বব উলমার : এক ল্যাপটপ কোচের আখ্যান

প্রথম দিনের খেলা শেষে ইয়াসির হামিদকে বলা হয়েছিল হালকা স্ট্রেচিং করে ড্রেসিং রুমে যাওয়ার জন্যে। ইয়াসির হামিদ দলের ট্রেইনার মারে স্টিভেন্সন এবং আমাকে এসে জিজ্ঞাসা বললো আমি “ফ্ল্যাট ফিটে” করতে চাই।এই জবাবে ট্রেইনার আর আমি দুইজনেই ভেবাচেকা খেয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ এই নিয়ে আলাপচারিতার পরে বুঝতে পারলাম যে সে আসলে খালি পায়ে স্ট্রেচিং করতে চাচ্ছে।


উপরের এই ঘটনাটি বব উলমারের বলা।যে প্রসঙ্গে বলা সেটি হলো দক্ষিন আফ্রিকা, পাকিস্তান এবং ওয়ারউইকশায়ার এই তিন দলের মধ্যে কোচিং করানোতে কী পার্থক্য তা নিয়ে। সংস্কৃতি, ভাষা,মনোবৃত্তি মূলত এই তিন জায়গাতেই প্রাচ্য আর প্রতীচ্যের (পড়ুন এশিয়া বাদে অন্য ক্রিকেট দেশ) মধ্যে পার্থক্য।


বব উলমারকে বলা হয়ে থাকে ক্রিকেটের প্রথম “কম্পিউটার কোচ”। ড্রেসিংরুমে হয়তো উলমারই প্রথম কোচ যিনি ক্রিকেটীয় তৈজসপত্তরের সাথে নিয়ে যেতেন একখানা ল্যাপটপও। ফুটবলে ব্যাপারগুলো খুবই স্বাভাবিক হলেও ক্রিকেটে একেবারেই অর্ধপক্ক।ফুটবলের কথা যখন বলেই ফেললাম সাথে এই তথ্যটাও বলি। উলমার ক্রিকেটে উইকেটরক্ষকদের নিজের স্থিতি সংক্রান্ত ধী বাড়ানোর জন্যে ফুটবলের গোলকিপার এবং তার অনুশীলন নিয়ে করেছেন অনেক অন্বেষণ-বিশ্লেষণ।আর করবেই না কেন উলমার যে একজন ভাবগ্রাহী ক্রিকেট প্রেমী।

অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের রিভার্স-সুইপে আমাদের চোখ জুড়িয়ে যেত।একদম কাব্যিক রিভার্স-সুইপ করতো ফ্লাওয়ারভাইদের বড়জন। কিন্তু এই রিভার্স-সুইপকে ক্রিকেটের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত করেছেন উলমার নিজেই। প্রায় তার একক প্রচেষ্টায় তখন জনপ্রিয় হয়ে উঠে এই শট। মানে ব্যাটসমানদেরকে আগ্রহী করে তুলেছিলেন এই শটে।সবসময় নিজেই যে নতুনকিছু করার কথা ভাবতেন তা কিন্তু না, নিজের অধীনস্হ খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিতেন বাক্সের বাইরে চিন্তা করার।সবকিছুর প্রতি তার অভিনিবেশ ছিল পুঙখানুপুঙখ।

পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত তিন-জাতি ওয়ানডে সিরিজ দিয়ে তার আফ্রিকার কোচ হিসেবে অভিষেক হয়।স্বাগতিক পাকিস্তান এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সবগুলো ম্যাচই হেরেছে তার দল।কিন্তু ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপের পরে উলমার যখন কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন তার অধীনে আফ্রিকার সীমিত ওভারের ম্যাচ জয় ১১৭ ম্যাচে ৮৩ টি, শতকরা ৭২.৮০ ম্যাচই জিতেছে তার দল। ১৫ টেস্ট সিরিজের মধ্যে জিতেছি ১০ টি। না, মর্নিং ডাজনন্ট অলওয়েজ শোজ দ্যা ডে। ৯৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আফ্রিকার পরাজয়ের জন্যে দায়ী কে? ডোনাল্ড নাকি ক্রিকেটের দেবী? ঈশ্বর আরেকটু সহায় হলে হয়তো উলমারের হাতেই আফ্রিকানরা পেয়ে যেত প্রথম বিশ্বকাপ।ভাগ্যদেবতা বড়ই নিষ্ঠুর। সেমিফাইনালের সেই পরাজয়ের দিনকে উলমার তার জীবনের সবচেয়ে জঘন্যতম দিনে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

২০০৪ দায়িত্ব নেন ক্রিকেটের অন্যতম হাই প্রোফাইল, চ্যালেঞ্জিং এবং বিতর্কে ঠাসা দল পাকিস্তানের। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের কাছে সিরিজ হারার পরে পিসিবি বড়েমিয়াকে কোচের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়। তারই স্থলাভিষিক্ত হন বব উলমার। ২০০৫ অ্যাশেজ জেতা ফর্মের তুঙ্গে থাকা ইংল্যান্ডকে হোম সিরিজে হারিয়েছিল পাকিস্তান। পরবর্তীতে ভারত এবং শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে টানা তিন টেস্ট সিরিজ জিতে আনপ্রেডিক্টেবল পাকিস্তান।
হ্যান্সি ক্রোনিয়ের ম্যাচ ফিক্সিং কেলেংকারী, তারপরে এলো আবার উলমারের দল পাকিস্তানের বল টেম্পারিং করার অভিযোগ, ২০০৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে। এর আগে একবার ১৯৯৭ সালে সাউথ আফ্রিকা,জিম্বাবুয়ে এবং ভারতের মধ্যকার এক ত্রিদেশীয় সিরিজেও উলমারের দলের বিপক্ষে বল টেম্পারিং এর অভিযোগ তুলেছিল ম্যাচ রেফারি ব্যারি জারমান।যদিও উলমার বলেছিল এইরকম কোনো কিছুই তার দল করেনি। পরে ম্যাচ অফিশিয়ালরাও উলমারের সাথে একই সূরে কথা বলেছিলেন।
২০০৬ সালে বব উলমার বলেওছিলেন যে সীমিত পরিসরে বল টেম্পারিং করাকে বোলারদের স্বার্থে জায়েজ করা হোক।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সম্মান সিতারা-ই-ইমতিয়াজ এ ভূষিত করা হয়েছিল পাকিস্তান ক্রিকেটে তার অবদানের জন্যে।লাহোরে তার নামে আছে একটি ক্রিকেট একাডেমিও।সাউথ আফ্রিকা আর পাকিস্তান আজীবন মনে রাখবে বব উলমারকে।


বিশ্ব ক্রিকেটে বেশ জনপ্রিয়, সবসময় সুধীরচিত্তের অধিকারী বব উলমারের আজকে ৭২তম জন্মদিন।২০০৭ সালে পৃথিবী ছেড়ে না গেলে হয়তো আনন্দের সাথে উৎযাপন করা হত আজকের দিন। ওপারে ভালো থাকবেন উলমার সাহেব।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

one × five =