ফ্যাসিজম এবং ফুটবল মিথায়েস সিন্ডালার দ্যা ম্যান অফ পেপার

১৯৩৯ সাল। জার্মান অবরুদ্ধ অস্ট্রিয়া। বলা হয়ে থাকে জার্মানির আস্ট্রিয়ার নাৎসি পার্টির সংখ্যা ছিল সবচেয় বেশী। তবে সবাই কি হিটলারকে পুজা করত ? যারা করতেন না তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ৩০এর দশকের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় মিথায়েস সিন্ডালার। র‍্যাপিড ভিয়েনা কিংবা জাতীয় দল কোনটিতেই তার বিকল্প ছিল না। অস্টিয়ান ফুটবলের সোনালী সময়ের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন সিন্ডালার। তবে হিটলার এবং ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করায় চরম মুল্য দিতে হয়েছে এমনকি তার মৃত্যুর সঠিক কারণ পর্যন্ত জানা সম্ভব হয়নি।
আগের রাতের পার্টি ছিল নিজের বারে। সেখানে নিজের বন্ধুদের নিয়ে ভোর রাত পর্যন্ত চলে পোকার খেলা। নিজের ফ্ল্যাটে ফিরতে ফিরতে প্রায় সকাল। নিজের দেশ শত্রুর ডেরা। বিষয়টা মেনে নেওয়া কষ্টকর ছিল সিন্ডালারের জন্য। বিষণ্ণতায় ভুগছিলেন তিনি। তবে সময়ের সঙ্গী ছিল বান্ধবি ক্যামেলা কাসটাগনোলা। ক্যাবেরে নাচিয়ে ক্যামেলাই যেন ছিল সিন্দালারের একমাত্র সঙ্গী। সেই রাতেও বাড়ি ফিরে এক সাথেই ঘুমিয়েছিলেন দুজনে। তবে তাদের আর উঠা হয়নি। দুদিন কোমায় থেকে মারা যান ক্যামেলা। সিন্ডালাদের শেষ ছিল তার নিজের বিছানায়। পুলিশ রিপোর্ট মতে কার্বন মনোক্সাইডের কারণে মারা যান তারা। কিন্তু তদন্ত বেশী দূর এগোয়নি। হত্যার অভিযোগ করেন মিথায়াসের স্বজনরা। তবে তাদের এই আবেদন ধপে টিকেনি। নাৎসি নিয়মে যে হত্যাকাণ্ডে মারা যাওয়া কেউ রাষ্ট্রীয় সম্মান পায় না। হ্যাঁ, এই অজুহাত দেখিয়েই সিন্ডালারের হত্যার তদন্ত বেশী দূর এগোয়নি। আস্টিয়ার সর্বকালের সেরা এই খেলোয়াড়ের হত্যাকে অ্যাকসিডেন্ট নাম দিতে কার্পণ্য করেনি নাৎসিরা। তার অন্তস্টিক্রিয়ার দিন মানুষের ঢল নামে রাস্তায়। নিজের প্রিয় খেলোয়াড়কে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে হাজার হাজার মানুষ নেমে আসে রাস্তায়। ১৯৪৫ সালে হিটলারের পরাজয় ঘটে কিন্তু আজও মিথায়াস সিন্ডালাদের হত্যার কোন বিচার হয়নি। নাৎসিরা যে তার ফাইলগুলো নষ্ট করে ফেলেছে।
আমাদের অনেকের কাছেই মিথায়াস সিন্ডালার এক অজনা নাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পুর্ব সময় বিশেষ করে ১৯৩০ দশকে আস্ট্রিয়ান ফুটবল দল ছিল সেরা ফুটবল শক্তিসুলর একটা। র‍্যাপিড ভিয়েনা ছিল এই শক্তির একটা মোটা স্তম্ভ। সেই যুগের ইংল্যান্ড, ইতালি, স্কটল্যান্ডের কাছে শক্ত প্রতিপক্ষ ছিল তারা। দুর্বল জার্মানিকে ৫ বা ৬ গোলে হারানো ছিল দাল ভাতের ব্যাপার। তবে হিটলারের আস্ত্রিয়া আক্রমণের পরের সময়গুলো ছিল হতাশাজনক। আস্ট্রিয়ান দলকে বিলুপ্ত করে নাৎসিরা। জার্মান দলে তাদের খেলতে বাধ্য করে। বিষয়গুলো মেনে নেওয়া ছিল ব্যাক্তিত্তসম্পূর্ণ সিন্দালারের জন্য আপমানজনক।
নিজের শুরুটা কিন্তু সহজ ছিল না মিথায়েস সিন্ডালারের জন্য। চেক অভিবাসী মা বাবার সন্তান তিনি। শ্রমিক পরিবারে জন্ম নেওয়া সিন্ডালাদের প্রতিভা সবার সামনে আসতে শুরু করে ছোট বয়স থেকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিজের বাবাকে হারানোর পর সারা কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন এই কালজয়ী ফুটবলার। স্ট্রাইকার হিসাবে গোলের পর গোল করে ভিয়েনাকে সাফল্য এনে দেন তিনি। দক্ষতার দিক দিয়ে নিজের সময়ের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন এই স্ট্রাইকার। আস্ট্রিয়ান দলের শেষ ম্যচেও দলের অধিনায়কের দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে। ফুটবলারদের মধ্যে প্রথম বিজ্ঞাপন করার মধ্যে দিয়ে তার জনপ্রিয়তা বুঝা যায়। জার্মানির দখলে চলে যাওয়ার পর সিন্ডালারকে নাৎসি পার্টিতে যোগ দিতে হয় অন্য সকল সাধারণ আস্ট্রিয়ানদের মতন তবে জার্মানির হয়ে খেলতে বাধ্য করা হলে তিনি সেটা প্রত্যাখ্যান করেন। তাকে ইহুদীপ্রেমী এবং পিতৃভুমির জন্য বিপদজনক হিসাবে আখ্যায়িত করে নাৎসি ফুটবল বোদ্ধারা। যার চূড়ান্ত ফল তাকে দিতে হয় নিজের জীবন দিয়ে।
অনেক সময় গড়িয়েছে। আজ নেই মিথায়াস সিন্ডালার তবে তার জীবন কাহিনি টিকে আছে আজও থাকবে আজীবন। আস্ট্রিয়ান ইতিহাসের সেরা এই খেলোয়াড় কিভাবে মারা গেছেন সেটা হয়তো আর জানা যাবে না কোনদিন। তবে ইতিহাস তাকে স্মরণ করবে।Sindelar 1

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

16 − 5 =