বিশ্বকাপ ফুটবলের সেরা একাদশ : গোল্লাছুটের চোখে

বিশ্বকাপ ফুটবলের সেরা একাদশ : গোল্লাছুটের চোখে

শেষ হয়ে গেল বিশ্বকাপ। সুদীর্ঘ এক মাস ধরে হওয়া ৩২টা দলের ফুটবলীয় যুদ্ধের শেষ হাসিটা হাসলো ফরাসিরাই। ২০ বছর পরে দ্বিতীয় শিরোপা জিতেছে তারা। ওদিকে মারিও জাগালো ও ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের পর তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে খেলোয়াড় ও কোচ উভয় ভূমিকাতেই জোড়া বিশ্বকাপ জিতলেন ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম। কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের সর্বশেষ এই মহযজ্ঞে এক মাস ধরে ফুটবলশৈলী প্রদর্শন করেছেন ৩২ দলের অনেক খেলোয়াড়। তাঁদের মধ্য থেকেই এই বিশ্বকাপের সেরা একাদশ নির্বাচন করার চেষ্টা করেছে গোল্লাছুট। দেখে নিন কে কে আছেন এই স্কোয়াডে!

৪-২-৩-১ ছকে সাজানো হয়েছে দলটিকে, দেখে নিন কে কে আছেন!

গোলরক্ষক – ড্যানিয়েল সুবাসিচ (ক্রোয়েশিয়া)

এই জায়গায় চাইলে আরও বেশ কিছু গোলরক্ষক আসতে পারতেন। ফ্রান্সের গোলরক্ষক হুগো লিওরিস, ডেনমার্কের ক্যাসপার শ্মাইকেল, বেলজিয়ামের থিবো কর্তোয়া, রাশিয়ার ইগোর আকিনফিভ, ইংল্যান্ডের জর্ডান পিকফোর্ড। কর্তোয়া তো বিশ্বকাপের সেরা গোলরক্ষকের পুরষ্কারই পেয়েছেন। তবে গোল্লাছুটের দৃষ্টিতে এই বিশ্বকাপের সেরা গোলরক্ষক ড্যানিয়েল সুবাসিচ। এবং সেটা সম্পূর্ণ ফুটবলীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই। ক্রোয়েশিয়ার নকআউট রাউন্ডের প্রথম দুটো ম্যাচই গড়িয়েছিল পেনাল্টি পর্যন্ত। ডেনমার্ক ও রাশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচদুটো। পেনাল্টিতে গড়ানো মানে ঐ গোলরক্ষক ড্যানিয়েল সুবাসিচের পারফরম্যান্সের উপরেই তখন ঝুলছিল ক্রোয়েশিয়ার ভাগ্য। সুবাসিচ তাঁর দেশের প্রত্যাশা ফেলতে পারেননি, দুর্দান্ত পারফর্ম করে একাই ক্রোয়েশিয়াকে নিয়ে এসেছেন বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। প্রথম ম্যাচে ক্রিস্টিয়ান এরিকসেন, ল্যাসে শোয়েনে আর নিকোলাই জর্গেনসেনের পেনাল্টি রুখে দিয়ে দলকে নিয়ে গেছেন কোয়ার্টার ফাইনালে, আর কোয়ার্টারে ফেদর স্মোলভের পেনাল্টি আটকে দিয়ে ক্রোয়েশিয়াকে তুলে এনেছেন সেমিফাইনালের মঞ্চে। দলকে ইতিহাসের প্রথম ফাইনালে তোলার পেছনে যে গোলরক্ষকের এত অবদান, তাকে কিভাবে উপেক্ষা করতে পারেন আপনি?

বিশ্বকাপ ফুটবলের সেরা একাদশ : গোল্লাছুটের চোখে
ড্যানিয়েল সুবাসিচ

একটুর জন্য জায়গা পাননি – থিবো কর্তোয়া (বেলজিয়াম), হুগো লিওরিস (ফ্রান্স), ক্যাসপার শ্মাইকেল (ডেনমার্ক), জর্ডান পিকফোর্ড (ইংল্যান্ড)

রাইটব্যাক – কিয়েরান ট্রিপিয়ের (ইংল্যান্ড)

