বার্নলির অপ্রত্যাশিত উত্থান : ম্যানেজার শন ডাইচের ভিন্নধর্মী কৌশল

বার্নলির অপ্রত্যাশিত উত্থান : ম্যানেজার শন ডাইচের ভিন্নধর্মী কৌশল

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের এ মৌসুমের অর্ধেক শেষ। লিভারপুল, চেলসি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ম্যানচেস্টার সিটি, আর্সেনাল, টটেনহ্যাম হটস্পার, লেস্টার সিটি – লিগের রাঘব বোয়ালরাই মূলত প্রথম ৬-৭টা পজিশানে প্রত্যেকবার থাকলেও এভারটন, ওয়াটফোর্ড, সাউদাম্পটন, স্টোক সিটি – এসব ক্লাবগুলো নিজেদের দিনে যেকোন বড় দলকেই হারিয়ে দিতে পারে। যেকোন দলেরই এরকম যেকোন দিন হুট করে জিততে পারার জন্যই মনেহয় প্রিমিয়ার লিগকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগ বলা হয়। এই কথাটা প্রমাণ করার জন্য এবার বার্নলির প্রচেষ্টাটা বেশ করে চোখে পড়ছে। কারণ লিগের মোটামুটি অর্ধেক শেষ হবার পরেও লিভারপুল, টটেনহ্যাম, লেস্টার সিটিকে টপকে বার্নলির অবস্থানটা লিগ টেবিলে পঞ্চম! আর এর পেছনে সর্বাধিক অবদান অবশ্যই বার্নলির ম্যানেজার শন ডাইচের।

প্রিমিয়ার লিগের প্রথম রাউন্ডে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন চেলসিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে অঘটন ঘটিয়েই এবারের মৌসুমে শুরু হয় বার্নলির। ম্যানেজার শন ডাইচ বোধহয় তখনই সবাইকে একটা ধারণা দিয়ে দিয়েছিলেন যে এই মৌসুমে লিগের বড়ভাইদের পাঞ্চিং ব্যাগ হিসেবে কাজ করার জন্য খেলবে না বার্নলি। মৌসুমের অর্ধেক শেষ, এই আঠারো ম্যাচে মোটামুটি সে কতাটাই বারবার প্রমাণ করে যাচ্ছে তারা। চেলসির সাথে জিতে মৌসুম শুরু করা বার্নলি এরপর ড্র করেছে লিভারপুল আর টটেনহ্যামের সাথে। আর্সেনাল আর লেস্টারের সাথে হারলেও দুটো ১-০ স্কোরলাইন প্রমাণ করে বার্নলির সাথে ম্যাচটা মোটেও সহজ ছিল না আর্সেনাল আর লেস্টারের জন্য।

এই ১৮ ম্যাচের মধ্যে বার্নলি হেরেছে মাত্র ৪টা ম্যাচ। বলে রাখা ভালো, এর থেকে কম ম্যাচ এই পর্যন্ত হেরেছে শুধু ম্যানচেস্টার সিটি (০), লিভারপুল (২) আর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড (৩)। বার্নলির সমান ৪টা ম্যাচ হেরেছে গত মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন চেলসি। বার্নলি এই চারটা ম্যাচ হেরেছে আর্সেনাল, লেস্টার সিটি, ম্যানচেস্টার সিটি আর ওয়েস্ট ব্রমউইচ অ্যালবিওনের সাথে। তবে একটা জিনিস লক্ষ্যণীয়, বার্নলির ম্যাচগুলোর স্কোরলাইন দেখলে দেখতে পাবেন, একমাত্র চেলসির সাথে প্রথম ঐ ম্যাচটা আর পরে বোর্নমাথের সাথে ম্যাচটা ছাড়া বাকী যে সাতটা ম্যাচ তারা এই পর্যন্ত জিতেছে, প্রত্যেকটা ম্যাচই ক্লিনশিট রেখেই জিতেছে, অর্থাৎ প্রতিপক্ষকে কোন গোল দিতে দেয়নি। আর জেতা ম্যাচের কোনটাতেই দুটোর বেশী গোল দেয়নি। আর যেসব ম্যাচ হেরেছে, সে চারটা ম্যাচের মধ্যে শুধুমাত্র ম্যানসিটিই তাদের একাধিক গোল দিয়ে হারাতে পেরেছে।

আর এখানেই মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে বার্নলির কোচ শন ডাইচের কৌশলটা – গোল যেহেতু করতে পারছি না, গোল খাবো ও না!

