বুন্দেস-ট্রেইনার জোয়াকিম লো এর জন্মদিনে…

বুন্দেস-ট্রেইনার জোয়াকিম লো এর জন্মদিনে...
ইউরো ২০০৪, প্রথম রাউন্ড। হল্যান্ড ও নবাগত লাটভিয়ার সাথে ড্র, চেক প্রজাতন্ত্রের সাথে হার। দুই বছর আগে বিশ্বকাপে রানার্স আপ হওয়া দলটি এই নিয়ে পরপর দুইবার ইউরোপ সেরার প্রতিযোগিতার প্রথম ধাপেই বাদ পড়ল। ভঙ্গুর জার্মানি দল নিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌছানোয় নিজ দেশে বীরের মর্যাদা পাওয়া ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপজয়ী রুডি ফলার কে দায়িত্ব থেকে সরে যেতে হল গ্লানি নিয়ে। অনেক জল্পনা-কল্পনার পর, জার্মান দলের দায়িত্ব পেলেন রুডি ফলারের ‘৯০ ও ‘৯৪ বিশ্বকাপের স্ট্রাইকিং পার্টনার ইউর্গেন ক্লিন্সম্যান। ফলার জাতীয় দল থেকে অবসর গ্রহণের পর ক্লিন্সম্যান জাতীয় দলে স্ট্রাইকিং পার্টনার হিসেবে পেয়েছিলেন যাকে, যাকে ‘৯৬ এর ফাইনালে গোলসহায়তা করে ইউরো জিতিয়েছিলেন দলকে, ‘৯৮ বিশ্বকাপেও যার সাথে মিলে যৌথভাবে ৬ গোল করেছিলেন, সেই অলিভার বিয়েরহফ হলেন জাতীয় দলের ম্যানেজার। কিন্তু এরা তো কেউই জাতীয় দল বা বুন্দেসলিগাতে আগে কোচিং করাননি। কোচিংয়ের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাপার সমূহ নিয়ে সাহায্য করার জন্য একজন সহকারী কোচ তাদের প্রয়োজন। প্রশ্ন হচ্ছে, কে থাকবেন সেই পদে?
 
ক্লিন্সম্যানের মাথায় আগে থেকেই এক ব্যক্তির নাম ঠিক ছিল। স্টুটগার্টে এক রেস্তোরাঁতে লাঞ্চ করার সময় অলিভার বিয়েরহফের সাথে দেখা হয় এক পরিচিত কোচের। বিয়েরহফ ফোন মারফত ক্লিন্সম্যানকে এই কোচের নাম সহকারী হিসেবে প্রস্তাব করলে তিনি জানালেন – এই সেই ব্যক্তি, যার নাম তিনি আগে থেকেই ভেবে রেখেছেন। তিনি আর কেউ নন – জোয়াকিম লো।
 
১৯৬০ সালের এই দিনে, পশ্চিম জার্মানি এর শোনাউ-এ জন্মগ্রহণ করেন জোয়াকিম লো। ১৮ বছর বয়সে বুন্দেসলীগা ২ এর দল ফ্রেইবুর্গের হয়ে অভিষেক হয় তার। পরবর্তীতে আরো দুইবার অন্য ক্লাব থেকে ফিরে আসেন এখানে তিনি, ফ্রেইবুর্গের সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ গোল স্কোরিং এর রেকর্ডটাকে করে নেন নিজের। কিন্তু অন্য ক্লাব গুলো (ফ্রাঙ্কফুর্ট, কার্লস্রুহ) তে তেমন সুবিধা করতে পারেননি তিনি।পরবর্তীতে সুইজারল্যান্ডে খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানেন জোয়াকিম লো। জাতীয় দলের হয়ে এই সময়ে তার অর্জন অনূর্ধ্ব ২১ দল এর চারটি ম্যাচ।
 
কোচিং জীবন তার শুরু হয় ১৯৯৪ সাল এর হয় উইন্টারথুর ক্লাব এর হয়ে। এরপর স্টুটগার্ট, কার্সরূহ হয়ে জোয়াকিম লো আসেন অস্ট্রিয়া ভিয়েন ক্লাবে। এর মাঝে হেনেফ স্পোর্টস স্কুল এর কোচিং ট্রেনিং এ তার পরিচয় হয় ক্লিন্সম্যানের সাথে।
 
সহকারী হিসেবে কেন জোয়াকিম লো?
 
