বাঘ-সিংহের লড়াইয়ের আগে

অনেক “যদি”, “কিন্তু”, “হয়তোবা” মাথায় রেখে বাংলাদেশ আর শ্রীলংকার ম্যাচের আগের কথাগুলো লিখতে হচ্ছে । খেলাধুলার ব্যাপারটাই এমন ! ফুটবলের মাঠের খেলা হয় ৯০ মিনিট , কিন্তু তা মানুষের মুখে ঘুরতে ঘুরতে আর মাঠের ৯০ মিনিটে আটকে থাকে না । তারচেয়ে অনেক বড় ! অনেক বিশাল ! ক্রিকেটটাও অমন ! মাঠের ১০০ ওভারের খেলার চাইতে মাঝে মাঝে বিশালতর হয়ে উঠে ম্যাচের আগের পারিপার্শ্বিকতা ।

• “যদি” শ্রীলঙ্কা আফগানদের সাথে ৫১-৪ এর পর আর মাথা তুলে না দাঁড়াতে পারত ? যদি মাহেলা অফফর্মকে বিদায় জানানো শতকটা না হাঁকিয়ে দিতেন ? যদি ডুনেডিনে সেদিন ম্যাচশেষে শ্রীলংকার শেষ দুই ব্যাটসম্যানকে মাথা নিচু করে বের হতে হত ? “তাহলে হয়তোবা”, বাংলাদেশই থাকত কালকের বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা ম্যাচের পরিষ্কার ফেবারিট ।
• “যদি” দুই ম্যাচে ৩ পয়েন্ট পাওয়া বাংলাদেশ শিবিরে আকস্মিক আলামিন-ঝড় হানা না দিত ? যদি শফিউলকে হুড়মুড় করে অস্ট্রেলিয়ার বিমান ধরতে না হত ? “তাহলে হয়তোবা”, ম্যাচের আগে টাইগার শিবির নিয়ে এতোটা কানাঘুষা এর ওর মুখে ঘুরে বেড়াত না ।
বাস্তবতাটা অন্যরকম ! ম্যাচের আগের রাতের হিসেবটাও তাই বদলে যাচ্ছে আমূল ! আর তাইতো , ঘোর আবেগপ্রবণ বাংলাদেশি হয়েও ম্যাচের পাল্লাটাকে আপনার মনে হবে যেন ৬০-৪০ এ শ্রীলংকার দিকে হেলে আছে ।

যদি কাগজ-কলমের হিসাব নিকাশে যেতে হয় ম্যাচের আগের দিন শ্রীলংকাকে এগিয়ে রাখতে হবে ব্যাটিং অর্ডারে দুই মহারথি কুমার সাঙ্গাকারা আর মাহেলা জয়াবর্ধনের উপস্থিতির কারণে । দুইজনের সম্মিলিত ম্যাচসংখ্যা ৮৪২ টি। ২৬০০০ এর কাছাকাছি ওয়ানডে ক্যারিয়ার রান । এর মধ্যে কুমার সাঙ্গাকার দুর্নাম আছে বাংলাদেশের সাথে সবসময় বেশিই ভালো খেলার । বাংলাদেশের সাথে ৪টা শতক আর ৬টা ফিফটি আছে সাঙ্গার ঝোলায় । সাঙ্গার মতো গ্রেটদের দুটো ইনিংস খারাপ গেলে ভয় পেতে হয় প্রতিপক্ষকে । কারণ পুষিয়ে দেওয়া ঝড়টা আসতে পারে যেকোনো দিন । আগের দুই ম্যাচের ৭ আর ৩৯ রানের ইনিংস দুটো ঠিক যায় না সাঙ্গাকারার নামের সাথে । বিস্ফোরনটা হতে পারে যেকোন ম্যাচেই ! যেকোন দিন ! খুব করে চাইব , দিনটা ২৬ ফেব্রুয়ারি না হোক !

