বার্সেলোনার কৌশলের সাথে কিভাবে মানিয়ে নেবেন ম্যালকম?

বার্সেলোনার কৌশলের সাথে কিভাবে মানিয়ে নেবেন ম্যালকম?

লাতিন আমেরিকার আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের একটা কদর সব যুগেই ছিল, এখনো আছে। বিশেষত সেই আক্রমণভাগের খেলোয়াড় যদি হন ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার, তাহলে তো আর কথাই নেই। মোটামুটি গত শীতকালীন দলবদলের সময় থেকেই এরকম একজন ব্রাজিলীয় আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ের নামডাক শোনা যাচ্ছিল, যে তরুণ প্রতিভার উপর মোটামুটি ইউরোপের নামীদামী বেশ কিছু ক্লাব আগ্রহী। তাঁর নাম ম্যালকম, ব্রাজিলীয় উইঙ্গার, আক্রমণোভাগের ডানদিকে খেলতে স্বচ্ছন্দবোধ করেন, খেলেন ফরাসি ক্লাব বোর্দোতে। টটেনহ্যাম হটস্পার, আর্সেনাল, ইন্টার মিলান, এভারটন, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, বায়ার্ন মিউনিখ – বাঘা বাঘা সকল ক্লাব বলে ম্যালকম কে দলে নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী – তখন এমনটাই শোনা যাচ্ছিল। ২১ বছর বয়সী এই উইঙ্গার সেবার বোর্দো না ছাড়তে পারলেও এবার তাঁকে নিয়ে যথারীতি আরেক দফা টানাটানি পড়ে গিয়েছিল। ৩২ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ইতালিয়ান ক্লাব এএস রোমায় যাচ্ছেন তিনি, এমনটাই শোনা গিয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে হুট করে বার্সেলোনা এসে এএস রোমার পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ভেস্তে দিয়ে নিয়ে গেল ম্যালকম কে। ম্যালকম এখন বার্সেলোনার খেলোয়াড়। ৪১ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বোর্দো থেকে মেসির দলে নাম লিখিয়েছেন তিনি। ফলে চেলসি থেকে আরেক ব্রাজিলীয় উইঙ্গার উইলিয়ানকে দলে আনার ব্যাপারে সকল পরিকল্পনা বাতিল করে দিয়েছে বার্সেলোনা। চেলসিতেই থাকছেন উইলিয়ান।

কিন্তু কিরকম খেলোয়াড় এই ম্যালকম? তাঁর মত একটা খেলোয়াড়কে পাওয়ার জন্য বার্সেলোনা এমন তাড়াহুড়োই বা শুরু করে দিয়েছিল কেন? মোদ্দা কথা হল, বার্সেলোনার এই দলবদলের বাজারে শুরু থেকেই একজন রাইট উইঙ্গার দলে নেওয়ার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছিল। ফরাসি উইঙ্গার ওসমানে দেম্বেলের ইনজুরির কারণে হোক কিংবা কোচ আর্নেস্তো ভালভার্দের কৌশলের সাথে দেম্বেলের বনিবনা না হবার কারণেই হোক, দেম্বেলের জায়গাতেই আরেকটা রাইট উইঙ্গার আনতে চেয়েছেন বার্সেলোনা কোচ আর্নেস্তো ভালভার্দে। আর এক্ষেত্রে ভালভার্দের মূল পছন্দ ছিলেন চেলসির ২৯ বছর বয়সী উইঙ্গার উইলিয়ান। গত চ্যাম্পিয়নস লিগের দ্বিতীয় রাউন্ডে চেলসির বিপক্ষে ম্যাচে এই উইলিয়ানের কাছেই নাকানিচুবানি খেয়েছিল বার্সেলোনা। এ জন্যই কি না, অন্য কেউ না, বরং এই উইলিয়ানকে দলে আনার ব্যাপারেই তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছিল বার্সেলোনা। কিন্তু বাধ সাধে চেলসি। বার্সেলোনার কাছে ৮০ মিলিয়ন ইউরোর একটা অবাস্তব প্রস্তাব করে বসে তারা। বার্সেলোনাও উইলিয়ানের জন্য ৬৫ মিলিয়ন ইউরোর বেশী দিতে রাজী ছিল না। তাই সব মিলিয়ে উইলিয়ানের প্রতি অনাগ্রহী হয়ে পড়ে বার্সা, শেষ মুহূর্তে ঝুঁকে পড়ে ম্যালকম এর দিকে, আর কপাল পুড়ে উইলিয়ান আর এএস রোমার।

বার্সেলোনার কৌশলের সাথে কিভাবে মানিয়ে নেবেন ম্যালকম?

কিন্তু ভালভার্দের স্কোয়াডে ম্যালকম কিরকম গুরুত্ব বহন করবেন?

