বদলে যাওয়া স্টার্লিং : গার্দিওলার প্রভাব

বদলে যাওয়া স্টার্লিং : গার্দিওলার প্রভাব

বয়স মাত্র ২২। এর মধ্যেই ক্যারিয়ারের এপিঠ-ওপিঠ মোটামুটি দেখা হয়ে গেছে, এই দাবি করতেই পারেন ম্যানচেস্টার সিটির ইংলিশ উইঙ্গার রাহিম স্টার্লিং। মাত্র ১৮ বছর বয়সে লুইস সুয়ারেজ-ড্যানিয়েল স্টারিজদের সাথে লিভারপুলের হয়ে প্রায় লিগ জিতে ফেলা স্টার্লিং এর প্রতিভার কথা তখন থেকেই জানে বিশ্ববাসী। সেই প্রতিভার খবর পেয়েই লিভারপুলের লিগ প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার সিটি স্টার্লিং এর পিছে প্রায় ৪৯ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে তাকে দলে নিয়ে আসে।

অনেক সমালোচনার জন্ম দিয়ে লিভারপুল থেকে ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়া স্টার্লিং প্রথম দুই মৌসুমে সেরকম কিছুই করতে পারলেন না সিটির হয়ে। প্রতিভাধর উইঙ্গার, ভালো ড্রিবল করতে পারেন, ডিফেন্ডারদের তটস্থ রাখতে পারেন, সিটির হয়ে প্রথম মৌসুমে কোচ ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনির অধীনে স্টার্লিং এর পরিচয় ছিল এটাই। যে আশা নিয়ে ম্যানচেস্টার সিটি তাকে লিভারপুল থেকে দলে এনেছিল, প্রথম দুই মৌসুমে সে আশা পূরণ করতে পারলেন সামান্যই।

শুরু হল সমালোচনা। সবাই ধরেই নিলেন স্টার্লিংকে দিয়ে কিছু হবেনা আর। আর দশটা মিডিয়ার আকর্ষণ পাওয়া ইংলিশ খেলোয়াড়ের মতই দশা হবে রাহিম স্টার্লিংয়ের। ডেভিড বেন্টলি, ফ্র্যান্সিস জেফার্স, জ্যাক উইলশেয়ারদের মত স্টার্লিংও নিজের প্রতিভার প্রতি সুবিচার না করে হারিয়ে যাবেন কালকের অতল গহ্বরে – ভাবা শুরু করলেন সবাই। স্টার্লিংয়ের ব্যক্তিগত জীবনও চলে আসলো ইংলিশ মিডিয়ার আতসী কাচের তলায় – আরও কত কিছু!

গত মৌসুমে হল পালাবদল। চিলিয়ান কোচ ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনিকে ছাঁটাই করে বায়ার্ন মিউনিখ থেকে কিংবদন্তী সাবেক বার্সেলোনা কোচ পেপ গার্দিওলাকে ম্যানেজার করে নিয়ে আসলো ম্যানচেস্টার সিটি। কোচ হয়ে এসেই গার্দিওলা স্টার্লিংকে ফোন করে জানালেন তাঁর পরিকল্পনায় স্টার্লিং খুব ভালোভাবেই আছেন। স্টার্লিং তখন মাত্র ইংল্যান্ডের হয়ে ভুলে যাওয়া এক ইউরো শেষে করে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে তাঁর দ্বিতীয় মৌসুম শুরু করার জন্য ক্ষণ গুনছেন।

বদলে যাওয়া স্টার্লিং : গার্দিওলার প্রভাব

সিটিতে গার্দিওলার প্রথম মৌসুমেও সেরকম কিছু করতে পারলেন না স্টার্লিং। গার্দিওলার অধীনে সিটিও প্রথম মৌসুমে জিততে পারলো না কিছু। আবারও শুরু হল স্টার্লিংকে নিয়ে গুঞ্জন। সবাই ধরেই নিল এই মৌসুমে সিটি ছাড়ছেন স্টার্লিং, তাঁর উপর মোনাকো থেকে বিধ্বংসী পর্তুগীজ উইঙ্গার বার্নার্ডো সিলভার দলে আসার পর সবাই ধরেই নিল স্টার্লিংয়ের দিন শেষ সিটিতে। এমনকি এবার গ্রীষ্মকালীণ দলবদলের শেষ দিনে স্টার্লিংয়ের জন্য ম্যানচেস্টার সিটির টেবিলে একটা প্রস্তাব রাখলো আর্সেনাল। আর্সেনাল উইঙ্গার অ্যালেক্সিস স্যানচেজের প্রতি আগ্রহী ছিল সিটি, আর্সেনাল সাফ জানিয়ে দিল স্যানচেজের পরিবর্তে স্টার্লিংকে দিলেই কেবলমাত্র সিটিতে স্যানচেজকে পাঠাতে রাজী হবে আর্সেনাল। নতুবা নয়।

