বিশ্বজয়ী ফ্রান্স : এবং আরেকটি তারার সংযোজন

বিশ্বজয়ী ফ্রান্স : এবং আরেকটি তারার সংযোজন

রেফারীর শেষ বাঁশির অপেক্ষায় তখন সবাই। ফ্রান্সের বেঞ্চ প্লেয়ারদের কেউ আর তখন বেঞ্চে বসে নেই, মাঠে দৌড় দিতে প্রস্তুত। এবং এরপর সেই বহুল প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। ২০ বছর পর আবার বিশ্বকাপ জিতলো ফ্রান্স। মাঠে স্ট্রাইকার অলিভিয়ের জিরুর এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি, অধিনায়ক ও গোলরক্ষক হুগো লরিসের হাঁটু গেড়ে বসা, কিলিয়ান এমবাপ্পের গিয়ে কোচ দিদিয়ের দেশমকে জড়িয়ে ধরা আর আতোয়াঁ গ্রিজম্যানের আনন্দ অশ্রু, সব কিছুতে ফ্রান্সের জয় একাকার। ক্রোয়েশিয়ার খেলোয়াড়রা তখন হতাশায় ডুবে গেছে, রূপকথা হলো না, তাদের কোনো পরিকল্পনাই কাজ করেনি সেদিন, কোনোভাবেই আটকানো যায়নি ফরাসীদের। মুষলধারে হওয়া বৃষ্টির মধ্যেই কাপ উঁচু করে ধরলেন ক্যাপ্টেন হুগো লরিস, রচিত হল ফ্রান্স ফুটবলের আরেকটি বিস্ময় অধ্যায়।
২০১৮ বিশ্বকাপের শুরুতে ফ্রান্স অন্যতম ফেভারিট দল ছিল, কিন্তু খেলার মাধ্যমে তাঁরা ঠিক মন জয় করতে পারেনি দর্শকদের। এক ঝাঁক তারকা নিয়েও তাদের খেলার মধ্যে ছিল এক রক্ষণশীল ভাব। দেশামের ট্যাক্টিক্সকে তাই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন অনেকেই। টিম নির্বাচন নিয়েও ছিল অনেক সমালোচনা। গোল না পাওয়ার পরও ম্যাচের পর ম্যাচ অলিভিয়ের জিরুকে খেলানো, স্কোয়াডে নামকরা উইঙ্গার থাকার পরও মাতুইদির উইঙ্গে খেলা, এসব প্রশ্নে যখন দেশাম জর্জরিত, তিনি যেনো তখন সেগুলোর উত্তর দিলেন বিশ্বকাপ জিতেই! আর শুধু বিশ্বকাপ জিতেননি তিনি, জিতেছেন রীতিমত প্রতি ম্যাচে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। পুরো আসরে কোনো ম্যাচে আগে গোল হজম করেনি দেশামের দল, পিছিয়ে ছিল শুধু একবার, ৯ মিনিটের জন্য আর্জেন্টিনার বিপক্ষে। কথায় আছে “মাঠে আক্রমণভাগ ম্যাচ জিতালেও টুর্নামেন্ট জিতায় রক্ষণভাগ।” ফ্রান্সের খেলায় সেটা ছিল স্পষ্ট, তাঁরা চাননি ইউরো ২০১৬ এর পুনরাবৃত্তি ঘটুক, তাই প্রথম থেকেই একটু ‘সেইফ’ খেলে যাওয়া। তবে নিজের দলের আক্রমণভাগের উপর দেশামের ছিল অগাধ বিশ্বাস, তিনি জানতেন প্রয়োজনে ঠিকই জ্বলে উঠবে ফ্রান্স, আর ফ্রান্সকে পুরো বিশ্বকাপে জ্বলে উঠতে দেখা গেছে বলতে গেলে দুটি ম্যাচে, ২য় পর্বে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এবং ফাইনালে। একবার তাঁরা ২-১ পিছিয়ে ছিল আরেকবার ১-১ এ সমতায় ছিল। প্রয়োজনের সময় আক্রমণভাগের যা করার তাই করেছে তাঁরা, ফলাফল? ঐ দুই ম্যাচেই ৪টি করে গোল করেছে ফ্রান্স। এছাড়া ফ্রান্সের এবার অন্যতম অ্যাটাকিং ট্যাক্টিক্স ছিল সেট পিস। গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু গোল এসেছে কর্নার ও ফ্রিকিকে হেডার থেকে। ফ্রান্সের অ্যাটাকিং ট্যাক্টিক্স বিশ্লেষণ করলে একটা ধরণই পাওয়া যাবে আর তা হলো, “যতটুক দরকার, ঠিক ততটুকই করা, এর বেশি নয়।” ফ্যানদের মন জয় করার থেকে ম্যাচ জয় করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাদের কাছে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৪-২ এ এগিয়ে থাকার পর এক পর্যায়ে লেফটব্যাক লুকাস হার্নান্দেজ যখন উপরে উঠছিলেন, গ্রিজম্যান তখন তাঁকে ইশারা দিচ্ছিলেন উপরে না ওঠার, কারণ আর তাদের গোলের দরকার নেই সেই ম্যাচে। প্লেয়ারদের বডি ল্যাংগুয়েজ এবং দেশামের খেলার মাঝে ইন্সট্রাকশনে বার বার এটাই প্রমাণিত হচ্ছিলো এবং এটাই অনেকের পছন্দ হয়নি। এবং এ ব্যাপারে যে শুধু ফ্যানরা অখুশি ছিলেন তা নয়, ম্যাচ হারার পর মুখ খুলেছেন বেলজিয়ামের গোলকিপার থিবো কর্তোয়া এবং ক্রোয়েশিয়ার ডিফেন্ডার দেয়ান লভ্রেনের মতো প্লেয়াররা। ফ্রান্স নাকি মাঠে ফুটবল খেলেনি, যা খেলেছে তা এন্টি-ফুটবল! এসব তর্কবিতর্ক অনেকদূর গড়ায় বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়, কিছু ফ্রেঞ্চ প্লেয়ার এর বিপক্ষে কথা বললেও বরাবরের মতো চুপ চিলেন দেশাম। তিনি ঠিক যেভাবে উত্তর দিতে চেয়েছিলেন সেভাবেই দিয়েছেন। হয়তো এমন সমালোচনা আরো গড়াতো যদি ফ্রান্স বিশ্বকাপ জিততে ব্যর্থ হতো, কিন্তু তা তো আর হয়নি। বিশ্ব জুড়ে ফ্রান্সকে নিয়ে এখন শুধুই প্রশংসা। এবং তা হবেই বা না কেনো? তাঁরা যে বিশ্বজয়ী দল, একটি তারার পাশে আরেকটি তারার সংযোজন হয়েছে তাদের লোগোতে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

5 + 13 =