বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদ – রাজত্বের গল্প

একরাম খালেদ :

সৃষ্টির শুরু থেকে কত আধিপত্যের শাসন দেখেছে এই মহাবিশ্ব!কিন্তু কখনো হারানো আধিপত্যবাধ দ্বিতীয়বার খুজে পায়নি কোনো জাতি। মঙ্গলদের আধিপত্যের অবসান ঘটে চেঙ্গিস খানের নিজ বংশধরদের কুকীর্তি ও অন্তর্দন্দের জন্যে। অটোম্যান সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে সুলতানদের আরাম আয়েশি জীবনের পাশাপাশি তলোয়ারের ধার ও ব্রেনে জং ধরার কারণে।
ঠিক তেমনই ক্লাব ফুটবলে রিয়াল মাদ্রিদের রাজত্বের অবসান ঘটেছিল অতিরিক্ত অর্থবিত্ত ও অহংকারের কাছে।তবে আপনারা জানেন ফুটবল আর ঐসব এক বিষয় না!এখানেই হল ফুটবলের সাথে অন্যান্য কিছুর বৈপরীত্য।ফুটবলে একজন ভালো প্রেসিডেন্ট পেলে দল আবার পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠে।
লা লিগায় ভিয়ারিয়াল এর সাথে ম্যাচের আগের রাত পর্যন্ত প্রিয় দলের জয় নিয়ে আমি ছিলাম খুবই চিন্তিত কিন্তু এখন যখন সবাই মাদ্রিদের ট্রফি অর্জন নিয়ে আনন্দে মেতে উঠছে তখন আমি ডুবে আছি ভিন্ন কি যেনো এক মিশ্র অনুভূতিতে!
আমার কেনো যেনো মনে হয় এ যেনো শুধুমাত্র একটা ট্রফি অর্জনের কোনো বিষয় নয়! হয়তো এর চেয়ে আরো বেশি কিছু! ঠিক যেনো গত দশকে রাজত্ব করা বার্সেলোনা’র মতো রিয়াল মাদ্রিদের সামনে আবার লিগে রাজত্ব করার সুবর্ণ সুযোগ হাতে আসা।আবার সময় এসেছে অনেক গুলো ট্রফি অর্জনের।
সত্যি বলতে আমি রিয়াল মাদ্রিদের আগামী দিনের ভবিষ্যত নিয়ে এই উচ্চাশা কেনো করছি জানেন??এর অন্যতম কারণ হল আমাদের বর্তমান দলে রয়েছে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটা বিশাল বড় স্কোয়াড ও ভবিষ্যতের জন্য পাইপ লাইনে থাকা অসংখ্য ট্যালেন্ট বয়। যেমন জাপানিজ মেসি খ্যাত কুবো,সেবায়োস,জুনিয়র দলের রাইট ব্যাক পজিশনের হার্নান্ডেজ,ওডেগার্ড, সহ আরো অনেক নাম। দলে ভেড়ানোর মধ্যে জোড়ালো রিউমার হল ফ্রেঞ্চ ম্যান কিলিয়ান এম্বাপ্পে ও ডিএম পজিশনের কামাভিংগা।তাই আমরা স্বপ্ন দেখতেই পারি আগামীর রিয়াল মাদ্রিদ হবে আরো অনেক শক্তিশালী।
রিয়াল মাদ্রিদের সবচেয়ে বড় যেই জায়গাটা, সেটা হল এই দল সবসময় কিংবদন্তি কোচ দ্বারা পরিচালিত হয়।এখানে একক প্লেয়ারের গুরুত্ব থাকলেও শুধুমাত্র তাকে কেন্দ্র করে দলের বাকিরা আবির্ভূত হয়না।বর্তমান সময়ে কোচ হিসাবে দলে রয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের সবার ভরসায় প্রতীক জিজু , আর উনি যতদিন থাকবেন আশাকরি দল কখনো কোনো টুর্নামেন্টে শূন্য হাতে ফিরলেও পরবর্তী ট্রফি অর্জনে ঠিকই ঘুরে দাড়াবেন। উনি একজন খেলোয়াড় হিসাবে যেমন লড়াকু মানসিকতার ছিলেন ঠিক তেমনই কোচ হিসাবেও ট্যাক্টিসের পাশাপাশি লড়াকু মনোভাব তার দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে পুশ করে দেন। উনার নিজের প্লেইং স্টাইলের মতো দলকে বল কন্ট্রোল ও জোটবদ্ধ করে খেলাতে পছন্দ করেন। আর এটাই উনার সাফল্যের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
