বায়ার্ন শিবিরে লেফান্ডোফস্কির ব্যাকআপ : স্যান্দ্রো ওয়াগনার

বায়ার্ন শিবিরে লেফান্ডোফস্কির ব্যাকআপ : স্যান্দ্রো ওয়াগনার

জার্মান বুন্দেসলিগায় একটি কথা সবসময়ই সত্য প্রমাণিত হয়। লিগের সেরা সেরা খেলোয়াড়েরা ক্যারিয়ারের যেকোন মুহূর্তে লিগের সবচেয়ে শক্তিশালী দল বায়ার্ন মিউনিখে আসবেনই আসবেন। সেটা ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে হোক, বা ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে থাকা অবস্থায় হোক, বা ক্যারিয়ারের বালুকাবেলায় হোক। আর সেই খেলোয়াড় যদি জার্মান হন, তাহলে তো আর কোন কথাই নেই। অতি অবশ্যই বায়ার্ন মিউনিখে তার পায়ের ছাপ পড়বেই। জার্মানির এখনকার জাতীয় দলটার দিকেই নজর করে দেখুন না, মেসুত ওজিল আর স্যামি খেদিরা ছাড়া মূল একাদশের নিয়মিত প্রায় সকল খেলোয়াড়ই ক্যারিয়ারের কোন না কোন সময় বায়ার্নে কাটিয়েছেন, নাহয় কাটাচ্ছেন (কিংবা কে জানে, হয়তো সামনে কাটাবেন!)।

এ তালিকার আপাত সর্বশেষ সংযোজন হতে চলেছেন জার্মান স্ট্রাইকার স্যান্দ্রো ওয়াগনার। দলের মূল স্ট্রাইকার রবার্ট লেফান্ডোফস্কির ব্যাকআপ হিসেবেই মূলত দলে আনা হচ্ছে পোড় খাওয়া এই জার্মান স্ট্রাইকারকে। আরেক জার্মান ক্লাব হফেনহেইম থেকে ১৩ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বায়ার্ন মিউনিখে নাম লেখাতে চলেছেন ৩০ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার।

তবে ওয়াগনারের এই বায়ার্ন আগমনকে কিন্তু মোটেও প্রথম বলা যাচ্ছেনা। ছোটবেলায় বায়ার্নের যুবদলে খেলা এই স্ট্রাইকার ২০০৭-০৮ মৌসুমে লিগে চারটার মত ম্যাচ খেলেছেন বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে। কিন্তু তাতে প্রতিভার ঝলক না দেখাতে পারার কারণে মিউনিখ ছেড়ে চলে যেতে হয় ডুইসবার্গে। সেখান থেকে ওয়ের্ডার ব্রেমেন, হার্থা বার্লিন, ডার্মস্ট্যাট, কাইজারস্লটার্ন – কম ঘাটের জল খাননি ওয়াগনার। ২০০৯ সালে জার্মানির হয়ে অনূর্ধ্ব ২১ ইউরো জেতা ওয়াগনারের ক্লাব ক্যারিয়ারটা গোলসমৃদ্ধ ছিল – একথা কেউই বলবেনা। প্রতিভা ছিল, কিন্তু প্রতিভাকে গোলে রূপান্তরিত করতে পেরেছেন সামান্যই। অবশেষে ২০১৫ সালে বুন্দেসলিগায় ফিরেই ডার্মস্ট্যাটের হয়ে প্রতিভাকে পারফরম্যান্সে রূপ দেওয়া শুরু করেন তিনি। ডার্মস্ট্যাটের হয়ে সে মৌসুমে লিগে ১৪ গোল করা ওয়াগনার নজরে পড়ে যান হফেনহেইম কর্তাদের, পরের মৌসুমেই ডার্মস্ট্যাট থেকে চলে আসেন হফেনহেইমে। গোলের বন্যা অব্যাহত থাকে এখানেও। হফেনহেইমের হয়ে গত দেড় মৌসুমে লিগে চল্লিশটার মত ম্যাচ খেলে ১৫টা গোল করেছেন তিনি এখন পর্যন্ত।

