বাস্তিয়ান শোয়াইনস্টাইগার : জার্মানদের মাস্টারমাইন্ড

বাস্তিয়ান শোয়াইনস্টাইগার : জার্মানদের মাস্টারমাইন্ড

দুনিয়ায় তাকে অপছন্দ করত এরকম বোধহয় কেউ ছিলনা। অন্তত সমগ্র জার্মানিতে তিনি ছিলেন এক ভালবাসার নাম, এক ভালবাসার প্রতীক। চারদিকেই পেয়েছেন জনগণের অসামান্য শ্রদ্ধা, প্রেম ও ভালোবাসা। মিডফিল্ডে তার অসীম শক্তি দেখে তাকে বলা হত “মিডফিল্ড মোটর”। তাছাড়া তিনি খেলার গতিবিধি সম্পর্কে বেশ ভালো নজর রাখতে পারতেন ও চমৎকার পজিশনিং এর অধিকারী যার ফলে প্রায় সময় অসাধারণ লং শটকে গোলে পরিণত করতেন এই মিডফিল্ড মোটর। আর এইসব কারণেই তাকে জার্মানির ” মাথার বুদ্ধি “ও ” মিডফিল্ড মাস্টারমাইন্ড” এর আখ্যা দেন তার বস, জোয়াকিম লো। তবে এই সৈনিকের গুণ এখানেই শেষ নয়; এইসব ছাড়াও তিনি সেট পিস ডেলিভারিতে ছিলেন অত্যন্ত দহ্ম।

১৯৮৪ সালের আজকের এই দিনে কলবেরমুর, পশ্চিম জার্মনিতে জন্ম নেয়া ৬ ফুট এই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারও বোধহয় জানতেন না যে তিনি ক্লাব ও জাতীয় দলের এত বড় অংশ হয়ে থাকবেন। সকল শ্রেনী ও ধর্মের মানুষের এতটা ভালবাসা পাবেন৷ বুঝলেন না এখনো তিনি কে? তিনিই হচ্ছেন শিকাগো ফায়ারের বিখ্যাত নম্বর ৩১, বাস্তিয়ান শোয়াইনস্টাইগার যিনি ক্যারিয়ার এর শুরুতে রাইট মিডফিল্ডার হিসেবে মাঠ কাঁপাতেন।

ইয়ুথ ক্যারিয়ার এর প্রথম দুই বছর ইভি ওভেরাওডর্ফে কাটান শোয়াইনস্টাইগার। এরপর ৬ বছর টিএসভি ১৮৬০ রসেনহাইমের হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। ১৯৯৮ সালের ১লা জুলাই ফুটবল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় আসে শোয়াইনস্টাইগার এর। এদিন তিনি বায়ার্ন মিউনিখের এর সাথে ইয়ুথ কন্ট্রাক্ট সই করেন। যুব দলের সঙ্গে বুন্দেস্লিগা ৩ এ অসাধারণ কিছু নৈপুণ্য প্রদর্শন করে ২০০২ সালেই বায়ার্ন রিজার্ভ টিমে ডাক পান তিনি। তারপর প্রথম দলের সাথে মাত্র দুটি ট্রেনিং সেশন এ অংশগ্রহণ করার পরেই ১৮ বছর বয়সী শোয়াইনস্টাইগার কে অভিষেকের সুযোগ প্রদান করেন তৎকালীন বায়ার্ন কোচ, ওটমার হিটজফিল্ড। লেন্স এর বিরুদ্ধে চ্যাম্পিয়নস লিগের সেই ম্যাচে অ্যাসিস্টও করেন তিনি। পরের বছরে পেশাদার চুক্তি সই করেন এই মিডফিল্ড মাস্টারমাইন্ড। ২০০২-০৩ মৌসুমে ১৪ এপিয়ারেন্স করার পর এরপর পরের বছরেই করেন তার প্রায় দ্বিগুণ(২৬)। শোয়াইনস্টাইগার এর প্রথম বায়ার্ন গোলের দেখা মেলে ভল্ফসবুর্গের বিপহ্মে ২০০৩ সালের একটি লিগ ম্যাচে।

