বিশ্বকাপ মাসকটসমূহ: কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার অপূর্ব নিদর্শন

মাসকট! বলতেই সবার সামনে ভেসে উঠে প্রাণোচ্ছল, উদ্দীপ্ত প্রাণী যা পুরো অনুষ্ঠান বা প্রতিযোগিতাজুড়েই মাতিয়ে রাখবে পুরো বিশ্ববাসীকে, স্বাগতিক দেশের প্রতিবিম্বকে তুলে ধরবে নিজের শাশ্বত ও স্বতন্ত্র পন্থায়। যে কোন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অন্যতম সেরা আকর্ষণ এই মাসকট। মাসকট হতে পারে কোন প্রাণী বা কোন ব্যাক্তি বা এমন কিছু যা স্বাগতিকদের জন্য সৌভাগ্যদায়ক। এটি হতে পারে কোন কাল্পনিক চরিত্র বা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য যা সকলের দৃষ্টি কেড়ে নেবে। অনেক না বলা প্রতিবাদ বা আখ্যাপন তুলে ধরবে মাসকট। রঙ বেরঙের অনেক পরিচ্ছদ ও যে কোন তাৎপর্যপূর্ণ নাম মাসকটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রায় সবধরনের প্রতিযোগিতায় মাসকটের উপস্থিতি দেখা যায়। ফুটবলেও মাসকটের সরব উপস্থিতি প্রতি বিশ্বকাপেই দেখা যায়। কিন্তু ১৯৬৬ সালের আগ পর্যন্ত কোন মাসকট ব্যবহার করা হয়নি। ১৯৬৬ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ দিয়েই ফুটবলে মাসকটের প্রচলন শুরু হয়। এরপর থেকে দর্শক ও ভক্ত-সমর্থকদের আনন্দ দিয়ে আসছে মাসকট।

 

ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ- ১৯৬৬

মাসকট: উইলি

বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রথমবারের মত মাসকট ব্যবহার করা হয় ১৯৬৬ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে। সহজ ভাষায় বললে একটি সিংহ ফুটবল খেলছে। ‘উইলি’ নামক একটি কার্টুন সিংহ যেটির শরীরে গ্রেট ব্রিটেনের (যদিও বিশ্বকাপ ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হয়) লাল, নীল ও সাদা পতাকা জড়ানো যা একটি ফুটবলে কিক করছে। গায়ে জড়ানো পতাকায় ‘world cup’ লেখা।

আমরা সবাই জানি ইংল্যান্ড জাতীয় দলকে ‘থ্রি লায়ন্স’ ডাকা হয়। উইলি সেই সিংহের একটি যেটি নিজ মাঠে স্বাগতিকতার সুবিধা নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। ওয়েম্বলির ফাইনালেও অবশ্য ৪-২ গোলে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ইংল্যান্ড।

রেগ হোয়ে উইলি’র নকশা প্রণয়ন করেন। যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয় কোন দিকটির বা কোন ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে তিনি উইলি’কে আঁকার পরিকল্পনা করলেন? তিনি সোজাসাপ্টা উত্তর দেন নিজ সন্তান লিও এর প্রতি নজর রেখেই তিনি উইলি’র নকশা প্রণয়ন করেন!

প্রথম মাসকটটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। যে কারণে আর ফিরে তাকাতে হয়নি ফিফাকে। পরবর্তী সব বিশ্বকাপেই মাসকট অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে।

picture-6

 

মেক্সিকো বিশ্বকাপ-১৯৭০

মাসকট: হুয়ানিতো

ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের সংস্কৃতি বা মাসকট প্রচলন চালু রাখে মেক্সিকানরাও; তবে কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকে। তবে এবার আর কোন সিংহ নয়; বরং একটি নিষ্পাপ ছোট ছেলে যে ফুটবলীয় ভঙ্গিমা ও মেক্সিকান জার্সির আদলে একটি ফুটবলের উপর দাড়িয়ে আছে। মাথায় সমভ্রেরো (এক ধরণের উঁচু কানওয়ালা টুপি) পড়া যেখানে ‘MEXICO 70’ লেখা।