ফুটবল যেহেতু প্রোফেশনাল খেলা তাই সময়ের সাথে পরিবর্তন আসাটা স্বাভাবিক।তবে রিয়াল মাদ্রিদ আর যাইহোক একেবারে ‘বি’ ক্যাটাগরির দল কখনো হবেনা। নেতৃত্ব হয়তো সবসময় হাতে থাকেনা তবে এই রিয়াল মাদ্রিদকে কেউ সমীহ না করে এতো সহজে পার পাবেনা।
এবার আমি বলবো বার্সেলোনার কথা, হ্যাঁ বন্ধুরা এই বার্সেলোনা…..যেই দলের সাথে আমার ও আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে রয়েছে এক অভূতপূর্ব মিল!যেমন করে আমি চাইনা আমার শরীরের অভ্যন্তরের রোগ গুলো খুজে বের করে টেনশনে মরার আগে মরে যেতে!আর আমাদের দেশের মানুষের কথা যদি বলি, তাহলে এই বিষয়ে একটা বিশাল আকৃতির বই লিখা যাবে!তবে আজ আমি বলবো চলমান করোনা ভাইরাসের কথা। আমাদের দেশের মানুষ গুলো যেনো ভয়ে টেস্ট পর্যন্ত করাতে চাচ্ছেনা। যার দরুন আজ আঠারো কোটি মানুষের দেশে দিনে আঠারো হাজার টেস্ট পর্যন্ত হয়না!যেনো আল্লাহর উপর ভরসা করাই বান্দার সর্বোত্তম পন্থা ! আসলে রোগ বের হলে চিকিৎসা করতে হবে,অন্যদিকে ভীতু লোকেরা চায়না তাদের শরীরে কোনো রোগ বের হোক! কারণ তাতে করে একজন ভীতু লোক মৃত্যুর আগেই সে মানষিক ভাবে হাজারবার মরবে!!!
বর্তমান সময়ের বার্সেলোনা’র কথা বলতে গেলে এমন করেই বলতে হবে।বার্সেলোনা’র বর্তমান প্রেসিডেন্টের অবস্থা হয়েছে অনেকটা আমার মতো রোগাক্রান্ত ও ব্রেনে জং ধরা অটোম্যানদের মতো। এ যেনো একটা আবৃত অবস্থায় নিজেকে জোর করে ফেলে রাখা,ভিন্ন কিছু ভাবার মতো জায়গা যেখানে কোনো নেই! তবে সত্যি বলতে এমন অবস্থায় যদি আমি পড়তাম নিজের পদ ছেড়ে অন্যদের সুযোগ করে দিতাম।কেনো যেনো মনে হয় উনি আর এই দলকে কিছু দিতে পারবেন না!এটা একান্তই আমার নিজশ্ব মত। কারণ উনি যখন ২০১৪ সালে ক্লাবের প্রেসিডেন্ট পদে আসিন হয়ে এসেছিলেন তখন বার্সেলোনা ছিল ক্লাব ফুটবলে রাজত্বের আসনে।২০১৫ সালের পর থেকে বার্সেলোনা সোনালী সময়ের প্লেয়ার গুলো যখন যাওয়া শুরু করে তখন থেকেই বার্সেলোনা দূর্বল হতে থাকে। আর ২০১৭ সালে কফিনে শেষ পেরেক টি মারেন ব্রাজিলিয়ান সেনসেশন নেইমার। এরপর শুরু হয় দলের কাড়ি কাড়ি অর্থের অপব্যয় ও চুড়ান্ত অধপতন।
সেই থেকে মি.বার্তামেউ এখন পর্যন্ত শুধু টাকাই খরচ করেই যাচ্ছেন।আর তো ২০১৭ সালের পর থেকে দলে আসতে চাইছেনা কোনো হ্যাভিওয়েট কোচ। এমন সময় রিয়াল মাদ্রিদ দল আনে আনচেলত্তি ও জিদানের মতো মাস্টার মাইন্ড কোচ ও টনি ক্রুস, মদ্রিচের মতো ওয়ার্ল্ড ক্লাস মিডি,যারা ছিল ক্রিস্টিয়ানো’কে বল যোগানের মূল কারিগর। এই সময়ে রিয়াল আবার পুনরুদ্ধার করে তাদের হারিয়ে যাওয়া রাজত্ব।