বাংলাদেশের ভয়টা কিন্তু ওদের দুজনকেই
বাংলাদেশের ভয়টা কিন্তু ওদের দুজনকেই

গেল ম্যাচে জাত চেনানো মাহেলা জয়াবর্ধনে চাইবেন ২০১০ এ ঢাকায় করা সেঞ্চুরির পুনরাবৃত্তি করতে ।
অভিজ্ঞতায় ততোটা ঋদ্ধ না হলেও বাংলাদেশ শিবিরের ঠিক এই জায়গাটায় ভরসা করতেই পারে সাকিব আল হাসান আর মুশফিকুর রহিমের উপর । তার অনেকটা এ দুইজনের সাম্প্রতিক ফর্ম, আবার অনেকটা আগের ম্যাচে পাওয়া আত্মবিশ্বাসের জ্বালানিটার কারণে । আর তার সাথে গেলো কয়েক বছর এই দুজন দলকে অনেক বিপদের পরিস্থিতির হাত থেকে বাঁচিয়েছেন । স্লথ ব্যাটিং এর পরে রানরেট মেরামতের ডিউটিই হোক আর চটজলদি উইকেট পড়ার পরে নেমে ইনিংস মেরামতের দ্বায়িত্বই হোক , চাপটা এই বয়সেই বেশ ভালো নিতে পারেন মুশফিকুর রহিম আর সাকিব আল হাসান । তবে বাংলাদেশের বোলিং লাইনকে মাথায় রাখতেই হবে , সাঙ্গা বা জয়া- এদের মধ্যে যেকোন একজনের একটা ভালো দিন বা একটা ভালো ইনিংস ম্যাচ থেকে ছিঁটকে দিতে পারে বাংলাদেশকে ।

দারুন ফর্মে সাকিব আল হাসান আর মুশফিক
দারুন ফর্মে সাকিব আল হাসান আর মুশফিক

তারপরের জায়গাটায় তাকালে একটু হতাশ আমাদের হতেই হবে ! পাল্লার একপাশে এঞ্জেলো ম্যাথুস-থিসারা পেরেরার পাশে সাব্বির আর নাসিরদের যেনো একটু বেশিই হালকা মনে হয় । এশিয়া কাপের কীর্তির পরে থিসারা পেরেরাকে ভোলার কোন কারণ হয়তো বাংলাদেশের নেই । নেতৃত্ব পাওয়া এঞ্জেলো ম্যাথুস নিয়মিত রান পাচ্ছেন । শেষ তিনটে ওয়ানডে ইনিংসে ম্যাথুসের সংগ্রহ ৪৪, ৪৬ আর ৫৮ । ৪০ এর উপরে ব্যাটিং গড় আর সাড়ে ৪ এর আশেপাশে ইকোনোমি রেট বলে ৬ নাম্বারে বা ৭ নাম্বারে একজন এঞ্জেলো ম্যাথুস দলে একজন পূর্ণ ব্যাটসম্যান বাড়িয়ে দেয়, আবার একজন বোলার এঞ্জেলো ম্যাথুস বলটাও করতে পারেন যেকোন সময়। বোলার ম্যাথুসের বড় শক্তি ইনিংসের যে কোন সময়ে বল করতে দিলে করণীয়টা খুব ভালো বোঝেন । প্রথম দিকে মালিঙ্গা বা সুরঙ্গা লাকমালরা পিটুনিটা বেশি খেয়ে গেলে ম্যাথুস এসে গুড লেংথে বল রেখে রানের রাশও টেনে ধরতে পারেন আবার পরের দিকে বলটা হাতে নিলে অনেক কম জায়গা দিয়ে বল করতে পারেন ব্যাটসম্যানকে ।

শেষের ওভারগুলোয় ম্যাথুস আর পেরেরাকে থামানোই চ্যালেঞ্জ
শেষের ওভারগুলোয় ম্যাথুস আর পেরেরাকে থামানোই চ্যালেঞ্জ

এই বিশ্বকাপের প্রায় প্রতিটা ম্যাচেই স্লগ ওভারে রান আসছে দেদারসে । সেদিক থেকে বাংলাদেশ একটু হলেও পিছিয়ে থাকবে । সাব্বির আর মাশরাফির বড় শট খেলার শক্তিটা আছে । কিন্তু বাস্তবতার নিরীখে বিচার করতে গেলে ওদের পেরেরা আর ম্যাথুসের কাছে আমাদের লোয়ার মিডল অর্ডারটাকে আসলেই একটু হীনবল লাগে !
নিউজিল্যান্ড ম্যাচে ৯ ওভারে ৮৪ রান দেওয়া মালিঙ্গা আফগানদের সাথে ৩ উইকেট পেয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন লোয়ার মিডল অর্ডারে স্লগারের অভাবে ভুগতে থাকা বাংলাদেশের জন্যে শেষের দিকে ঝড়ের গতিতে রান তোলাটা হবে দুরূহ কাজ । বাংলাদেশের মাঠ মালিঙ্গার জন্যে পয়া, ক্যারিয়ারের শেষ ২টি ৫ উইকেটই যে এসছে ফতুল্লা আর মিরপুরে । প্রতিপক্ষ বাংলাদেশকে পয়া বানানোর চেষ্টাটা মালিঙ্গার থাকবে ভালোমতোই ।আর মুরালি-পরবর্তী শ্রীলংকার স্পিনকে আলো দেখানো রঙ্গনা হেরাথ তার নিয়ন্ত্রিত ফ্লাইটে ব্যাটসম্যানকে বোকা বানাতে পারেন যেকোনো সময় ।

