতিও চোখে পড়ে। হ্যারি কেইন এর প্রথম গোলের সময় বেয়েরিন ঠিকমতো মার্ক করতে পারেন নি। আর ড্যানি রোজকে একাধিকবার খালি জায়গা করে ক্রস করার সুযোগ দিয়েছিলেন। ইন্টারসেপশনে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন যদিও তারপরেও ওই ম্যাচে তার পার্ফমেন্স ওভারঅল ভালো বলা যাবে না।

11133776_856104791118373_7316818813466022785_n
মোনাকোর সাথে অ্যাওয়ে ম্যাচে দেখা যায় দলের বিল্ডআপ প্লে তে অনেক বেশি অংশগ্রহন করতে। মোনাকোর ন্যারো ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড কে এড়াতে অনেক বার ফ্ল্যাংক থেকে আক্রমনের চেষ্টা করেছেন কিন্তু ক্রস করার ব্যর্থতা চোখে পড়ে সফলতা না পাওয়ায়।

11138673_856105014451684_5830686336787485104_n

তবে বেয়েরিন নিজের দুর্বলতা এবং ঘাটতি গুলো ক্রমাগত ওভারকাম করতে চেষ্টা করছেন সেটা তাকে এখন খেলতে দেখলেই বোঝা যায়।
রাইটব্যাক হিসেবে রাইট সেন্টারব্যাকের সাথে তার বোঝাপড়ার উন্নতি লক্ষণীয়। ডিফেন্স লাইন মেনটেন করার ক্ষেত্রে সঠিক সময়েই স্পেস ক্লোজ করে আনছেন। আবার অ্যাটাকারদের চার্জ করার ক্ষেত্রেও টাইমিং আগের চাইতে অনেক বেটার হয়েছে। যেখানে ডর্টমুন্ডের সাথে ম্যাচে দেখা গিয়েছিল বারংবার যে বল জেতা সম্ভব না সেটা তাড়া করতে গিয়ে অনেকখানি জায়গা ছেড়ে দিচ্ছেন, এই জায়গাতেও অ্যাকুরেসি বেড়েছে। অ্যাস্টন ভিলার সাথে ম্যাচে কয়েকটি ক্রুশাল ইন্টারসেপশন করেন তিনি। আর আর্সেনালের হয়ে নিজের প্রথম গোলটি করার আগে তার মার্কার স্কট সিনক্লেয়ার কে ফাঁকি দিতে চমৎকার ভাবে তার ডান পাশ থেকে বামে মুভ করেন এবং নিঁখুত ভাবে সাইড ফুটে মাটি ঘেঁষা শটে ফিনিশ করেন।

10660321_856105104451675_2877472123838402160_n
সর্বশেষ লিভারপুলের সাথে ম্যাচেও দারুন খেলেছেন বেয়েরিন। রামজের সাথে চমৎকার বোঝাপড়া দেখা গেছে, তার ক্যারিয়ারের ২য় গোলের অ্যাসিস্ট করেছেন রামজে। লিভারপুলের ডিফেন্ডারদের এর পাশ কাটিয়ে তুলনামুলক দুর্বল বাঁ পায়ের বাঁকানো শটে করেন দৃষ্টিনন্দন একটা গোল। আর্সেনালের হাই প্রেসিং এ তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লিভারপুলের সীমানায় একাধিকবার বল ইন্টারসেপ্ট করেন এবং দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন ট্যাকল করেন। আর্সেনাল এই ম্যাচে প্রথম থেকেই লিভারপুলকে প্রেস করে তাদের বল ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল ক্লোজ করে আনছিল। তার অংশ হিসেবে বেলেরিনও দুর্দান্ত ছিলেন। তবে নিজ বক্সে স্টার্লিং কে ফাউল করে পেনাল্টি কনসিড করেন বেলেরিন যেটা তার ওভারঅল ডিসিপ্লিন এর একটা ঘাটতি বলা যায়।

গোলের পর বেয়েরিন
গোলের পর বেয়েরিন

মোটের ওপর হেক্টর বেয়েরিনের খেলা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় :
★ ড্রিবলিং করতে পছন্দ করেন
★ ছোট পাসের ওপর নির্ভরশীল
★ গেম রিডিং ক্ষমতা ভালো, ইন্টারসেপশন এ দক্ষ
★ ডিফেন্সিভ ওয়ার্করেট খুব ভালো
★ বাতাসে দুর্বল
★ ক্রসিং ভালো না
★ ফাউল কনসিড করেন বেশি

নিজের কিছু দুর্বলতা বেশ দ্রুততার সাথেই কাটিয়ে উঠেছেন বেয়েরিন। তবে এখনো অনেক জায়গায় উন্নতি করবার অবকাশ রয়েছে। যদি ডেভেলপমেন্ট এর এই গতি অব্যাহত থাকে তবে অবশ্যই আমরা একজন বিশ্বমানের আদর্শ রাইটব্যাক দেখবো কয়েক বছরের ভেতরে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

13 + two =