বার্সেলোনার নতুন রত্ন – কে এই ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং?

বার্সেলোনার নতুন রত্ন - কে এই ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং?

ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং কে? এই প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই হয়তো শুধু এটুকুই বলবেন যে সে হল্যান্ডের জাতীয় দলের একজন খেলোয়াড় যিনি মাত্র আয়াক্স থেকে বার্সেলোনাতে এসেছেন, এই দলবুলের বাজারে। এটুকু উত্তর তো খুব সহজ এবং সবাই জানি, আসুন দেখা যাক খেলার মাঠে তার বৈশিষ্ট্য এবং কিভাবে তিনি নতুন এক প্রতিভা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

২০১৭ সালের ২৬ নভেম্বর, আয়াক্স আমস্টারডাম বনাম রোডা ম্যাচ চলাকালীন ১-১ অবস্থায় দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামেন ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং এবং মাঠে তিনি আয়াক্সের আরেক তরুণ প্রতিভা, সেন্টারব্যাক ম্যাথিস ডি লিট এর পাশে রক্ষণভাগে খেলা শুরু করেন। ডি ইয়ং মাঠে নামার সাথে সাথে আয়াক্সের খেলার ধরণে যেন এক পরিবর্তন চলে আসে। সম্পূর্ণ এক নতুন দল হিসেবে খেলতে থাকে আয়াক্স। ডি লিট এর পাশাপাশি সেন্টারব্যাক হিসেবে খেলা সত্ত্বেও তিনি সকলের নজর কাড়েন তার নিখুঁত পাস দেওয়ার ক্ষমতার জন্য। ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং মাঠে নামার সাথে সাথে আয়াক্স এতো বেশি লং পাসিং নির্ভর ও আক্রমণাত্মক খেলতে থাকে যার সামনে রোডা কোনভাবেই রক্ষণকাজ ঠিকভাবে করতে পারছিল না। ম্যাচটি শেষ হয় আয়াক্সের ৫-১ গোলের জয়ের মাধ্যমে এবং সেই ম্যাচে ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং একাই ৩ টি গোলসহায়তা ও ৪ টি কি পাস্ প্রদান করেন। একজন সেন্টারব্যাক এইভাবে ম্যাচে প্রভাব ফেলতে পারে, এটা সচরাচর দেখা যায়না। কারণ ডি ইয়ং একজন সচরাচর ডিফেন্ডারদের মত ডিফেন্ডার নন। আয়াক্সের মূল দলে তার স্থানটি হঠাৎ করে হলেও খুব দ্রুত তার পজিশন ও খেলার ধরণ নিয়ে শুরু হয় আলোচনা ; এই আলোচনা ইউরোপ ছেড়ে ল্যাটিন আমেরিকা গিয়েও পৌঁছায়। আর্জেন্টিনা তে তাকে নিয়ে এখন অধ্যয়ন করা হয়, কিভাবে একজন যুব ফুটবলারকে গড়ে তোলা উচিত।

ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং এর মূল গুণ যদিও অফ দ্য বল মুভমেন্টের ক্ষেত্রে, অর্থাৎ বল ছাড়া অবস্থায় খেলা বুঝার ক্ষেত্রে, কিন্তু তারপরও বল পায়ে রেখে তার খেলার মাঝে রয়েছে এক আলাদা সৌন্দর্য। বল পায়ে যখন তিনি সামনে এগিয়ে যান তখন মনে হয় তিনি যেন হেঁটে যাচ্ছেন , বল সবসময় যেন পায়ের সাথেই লাগানো থাকে তাঁর এবং মাথা থাকে উঁচু অবস্থায় যার কারণে বল পায়ে থাকলেও পুরো মাঠের চিত্রটি তার নজরেই থাকে। বয়স মাত্র ২০ হলেও তার মাঝে পুরো দলের খেলা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আছে।

ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং এর বিশেষ কিছু বৈশিষ্ঠ্যের কারণে আয়াক্সের তৎকালীন কোচ পিয়েত কাইজার তার জন্য সম্পূর্ণ এক নতুন পজিশন বের করেন : ডিফেন্সের সামনে থেকে একইসাথে মিডফিল্ডার ও একই সাথে ডিফেন্ডারের কাজ করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় ডি ইয়ং কে। ডি ইয়ং আসলে কোন পজিশনে খেলেন সেই উত্তর দেয়া সহজ নয় মোটেও। সর্বপ্রথম মনে রাখতে হবে তিনি না একজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার আবার না একজন প্রথাগত সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার। একই সাথে তিনি ২ পজিশনেই খেলেন আবার কোনো পজিশনেই বাঁধাধরা খেলোয়াড় হিসেবে খেলেন না। এর ৪-৩-৩ ফর্মেশনে ডিফেন্ডার হিসেবে খেলা শুরু করলেও আয়াক্সের পায়ে বল থাকা অবস্থায় মিডফিল্ড পর্যন্ত উঠে যেতেন প্লেমেকিং পজিশনে, এমনকি দল যখন আক্রমণ করত, তখন দলের সাথে তিনিও আক্রমণভাগে সহায়তা করতেন। এর মাঝে পিয়েত কাইজারের জায়গায় আয়াক্সের কোচ হিসেবে দলে আসেন আদো তেন হাগ, এবং তিনিও ডি ইয়ং কে তার পূর্বের নিয়মেই খেলাতে থাকেন। নিচে থেকে এই ধরণের খেলা শুরু করার ক্ষমতার কারণে ডি ইয়ং এর সাথে পুরো আয়াক্স দলের খেলাই পরিবর্তন হয়ে যায়।