বার্নলির অপ্রত্যাশিত উত্থান : ম্যানেজার শন ডাইচের ভিন্নধর্মী কৌশল
শন ডাইচ

বার্নলির স্কোয়াডটার দিকে তাকিয়ে দেখুন, কোন পরিচিত নামকরা খেলোয়াড় পাবেন না – আর না পাওয়াটাই স্বাভাবিক। মোটামুটি বার্নলিতে খেলে সুপারস্টারডম পাওয়া খেলোয়াড়েরা এই মৌসুম শুরুর আগেই অপেক্ষাকৃত অন্য ক্লাবে চলে গেছেন (যেমন সেন্টারব্যাক মাইকেল কিন চলে গেছেন এভারটন, দুই মৌসুম আগে স্ট্রাইকার ড্যানি ইংস চলে গেছেন লিভারপুলে, রাইটব্যাক কিয়েরান ট্রিপিয়ের পাড়ি জমিয়েছেন টটেনহ্যামে)। কোচ শন ডাইচ জানেন অল্প বাজেটের দল নিয়ে অল্প পরিচিত খেলোয়াড়দের নিয়ে খেলতে হলে অতিরিক্ত ডিফেন্সিভ ট্যাকটিকস নিয়েই খেলতে হবে।

আর এই ডিফেন্সিভ ট্যাকটিকসটারই নাম – “লো ব্লক ট্যাকটিকস”

কি এই লো ব্লক ট্যাকটিকস?

সোজা বাংলায় এটা “পার্ক দ্য বাস” এরই আরেকটা রূপ। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বর্তমান কোচ হোসে মরিনহো যে ট্যাকটিকসের জন্য নন্দিত বা নিন্দিত।

এই মৌসুমে বার্নলির ম্যাচগুলোর দিকে লক্ষ্য করুন। যেটা বললাম একটু আগে, যেসব ম্যাচ তারা জিতেছে, সেগুলোর প্রায় প্রত্যেকটাতেই তারা কোন গোল না খেয়ে ১-২ গোলের ব্যবধানে ১-০ বা ২-০ স্কোরলাইনে জিতেছে। ড্র হওয়া ম্যাচগুলোর স্কোরলাইন 0-0 কিংবা ১-১। বোঝাই যাচ্ছে, বার্নলির ম্যাচগুলো গোলপ্রেমী মানুষদের জন্য দৃষ্টিসুখকর কিছু না। এই আঠারো ম্যাচের মধ্যে বার্নলি এই পর্যন্ত গোল দিয়েছে ১৬টা, খেয়েছে ১২টা। ১৬টা গোল দিয়েছে নিউক্যাসল ইউনাইটেডের মত দল এখন আছে প্রিমিয়ার লিগের রেলিগেশান জোনে। নিউক্যাসলের সাথে বার্নলির পার্থক্যের জায়গাটাই তাই হয়েছে বার্নলির কম গোল খাওয়াটা – যে কারণে তারা এখন পয়েন্ট তালিকার ৫ নাম্বারে। ম্যানচেস্টারের দুই দল ছাড়া বার্নলির থেকে কম গোল লিগে আর কেউ খায়নি এই মৌসুমে।

