ফুটবল অভিধান: ফরোয়ার্ড ও স্ট্রাইকার- পার্থক্য এবং বিস্তারিত

শুরু করার আগে ফরোয়ার্ড ও স্ট্রাইকার কি? ছোট্ট করে বলতে গেলে ফরোয়ার্ড হল ঐসব খেলোয়াড়েরা যারা প্রতিপক্ষের গোলের সবচেয়ে নিকটে থাকে, প্রতিপক্ষের গোলের সবচেয়ে নিকটে থাকা মানেই এটা সহজেই বোধগম্য যে ফরোয়ার্ডের মূল দ্বায়িত্বই হল গোল করা এবং এখানেই শেষ নয়, গোল করা এবং গোলের সুযোগ তৈরি করাটাও ফরোয়ার্ড খেলোয়াড়দের অন্যতম একটি অংশ।

স্ট্রাইকারের সাথে অনেকেই হয়ত আবার সেন্টার-ফরোয়ার্ডকে গুলিয়ে ফেলে, তবে এক কথায় স্ট্রাইকারের একমাত্র দায়িত্ব হল গোল করা, হ্যাঁ শুধু গোল করা এবং অবশ্যই যত খুশি তত। বিশদ করে বলার পূর্বে  সংক্ষিপ্ত ভাবে বলতে গেলে  নিখুঁত গোলস্কোরিং সক্ষমতার সাথে সাথে দারুণ গতিসম্পন্ন একজন যে কিনা প্রতিপক্ষের রক্ষণের দুর্বল অংশ  কিংবা ডিফেন্ডারের ‘ব্লাইন্ড সাইড’ দিয়ে দুর্দান্ত গতি কিংবা অসাধারণ পজিশনিং এর মাধ্যমে জায়গা করে নিয়ে তার জন্য বাড়িয়ে দেওয়া পাস থেকে গোল করবে অথবা নিজেই গোলের সুযোগ তৈরি করে গোল করবে।

ফুটবলীয় কৌশলে কিংবা দক্ষতায় পুথিঁগত কিংবা প্রথাগত বিষয়ের প্রচলন ততটা প্রকট নয়, কেননা সময়ের সাথে ফুটবলে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে এবং আসবে; এটা একই সাথে মাঠের পজিশনিং এবং পজিশনের বেলাতেও। সত্যি বলতে এখানে কিছুই ধ্রুব নয়, যেমন এক সময়ের অন্যতম গোল পোচারের ভূমিকা আজ প্রায় নেই বললেই চলে।

ফরোয়ার্ড

সাম্প্রতিক ফুটবলে একজন থেকে শুরু করে তিনজন ফরোয়ার্ডের মধ্যে একজন কোচ সাধারণত সীমাবদ্ধ থাকে, অবশ্য সেখানে ফরোয়ার্ডের ভূমিকা পরিবর্তনশীল। ফরোয়ার্ড যেমন গোল করবে তেমনি গোল করাবে, একই সাথে অনেক ফরোয়ার্ড দলের রক্ষণে কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারে যখন সে তার পজিশনে থাকছে না। ফরোয়ার্ডের খেলোয়াড়েরা সাধারণত গড় উচ্চতার চেয়ে একটু বেশি উচ্চতার অধিকারী হলে বাতাসের বল দখলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রখর দৃষ্টিশক্তি কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণ দুর্বলতা বের করে লোন স্ট্রাইকারকে থ্রু বল বাড়িয়ে দিতে পারে, সেই সাথে শারীরিক ভাবে শক্তিশালী হলে তা কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণ দেয়াল ভেঙ্গে গোল করার সুযোগ তৈরি কিংবা গোল করে থাকে একজন ফরোয়ার্ড। ডান-বাম উইং দিয়ে আসা ক্রস থেকে হেডে গোল, স্ট্রাইকারের জন্য বা অন্য ফরোয়ার্ড খেলোয়াড়দের জন্য জায়গা বের করে দেওয়া ফরোয়ার্ড খেলোয়াড়দের কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ । নিজেদের রক্ষণভাগ থেকে মাঝমাঠে এবং মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ ভাগে সেতুবন্ধন তৈরিতে মিডফিল্ডারের সাথে সাথে ফরোয়ার্ডেরও ব্যাপক ভূমিকা থাকে। প্রতি-আক্রমণ অথবা আক্রমণে যাওয়ার সময় বলের দখল রাখার কাজটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতিপক্ষের কঠিন ট্যাকল, কড়া মার্কিং বা প্রবল চাপের মধ্যেও এই কাজটা করতে হয় ফরোয়ার্ডকেই, এক্ষত্রে বলের দখল রাখাটা এই জন্যও জরুরী যে যেন অন্য খেলোয়াড়েরা আক্রমণে সাহায্য করার জন্য উপরে উঠে আসার সময় পায়। দলের আক্রমণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফরোয়ার্ডকে কেন্দ্র করে করেই বেশিরভাগ আক্রমণ পরিচালিত হয় সেক্ষেত্রে ফরোয়ার্ড কাজ করে ‘টার্গেট’ হিসেবে; এক্ষেত্রে অবশ্য ফরোয়ার্ডের অনেক শ্রেণিবিভাগ স্বভাবতই চলে আসবে, মূলত সেন্টার ফরোয়ার্ড কাজ করে একজন ‘টার্গেট ম্যান’ হিসেবে।