বার্সেলোনার অতিত বর্তমান ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতঃবার্সেলোনার অহংকার বলতে অল্প কিছু নামের মধ্যে অন্যতম হলেন ইয়োহান ক্রুইফ।মূলত অল্প বলতে আমি এটাই বুঝিয়েছি যে বার্সেলোনার উল্লেখযোগ্য উত্থানের গল্পের শুরুটা হল ১৯৯১ সাল থেকে।ইয়োয়ান ক্রুইফের মতো কিংবদন্তি কোচ ও টিকিটাকার জনকের হাত ধরে বার্সেলোনার ঘরে আসে প্রথম ইউরোপিয়ান ট্রফি।অবশ্য ক্রুইফের অবদান শুধু এটুকু বলেই শেষ করা উচিত হবেনা।উনি হলেন বার্সেলোনার ইতিহাসে লয়্যালিটির সবচেয়ে সবচেয়ে বড় নক্ষত্র। একজন ভিনদেশী হয়েও বার্সেলোনাকে বানিয়ে ফেলেছিলেন নিজের বাড়ি।উনার সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময় হল আজকের লা মাসিয়া নামক বার্সা একাডেমি। উনার এমন ত্যাগের কথা বললে আরো অনেক কিছু নিয়ে বলা যাবে। এক সময়ের অতি সাধারণ একটা দল আজ ক্রুইফের জন্য জ্বলজ্বল করে আলো ছড়াচ্ছে।
অবশ্য একজন প্লেয়ার হিসাবে এই দলকে একবিংশ শতাব্দীর সেরা ক্লাবের অবস্থানে নিয়ে গেছেন লিওনেল মেসি নামক জীবন্ত কিংবদন্তি। যাহোক আমি আরেকটু পেছনে যেতে চাচ্ছি। বার্সেলোনাকে আরো উপরে নিতে যে ক’জন কারিগর কিংবদন্তি ক্রুইফের পর দূত হিসাবে এসেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হল তারই স্বদেশী ফ্রাংক রাইকার্ড ও কিংবদন্তি খেলোয়াড় রোনালদিনহো। ফ্রাংক রাইকার্ড ও রোনালদিনহো মিলে বার্সেলোনার প্রথম ইউরোপিয়ান ট্রফি জয়ের দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ পর দ্বিতীয় বারের মতো এই অসাধ্য সাধন করেছিলেন বার্সেলোনার হয়ে। এরই ধারাবাহিকতায় এসেছিলেন ইয়োহান ক্রুইফের ছাত্র পেপ গার্ডিওলা।তিনি ক্রুইফের শেখানো ট্যাক্টিস দিয়েই এই দলকে গড়ে তুলেছিলেন ইউরোপের সেরাদের সেরা দলে। পেপ এর আরেকটি বড় গুণ হল তিনি এই কাজটি করেছিলেন নিজেদের একাডেমির লা মাসিয়া’র খেলোয়াড়দের নিয়ে। এই দল থেকে ফুটবল বিশ্ব ও স্পেন পেয়েছিল কিংবদন্তি অনেকগুলো মহাতারকা।
অথপর একসময় পেপ গার্ডিওলা বিদায়ের পরও এই সাফল্য ছিল ধারাবাহিক।এবার ছিলেন লুইস এনরিকে।উনিও তার পূর্বসূরির পথ অনুসরণ করেছিলেন এবং দলকে অদম্য একটা জোটবদ্ধ ফুটবল খেলিয়ে সাফল্য চলমান রেখেছিলেন।
★ আজো মনে পড়ে রিয়াল মাদ্রিদের সেই গ্যালাক্টিকো দলের কথা!! আসলে সেটা গড়ে উঠেছিল বিশ্বব্যাপী পরিচিতি বাড়ানো ও তারকার মেলা দিয়ে তৈরি করা দলকে হাইলাইট করে অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি ক্ষমতার উচ্চশিখর পাকাপোক্ত করা!