স্প্যানিশ ভাষায় ‘হুয়ান’ একটি খুবই পরিচিত নাম। তাই মাসকটের নামও রাখা হয় ‘হুয়ানিতো’। এই বিশ্বকাপই প্রথম রঙিন টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়।

juanito-maravilla-fifa-world-cup-1970-mascot

জার্মানি বিশ্বকাপ-১৯৭৪

মাসকট: টিপ অ্যান্ড টাপ

হাস্যজ্বল দুইটি ছেলে টিপ ও ট্যাপ যাদের জার্সি তাদের শরীরের সাথে পুরোপুরি ফিট করেনি। হুয়ানিতোর মতই তাদের হাবভাব। কিন্তু এবার তাদের গাঁয়ে মেক্সিকোর জার্সি নয়। স্বাগতিক দেশ পশ্চিম জার্মানির জার্সির আদলেই সাদা শার্ট ও কালো শর্টস পড়ে আছে টিপ-ট্যাপ। একজনের জার্সিতে লেখা ‘wm’ ও আরেকজনের ‘74’। এই দুইটি শব্দই যেন পুরো জার্মানিকে সবার সামনে আরো উজ্জলতরভাবে প্রদর্শিত করছে।

‘wm’ অক্ষর দুইটিকে দিয়ে বুঝায় ‘weltmeisterchaft’ জার্মান ভাষায় এই শব্দের বাংলা অর্থ হচ্ছে বিশ্বকাপ।  অসাধারণ সুন্দর এই মাসকট ধারণার জনক ইতালিয়ান ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগা।

alemania

আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ-১৯৭৮

মাসকট: গাউচিতো

হাস্যজ্বল প্রাণবন্ত ছোট ছেলেকে মাসকট হিসেবে নির্বাচন করার ধারা থেকে আর্জেন্টিনাও বাদ যায়নি। ‘গাউচিতো’ নামের ছোট ছেলে আর্জেন্টিনার জার্সি গাঁয়ে জড়িয়ে ফুটবলে কিক করছে- আর্জেন্টাইনরা এই ধারণার মাধ্যমে নিজেকে তুলে ধরে বিশ্ববাসীর সামনে।

তবে এই মাসকটের সাথে গত বিশ্বকাপ মাসকটগুলোর মাঝে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। আর্জেন্টাইন ঐতিহ্যের বহিপ্রকাশ ঘটেছে গাউচিতোর মাধ্যমে। আর্জেন্টিনার কাউবয়দের আর্জেন্টিনায় ‘গাউচো’ নামে ডাকা হয়। আর আর্জেন্টিনার জাতিয়তাবাদের প্রতীক গাউচো’রা। তাই গাউচো থেকেই ‘গাউচিতো’ নামটি এসেছে। গাউচিতো গাউচো’দের মতই মাথায় হ্যাট ও গলায় মাফলার ঝুলিয়ে রেখেছে। প্রাণোচ্ছল ছোট্ট গাউচিতো আর্জেন্টাইন জাতীয়তাবাদের প্রকাশ দেখিয়ে গেছে পুরো বিশ্বকাপজুড়েই। নিজ মাটিতে ১৯৭৮ বিশ্বকাপ জিতেছিল আর্জেন্টিনাই।

argentina-gauhito-mundialito-world-cup-1978-mascot

১৯৮২ স্পেন বিশ্বকাপ মাসকট

মাসকট: নারানিতো

স্প্যানিশরা তথাকথিত ছোট্ট ছেলে ধারণা থেকে বেরিয়ে আসে সম্পূর্ণ নতুন ধরণের মাসকটের প্রদর্শন করে- ‘উচ্ছ্বসিত ছেলে কমলা’ যে স্পেন জাতীয় দলের জার্সি পরে ফুটবল হাতে নিয়ে দাড়িয়ে আছে। অদ্ভুত অনন্য এই ধারণার উৎপত্তি হয় দুই মার্কেটিং বিজ্ঞাপনদাতা মারিয়া দোলোরেস ও হোসে মারিয়া মার্তিন পাচেকোর মাথা থেকে; বিশেষ করে মার্তিন পাচেকোর। প্লাজা নিউ সেভিয়ার পথ ধরে যাওয়ার সময় অনেকগুলো কমলা গাছ দেখে এই মাসকট প্রবর্তনের কথা ভাবেন তিনি।