বার্নলির কোচ শন ডাইচকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, দেওয়া হয়েছে সময়। বছর পাঁচেক আগে বার্নলির ম্যানেজার হওয়া এই কোচ যথেষ্ট সময় পেয়েছেন নিজের আইডিয়া নিজের ট্যাকটিকসটার সফল প্রয়োগ ঘটানোর। যেটার সুফল বার্নলি এখন পাচ্ছে। ফলে ইংস, ট্রিপিয়ের, কিন রা চলে গেলেও দলবদলের বাজারে নিজেদের আদর্শের খেলোয়াড় খুঁজে নিয়ে দলে খেলাতে সমস্যা হচ্ছেনা বার্নলির। ইংলিশ লিগের কয়টা ম্যানেজার বলতে পারবেন – এক আর্সেন ওয়েঙ্গার ছাড়া – যে তাঁর আদর্শের সঠিক বাস্তবায়ন করার জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়েছে? নিজের আদর্শের খেলোয়াড়কে দলে নিয়ে এসে তাদের পারফরম্যান্সকে উন্নত করা – এই টোটকার জন্যই গত দুই বছরে বার্নলি থেকে পাঁচজন ইংল্যান্ডের হয়ে অভিষিক্ত হয়েছে – মাইকেল কিন, কিয়েরান ট্রিপিয়ের, ড্যানি ইংস, টম হিটন, জ্যাক কর্ক। ডাইচ শুধু সেসব খেলোয়াড়দেরকেই দলে আনেন, যাদের তিনি উন্নত করতে পারবেন, তাঁর ট্যাকটিকসের মধ্যে সমন্বয় করতে পারবেন।

বার্নলির এই লো ব্লক ট্যাকটিকস খুবই সাধারণ ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। ৪-৪-২ বা ৪-৪-১-১ ফর্মেশানে তারা সরাসরি আক্রমণ করে, কোন অতিরিক্ত পাস বা বল পজেশানে রাখার আড়ম্বর নেই যেখানে, আর রক্ষণ করে অনেক নিচে নেমে। ৪-৪-২ বা ৪-৪-১-১ এই ফর্মেশানে গোলরক্ষক টম হিটন বা নিক পোপের সামনে দুজন সেন্টারব্যাক বেন মি আর জেইমস টারকোস্কি খুব কাছাকাছি অবস্থান করেন, ডিবক্সের মধ্যে। দুই ফুলব্যাক – ডানদিকে ম্যাট লোটন (কিংবা কখনো ফিল বার্ডসলি) আর বামদিকে স্টিফেন ওয়ার্ডও সুযোগ পেলে উপরে না উঠে ডিবক্সের পাশেই থাকেন। ডিফেন্সই থাকে এই চারজনের মূল লক্ষ্য। সামনে চারজন মিডফিল্ডারের মধ্যে দুজন থাকেন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার, আর দুজন ওয়াইড মিডফিল্ডার। এই দুজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের মধ্যে একজন – জ্যাক কর্কের কাজ হল দুই সেন্টারব্যাকের মধ্যে থেকে অনেকটা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের মত দলের রক্ষণটাকে আরেকটু শক্তিশালী করা। আর তাঁর সাথে যে দ্বিতীয় সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার থাকেন (অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেলজিয়ান সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার স্টিভেন ডিফোর), তাঁর কাজ হল কর্কের থেকে অপেক্ষাকৃত একটু বেশী আক্রমণে যাওয়া, তবে অবশ্যই রক্ষণকে ভুলে গিয়ে নয়। দুই ওয়াইড মিডফিল্ডারের ভূমিকা পালন করেন স্কট আরফিল্ড, ইয়োহান বার্গ গুডমন্ডসন, রবি ব্র্যাডি – এদের মধ্যে যেকোন দুইজন। এই দুই ওয়াইড মিডফিল্ডারেরও বেশী উপরে ওঠার লাইসেন্স নেই – দুই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের সাথে মোটামুটি এক লাইনেই অবস্থান হয় তাদের। ফলে গোলরক্ষকের সামনে ডিফেন্সের দুটো লাইন থাকে, এটা বললেও অত্যুক্তি হয়না।

