বাঁ পা এবং একজন জাদুকর…

দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা বা দিয়েগো ম্যারাডোনা। এই নামটি শুধু কোন নাম নয়। DM10 একটি ইতিহাস এবং একটি আখ্যানের নাম। যে আখ্যানে রয়েছে উত্থান-পতন এবং রোমাঞ্চের বিস্ময়কর মিশ্রণ। দিয়েগো নামটি একটি ব্র্যান্ড, পৃথিবীর সব চাইতে দামি ব্র্যান্ড। এই নামে পরিচিত হয় একটি জাতি, এই নামে আবেগময় হয়ে উঠে একটি খেলা, এই নামে আলোড়িত হয় বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি মনুষ্য হৃদয়।

 

maradona1

আজ থেকে অর্ধ-শতাব্দী আগে ১৯৬০ সালের ৩০শে অক্টোবর, বুয়েন্স এইরেস- এর এক বস্তিতে জন্ম নেন ফুটবল ইতিহাসের উজ্জ্বলতম এই নক্ষত্র। ক্ষুধা-দারিদ্র্য,

শারিরীক ক্ষীণতা প্রভৃতি প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে ম্যারাডোনা, ম্যারাডোনা হয়ে উঠেন সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায়।

২০ অক্টোবর ১৯৭৬ সালে পেশাদার ফুটবলার হিসেবে খেলা শুরু করেন এক সময়ের ‘বল-বয়’ দিয়েগো। ‘আর্জেন্টাইন জুনিয়রস্‌’-এ ১৯৭৬-১৯৮১ সালে ১৬৭ ম্যাচে করেছিলেন ১১৫ গোল। এরপর ‘বোকা জুনিয়রস্‌’-এ আসেন ১ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফী-তে। ১৯৮২ সালে ‘বোকা’-র হয়ে প্রথম লিগ শিরোপা জিতেন ম্যারাডোনা।

cristiano-ronaldo-453-diego-armando-maradona-running-at-a-game-for-barcelona

৮২’র বিশ্বকাপের পর ম্যারাডোনা যোগ দেন স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনায়। ম্যারাডোনাকে পেতে বার্সাকে খরচ করতে হয়েছিল ৫ মিলিয়ন ইউরো, যা ছিল তখনকার বিশ্ব-রেকর্ড। বার্সার হয়ে জিতেন ‘কোপা ডেল রে’ এবং ‘স্পানিশ সুপার কাপ’। ১৯৮৪ সালে ম্যারাডোনাকে ‘ন্যূ ক্যাম্প’ ছাড়তে হয় বার্সার প্রেসিডেন্ট ‘জোসেপ নুনেজ’-এর সাথে বিতর্কে জড়ানোয়। কিন্তু রাজার প্রস্থান রাজার মতই হয়। এবারও ৬.৯ মিলিয়ন ইউরোর রেকর্ড ট্রান্সফার। আর ‘নাপোলিতে’ শুরু হয় ম্যারাডোনা যুগ।

Diego Maradona of Napoli SSC

ম্যারাডোনার পায়ে ভর দিয়ে নাপোলি ১ম বারের মত ‘সিরি এ’ শিরোপা জিতে ১৯৮৬/৮৭ সালে। ম্যারাডোনা ছিলেন সেইবার ‘সিরি এ’-এর সর্বোচ্চ গোলদাতা। ৮৭’তে আরও জিতে নেয় ‘কোপা ইতালিয়া’-র শিরোপা। ১৯৮৭/৮৮ এবং ১৯৮৮/৮৯ সালে নাপোলি ‘সিরি এ’-তে ২য় স্থান পায়। ১৯৮৯/৯০’তে আবার ‘সিরি এ’-এর শিরোপা পুনঃরুদ্ধার করে ম্যারাডোনার নাপোলি। ৮৯’তে ‘UEFA Cup’-এর শিরোপার পাশাপাশি ‘কোপা ইতালিয়া’-তে হয় ২য়। ৯০’তে নাপোলি জিতে নেয় ‘ইতালিয়ান সুপার কাপ’। নাপোলিতে ১৮৮ ম্যাচ খেলে ম্যারাডোনা করেন ৮১ গোল। তাঁর পায়ের ছোঁয়ায় নাপোলির সবুজ মাঠ হয়ে উঠেছিল জাদুর গালিচা… আর এই জন্যই নেপলস্‌বাসীর ঘুম ভাঙ্গে ম্যারাডোনার মুর্তি দেখে। আর ১০ নম্বর জার্সিটি যত্নসহকারে চিরদিনের জন্য তুলে রেখেছে তাদের প্রিয় তারকার সম্মানে।

Diego-Maradona-2012-11-22ম্যারাডোনা মাত্র ১৬ বছর বয়সে জাতীয় দলে খেলা শুরু করেন এবং ১৮ বছর বয়সে যুব বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেন ১৯৭৯ সালে। তবে ১৯৭৮ সালে বিশ্বকাপ দলে থাকলেও কোচ সিজার মেনোত্তি  তাঁকে খেলান নি। বিশ্বকাপে প্রথম সুযোগ পান ১৯৮২ সালে। কিন্তু ৫ ম্যাচে ২ গোল করে ম্যারাডোনা ছিলেন তার ছায়া হয়ে। উল্টো ব্রাজিলের বিপক্ষে পান লাল কার্ড।

 