কিন্তু সবসময়েই স্টার্লিংয়ের উপর, স্টার্লিংয়ের প্রতিভার উপর ভরসা করে গিয়েছিলেন একজন। গোটা দুনিয়া যেখানে স্টার্লিংয়ের বিপক্ষে ছিল, শুধুমাত্র একজনই ছিলেন স্টার্লিংয়ের পক্ষে, এবং বলা বাহুল্য, তাঁর ভরসাটাই স্টার্লিংয়ের সবচেয়ে বেশী দরকার ছিল।

তিনি পেপ গার্দিওলা।

স্টার্লিংয়ের জন্য আর্সেনালের প্রস্তাবকে তিনি সরাসরি নাকচ করে দেন। গার্দিওলা বিশ্বাস করতেন স্টার্লিং তাঁর অধীনে সিটির হয়ে আলো ছড়াবেনই।

গার্দিওলা ভুল ছিলেন না।

ভুল যে ছিলেন না সেটা এই মৌসুমে বদলে যাওয়া স্টার্লিংকে দেখেই সবাই বুঝতে পারছে, এবং সবাই বুঝতে পারছে কেন গার্দিওলা শেষ মুহূর্তে আর্সেনাল থেকে স্যানচেজকে দলে আনার জন্য অতটা তোড়জোড় করেননি। এমনকি এই মৌসুমে মোনাকো থেকে যে বার্নার্ডো সিলভাকে দলে আনা হয়েছে সে সিলভাও নিয়মিত সিটিতে সুযোগ পাচ্ছেন না, সেটাও এই স্টার্লিংয়ের জন্যই। এখনো ডিসেম্বরই আসেনি, এর মধ্যেই ১৯ ম্যাচে স্টার্লিং গোল করে ফেলেছেন ১৩ টি! ক্যারিয়ার শুরু করার পর অন্য কোন মৌসুমে এতটা কার্যকরী ছিলেন না স্টার্লিং।

সবচেয়ে চোখে পড়ছে যেটা, সেটা হল রাহিম স্টার্লিংয়ের ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা। এই মৌসুমের আগে সিটিকে নিজে থেকে ম্যাচ জিতিয়েছেন, গোল করে দৃশ্যত পয়েন্ট এনে দিয়েছেন, এরকম কোন ঘটনার কথা মনে পড়েনা। কিন্তু এই মৌসুমে শেষ দশ মিনিটে গোল করে সিটিকে ম্যাচ জিতিয়ে বা ড্র করিয়ে ১৯ পয়েন্ট এনে দিয়েছেন এই স্টার্লিং!

বিশ্বাস করা যায়?

এই মৌসুমে স্টার্লিং এখন পর্যন্ত যে ১৩ গোল করেছেন সেগুলো করেছেন ৮২, ৯৭, ৮৯, ৫১, ৫৯, ৯০, ১৯, ৯, ৬৪, ৯০, ৮৮, ৮৪, ৯৬ মিনিটে! শেষ দশ মিনিটে ৮ গোল করেছেন, যার মধ্যে ৬ গোল সিটিকে জয় এনে দিয়েছে (৯৭ মিনিটে বোর্নমাথের সাথে গোল, ফেইনুর্দের সাথে ৮৮ মিনিটের গোল, ওয়াটফোর্ড আর নাপোলির সাথে শেষ মুহূর্তের গোল, সাউদাম্পটনের সাথে ৯৬ মিনিটের গোল, ৮৪ মিনিটে হাডার্সফিল্ডের সাথে গোল), আর এক গোল (এভারটনের সাথে ৮২ মিনিটে গোল) সিটিকে এনে দিয়েছে ড্র।