ভাগ্যক্রমে কিয়েরান ট্রিপিয়েরের মধ্যে একজন সেটপিস বিশেষজ্ঞ পেয়েছিল দেখে ইংল্যান্ড এবার বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল পর্যন্ত উঠতে পেরেছে। কর্নার, ক্রস, ফ্রি-কিকে বর্তমানে কিয়েরান ট্রিপিয়েরের মত ভালো ও কার্যকরী খেলোয়াড় খুব কমই আছে। ফলে যেটা হয়েছে, সাউথগেট এই ট্রিপিয়েরের সেটপিস দক্ষতার উপরেই চূড়ান্তমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন এই বিশ্বকাপে। হিসাব করে দেখুন, এবার হ্যারি কেইনের পেনাল্টিগুলো বাদ দিলে ইংল্যান্ডের অধিকাংশ গোলই কোন না কোন ভাবে ট্রিপিয়ের-নির্ভর। প্রথম ম্যাচে হ্যারি কেইনের দুই গোলে দুটো চোখজুড়ানো কর্নার আর ক্রসটাও তারই করা, দ্বিতীয় ম্যাচে জন স্টোনসের দুই গোলের প্রথমটার বলও এসেছে তাঁর কর্নার থেকেই, স্টোনসের দ্বিতীয় গোলের আগেও ফ্রিকিকটা ট্রিপিয়েরেরই নেওয়া। এমনকি ঐ ম্যাচের প্রথম পেনাল্টিতে হেসে লিনগার্ড যে ডি-বক্সে পড়ে গেলেন, লিনগার্ডকে আক্রমণমুখী ও ক্রসটাও ট্রিপিয়েরই দিয়েছিলেন! আর সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে তো দুর্দান্ত ফ্রি-কিকে নিজেই গোল করলেন একটা। একটা রাইটব্যাক/রাইট উইংব্যাক, যার উপরে তাঁর দল এই মাত্রায় নির্ভরশীল, সেরা একাদশের রাইটব্যাক পজিশনে তাঁর স্থান পাওয়াটাই তো সমীচীন!

বিশ্বকাপ ফুটবলের সেরা একাদশ : গোল্লাছুটের চোখে
কিয়েরান ট্রিপিয়ের

একটুর জন্য জায়গা পাননি – বেঞ্জামিন পাভার্ড (ফ্রান্স), সিমে ভরসালিকো (ক্রোয়েশিয়া), মারিও ফার্নান্দেজ (রাশিয়া), থমাস মিউনিয়ের (বেলজিয়াম)

লেফটব্যাক – লুকাস হার্নান্দেজ (ফ্রান্স)

অবিসংবাদিতভাবেই এই বিশ্বকাপের সেরা লেফটব্যাক অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে খেলা এই তরুণ। সেন্টারব্যাক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা হার্নান্দেজ বেশ কিছুদিন ধরেই লেফটব্যাক হিসেবে খেলছেন। ম্যানচেস্টার সিটির লেফটব্যাক বেঞ্জামিন মেন্ডির ইনজুরির কারণে তাঁর কপাল খুলে যায় এবার। আর সেই সুযোগটাকে কি দু’হাত ভরেই না নিয়েছেন তিনি! ফ্রান্সের ডিফেন্সের বামদিকে এক আস্থার নাম ছিলেন এই লুকাস হার্নান্দেজ। পরিণত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন নিজের মূল্য। কখন আক্রমণে সাহায্য করতে হবে, কখন নিচে নেমে রক্ষণ করতে হবে, সব দিক দিয়েই লুকাস ছিলেন অনন্য।

বিশ্বকাপ ফুটবলের সেরা একাদশ : গোল্লাছুটের চোখে
লুকাস হার্নান্দেজ

একটুর জন্য জায়গা পাননি – ডিয়েগো ল্যাশাল্ট (উরুগুয়ে), ইভান স্ত্রিনিচ (ক্রোয়েশিয়া)

সেন্টারব্যাক – রাফায়েল ভ্যারেন (ফ্রান্স) ও ডিয়েগো গোডিন (উরুগুয়ে)