২০০৫-০৬ মৌসুমে সবাইকে হতবাক করে শোয়াইনস্টাইগার কে রিজার্ভ টিমে পাঠান নতুন বায়ার্ন কোচ, ফেলিক্স মাগাথ। তবে পরবর্তীতে তিনি দ্রুতই আবার মূল দলে ফেরেন। ২০০৫-০৮ মৌসুমগুলোয় তিনি ক্লাবের হয়ে ১৩৫টি ম্যাচ খেলেন এবং আস্তে আস্তে দলের অপরিহার্য সদস্য হয়ে ওঠেন। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে তিনি ৬ বছরের নতুন চুক্তি সই করেন জার্মান জায়ান্টদের সাথে। ২০১২ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিতে রিয়ালের বিপহ্মে সাফল্যের সঙ্গে ম্যাচের শেষ স্পট কিক নেন তিনি। তবে ওই সিজনের ফাইনালে চেলসির বিরুদ্ধে তিনি তার স্পট কিক সফলভাবে নিতে পারেননি এবং পেনাল্টিতে ৫-৩ ব্যবধানে চেলসি উচল শিরোপা ঘরে তোলে। কিন্তু তার আক্ষেপ বেশিদিনের জন্য ছিলনা; পরের মৌসুমেই(২০১২-১৩) বায়ার্ন এর ট্রেবল উইনিং সিজনে বিরাট অবদান রাখেন শোয়াইনস্টাইগার, জাভি মার্টিনেজের সাথে গড়ে তোলেন এক দারুণ মিডফিল্ড জুটি। এ সময় তার কোচ, ইয়ুপ হেইঙ্কেস বলেনঃ “বাস্তিয়ান শোয়াইনস্টাইগার বিশ্বের সেরা মিডফিল্ডার। আমি চাই সে, থমাস মুলার বা ফ্রাঙ্ক রিবেরি ব্যালন ডি’অর জিতুক।” ২০১৫ সালের ২৩ই মে বায়ার্ন এর হয়ে শেষ গোল করেন তিনি তাও তার সর্বশেষ ম্যাচে। বাভারিয়ানদের এই ফ্যান ফেভারিটকে “ফুসবলগট” অর্থাৎ ফুটবল বিধাতার খেতাব দেয়া হয় তখন।

বাস্তিয়ান শোয়াইনস্টাইগার : জার্মানদের মাস্টারমাইন্ড

২০১৫ সালের ১৩ই জুলাই ৯ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ফুসবলগট ৩ বছরের চুক্তিতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে পাড়ি জমান। একই বছরের আগষ্টে অভিষেক করার মাধ্যমে তিনি ইউনাইটেড এর সর্বপ্রথম জার্মান স্টার্টার হন। হোসে মরিনহো নতুন কোচ হওয়ার পর প্রিয় শোয়াইনস্টাইগার এর ক্যারিয়ার এর কেবল অবনতি হয়। অনুর্ধ ২৩ দলের সাথে অনুশীলন করা জন্য তাকে আদেশ করেন জোসে। এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন সাবেক ইউনাইটেড খেলোয়াড়রা। ২০১৬ সালের শেষের দিকে মূল দলের সাথে ট্রেনিং এ ফেরেন তিনি। ডিসেম্বর মাসে উইগানের সাথে এফএ কাপের চতুর্থ রাউন্ড ম্যাচে দারুণ ওভারহেড শটে গোল করার পাশাপাশি দুটি অ্যাসিস্ট করেন তিনি। ফলাফল, ম্যানচেস্টারে একমাত্র ম্যান অব ম্যাচ জয়ের কৃতিত্ব। ২০১৭ সালের মার্চ মাসে বাস্তিয়ান শোয়াইনস্টাইগার যুক্তরাষ্ট্রের এমএলএসের দল, শিকাগো ফায়ারে যোগ দেন। একই বছরের ১৭ এপ্রিল অভিষেকের দিনেই গোলের দেখা পান তিনি। সেই মৌসুমে শিকাগোকে ৫ বছরে প্রথমমার মতন প্লে অফে তুলতে বিরাট অবদান রাখেন এই লিজেন্ড ৷ সংক্ষিপ্ত রূপে তার সিনিয়র লিগ ক্যারিয়ার-