ক্লিন্সম্যান কে প্রশ্ন করলে তিনি একটি কথাই বলেছিলেন – “আমার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে কোন কোচ আমাকে ব্যাখ্যা করতে পারেন নি, রক্ষণভাগ এর ফ্ল্যাট ব্যাক ফোর সিস্টেম কীভাবে সংগঠন করা উচিত। জোয়াকিম লো আমাকে তা এক মিনিটে বুঝিয়েছিল।
 
২০০৪-২০০৬, এই দুই বছর, ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যান, জোয়াকিম লো, অলিভার বিয়েরহফ এবং গোল কিপিং কোচ ‘৯৬ এর ইউরোজয়ী আন্দ্রেস কোপকে – মূলত দুইটি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যান এই চতুষ্টয়। ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন বিশ্বকাপে জার্মানিকে তার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করা এবং জার্মানি জাতীয় দলের আগামী ১০ বছরের জন্য একটি ভিত্তি রেখে যাওয়া। বলা বাহুল্য, ১০ বছর পরে তথা ২০১৪ সালে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন কারা ছিল!
 
লক্ষ্য পূরণের পথে তাদের সামনে পড়ে ২০০৫ কনফেডারেশনস কাপ। এবং ২০০৬ এর বিশ্বকাপ। দুইবারই টুর্নামেন্ট বিজয়ী দল (ব্রাজিল ও ইটালি যথাক্রমে) এর কাছে হেরে তৃতীয় হয় জার্মানি। তবে দলের আক্রমণাত্মক খেলার মেজাজ সবাইকে মুগ্ধ করে। এসাইনমেন্ট শেষ করে ক্লিন্সম্যান জাতীয় দলের দায়িত্ব ছেড়ে দিলে জোয়াকিম লো উঠে আসেন মূল দায়িত্বে।
 
২০০৬-২০১৭, ১১ বছর। কেমন ছিল তার পারফরমেন্স? এই সময়ে জার্মানি দুইটি বিশ্বকাপ ও তিনটি ইউরো খেলে। সব মিলিয়ে পাঁচ টুর্নামেন্ট এ তারা তিনবার তৃতীয় হয়, একবার রানার্স আপ ও একবার চ্যাম্পিয়ন। ২০০০,২০০৪ এর ইউরো এর দু:সহ স্মৃতি এখন অতীত।
বুন্দেস-ট্রেইনার জোয়াকিম লো এর জন্মদিনে...
এই দীর্ঘ পথে সাফল্যের সাথে ছিল কিছু সমালোচনা, দুর্ঘটনাও। ২০১০ বিশ্বকাপের আগে প্রথম গোলকিপার রবার্ট এংকের আত্মহত্যা, সুপারস্টার অধিনায়ক মাইকেল বালাকের ইঞ্জুরির কারণে বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ হয়ে যাওয়া – এসব কিছু মাথায় নিয়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় জার্মানি এর ইতিহাস এর সবচেয়ে তরুণ দল নিয়ে যান। আনকোরা এই দল নিয়েও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে প্রশংসা পেয়েছিলেন সবার। ইউরো ২০১২ এর বাছাইপর্বে সুইডেন এর সাথে চার গোল দিয়ে আবার চার গোল হজম করে ড্র করায় সমালোচনা এর তীর ছুটে এসেছিল। অধিনায়ক লাম কে রাইটব্যাক থেকে সরিয়ে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে খেলানোয় নিজ দেশে কথা শুনতে হয়েছিল তাকে।
 
কিন্তু এই লো ই ২০১২ এর বায়ার্ন-ডর্টমুন্ড ভাগে বিভক্ত জার্মান দল কে ২০১৪ সালে একীভূত করে সর্বকালের সেরা প্রস্তুতি নিয়ে বিশ্বকাপ ছিনিয়ে নিয়ে আসেন। দলের প্রয়োজনে লাম কে আবার রাইট ব্যাকে ফিরিয়ে আনতে দুইবার ভাবেননি তিনি। ২০১৬ এর ইউরোর নক আউট পর্বের ম্যাচে আন্তোনিও কন্তের ৩-৫-২ ফর্মেশানের মোকাবেলা করতে ইটালি এর বিরুদ্ধে ৩-৪-২-১ এর অনভ্যস্ত ফর্মেশনে খেলিয়ে ম্যাচ রক্ষা করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ এই সময়ে আত্মবিশ্বাস এবং প্রতি টুর্নামেন্টের আগে নিখুঁত প্রস্তুতি তাকে বসিয়েছে হেলমুট শোন, সেপ হেরবার্গার ও ফ্রাঞ্জ কাইজার বেকেনবাউয়ারের সাথে একই সারিতে।
আজ এই মাস্টার ট্যাকটিশিয়ানের জন্মদিন, যার জন্যই মূলত গড়ে উঠেছে আজকের জার্মান দলের ভিত্তি।
 
শুভ জন্মদিন, জোয়াকিম লো।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

3 × 5 =