ফ্রান্স ডিফেন্সের নেতা হিসেবে রাফায়েল ভ্যারেন এই বিশ্বকাপ এই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। গ্রুপপর্বে ফ্রান্সের ডিফেন্স গোল খেয়েছে মাত্র একটি, তাও আবার পেনাল্টি থেকে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফ্রান্সের ডিফেন্স একটু নড়বড়ে থাকলেও পরে উরুগুয়ে আর বেলজিয়ামের বিপক্ষে একটা গোলও না খেয়ে তারা দেখিয়ে দিয়েছে তাদের ডিফেন্স কতটা অটুট, আর এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাফায়েল ভ্যারেনের। উরুগুয়ের বিপক্ষে তাঁর সার্জিও রামোস-সুলভ হেড করে করা গোলটার কথাই বা ভুলবেন কি করে? ভালো খেলেছেন উমতিতিও। কিন্তু পুরো ডিফেন্সকে ভ্যারেনই সংগঠিত করেছেন প্রতি মূহুর্তে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের সেরা একাদশ : গোল্লাছুটের চোখে
রাফায়েল ভ্যারেন

সেন্টারব্যাক হিসেবে ভ্যারানের সঙ্গী হতে পারেন ডিয়েগো গোডিন। বিশ্বকাপ এ উরুগুয়ে যতক্ষণ ছিল, প্রতি মূহুর্তেই প্রমাণ করেছেন কেন রামোস বা পিকে বা হামেলস নয়, বরং বর্তমান সময়ের সেরা সেন্টারব্যাক হলেন এই ডিয়েগো গোডিন। খেলার স্টাইলে কোন আড়ম্বর নেই, নেই অযাচিত ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা। উরুগুয়ে যে প্রথম চার ম্যাচে মাত্র একটা গোল খেল, তারা যে দ্বিতীয় রাউন্ডে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে ওভাবে নিশ্চুপ করে রাখলো, তার পেছনে ডিয়েগো গোডিনেরই কৃতিত্ব সর্বাধিক।

বিশ্বকাপ ফুটবলের সেরা একাদশ : গোল্লাছুটের চোখে
ডিয়েগো গোডিন

একটুর জন্য জায়গা পাননি – দোমাগোজ ভিদা (ক্রোয়েশিয়া), দেয়ান লভরেন (ক্রোয়েশিয়া), স্যামুয়েল উমতিতি (ফ্রান্স), ইয়েরি মিনা (কলম্বিয়া), অ্যান্দ্রেয়া গ্র্যাঙ্কভিস্ট (সুইডেন), হ্যারি ম্যাগুইরে (ইংল্যান্ড), ইয়ান ভার্টঙ্ঘেন (বেলজিয়াম), হোসে মারিয়া জিমেনেজ (উরুগুয়ে), জন স্টোনস (ইংল্যান্ড)

ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার – এনগোলো কান্তে (ফ্রান্স)

কান্তে ছাড়া আর কে আছেন এই পজিশনে সেরা দলে জায়গা করে নেওয়ার মত? পুরো টুর্নামেন্টে যেভাবে বিরামহীনভাবে ভালো খেলা দেখিয়ে গেলেন, কান্তে আর কিছুদিন এভাবে খেলে গেলেই গুরু ক্লদ ম্যাকেলেলেকে ছাড়িয়ে যাবেন অচিরেই, এতটাই অসাধারণ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার তিনি। দ্বিতীয় রাউন্ডে বলতে গেলে একাই তো মেসিকে পকেটে পুরে রাখলেন! সেমিফাইনালে তাঁর জন্যই পুরোটা সময় হাঁসফাঁস করেছেন কেভিন ডে ব্রুইনিয়া। কান্তে নামক মহীরুহের ছায়া পিছনে ছিল বলেই পল পগবাও নিজেকে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন এই টুর্নামেন্টে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের সেরা একাদশ : গোল্লাছুটের চোখে
এনগোলো কান্তে

একটুর জন্য জায়গা পাননি – মার্সেলো ব্রোজোভিচ (ক্রোয়েশিয়া), মারুয়ান ফেলাইনি (বেলজিয়াম), জর্ডান হেন্ডারসন (ইংল্যান্ড)

সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার – লুকা মডরিচ (ক্রোয়েশিয়া)