যদিও কমলা স্প্যানিশ মাসকট হিসেবে স্বীকৃতি পায় কিন্তু স্পেনিয়ার্ডরা একে প্রথমদিকে সহজভাবে নেয়নি। ঐতিহ্যবাহী ষাঁড়কেই মাসকট হিসেবে দেখতে চেয়েছিল স্পেন।নারানিতোর সমালোচনা করেন স্পেনিয়ার্ডরাই। কিন্তু ধীরে ধীরে স্প্যানিশদের হৃদয়ে স্থান করে নেয় নারানিতো। মাঠে সরব উপস্থিতি সকলকে অভিভূত করে সকলকেই। পরবর্তীতে নারানিতোকে নিয়ে ফুটবল কার্টুন তৈরি করা হয়। এতেই বুঝা যায় কতটা জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো নারানিতো।

spain-naranjito-fifa-world-cup-1982-mascot

মেক্সিকো বিশ্বকাপ-১৯৮৬

মাসকট: পিকে

আরো অভিনব মাসকট প্রদর্শন করে মেক্সিকো। হুয়ানিতোর পর এইবার তারা নিয়ে আসে পিকে। স্পেনিয়ার্ডদের ‘নারানিতো’ কমলার পরিবর্তে মেক্সিকানরা তাদের ঐতিহ্য হিসেবে মেক্সিকান সবুজ ঝাল মরিচকে তুলে ধরে; যার মাথায় হলুদ রঙের বিশাল সমভ্রেরো এবং মুখে হাস্যকর বিশাল মোচ। হাতে ফুটবল, গাঁয়ে লাল জার্সি জড়ানো ও পায়ে অত্যাধিক বড় বুট। ‘পিকান্তে’ একধরণের স্প্যানিশ মসলা ও সস থেকেই মাসকটটির নামকরণ করা হয় ‘পিকে’।

পিকে’র নকশা করেন মেক্সিকো সিটি অ্যাডভারটাইসিং ও ডিজাইনিং কোম্পানি। ‘নারানিতো’র মত ১৯৮৬ বিশ্বকাপ মাসকটও অনেক সমালোচনার সম্মুখীন হয়। সরকারি তরফ থেকেও পিকের সমালোচনা করা হয়। কিন্তু নারানিতো আস্তে আস্তে সবার সাথে মিশে যেতে পেরেছিল, পিকে সেভাবে পারেনি। মুলত কিছুটা পুরাতন ধারণার মাসকট হিসেবে মেক্সিকানরা পিকে’কে সাদরে গ্রহণ করতে পারেনি।

 ccba7c5e60836d7d6dfcfdc8359d30b8

ইতালি বিশ্বকাপ-১৯৯০

মাসকট: চাও

অদ্ভুত, কোন মানুষ নয় এমনকি কোন প্রাণী বা ফলও নয়। অদ্ভুত এক ধরণের মাসকট সবার সামনে নিয়ে আসে ইতালি। ইতালির কোন ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি ‘চাও’ মাসকট দিয়ে উঠে আসেনি; বরং উঠিয়ে আনার চেষ্টাও করা হয়নি। শুধু ইতালির পতাকার তিন রঙ (লাল, সাদা ও সবুজ) ও মাসকটের নামটিই ইতালিয়ানদের সাথে সামঞ্জস্য; আর কিছুই নয়।

