বেল-রূপকথা!

ওয়েলশের বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা এবার হয়ত হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে । এতদিন নাতি-নাতনীদের প্রাচীন রুপকথা, উপকথা শুনিয়ে তারা ক্লান্ত । ওয়েলশের নতুন প্রজন্ম তো বটেই, প্রজন্মের অগ্রজরাও এবার সাক্ষী হচ্ছে এক রুপকথার অংশ হতে । যে রুপকথার কল্পবহর গড়ে উঠছে তাদের চর্ম অক্ষির সামনেই ।
রুপকথা আর তাতে রাজকুমার থাকবেনা, তা কি হয় ? গ্যারেথ ফ্র্যান্ক বেল !
ওয়েলস রুপকথার মহানায়ক ।
পরাক্রমশালী ইংল্যাণ্ডের ছায়া থাকা দেশটি বিশ্বে বেশ অপরিচিত এক নাম ।
তবে রুপকথা যে পরিচিত প্রখ্যাত জনপদেই গড়ে ওঠে তা কিন্তু নয় ।
ওয়েলস পেরেছে !
তাদের রুপকথার গল্প তৈরি হচ্ছে গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ খ্যাত ফুটবলকে ঘিরে ।
যার নেতৃত্বে স্বয়ং তাদের ফিনিক্স পাখি বেল ।
টটেনহ্যামের সেই লেফট উইংব্যাক তখন স্পিড দিয়ে মাঠ কাঁপাচ্ছিলো ।
ঝুঁকিটা তাই নিয়েই নিলেন তার কোচ । রক্ষণ সৈন্য থেকে সরাসরি বনে গেলেন আক্রমণ সেনানী ।
ব্যস ! তখন থেকেই যেন অতি সংগোপনে আরম্ভ হলো ওয়েলস রুপকথার ভূমিকাংশ । ইংল্যাণ্ডের ঘরোয়া ফুটবলে তখন তিনি বর্ষসেরা । জহুরী মাদ্রিদ আর কি ছাড়ে তাকে !
টটেনহ্যামের মালিকের সাথে একরকম চ্যালেঞ্জ জানিয়েই তাকে দলে ভেড়ালো ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ । বেলের মাদ্রিদ অধ্যায়টা শুরু হলো ইতিহাস বদলানো দিয়ে । ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বদলী অর্থের রেকর্ড তখন বেলের বদলীতে ।
নামটা তাই হয়েই গেল ‘হাণ্ড্রেড মিলিয়ন বেবি’ ।

357F7B2600000578-3651219-image-a-25_1466462437773
এক শতকে পাওয়া বেল মাদ্রিদকে দিলেন শত শতকের উপহার । প্রথম মৌসুমেই বেলে বাজিমাত । দলের প্রাণ ভোমরা রোনালদোর অনুপস্থিতিতে কোপা দেল রে’র ফাইনাল জেতালেন মাদ্রিদকে । স্প্যানিশ ঘরোয়া লীগের দ্বিতীয় বড় এই ট্রফি অবশ্য সেবার অন্য মাত্রা পায় । কেননা, প্রতিপক্ষ ছিল চির প্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনা আর বেলের গোলটি ছিল উল্কার ফুটবলীয় সংস্করণ ।
এরপর তো রীতিমত নতুন করে মাদ্রিদ রুপকথা তৈরি হলো । যেখানে ঐ বেলই থাকলো জয় সূচক গোল মালিকের ভূমিকায় । লা দেসিমা জয়টা যখন একদমই শেষ তখনই সার্জিও রামোসের ঐতিহাসিক হেডে গোল । আর অতিরিক্ত সময়ে সেই হেড থেকেই বেলের গোলে মাদ্রিদের এগিয়ে যাওয়া ।
এরপর আরও দুটো ট্রফি ।
তারপরের বছর যেন চিত্র পুরোটা উল্টো । ইনজুরি আর ছন্দপতনে টালমাল গ্যারেথ । চিত্রটা অপরিবর্তিত থাকলো মৌসুমের শেষ অব্দি ।
চারিদিক থেকে তখন শোঁ শোঁ করে ছুটে আসছে সমালোচনার বিষাক্ত বল্লম ।
বিক্ষত হতেই হলো তাকে !
বিক্ষত হলেন, তবে দমলেননা ।
মাদ্রিদের নতুন দুই কোচের অধীনে ফিরলো সেই ১০০ মিলিয়নের বেল ।
তবে এবার ছন্দপতনকে হটানো গেলেও ইনজুরিটা দমন করা গেলোনা । গুনে গুনে পাঁচবার ইনজুরিতে দল থেকে ছিটকে গেলেন বেল ।
কিন্তু তাতেও মৌসুম শেষে ব্যক্তিগত আর দলীয় পরিসংখ্যানে বেল উতরে গেল বেলসূলভে ।
লা দেসিমার পর এবার জিতলেন লা আনদেসিমা ।
সেই রুপকথা গল্পেও তার নাম জড়িয়ে গেল । রামোসের লিড এনে দেওয়া গোলটা তার মাথা ছুঁয়েই পৌছে ছিল ।
এরই মাঝে নিজ দেশের হয়ে রুপকথার জন্ম দিলেন তিনি ।
প্রথমবারের উয়েফা ইউরো কাপে ওয়েলস । কারিগর সেই বেলই ।
১৯৫৮ তে বিশ্বকাপ খেলা দেশটির কাছে যেন ইউরো এক বিমাতা ।
আর বিমাতার কোলে বসেই ব্যক্তিগত ইতিহাসটাও রচিত হলো বেলনামায় ।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে গোল করে টুর্নামেন্টের ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়ার তিনি, যিনি টানা তিন ম্যাচে গোল পেয়েছেন । আগের ম্যাচে শেষ মুহুর্তের কোল তাদের কাঁদিয়েছে বটে । তবে শেষ সমীকরণে ইংলিশ মিডিয়ার সেই দাম্ভিক পুঁচকে ওয়েলসই গ্রুপ সেরা ।
দ্য ড্রাগনস ওয়েলসের রুপকথা বিশ্ব তালিকায় ১২০ থেকে ২৬ ।
আসছে জুলাইয়ে নয়া র‍্যাংকিং ঘোষণায় ২৬ সংখ্যাটা যে বদলে যাবে তা ইউরোর ওয়েলস জানিয়েই রেখেছে ।
সেই সাথে বিশ্বকে বেল জানান দিচ্ছে-
“রুপকথার জনকরা শত সহস্রতেই পরিমাপন হয় ।”

ছোট্ট সেই দেশ ওয়েলস !
সময় বদলেছে । আজ তাদের চোখে অন্য এক স্বপ্ন । যে স্বপ্নে ঘোড় সওয়ারী গ্যারেথ বেল নামক এক মাদ্রিদ সিংহ, এক ওয়েলস ড্রাগন । চলছে, চলুক ।
দিনে-ক্ষণে রচিত হোক ওয়েলস রুপকথা ।
প্রৌঢ়া আর প্রজন্ম একসাথে সাক্ষী হোক গল্প বলা এক ইতিহাসের ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

three − 2 =