দৃশ্যত এভাবেই সিটিকে একের পর এক পয়েন্ট এনে দিচ্ছেন স্টার্লিং, গার্দিওলার আস্থার প্রতিদান দিয়ে চলেছেন।

পরিবর্তন এসেছে তাঁর খেলার স্টাইলের মধ্যেও। এই মৌসুমে আরও অনেক বেশী ধারালো, আরও অনেক বেশী ভয়াল উইঙ্গার হয়ে উঠেছেন তিনি। উন্নত হয়েছে তাঁর সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পাস গ্রহণ করতে পারার ক্ষমতা, উন্নত হয়েছে ডি-বক্সে গোল করার পজিশানে থাকতে পারার ক্ষমতাও। পাস প্রদান করে এক ঝটকায় নিজের শরীরকে ঘুরিয়ে নিজের মার্কারকে ছিটকে দিয়ে ডিবক্সের মধ্যে ঢুকে গোল করার মত পজিশানে পৌঁছে যাচ্ছেন ক্রমশ, যেটা গার্দিওলাই তাকে শিখিয়েছেন।

গত বছরের পারফর‍ম্যান্সের সাথে এই বছরের পারফরম্যান্সেও এসেছে আকাশ-পাতাল তফাত। প্রতি ৯০ মিনিটে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই মৌসুমের সাথে গত মৌসুমের পার্থক্যটা নিজেই দেখে নিন –

  • প্রতি নব্বই মিনিটে গত মৌসুমে স্টার্লিং গোল করতেন ০.২৫টা করে, এই মৌসুমে সেটা ০.৯৬
  • গোলসহায়তা গত মৌসুমে ০.৪১, এই মৌসুমেও তাই
  • প্রতি ৯৩ মিনিটে সফল পাস গত মৌসুমে ২৯.৮৩টা, এই মৌসুমে ৩২.৯০
  • সফল পাসের হার গত মৌসুমে ৮০%, এ মৌসুমে ৮২%
  • কী পাস গত মৌসুমে ১.৪৩, এবার ১.৪৯
  • গোলের সুযোগ সৃষ্টি গত মৌসুমে ১.৬৫, এ মৌসুমে ১.৭০
  • সেট পিস থেকে গত মৌসুমে কোন গোলই করেননি, এই মৌসুমে একটা করেছেন
  • গোলে শট নিয়েছেন প্রতি নব্বই মিনিটে ২.২৯টা, এই মৌসুমে ২.৯৭টা
  • বক্সে বল পেয়েছেন গত মৌসুমে ৩.৩বার করে, এবার পাচ্ছেন ৪বার করে
  • আক্রমণভাগে থ্রু বল দিয়েছিলেন গতবার ০.০৫টা করে, এবার দিচ্ছেন ০.২৪টা করে

দেখতেই পাচ্ছেন, গত মৌসুম থেকে এই মৌসুমে স্টার্লিংয়ের পারফরম্যান্সের কতটা উন্নতি হয়েছে! গত মৌসুমে প্রতি ১৯৪ মিনিটে একটা করে গোল বা গোলসহায়তা করতেন তিনি। তারও আগের মৌসুমে প্রতি ২৪১ মিনিটে একটা করে গোল বা গোলসহায়তা করতেন। কিন্তু এই মৌসুমে সময়টা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫৬ মিনিটে! আর এটা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র গার্দিওলার জন্যেই। যে লোক বার্সেলোনায় মেসিকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম খেলোয়াড় হিসেবে গড়েছেন, যে লোক জেরার্ড পিকে, সার্জিও বুসকেটস, পেদ্রো, অ্যান্দ্রেস ইনিয়েস্তা, থমাস মুলার, জোশুয়া কিমিখ, জেরোম বোয়াটেংএর মত খেলোয়াড়কে নিয়ে গেছেন বিশ্বসেরার কাতারে, তিনি যে স্টার্লিং এর সাথেও এমনই কিছু একটা করবেন, সেটা জানাই ছিল।

যেটা কিনা এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি।

কমেন্টস

কমেন্টস

One thought on “বদলে যাওয়া স্টার্লিং : গার্দিওলার প্রভাব

মন্তব্য করুন

fourteen + eight =