সেই দলে ছিলেন না এমন বড় কোনো তারকা বাদ নেই!তবুও দল এনে দিতে পারেনি বড় কোনো ট্রফি। সত্যি বলতে রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাস ঘাটলে পাওয়া যায় সাফল্য ঠিক তাদের হাতে দিয়েই এসেছে যারা একটা দল হিসাবে পারফর্ম করেছে। আর সেই জেনারেশন ই হয়েছে রিয়াল মাদ্রিদের গোল্ডেন জেনারেশন।
★ এমন একটি জেনারেশন বার্সেলোনাও পেয়েছিল গত দশকের প্রথম দিকে। আর তাই তাদের সমস্ত বড় অর্জন ততটুকুই।যখনই তারা টাকা নিয়ে মাঠে নেমেছে তখনই তারা নিজেদের অর্থের কাছে পরাজিত হয়েছে!আজকের বার্সেলোনা’র সোনালী সূর্যের আলো পেতে আরো অনেক বেগ পেতে হবে!কারণ দলের সাপোর্টার এবং বোর্ড ঢেকে আছে তাদের আবেগ ও অদক্ষতার চাদরে। আর এটা থেকে তারা যতদিন বের হতে পারবেনা ততদিন চাইলে দলে এগারোটা মহা তারকা এনেও বড় কিছু পাবে বলে আমি মনে করিনা। বর্তমান অদক্ষ বোর্ডের অধীনে বড় কোনো কোচ ও আসতে চাইছেনা।
সবশেষে বলবো বার্সেলোনা যদি আবারো তাদের সেই হারানো গৌরব ফিরে পেতে চায় তাহলে এইসব ‘বি’ ক্যাটাগরির কোচ ফেলে দিয়ে ধীরস্থির ভাবে এগুতে হবে। প্রথমেই বড় কোন কোচের অধীনে অথবা দলের কোনো এক্স কিংবদন্তি যেমন জাভি দিয়ে শুরু করতে পারে। তবে আমি বলবো তাদের এই টিকিটাকা থেকে আপাতত সরে আসতে হবে, আর সেজন্যই আমার প্রথম পছন্দের নাম হল সেই পুরনো ফ্রাংক রাইকার্ড।যদিও এখন তাকে আনা অসম্ভব তবে পেপ গার্ডিওলা আসলেও ভালো হবে।
প্রিয় বার্সেলোনা সাপোর্টার ভাইয়েরা আপনাদের হয়তো মনে আছে পেপ কিন্তু এসেই প্রথম কোপটা দিয়েছিলেন দলের সবচেয়ে বড় নির্ভরশীল তারকা দিনহো’কে দিয়ে।এরপর সেমুয়েল ইতো সহ একে একে অনেক তারকা প্লেয়ারের কর্তৃত্ব ছেটে ফেলে দেন।দলে ভেড়ান একঝাঁক তরুণ ও ট্যালেন্ট খেলোয়াড়। যারা মূলত তার কথার বাইরে একটা স্টেপ পর্যন্ত দিবেনা। মোট কথা ট্যালেন্ট হলেও তুমি মাঠে আমার কামলা। তাই দলে যেই বোর্ডই থাকুক না কেনো কোচ কে দিতে হবে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা। হয়তো তেমন হলে আপনার অনেক প্রিয় প্লেয়ারকেই প্রিয় দলের হয়ে খেলতে দেখবেন না। মোট কথা ২০০৮ সালের মতো নতুন এক বার্সেলোনা।
আজকের মতো সবাইকে শুভ কামনা জানিয়ে এখানেই শেষ করছি। আল্লাহ হাফেজ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

8 + fifteen =