বিশ্বকাপ এর সেরা খেলোয়াড় গোল্লাছুটের একাদশে সুযোগ পাবেন না, তা কি হয়? পুরো টুর্নামেন্টেই ক্রোয়েশিয়ার মিডফিল্ডের প্রাণভোমরা ছিলেন এই মডরিচ। মডরিচ কতটা অনন্য, তাঁর প্রমাণ খালি একটা তথ্যতেই পাবেন। ডেনমার্কের ম্যাচে পুরো নব্বই মিনিট খেলার পর অতিরিক্ত সময়েরও ২৩ মিনিট চলে যাওয়ার পর মাঠের বাকী খেলোয়াড়েরা যেখানে ক্লান্তি ও অবসাদে হাঁসফাঁস করছেন। ঠিক তখনই আনতে রেবিচকে দুর্দান্ত এক থ্রু তে গোল করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি। যেন ম্যাচ মাত্র শুরু হয়েছে, ১২৩ মিনিটে এরকম থ্রু পাস দেওয়াটা খুব সহজ একটা বিষয়! পরিসংখ্যানে এসেছে, পুরো টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশী দৌড়েছেন এই মডরিচ। সতীর্থদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছেন অবিরাম।

বিশ্বকাপ ফুটবলের সেরা একাদশ : গোল্লাছুটের চোখে
লুকা মডরিচ

একটুর জন্য জায়গা পাননি – ইভান রাকিটিচ (ক্রোয়েশিয়া), পল পগবা (ফ্রান্স)

রাইট উইঙ্গার – কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স)

ক্লাব ক্যারিয়ারে তারকা তো ছিলেনই, এই বিশ্বকাপ এ নিজেকে বিশ্বমঞ্চে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ফ্রান্সের এই বিস্ময়বালক। দ্বিতীয় রাউন্ডে মেসির আর্জেন্টিনাকে বলতে গেলে একাই হারিওয়ে দিয়েছেন, ফাইনালে একটা গোল করে পেলের রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন – টিনএজার হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করার রেকর্ড। পুরো টুর্নামেন্টে রাইট উইং দিয়ে এমবাপ্পের দৌড়, গতি, ড্রিবলিং যে কত ডিফেন্ডারের ঘুম হারামের কারণ হয়েছে তা জানতে নিকোলাস ওটামেন্ডি, দোমাগোজ ভিদা, হোসে জিমেনেজ, ইয়ান ভার্টঙ্ঘেনদের জিজ্ঞেস করে দেখুন! বিশ্বকাপ এর সেরা যুব প্রতিভার পুরষ্কারটা তাই যোগ্য মানুষের হাতেই উঠেছে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের সেরা একাদশ : গোল্লাছুটের চোখে
কিলিয়ান এমবাপ্পে

একটুর জন্য জায়গা পাননি – আনতে রেবিচ (ক্রোয়েশিয়া), কেভিন ডে ব্রুইনিয়া (বেলজিয়াম), ভিক্টর ক্লায়েসন (সুইডেন)

লেফট উইঙ্গার – ইডেন হ্যাজার্ড (বেলজিয়াম)

নেইমারের পাশাপাশি হ্যাজার্ডকেও কেন মেসি-রোনালদোর উত্তরসূরি বলা হয় – সেই তর্কের আগুণে আরেকটু সলতে দিয়েছেন এই হ্যাজার্ড, এই বিশ্বকাপ এ। বাম উইংটায় নিজের ছাপ বেশ ভালোভাবেই রেখেছেন প্রত্যেকটা ম্যাচে। এই টুর্নামেন্টে হ্যাজার্ডের থেকে বেশী সফল ড্রিবল আর কেউ করতে পারেননি। গোলও করেছেন তিনটা। ব্রাজিল আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যেভাবে খেলেছেন, মডরিচের পর দ্বিতীয় সেরা কে হবেন তা নিয়ে আর ভাবতে হয়নি বিচারকদের। মূলত ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচে ব্রাজিল-বধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার ছিলেন হ্যাজার্ড।

বিশ্বকাপ ফুটবলের সেরা একাদশ : গোল্লাছুটের চোখে
ইডেন হ্যাজার্ড

একটুর জন্য জায়গা পাননি – ইভান পেরিসিচ (ক্রোয়েশিয়া), ডেনিস চেরিশেভ (রাশিয়া)

সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার – আতোয়াঁ গ্রিজম্যান 

বিশ্বকাপ ফুটবলে ফ্রান্সের রক্ষণভাগের দায়িত্ব কান্তে আর ভ্যারেন যেভাবে সামলেছেন, আক্রমণভাগের দায়িত্ব সেভাবে সামলেছেন গ্রিজম্যান। গ্রিজম্যানের বুদ্ধিদীপ্ত খেলার স্টাইলের জন্যই এমবাপ্পে পরিস্ফুটিত হতে পেরেছেন ভালোভাবে। আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হলেও দলের প্রয়োজনে আরও নিচে নেমে খেলেছেন যখন তখন, খেলা বানিয়ে দিয়েছেন। স্নায়ু ঠাণ্ডা রেখে দুটো পেনাল্টি নিয়েছেন এমন সময়, যে সময়ে গোলগুলো ফ্রান্সের অনেক দরকারি ছিল। সবচেয়ে বড় বিষয়, এই টুর্নামেন্টে ফ্রান্সের আক্রমণভাগকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে নিজের উপর থেকে ‘চোকার’ তকমাটা সরিয়েছেন। মডরিচ আর হ্যাজার্ডের পর তৃতীয় সেরা খেলোয়াড়ও তাই তিনিই হয়েছেন।

বিশ্বকাপ ফুটবলের সেরা একাদশ : গোল্লাছুটের চোখে
আতোয়াঁ গ্রিজম্যান

একটুর জন্য জায়গা পাননি – ফিলিপ্পে কউতিনহো (ব্রাজিল)

স্ট্রাইকার – রোমেলু লুকাকু

রোমেলু লুকাকুর কাছে এই বিশ্বকাপটা ছিল নিজেকে নতুন করে বিশ্বের কাছে উপস্থাপন করার এক টুর্নামেন্ট। বিশ্বকাপ শুরু আগেই অনেকে বলা শুরু করেছিলেন, বেলজিয়াম দলটা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারছেনা শুধুমাত্র তাদের মূল স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু এর কারণে। ইডেন হ্যাজার্ড, কেভিন ডে ব্রুইনিয়া, ড্রিয়েস মার্টেন্স প্রমুখ ট্যাকটিক্যালি অধিক পোক্ত খেলোয়াড়দের তুলনায় লুকাকু যেন একটু নিষ্প্রভ। দলের কাউন্টার আক্রমণগুলোকে লুকাকু ঠিক ভালোমত শেষ করতে পারেন না, আক্রমণ নষ্ট করেন – আরো কত অভিযোগ! রোমেলু লুকাকু মানেই শক্তিসর্বস্ব একজন স্ট্রাইকার, আর কিছুই নয়। মুভমেন্ট বা অন্যান্য খেলোয়াড়দের সাথে রসায়নটা ঠিক জমাতে পারেন না অলসতার কারণে। লুকাকুর বিরুদ্ধে এরকম হাজারো দোষের ফিরিস্তিই শোনা গিয়েছিল বিশ্বকাপের আগে। এই টুর্নামেন্ট শুরু সাথে সাথেই ভোজবাজির মত নিন্দুকদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছেন লুকাকু, তাঁর খেলার স্টাইলের মাধ্যমেই। এই টুর্নামেন্টেই লুকাকু দেখিয়েছেন তিনি এখন শুধুই ডিবক্সের মধ্যে বসে থাকা সুযোগসন্ধানী শক্তিসর্বস্ব অলস স্ট্রাইকার নন। জাপানের বিপক্ষে ম্যাচটাই দেখুন, যে ম্যাচের একদম শেষ মূহুর্তের গোলে ম্যাচ জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে আসে বেলজিয়াম। গোলটা করেছিলেন নাসের চ্যাডলি, কিন্তু সে গোলটার পেছনে লুকাকুর স্বার্থহীন ‘ডামি’র অবদানই ছিল সবচেয়ে বেশি। শুধু এটাই নয়, দুর্দান্ত এই কাউন্টার আক্রমণটা যখনই শুরু হল, লুকাকু খুবই চতুরভাবে ডানদিক থেকে মাঝে চলে আসেন, সাথে জাপানের দুইজন খেলোয়াড়কে সরিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসেন, ব্যস্ত রাখেন। ফলে যেটা হয়, ডানদিকে থাকা থমাস মিউনিয়ের বেশ অনেকটুকু জায়গা পেয়ে যান। ফাঁকা জায়গায় থাকা এই মিউনিয়েরকেই পাস দেন কেভিন ডে ব্রুইনিয়া ক্রস করার জন্য, মিউনিয়ের লুকাকুকে উদ্দেশ্য করে ক্রস দেন ঠিকই, কিন্তু লুকাকু জানতেন দুই-তিনজন ডিফেন্ডার তাঁকে মার্ক করে আছে, সামনে আছে আগুয়ান গোলরক্ষক এইজি কাওয়াশিমা, এই অবস্থায় লুকাকু শট মারার চেষ্টা করলে ম্যাচের শেষ মূহুর্তে জীবনেও গোল করতে পারবেন না তিনি। তো তিনি কি করলেন? সুন্দরমত ঐ ক্রসে শট না করে দুই পায়ের ফাঁকের ভেতর দিয়ে বলটাকে চলে যেতে দিলেন, ফলে বলটা চলে গেল লুকাকুর পেছনে ফাঁকা অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকা উইঙ্গার নাসের চ্যাডলির দিকে। গোল করতে ভুল করেননি তিনি। যে স্ট্রাইকার দলগতভাবে এমন একটা আক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তাঁকে কিভাবে শক্তিসর্বস্ব অলস স্ট্রাইকার বলবেন আপনি?