সেন্টার ফরোয়ার্ড

মূলত সেন্টার ফরোয়ার্ড ‘টার্মটি’ এসেছে একেবারে ফুটবলের শুরুর দিকের ফরমেশন থেকে যেখানে তিন থেকে প্রায় পাঁচজন ফরোয়ার্ডও থাকত, যেখানে দুইজন ‘আউটসাইড ফরোয়ার্ড’(Outside forward)  দুইজন ‘ইনসাইড ফরোয়ার্ড’ (Inside forward) এবং একজন সেন্টার ফরোয়ার্ড।  আধুনিক ফুটবলে পদার্পনের পূর্বে ফুটবলে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সেন্টার ফরোয়ার্ডেরা। উত্তর ইউরোপ ও ইংল্যান্ডে ব্যাপক জনপ্রিয় এবং শক্তিশালী একটি চরিত্র হল সেন্টার ফরোয়ার্ডেরা। প্রথাগত এবং ঐতিহ্যগত সেন্টার ফরোয়ার্ডেরা সাধারণত লম্বা, শক্তিশালী, সাহসী এবং প্রখর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে থাকে, যেহেতু দলের আক্রমণের মূল কেন্দ্রবিন্দু সেহেতু বেশিরভাগ গোলেই ভূমিকা রাখত সেন্টার ফরোয়ার্ড। তবে বর্তমান সময়ের সেন্টার অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের সাথে সেন্টার ফরোয়ার্ডের ভূমিকা  বলতে গেলে পরিবর্তনযোগ্য তবে অনেক ক্ষেত্রে সেন্টার ফরোয়ার্ড দ্বিতীয় স্ট্রাইকারের সামনে কিংবা  সেন্টার অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের সামনে খেলে থাকে, বিশেষ করে  ৪-৩-১-২ বা ৪-১-২-১-২ ফরমেশনে। লং বল নিখুঁত ভাবে নিজের কাছে ধরে রাখা, পাস থেকে প্রাপ্ত বল দখলে রাখা এবং বাতাসের বল দখলে রাখতে হেডে দক্ষ হতে হয় সেন্টার ফরোয়ার্ডকে। শারীরিক শক্তি এবং কৌশলে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ফাঁকি দিয়ে গোল করানোয় এবং গোল করায় দক্ষ ফরোয়ার্ডের পায়ে স্বাভাবতই শুটিং সক্ষমতা শক্তিশালী, নিখুঁত এবং নির্ভুল হতে হয়(যেমন- ইব্রাহিমোভিচ)। সেন্টার ফরোয়ার্ডেরা সাধারণত যদি ম্যাচে গোল না পেয়েও থাকে সেক্ষেত্রে অবশ্যই গোলে ভূমিকা রাখতে হয়, প্রতিপক্ষের রক্ষণ দুর্গ ভেঙ্গে অথবা ডিফেন্ডারদের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে দলের অন্য খেলোয়াড়দের গোল করা এবং গোল করানোর সুযোগ তৈরি করে দিতেই হয়।  গতিশীল, ড্রিবলিং এ পারদর্শী, কৌশলী এবং নিখুঁত শুটিং সক্ষমতার ফরোয়ার্ডেরা একই সাথে অনেক সময়ে ‘প্লে ম্যাকিং’ ভূমিকা পালনের পাশাপাশি স্ট্রাইকারের কাজও অতি সহজেই করে দিতে পারে। তবে ইউরোপ বা ইংল্যান্ডে ফরোয়ার্ডের ব্যাপকতা যতটুকু অন্য সব অঞ্চলে ঠিক ততটা নয়।  অনেক দলই সেন্টার ফরোয়ার্ড ছাড়াই খেলেছে এবং খেলে থাকে, তবে ইংল্যান্ডে এখনো সেন্টার ফরোয়ার্ডের ব্যাপকতা যথেষ্ট লক্ষনীয়। ডিক্সি ডীন, অ্যালান শিয়েরার, ভাভা, চার্লস, ইব্রাহিমোভিচ সেন্টার ফরোয়ার্ডের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, অবশ্যই আরো অনেকেই আছে এই দীর্ঘ তালিকায়। গোল করার মারাত্মক দক্ষতার পাশাপাশি গোলে ভূমিকা রাখার জন্যে অনেক খেলোয়াড়কে স্ট্রাইকার এভং সেন্টার ফরোয়ার্ড এই দ্বৈত ভূমিকাতেই দেখতে পাওয়াটা আশ্চর্যের কিছু নয়।