২০০১-০৫ বায়ার্ন মিউনিখ ২> ৩৪ ম্যাচ, ২ গোল

২০০২-১৫ বায়ার্ন মিউনিখ > ৩৪২ ম্যাচ, ৪৫ গোল

২০১৫-১৭ ম্যান ইউনাইটেড > ১৮ ম্যাচ, ১ গোল

২০১৭- শিকাগো ফায়ার> ৪২ ম্যাচ, ৬ গোল

ক্লাব ক্যারিয়ারে তার অর্জনসমূহ-

🔸অনুর্ধ ১৭ বুন্দেস্লিগা>১

🔹অনুর্ধ ১৯ বুন্দেস্লিগা >২

🔸রেজনাল লিগা সাড>১

🔹বুন্দেস্লিগা> ৮

🔸ডিএফবি পোকাল>৭

🔹ডিএফএল লিগা পোকাল>১

🔸ডিএফএল সুপার কাপ>১

🔹চ্যাম্পিয়নস লিগ>১

২০০৪ সালে হাঙ্গারির বিপহ্মে প্রীতি ম্যাচে আন্তর্জাতিক অভিষেক বাস্তিয়ান শোয়াইনস্টাইগার এর। এরপর বাকিটা ইতিহাস। জার্মানির হয়ে উয়েফা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে রেকর্ড উপস্থিতি তার। অংশ নেন ২০০৪ সালের ইউরো থেকে সমস্ত উল্লেখযোগ্য টুর্নামেন্টে। সেই বছরে জার্মানি অনুর্ধ ২১ দলের সাথে ইউরো খেলার পর ডাক পান জাতীয় দলের ইউরো স্কোয়াডে। সেখানে নিজের খেলা প্রথম ম্যাচেই অ্যাসিস্ট করেন তিনি। তার প্রথম দুই আন্তর্জাতিক গোল আসে রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি প্রীতি ম্যাচে। তবে স্পট লাইটে আসেন তিনি ২ বছর পর নিজ দেশে অনুষ্টিত বিশ্বকাপে৷ তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে পর্তুগালের বিপহ্মে তিনি দুটি দর্শনীয়, দূর পাল্লার শট গোলে পরিণত করেন৷ ক্যারিয়ার এর শুরু দিকে অল্প কিছুতেই রেগে যেতেন বাস্তিয়ান,তবে সময় গড়ানোর সাথে সাথে এই অভ্যাসটা পুরাই শুধরিয়ে নেন তিনি৷ ২০০৮ সালের ইউরোতে ৪-৪-২ ফর্মেশনকে প্রাধান্য দিয়ে ফুসবলগটকে বেঞ্চ করে ইয়োকিম লোভ। তবে দলে ফিরে নিজের জাত চিনান বাস্তি; কোয়ার্টার ফাইনালে ১ গোল ও ২ এসিস্ট করেন এবং সেমিতেও একবার বল জালে পাঠান৷ ২০১০ সালের বিশ্বকাপের কোয়ালিফিকেশন ও মূল টুর্নামেন্টে দলের নিয়মিত সদস্য হন তিনি। সেই টুর্নামেন্টে ইঞ্জুরি আক্রান্ত মাইকেল বালাকের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে তিনি সেন্ট্রাল মিডে খেলার রোল পান। এই পজিশনেও নিজের সেরা খেলাটা দিতে সক্ষম হন তিনি; দারুণ লিডারশিপ ও অভিজ্ঞতা দেখিয়ে তিনি দলের আক্রমণ ও রক্ষণে রাখেন বিরাট ভূমিকা। সেই প্রতিযোগিতায় ৩টি এসিস্ট করে তিনি গোল্ডেন বলের সেরা ১০ লিস্টে জায়গা করে নেন। ২০১২ সাল থেকে মূলত সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড পজিশনে খেলেন এই মিডফিল্ড মোটর। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্ভাবত তার সেরা নৈপুণ্য তিনি দেখান তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে; ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল যদি সেদিন তার হাতে না দেখতাম তাহলে বোধহয় ফুটবল খেলাই দেখা ছেড়ে দিতাম৷ বিশ্বকাপের সফল মিশন শেষে ফিলিপ লাহম এর অবসরের পর থেকে তিনি অধিনায়কত্ব করেন। এই ফুটবল বিধাতার শেষ মেজর টুর্নামেন্ট ছিল ২০১৬ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ। ঐ প্রতিযোগিতা শেষে তিনি অবসরের ঘোষণা দেন ; আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এর শেষ মাশ খেলেন একই বছরের জুলাইয়ে, ফিনল্যান্ডে এর বিপক্ষে প্রতি ম্যাচে।

জাতীয় দলের হয়ে তার অর্জনসমূহ-

 বিশ্বকাপ→ ২০১৪ বিজয়ী, ২০০৬ ও ২০১০ ব্রোঞ্জ বিজয়ী।

 ইউরো→ ২০০৮ রানার্সআপ, ২০১২ ও ২০১৬ ব্রোঞ্জ বিজয়ী।

 কনফেডারেশন কাপ→ ২০০৫ ব্রোঞ্জ বিজয়ী

২০০৪-১৬ সাল মোট ১২ বছর মাঠ কাঁপিয়ে তার উপস্থিতি ১২১টি ও গোলসংখ্যা ২৪

ব্যাক্তিগত কিছু অর্জন-

🔳 সিবার্নেস লবার্ব্লেট(জার্মানির সেরা খেলোয়ারের পুরস্কার)→ ৩ বার

🔲বিশ্বকাপ ড্রিম টিম→২০১০

🔳জার্মান জাতীয় দল সেরা খেলোয়ার→২০১০

🔲ডিএফবি প্লেয়ার অব দ্যা ইয়ার→২০১৩

🔳এমএলএস অল স্টার→২০১৭

শুভ জন্মদিন বাস্তিয়ান শোয়াইনস্টাইগার, আপনিই থাকবেন ফুটবলে আমার সবচেয়ে বড় ভালবাসা। আমার কাছে আপনিই সেরা। আপনি যেদিন অবসর নিবেন হয়তো সেদিন আমিও ফুটবল খেলা দেখা ছেড়ে দিব।

লেখা – নাঈম আহমেদ

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

six + 9 =