‘চাও’ এখনো পর্যন্ত একমাত্র মাসকট যার কোন চোখ নেই। শুধু শক্ত স্টিক কাঠামো দিয়ে তৈরি এই মাসকটের মাথায় একটি ফুটবল। দেখলে মনে হয় এই মাত্রই ভেঙে পড়বে ‘চাও’। কিন্তু ‘চাও’ এর মাঝে অনন্য বৈশিষ্ট্য আছে যা আর কোন মাসকটে দেখা যায় নি। খুব নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ‘চাও’ মাসকটের মাঝে ইংরেজিতে ইতালি (italy) ফুটে উঠছে। ইতালিয়ান ভাষায় ‘চাও’ বলতে অভিবাদনকে বুঝায় যেমন ‘হ্যালো’।

ciao

ইউএসএ বিশ্বকাপ-১৯৯৪

মাসকট: স্ট্রাইকার দি ওয়ার্ল্ড কাপ পাপ

আমেরিকানরা মাসকট হিসেবে বেছে নেয় তাদের সবচেয়ে প্রিয় পোষা প্রাণী কুকুরকে। যার নাম দেয়া হয় ‘স্ট্রাইকার দি ওয়ার্ল্ড কাপ পাপ’। ‘স্ট্রাইকার’ নামের এই কুকুরটির গাঁয়ে সাদা-লাল, নীল জার্সি জড়ানো যা আমেরিকার জার্সিকেই ইঙ্গিত করে। স্ট্রাইকারের জার্সিতে ‘ইউএসএ ৯৪’ লেখা এবং পায়ে ফুটবল নিয়ে রেখেছে।

স্ট্রাইকারের নকশা প্রণয়ন করেছে বিখ্যাত আমেরিকান মুভি ও এন্টারটেইনমেন্ট প্রডিউসার ওয়ার্নার ব্রস স্টুডিওস। উদ্দেশ্য একটিই- আমেরিকানদের ফুটবলের প্রতি অনেক বেশি আকৃষ্ট করা। আমেরিকায় ফুটবল সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা নয়। তাই মার্কিনীদের মাঝে তাদের সেরা পোষা প্রাণীকে দিয়ে ফুটবলের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা অনেকাংশেই সফল হয়েছে।

striker-the-pup-fifa-football-world-cup-1994-mascot

ফ্রান্স বিশ্বকাপ-১৯৯৮

মাসকট: ফুটিক্স

মাসকট হিসেবে প্রাণীকে নির্বাচনে নেওয়ার প্রবণতা আবারো প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। স্ট্রাইকারের পর এবার ‘ফুটিক্স’। ফ্রান্সের জাতীয়তার প্রতীক গৃহপালিত মোরগকেই ১৯৯৮ বিশ্বকাপের মাসকট নির্বাচন করা হয়। পুরো ফ্রান্সজুড়েই ব্যাপক খ্যাতি পাওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব ফুটবল জগতেও ‘ফুটিক্স’এর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী আঁকার ধারণ করেছিল। ‘ফুটিক্স’ নামকরণ করার পিছনে ছোট একটি ইতিহাস আছে। ফুটবলের ‘ফুট’ আর ফ্রান্সের জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্র ‘আস্তেরিক্স দি গল’ এর ‘এক্স’ নিয়ে মাসকটের নাম দেয়া হয় ফুটিক্স। ফ্রান্সের জনগণই এই নামটি বেছে নেয়। ১৯,০০০ ভোটের বিনিময়েই ‘ফুটিক্স’ নামটি বেছে নেয়া হয়। ‘উইলি’এর গাঁয়ে যেমনভাবে ইংল্যান্ডের জাতীয় পতাকা অঙ্কিত পোশাক ছিল ঠিক তেমনিভাবেই ফ্রান্সের জাতীয় পতাকা ফুটে উঠে ‘ফুটিক্স’এর গায়েও।

ফুটিক্স এখনো অনেক জনপ্রিয়। তাঁর মনভোলানো হাসি আজও সমর্থকদের ফ্রান্স বিশ্বকাপের কথা মনে করিয়ে দেয়। বিশ্বকাপের অফিসিয়াল পার্টনার হিসেবে ফুটিক্সের ব্যাপকতর ব্যবহার ‘ফুটিক্স’কে সেলেব্রেটি বানিয়ে দেয়।

france98mascot

কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপ-২০০২

মাসকট: দি স্ফেরিক্স (অটো, কাজ ও নিক)