➡️এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং এর  আসল পজিশন কোনটি?

আয়াক্সের সাবেক কোচ পিটার বশ, যার অধীনে ডি ইয়ং এর অভিষেক হয়েছিল, তার বক্তব্য অনুযায়ী ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং হচ্ছে ডিফেন্সের সামনে মিডফিল্ডার। পিটার বশ বলেন , “আমি যখন ডি ইয়ং এর খেলা পর্যালোচনা করি তখন তার মাঝে দেখতে পাই প্রথাগত ‘নাম্বার ৬’ এর ছোঁয়া। খুবই আধুনিক এক মিডফিল্ডার সে। সে নম্বর ৬ হিসেবে খেলা শুরু করে একই সাথে নম্বর ৮ অথবা ১০ এর মত খেলার ও ক্ষমতা রাখে। ওর মাঝে অবিশ্বাস্য কিছু গুণাবলী রয়েছে এবং যে কেউ সেটি খেয়াল করতে পারে। ”

ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং নিজেও একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “রক্ষণভাগে ডিফেন্ডার হিসেবে খেলার বিষয়টাকে আমি শুধুমাত্র একটি সাময়িক এক্সপেরিমেন্ট হিসেবে দেখছি ; এই পজিশনে আমি দীর্ঘ সময় খেলতে চাইনা। আমি সবসময় মিডফিল্ডে খেলেছি এবং নিজেকে মিডফিল্ডার হিসেবেই মনে করি। ”

➡️তার পজিশন বুঝার জন্য কার সাথে তুলনা দেয়া যেতে পারে ?

ডি ইয়ং এর খেলার বৈশিষ্ঠ্যের কারণে বর্তমান সময়ের কোনো খেলোয়াড়ের সাথেই তার মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। যখন তিনি মিডফিল্ডে খেলেন তখন তার মাঝে রিয়াল মাদ্রিদের ক্রোয়েশিয়ান মিডফিল্ডার লুকা মডরিচ এর কিছুটা মিল যাওয়া যায় টেকনিক্যাল ক্ষমতার কারণে, আবার বার্সেলোনার ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার সার্জিও বুসকেটস এর সঙ্গেও তাঁর মিল পাওয়া যায় খেলায় কখন কি হচ্ছে সেটা বুঝতে পারার ক্ষমতার কারণে। সম্প্রতি হল্যান্ডে কেউ কেউ তাকে কিংবদন্তি ডাচ মিডফিল্ডার ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ডের সাথে তার তুলনা দিচ্ছেন, যদিও দুজনের শারীরিক গঠন ও ক্ষমতায় রয়েছে অনেক পার্থক্য।

হল্যান্ডে কেউ কেউ আবার তাকে জার্মান কিংবদন্তি ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার এর সাথেও তুলনা দিচ্ছে। ৭০ দশকের ডাচ জাতীয় দলের লিজেন্ডারি খেলোয়াড় আরি হান যিনি বেকেনবাওয়ার এর বিপক্ষে খেলেছেন অনেক বার কিছুদিন আগে ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং কে বেকেনবাওয়ার এর সাথেই তুলনা দিয়েছেন। ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং এর পজিশন বুঝানোর জন্য কেউ কেউ “ফলস মিডফিল্ডার” শব্দটিও ব্যবহার করেছে।

➡️এই সবকিছু হয়েছে হল্যান্ড ও আয়াক্স আমস্টাডামে খেলার প্রেক্ষেলেছেঢতে ; এখন তাকে তার পুনরাবৃত্তি করতে হবে বার্সেলোনার প্রেক্ষিতে। তবে বার্সার খেলার দর্শন ও ডি ইয়ং এর খেলার ধরণ অনেকটা একই সূত্রে গাঁথা আর তাই হয়তো বার্সা মাত্র ২১ বছর বয়সী এক যুবকের জন্য এতো বড় অংকের টাকা ঢেলেছে। খেলার মাঠে তিনি এখনও নিজেকে গড়ছেন, ভবিষ্যতে তাকে ভিন্ন কোনো পজিশনেও দেখা যেতে পারে। সময় বাকিটুকু বলে দিবে।

 

লিখেছেন – আরাফাত ইয়াসের

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

seven + 14 =