হিসেব করে দেখলে বার্সেলোনার আক্রমণভাগে তিনজনের মধ্যে দুইজনের জায়গা একদম নিশ্চিত, লিওনেল মেসি আর লুইস সুয়ারেজ। নেইমারের পরিবর্তে ফিলিপ্পে কউতিনহো আর ওসমানে দেম্বেলেকে আনা হলেও আক্রমণভাগে না খেলে মিডফিল্ডে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার জায়গাতেই খেলতে বেশী স্বচ্ছন্দ কউতিনহো, তাঁকে মূলত লিভারপুল থেকে আনাও হয়েছে ইনিয়েস্তার বিকল্প খেলোয়াড় হিসেবেই। এখন যেহেতু বার্সেলোনায় ইনিয়েস্তা-যুগ শেষ, তাই বলা যেতে পারে ৪-৩-৩ ফর্মেশনে নিজের পছন্দের জায়গাতেই খেলার সুযোগ পাবেন কউতিনহো। মেসি আর সুয়ারেজ ছাড়া বার্সেলোনার আক্রমণভাগের খেলোয়াড় বলতে আর আছেন ওসমানে দেম্বেলে, প্যাকো অ্যালসাসের আর এই ম্যালকম। দলে যেহেতু মোটামুটি প্রথাগত উইঙ্গারের ঘাটতি ছিল, ম্যালকম আসার কারণে সেই ঘাটতিটা একটু হলেও কমবে। বাম পায়ের খেলোয়াড় হলেও এই ম্যালকম কিন্তু আসলে খেলেন রাইট উইঙ্গার হিসেবে। রাইট উইঙ্গার হিসেবে খেললেও অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবেও যে তিনি একদম খেলতে পারেন না তা কিন্তু নয়। আর দশটা ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গারের মত তাঁরও কারিকুরির অভাব নেই। সেরকম শারীরিকভাবে শক্তসমর্থ না হলেও গতি আর দ্রুততা দিয়েই মার্কারকে ছিটকে ফেলতে পারেন। ডিবক্সের বাইরে থেকেও গোল একটা অভ্যাস আছে ম্যালকম এর, অনেকটা সদ্য হওয়া বার্সা-সতীর্থ ফিলিপ্পে কউতিনহোর মত। গত মৌসুমে ডিবক্সের বাইরে থেকে ৫টা গোল করেছিলেন ম্যালকম। গত মৌসুমে বোর্দোর হয়ে ১৯ গোলে ভূমিকা ছিল তাঁর, সেটা গোল করে হোক, বা সহায়তা করে হোক। আর পুরো মৌসুমে বিভিন্নভাবে গোলের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন ৮৭ বার।

মাত্র ১৭ বছর বয়সে করিন্থিয়ান্সের হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক ঘটে ফুটসাল খেলে খেলে নজরে আসা ম্যালকমের। ২০১৬ সালে বোর্দোতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি করিন্থিয়ানসের হয়ে এমন দুই কোচের অধীনে খেলেছেন, যারা বিভিন্ন সময়ে ব্রাজিলের কোচ ছিলেন বা আছেন – মানো মেনেজেস আর তিতে। শোনা যায়, করিন্থিয়ানস ছেড়ে ম্যালকম যেন ইউরোপে না যান সে কারণে তিতে ম্যালকমকে ফোন করে কেঁদেছিলেনও, কিন্তু লাভ হয়নি। বোর্দোতে এসেই নিজের জাত চেনাতে দেরী করেননি ম্যালকম। তাঁর দূরপাল্লার শটগুলো যে কতটা দুর্দান্ত, সেটা প্রমাণস্বরূপ ফরাসি লিগের সেরা গোলের পুরষ্কারটাও পেয়েছিলেন বছরখানেক আগে।

তবে ম্যালকমের খেলা পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, ওসমানে দেম্বেলের মত ঠিক দুই পায়েই বল নিয়ে সমান স্বচ্ছন্দ নন তিনি। মূলত বামপায়ের খেলোয়াড় হবার কারণে ডান পায়ে তিনি বেশ দুর্বল। এ কারণেই রাইট উইঙ্গার হিসেবেই মূলত বেশী খেলতে পছন্দ করেন তিনি। কাট-ইন করে প্রতিপক্ষের ডিবক্সের মধ্যে ঢুকে বাম পা দিয়ে জোরালো শট করে গোল করতে চান। ফলে জিনিসটা যেটা হতে পারে, মূল একাদশে জায়গা পাওয়ার জন্য মূলত সেই লিওনেল মেসির সাথেই লড়াই হতে পারে ম্যালকমের।

তবে বল নিয়ে ঐ বাম পায়েই অনেক স্বচ্ছন্দ ম্যালকম, সহজে বলের দখল হারাতে চান না। আর ওসমানে দেম্বেলের তুলনায় সৃষ্টিশীলতার দিক থেকে ম্যালকম একটু হলেও ভালো।

মাত্রই গত মৌসুমে ওসমানে দেম্বেলেকে ১০৫ মিলিয়ন ইউরো দিয়ে কেনা বার্সেলোনা আবারো আরেক তরুণ উইঙ্গার কেনো আনলো, ওসমানে দেম্বেলেকে না খেলয়ে, সে নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হওয়াটাই স্বাভাবিক, আর এই তর্ক-বিতর্ক থামানোর হাতিয়ারটা আছে কিন্তু এই ম্যালকমের কাছেই, আর সেটা হল – ভালো পারফর্ম্যান্স।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

10 + eleven =