অভিনব ধারণা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার বদৌলতে আরো বড় বিস্ময় উপহার দিল জাপানি আর দক্ষিণ কোরিয়ানরা। প্রথমবারের মত যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করে জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়া। প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ আসর বসে আমাদের এশিয়াতেই। সহসাই সবাইকে অবাক করে দেয় তাদের মাসকট; দি স্ফেরিক্স অটো, কাজ ও নিক।

প্রাণীকে মাসকট হিসেবে নেয়ার প্রবণতা জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়াও গ্রহণ করে কিন্তু মাসকটত্রয়ী সম্পূর্ণই কাল্পনিক। অটো, কাজ ও নিক অন্য গ্রহ থেকে এসেছে যেখানে তারা নিজেদের ভার্সনের ফুটবল খেলত যার নাম অ্যাটমোবল আর তারা যে গ্রহ থেকে এসেছে তাঁর নাম হচ্ছে অ্যাটমোজোন। এই তিনজনের মাঝে অটো (হলুদ রঙের) হচ্ছে অ্যাটমোবল তথা ফুটবলের কোচ আর কাজ (বেগুনি রঙের) ও নিক (নীল রঙের) অটোর দলের মুল সদস্য।

অটো, কাজ ও নিককে সামগ্রিকভাবে বলা হয় ‘দি স্ফেরিক্স’। ২৬ এপ্রিল, ২০০১ সালে বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক ৪০০ দিন আগে বিশ্ববাসীর সামনে প্রদর্শিত হয় ২০০২ বিশ্বকাপ মাসকট।

japan-1973432

জার্মানি বিশ্বকাপ-২০০৬

মাসকট: গোলিও এন্ড পিল্লে

মাসকট হিসেবে আবারো প্রত্যাবর্তন ঘটে সিংহের। ২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপের মাসকট হিসেবে নির্বাচিত হয় ‘গোলিও’ নামের সিংহের। যার পাশেই অবস্থান করছে তাঁর সবসময়ের সঙ্গী বাচনশিল ফুটবল ‘পিল্লে’। গোলিও (Goleo) নামটি কিন্তু দুইটি শব্দের একত্রিতকরনের ফল- ‘গোল’ (goal) ও ‘লিও’(leo)। ল্যাতিন ভাষায় লিও শব্দের অর্থ হল সিংহ। গোলিও জার্সির সামনে ‘০৬’ (২০০৬ বিশ্বকাপ) আর পিছনে গোলিওএর নিজের নাম লেখা। মজার ব্যাপার হল গোলিও সাদা রঙের টিশার্ট তথা জার্মান জার্সি নির্দেশ করলেও সে কোন প্যান্ট বা ট্রাউজার পড়ে নেই!

বিশ্বকাপ শুরুর দেড় বছর আগে ২০০৪ সালের নভেম্বরে ‘গোলিও ও পিল্লে’কে মাসকট হিসেবে প্রকাশ করা হয়। দুই কিংবদন্তি ফুটবলার ফ্রাঙ্ক বেকেনবাওয়ার ও পেলে এক সাথে এই মাসকটের উদ্বোধন করেন। কিন্তু শুরু থেকেই মাসকট অনেক সমালোচনার শিকার হয়। কেননা সিংহ কখনোই জার্মান কৃষ্টি বা সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে না, বরং জার্মান সংস্কৃতির সাথে মানানসই হল ঈগল পাখি (জার্মান কোট অফ আর্মের প্রতীক) বা কাঠবিড়ালি (জার্মান সংযমতা)। ইংল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের কৃষ্টির সাথে সিংহ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই সমালোচনার সম্মুখীন হওয়া তথৈবচ কিছু ছিল না। তাছাড়া কোন প্যান্ট বা ট্রাউজার না পড়ে থাকায় সমালোচনা আরো তীব্রতর হয়ে উঠে।