বার্নলির অপ্রত্যাশিত উত্থান : ম্যানেজার শন ডাইচের ভিন্নধর্মী কৌশল

উপরে দুইজন স্ট্রাইকারের একজন থাকেন প্রথাগত গোলশিকারী, যার শারীরিক গঠন ও ডিবক্সে নড়াচড়া করাটা সেরকম সমীহ জাগানিয়া হতে হবে। এ ভূমিকায় গত মৌসুমে ছিলেন আন্দ্রে গ্রে, তাঁর চলে যাওয়ার পর এই মৌসুমে এই দায়িত্বটা দেওয়া হয়েছে লিডস ইউনাইটেড থেকে আসা গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়নশিপের সর্বোচ্চ গোলদাতা নিউজিল্যান্ডের স্ট্রাইকার ক্রিস উডকে। উডের সাথে আরেকটা যে স্ট্রাইকার থাকে, তাঁর ভূমিকাটা হয় ৪-৪-২ ফর্মেশানে সহকারী স্ট্রাইকারের, কিংবা ৪-৫-১ ফর্মেশানে আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারের। যার কাজই হল মিডফিল্ড বা ডিফেন্সের ক্লিয়ার করা বল নিচে নেমে যোগাড় করে উপরে ক্রিস উডকে পাঠানো। এ ভূমিকায় থাকেন অ্যাশলি বার্নস, জেফ হেনড্রিকস কিংবা জোনাথান ওয়াল্টার্সের মধ্যে যেকোন একজন। মোটামুটি ফর্মেশানটা হয় এরকম –

বার্নলির অপ্রত্যাশিত উত্থান  ম্যানেজার শন ডাইচের ভিন্নধর্মী কৌশল

ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার জ্যাক কর্ক আর দুই সেন্টারব্যাক বেন মি ও জেমস টারকোস্কি এই স্টাইলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিন খেলোয়াড়। বার্নলির এই স্টাইলের ফলে প্রতিপক্ষ দল মিডফিল্ড থেকে অনেক শট করার জায়গা পায় গোলমুখ বরাবর, যার কারণে শট ব্লক ও ক্লিয়ার করার অনেক সুযোগ আসে বার্নলির সামনে। আর বলা বাহুল্য, ম্যানেজার শন ডাইচও এটাই চান যাতে প্রতিপক্ষ দল তাদেরকে শট করেন – কারণ মি, টারকোস্কি ও কর্ক, প্রত্যেকেই শট ব্লক করা ও ক্লিয়ারেন্স করার ক্ষেত্রে অনেক পটু। দুই সেন্টারব্যাক মি আর টারকোস্কি একদম গোলরক্ষকের সামনে থাকেন, দুই ফুলব্যাক লোটন আর ওয়ার্ডকেও দুই সেন্টারব্যাকের সাথে মোটামুটি একই লাইনে রাখা হয় আক্রমণ করার লাইসেন্স না দিয়ে, আর ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার জ্যাক কর্কের কাজ হয় মি-টারকোস্কির মধ্যে থেকে পরিচালিত হবার। এর ফলে যেটা হয় সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার দুইজনের সামনে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার/সহকারী স্ট্রাইকারের (হেনড্রিক/বার্নস/ওয়াল্টার্স) পেছনে অনেক ফাঁকা জায়গা থাকে, যে জায়গায় প্রতিপক্ষ দল নিজেরা খেলতে পারে। দুই ফুলব্যাক আর দুই ওয়াইড মিডফিল্ডারের কেন্দ্রমুখী অবস্থানের কারণে, অর্থাৎ মাঠের বেশী পাশে না যাবার প্রবণতার কারণে প্রতিপক্ষ দল ক্রস করতে পারে অনেক বেশী, যে ক্রস মি-টারকোস্কি-কর্ক সমানে ক্লিয়ার আর ব্লক করতে থাকেন। সেই ক্লিয়ার করা বল সংগ্রহ করে উপরে ওঠার দায়িত্বটা থাকে স্টিভেন ডিফোর আর সহকারী স্ট্রাইকার হেনড্রিকের উপর। যিনি উপরে থাকা ক্রিস উডকে বল দেন গোল করার জন্য।

বার্নলির এই লো ব্লক ট্যাকটিকসের সফলতা নির্ভর করে দলের একটা ইউনিট হিসেবে খেলার মধ্যে। সমষ্টিগতভাবে না খেললে এই ফর্মেশানে সফলতা লাভ করা অসম্ভব, যে কারণে বাজারে থাকা অধিক প্রতিভাবান বা অধিক পরিচিত খেলোয়াড়দের পিছে না গিয়ে কোচ শন ডাইচ সবসময় সেসব খেলোয়াড়ই কেনেন যারা তাঁর স্টাইলে খেলতে পারবে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

fourteen − six =