স্লগের আতঙ্ক মালিঙ্গা
স্লগের আতঙ্ক মালিঙ্গা

ভাস-মুরালির সময়কার মত ততোটা দুমড়ে মুচড়ে দেয়া না হলেও আপনি দুর্বল বলতে পারবেন না এই শ্রীলংকার বোলিং লাইনকেও । তবে লঙ্কার যদি মালিঙ্গা- লাকমল থাকে , তবে আস্তে কথা বলবে না বাংলাদেশও । মাশরাফি মুর্তজার ভালো দিনে কার্ডিফে গিলক্রিস্ট হোক আর ত্রিনিদাদে শেবাগ হোক, কুপোকাত হতে হয় সবাইকেই ! পাশে পাচ্ছেন ভয়ডরবিহীন তাসকিন আহমেদকে । যার সময়টা শুধুই সামনের দিকে তাকানোর । আর জোরে বল করার ! তবে রুবেলের কাছে বাংলাদেশের চাওয়া থাকবে তার ফাস্ট বোলারসুলভ শরীরী ভঙ্গির সাথে দারুন নিয়ন্ত্রন । তবে দিলশান আর থিরিমান্নের আসল মনোযোগটা থাকবে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজাকে বিপদ ছাড়া পার করে দেওয়ার দিকে ।

বয়সটা বাড়লেও আগুনটা কমে নি ম্যাশের !
বয়সটা বাড়লেও আগুনটা কমে নি ম্যাশের !

ব্যাটিং এ ফ্লাইং স্টার্ট বলতে যা বোঝায়, সেটা বাংলাদেশ পাচ্ছে না । আনামুল আর তামিম থিতু হতে সময়টা একটু বেশিই নিয়ে নিচ্ছেন । রেগুলেশন স্পিনে মাঝের ওভারগুলোয় যেখানে প্রতি ওভারে চারটে করে বা তিনটে করে সিঙ্গেলস আসে সহজে , সেখানে তামিম আর আনামুলকে যেনো খুঁজেই পাওয়া যায় না একটু আঁটসাট বোলিং আর ফিল্ডিং হলে । এবং শেষমেষ চাপটা সরে যাচ্ছে পরের ব্যাটসম্যানদের দিকে । আর দিনশেষে প্রথম দিকে উইকেট বাঁচিয়ে খেলা বাংলাদেশ শেষমেষ পুরো ৫০ ওভার না খেলেই হয়ে যাচ্ছে অলআউট । ২০ বা ২৫ ওভারের ওপেনিং জুটি বাংলাদেশ চাইবে আর তার সাথে চাইবে এই ওভারগুলোয় যাতে চার বা সাড়ে চারের আশেপাশে রান উঠে । ভাল শুরুর ইঙ্গিত দিয়ে ক্রস ব্যাটে খেলে আউট হয়ে গেলেও নবাগত সৌম্য সরকার ইঙ্গিত দিয়েছেন দারুন কিছু করে দেখানোর ।

বুনো তামিমের দেখা নেই অনেকদিন !
বুনো তামিমের দেখা নেই অনেকদিন !

মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড অস্ট্রেলিয়ার সবচাইতে বিখ্যাত মাঠগুলির একটি । এই ভেন্যুতে খেলা ম্যাচগুলোয় ওভারপ্রতি গড়ে সাড়ে চারের আশেপাশে রান উঠেছে । ব্যাট আর বলের লড়াইটা এখানে প্রায় সমানে সমানে হয় । বিশ্বকাপের শুরুর দিনে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের ম্যাচের ভেন্যুও ছিলো এই মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড !

২০০৩ সালে ভাস-লজ্জার পরে ২০০৭ সালেও বাংলাদেশকে শ্রীলংকার সাথে পেতে হয়েছে ১৯৮ রানের বিশাল ব্যবধানে পরাজয়ের লজ্জা । ৮ বছর পরের বাংলাদেশ অনেক প্রফেশনাল ! অনেক তারকাপূর্ণ ! এক আশরাফুল ছাড়া সেই বাংলাদেশে ম্যাচ উইনার ছিলো না ! সাকিব আল হাসান-মুশফিকুর রহিম আর মাশরাফির বাংলাদেশের সাথে কাগজে কলমে সাঙ্গা-জয়া আর ম্যাথুসের শ্রীলংকার ব্যবধান ঠিক ততোটা না, যতোটা ছিলো মুরালি-ভাস আর জয়সুরিয়ার লঙ্কার সাথে বাশার আর আশরাফুলের বাংলাদেশের । তাই , স্বপ্নটা বাংলাদেশ দেখতেই পারে । তবে ম্যাচের আগে খেলার বাইরে আলামিনকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া আর বড় আসরে প্রত্যাশামত খেলতে না পারার খারাপ ইতিহাসটা বাংলাদেশকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেয় আবার ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

10 − 7 =