goleo-pille

দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ-২০১০

মাসকট: জাকুমি

দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে বিচরণশীল প্রাণীগুলোর একটি চিতাবাঘ। এই চিতাবাঘকে কেন্দ্র করেই নিজেদের স্বপ্ন ও কৃষ্টি সারা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে দক্ষিণ আফ্রিকা। এই চিতাবাঘের নাম ‘জাকুমি’, স্বাগতিক দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার জার্সির আদলেই জাকুমিকে হলুদ (সোনালি) ও সবুজ রঙে রাঙানো হয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকানরা এমন কিছু দিয়ে নিজেদের মাসকট সাজাতে চেয়েছিল যা নিজেদের পাশাপাশি পুরো আফ্রিকাকে প্রতিনিধিত্ব করবে। বস্তুত এই দিক থেকে তারা খুবই সফল। ‘জাকুমি’ এর ‘জা’(za) দক্ষিণ আফ্রিকার আন্তর্জাতিক কোড নাম্বার আর আফ্রিকান অনেক ভাষায় ‘কুমি’ (kumi) অর্থ হল দশ। জাকুমি নামের সার্থকতা এখানেই। আর ১৯৯৪ সালের ১৬ জুন জাকুমির জন্ম। এই তারিখের সম্মিলিত তাৎপর্যতা দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্যাপক। ১৯৯৪ সালে প্রথমবারের মত দক্ষিণ আফ্রিকায় গনতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যে নির্বাচনে সাদা-কালো নির্বিশেষে সকল বর্ণের মানুষ ভোট দিতে আসে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই প্রথমবারের মত দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নেলসন ম্যান্ডেলা। আর ১৬ জুন? দক্ষিণ আফ্রিকার যুব ও তারুণ্য দিবস। ২০১০ সালের ১৬ জুন ‘জাকুমি’র বয়স দাঁড়ায় ১৬তে যা তপ্ত তারুণ্যের পরিচায়ক।

ফিফার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে জাকুমির প্রশংসা করে বলা হয়, “নিঃসন্দেহে ফুটবল রঙ্গমঞ্চে ‘জাকুমি’ প্রথম ও সর্বশেষ সবচেয়ে বড় উৎসব, আত্মবিশ্বাস, গর্ব, আতিথেয়তা, সামাজিক দক্ষতা ও উদারতা দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি পুরো আফ্রিকা মহাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে সে।”

mascota-mundial-2010-sakumi7_1

ব্রাজিল বিশ্বকাপ-২০১৪

মাসকট: ফুলেকো দি আরমাদিল্লো

২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের মাসকট হিসেবে বেছে নেয়া হয় ব্রাজিলিয়ান থ্রি ব্র্যান্ডেড আরমাদিল্লো প্রজাতির প্রাণীকে যার নাম ফুলেকো। ২৫ নভেম্বর ২০১২ সালে ফুলেকোকে জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়।

‘ব্রাজিলিয়ান থ্রি ব্র্যান্ডেড আরমাদিল্লো’ হচ্ছে আরমাদিল্লো প্রজাতির আরেকটি প্রজাতি। থ্রি ব্র্যান্ডেড ছাড়াও আরো এক ধরণের প্রজাতি ব্রাজিলে পাওয়া যায়। এই দুই প্রজাতির প্রানিগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তারা ইচ্ছা করলেই মাটিতে ফুটবলের মত গড়িয়ে যেতে পারে।

article-2204405-150db5d3000005dc-270_634x626

ফুলেকো নামকরন করা হয়েছে দুইটি শব্দের সম্মীলনে। ‘futbole’( পর্তুগিজ ভাষায়) আর ‘ecologia’ (ecology) এই দুই শব্দের এক মিলকরণ ফুলেকো। ফুলেকোকে বেছে নেয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশ্ববাসীকে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করা। ৯০% ব্রাজিলিয়ান মনে করে ২০১৪ বিশ্বকাপ পরিবেশগতবভাবে বন্ধুত্বসুলভ হওয়া উচিত। কারণ আরমাদিল্লো দিন দিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এক পরিসংখ্যান মতে জানা গেছে, গত ১০ বছরে মোট ৩০% ব্রাজিলিয়ান থ্রি ব্র্যান্ডেড আরমাদিল্লো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ছয়টি ব্রাজিলিয়ান এজেন্সির ৪৭টি প্রস্তাবনা থেকে ফুলেকোকে বেছে নেয়া হয়। 602700-mascotte

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

20 − fifteen =