ম্যারাডোনার পায়ের জাদু বিশ্বকে মোহিত করে ৮৬’র বিশ্বকাপে। উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩ গোলেরই উৎস ছিলেন ম্যারাডোনা। ইতালির বিপক্ষে ১-১ এ ড্র হওয়া ম্যাচে গোলটি করেন তিনি। বুলগেরিয়ার সাথেও ছিলেন ক্ষীপ্রতর।

ম্যারাডোনার সবচেয়ে আলোচিত এবং সমালোচিত ম্যাচ ছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচটি। এই ম্যাচে তাঁর দেয়াmaradona460x276 দুটি গোলের একটি ‘Hand of God’ এবং অন্যটি ‘Goal of the century’ হিসেবে স্বীকৃ্ত। ফকল্যান্ড যুদ্ধের ৭৪ দিনব্যাপি ভয়াবহতার জবাব দিতে ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হাত দিয়ে গোল করেন। ম্যারাডোনার ভাষায়, ‘ফকল্যান্ডে ওরা আমাদের যে আঘাত করেছিল তা হয়তো আমরা ভুলে যাব কিন্তু আমি যে আঘাত করলাম তা তারা কখনও ভুলতে পারবে না’।

Hand of God সম্পর্কে ম্যারাডোনা বলেন, ‘a little with the head of Maradona and a little with the hand of God’. ২০০৫ সসালের ২২ আগস্ট এক টেলিভিশন শোতে ম্যারাডোনা হাত দিয়ে গোল করার বিষয়টি স্বীকার করেন।ম্যারাডোনার ২য় গোলটি ফিফা কর্তৃক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গোল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

diego-maradona‘Hand of God’-এর ৪ মিনিট পরই ম্যারাডোনা বল নিয়ে মাঝ মাঠ থেকে দৌড় শুরু করেন। ৬৮ গজ দৌড়ানোর সময় বল স্পর্শ করেন মাত্র ১১ বার! একে একে কাটান ৫ জন ডিফেন্ডার (Peter Beardsley, Steve Hodge, Peter Reid, Terry Butcher, Terry Fenwick) এবং গোলরক্ষক Peter Shilton-কে। তারপর বল জড়ালেন জালে এবং আনন্দে ফেটে পড়লো পুরো স্টেডিয়াম।

সেমি-ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে আরও ভয়ংকর ছিলেন ম্যারাডোনা। ২ গোলের সাথে ছিল চোখ জুড়ানো ড্রিবলিং। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানি-কে হারানো হোর্হে বুরুচাগার দেয়া একমাত্র গোলটিরও সাপ্লাই লাইন ছিলেন DM10.

৮৬’র বিশ্বকাপে প্রত্যাশিতভাবেই ‘গোল্ডেন বল’ জিতেন ম্যারাডোনা।

৯০’র বিশ্বকাপে হাটুর ইনজুরির কারণে ম্যারাডোনা ঠিক ছন্দে ছিলেন না। তারপরও আর্জেন্টিনা হারায় জিকো-সক্রেটিস-এর ব্রাজিল, যুগোশ্লাভিয়া এবং ইতালিকে। কিন্তু পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে এবার ফাইনালে হেরে যায় ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। ৮৫ মিনিটে দেয়া বিতর্কিত সেই পেনাল্টিতে ১-০ গোলে হেরে যায় আর্জেনটিনা। ঐ ম্যাচে হারের পর ম্যারাডোনার সাথে কেঁদেছিল সারা বিশ্ব…।

৯৪’র বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা গ্রিস এবং নাইজেরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামেন। এরপর “Ephedrine” নেয়ার অপরাধে তাঁকে নিষিদ্ধ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ম্যারাডোনার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়। ১৭ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ম্যারাডোনা খেলেন ৯১ ম্যাচ এবং গোল করেন ৩৪টি। ৪ বিশ্বকাপের ২১ ম্যাচে গোল করেন ৮টি। পুরো ক্যারিয়ারে ৫৮৯ ম্যাচে করেন ৩১১ গোল! একজন প্লে-মেকারের জন্য যা বিশ্ময়কর।

ম্যারাডোনা ছিলেন সব সময়ই খবরের কগজের শিরোনাম। তাঁকে নিয়ে যত নিউজ হয়েছে এবং হচ্ছে তা পৃথিবীর আর কোন তারকাকে নিয়ে মনে হয় কখনও হয় নি। ড্রাগ-এ আসক্তি ম্যারাডোনাকে মৃত্যুর মুখোমুখি নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁর লড়াকু মানসিকতা আর মানুষের ভালবাসা তাঁকে মৃত্যুর মুখ থেকে ছিনিয়ে আনে। ২০০৭ সালের ৮ মে, ম্যারাডোনা ড্রাগ ছাড়ার ঘোষণা দেন।

img-diego-maradona-se-paye-pele-1322813385_620_400_crop_articles-150424

২০০২ সালে Internet Poll Vote-এ সর্বকালের সেরা ফুটবলার নির্বাচনে পৃথিবীর মানুষ তাঁর প্রাপ্য সম্মান তাঁকে দিয়েছিল। যে বাঁ পা এই পৃথিবীকে মোহিত করেছিল ফুটবল জাদুতে, সে পায়ের মালিক, “ফুটবল ইশ্বর”-কে ৫৩.৬% ভোট দিয়ে “সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার” নির্বাচন করেছিল ফূতবল জাদুতে বিমোহিত মর্ত্যবাসী। যেখানে তাঁর নিকটতম প্রতিদন্ধী পেলে পেয়েছিল ১৮.৫৩% ভোট।

 

 

diego_maradona2_1656095cফুটবলের এই মহানায়ক ২০১০ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের কোচ ছিলেন।

 

[ratings]

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

five × 3 =