তবে সবচেয়ে বেশী নজর কেড়েছেন জার্মানি জাতীয় দলের হয়ে। অনূর্ধ্ব ২১ ইউরো যেসব সতীর্থদের সাথে মিলেমিশে জিতেছিলেন, সেই ম্যাটস হামেলস, মেসুত ওজিল, ম্যানুয়েল নয়্যার, স্যামি খেদিরা – সকলেই এখন বিশ্বকাপজয়ী খেলোয়াড়। সে অনুযায়ী অনেক পরে গত বছর ২৯ বছর বয়সে জাতীয় দলে ডাক পান ওয়াগনার। দলে ডাক পেয়েই যেন হারানো বছরগুলোতে যা যা করতে পারতেন, সব একসাথে করা শুরু করেছেন তিনি। এই পর্যন্ত জার্মানির জার্সি গায়ে সাতটা ম্যাচ খেলে ৫টার মত গোল করা হয়ে গেছে তাঁর।

ফলে যা হবার তাই হয়েছে। তাঁর এই দুর্ধর্ষ ফর্ম চোখ এড়ায়নি বায়ার্ন কোচ ইয়াপ হেইঙ্কেসের। অবশেষে দশ বছর পর ঘরের ছেলেকে আবারো ঘরে ফেরাতে উদ্যোগী হয়েছে বায়ার্ন মিউনিখ।

বায়ার্ন শিবিরে লেফান্ডোফস্কির ব্যাকআপ : স্যান্দ্রো ওয়াগনার
বায়ার্নে কাটানো সময়

কিন্তু রবার্ট লেফান্ডোফস্কির যোগ্য ব্যাকআপ হতে পারবেন তো ওয়াগনার?

দলে টমাস মুলার আছেন। জার্মানি ও বায়ার্ন মিউনিখের সদানির্ভরযোগ্য এই স্ট্রাইকার গত এক-দেড় মৌসুম ধরেই নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন। খারাপ ফর্মের জন্য মূল একাদশ থেকে জায়গাও হারিয়েছেন। তাই মুলারের জায়গায় আরেকটু ভালো পারফরম্যান্সের প্রত্যাশাতেই ওয়াগনারের মূলত দলে আসা।

তবে খেলার স্টাইল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মুলার আর ওয়াগনারের খেলার স্টাইলের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। যেখানে মুলারকে মূলত একজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার/সহকারী স্ট্রাইকার বললে ভুল হয়না, সেখানে স্যান্দ্রো ওয়াগনারকে মনে করা হচ্ছে মিরোস্লাভ ক্লসা পরবর্তী যুগের সবচাইতে ভালো টার্গেটম্যান। মুলারের গোলক্ষুধার পাশাপাশি যেসব জিনিস চোখে পড়ে তা হচ্ছে আক্রমণভাগে সতীর্থদের জন্য জায়গা বানিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা ও প্রবণতা, ইঞ্জিনের মত গোটা আক্রমণভাজুড়ে দৌড়িয়ে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের তটস্থ করে ফেলা, ঠিক সময় ঠিক জায়গায় থেকে আক্রমণের পরিসমাপ্তি টানা ইত্যাদি। সেখানে স্যান্দ্রো ওয়াগনার ডিবক্স এর মধ্যে তুখোড় গোলশিকারি, অনেক শক্তিশালী ও পরিশ্রমী একটা স্ট্রাইকার। শক্তিশালী হবার কারণে হেড করে গোল করতেও প্রচণ্ড দক্ষ তিনি, মিরোস্লাভ ক্লসার মতই। আধুনিক জার্মান দলগুলো যেখানে স্প্যানিশ ট্যাকটিকস ও পেপ গার্দিওলার বায়ার্নের প্রভাবে প্রথাগত টার্গেটম্যানের জায়গায় ফলস নাইন খেলানোর ব্যাপারে (মারিও গতসা) আগ্রহী হয়ে উঠেছে, এই পরিবর্তনের যুগে স্যান্দ্রো ওয়াগনার তাই একটা উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। আধুনিক যুগের ফলস নাইনদের মত নিচে নেমে খেলা বানানো বা ড্রিবলিং এর আড়ম্বর নেই, বল পাওয়া মাত্রই নিজের মার্কার ডিফেন্ডারকে ছিটকে গোলমুখে শট বা হেড করার দিকেই যাদের লক্ষ্য।

তবে আত্মবিশ্বাসের কোন অভাব নেই এই স্ট্রাইকারের। নিজের চোখে তিনি নিজেই বর্তমান সময়ের সেরা জার্মান স্ট্রাইকার। এখন দেখার বিষয় নিজের কথার দাম বায়ার্ন আর জার্মানির জার্সি গায়ে কতটুকু রাখতে পারেন!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

ten − 10 =