বিশ্বকাপ ফুটবলের সেরা একাদশ : গোল্লাছুটের চোখে
রোমেলু লুকাকু

ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচটার কথাই ধরুন। এই ম্যাচে বেলজিয়াম কোচ রবার্টো মার্টিনেজ তার পছন্দের ৩-৪-৩ ফর্মেশন থেকে বেরিয়ে এসে ৪-৩-৩ ফর্মেশনে খেলান দলকে। আর এই পরিবর্তনের পেছনেও মার্টিনেজের মূল হাতিয়ার ছিলেন এই লুকাকু। লুকাকু সম্পর্কে জনমনে থাকা সেই শক্তিসর্বস্ব অলস টিপিক্যাল ডি-বক্সের স্ট্রাইকার এই ধারণাটাকে যেন চ্যালেঞ্জই জানালেন মার্টিনেজ। ৪-৩-৩ ফর্মেশনে প্রথমে দেখা গেল লুকাকু খেলবেন মাঝে, ডানে আর বাঁয়ে থাকবেন যথাক্রমে ডে ব্রুইনিয়া আর হ্যাজার্ড। কিন্তু ম্যাচ শুরু হবার সাথে সাথেই ব্রাজিল দলসহ সবাইকে চমকে দিয়ে লুকাকু খেলা শুরু করলে ডানদিকে! “রাইট উইঙ্গার” লুকাকুকে জায়গা করে দিয়ে মাঝে চলে আসলেন কেভিন ডে ব্রুইনিয়া, তিনি নিজে খেলা শুরু করলেন ফলস নাইন বা স্ট্রাইকার হিসেবে, এই কৌশলের সুফল বেলজিয়াম সরাসরি পেল দ্বিতীয় গোলের সময়ে, দ্বিতীয় গোলটাই করেন ডি ব্রুইনিয়া। সেই ম্যাচে গোল না করতে পারলেও লুকাকুর স্বার্থহীন খেলা নজর কাড়ে সবার। কে ভেবেছিল, লুকাকু ডানদিক থেকে সতীর্থদের সাথে দলগত খেলায় এত ভালো খেলতে পারেন? কিংবা অত ভালো ক্রস ফেলতে পারেন ডানদিক থেকে প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে?

নিজেকে এভাবে দলের স্বার্থে আমূল বদলে ফেলে চার গোল করে বেলজিয়ামকে বিশ্বকাপ সেমিতে তোলা লুকাকুই গোল্লাছুটের দৃষ্টিতে সেরা স্ট্রাইকার।

পুরো দলটা দেখে নিন এক নজরে –

বিশ্বকাপ ফুটবলের সেরা একাদশ : গোল্লাছুটের চোখে
গোল্লাছুটের সেরা বিশ্বকাপ একাদশ!

একটুর জন্য জায়গা পাননি – হ্যারি কেইন (ইংল্যান্ড), ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল), মারিও মান্দজুকিচ (ক্রোয়েশিয়া)

বিকল্প খেলোয়াড়

  • থিবো কর্তোয়া (গোলরক্ষক, বেলজিয়াম)
  • ইয়েরি মিনা (ডিফেন্ডার, কলম্বিয়া)
  • বেঞ্জামিন পাভার্ড (ডিফেন্ডার, ফ্রান্স)
  • কেভিন ডে ব্রুইনিয়া (মিডফিল্ডার, বেলজিয়াম)
  • ডেনিস চেরিশেভ (উইঙ্গার, রাশিয়া)
  • হ্যারি কেইন (স্ট্রাইকার, ইংল্যান্ড)
  • মারিও মান্দজুকিচ (স্ট্রাইকার, ক্রোয়েশিয়া)

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

eleven + 12 =