আধুনিক সেন্টার ফরোয়ার্ডের উজ্জ্বল উদাহরণ জলাতান ইব্রাহিমোভিচ
আধুনিক সেন্টার ফরোয়ার্ডের উজ্জ্বল উদাহরণ জলাতান ইব্রাহিমোভিচ

আউটসাইড ফরোয়ার্ড (Outside forward)

মূলত ২-৩-৫ এবং এই একই ফরমেশনের পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত রুপ  ২-৩-২-৩ ফরমেশনে আউটসাইড ফরোয়ার্ডের ব্যবহার লক্ষনীয়। ১৯৩০ সালে ভিত্তোরিও পজ্জোর ২-৩-২-৩ ফরমেশনের আউটসাইড ফরোয়ার্ড যদিও এখন বলতে গেলে একটি ঐতিহাসিক শব্দ তবে আধুনিক সময়ে এর রুপান্তরিত রুপ এখনো বিদ্যমান। আউটসাইড ফরোয়ার্ড সাধারণত ডান এবং বাম উইং দিয়ে আক্রমণে সহায়তা করার পাশাপাশি গোল করার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট পারদর্শী হয়। আউটসাইড ফরোয়ার্ডদের দারুণ গতির সাথে থাকতে হত ড্রিবলিং দক্ষতা পাশাপাশি গোল করার মতও শুটিং সক্ষমতা, লাইনের কাছ ঘেষে খেলার কারণে গোল করার মত অবস্থানে না থাকলে অন্য খেলোয়াড় খুজে নিয়ে গোলের সুযোগ তৈরি করাটা আউটসাইড ফরোয়ার্ডের অন্যতম গুনের মধ্যেই পড়ে, নিখুঁত ক্রস করার দক্ষতা এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। প্রতি-আক্রমণে এই খেলোয়ড়েরা গতির ব্যবহারের মাধ্যমে খেলায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে। দুর্দান্ত গতির সাথে গোল করার দক্ষতা আউটসাইড ফরোয়ার্ডকে ‘বর্তমানে’ নিয়ে গেছে অন্য মাত্রায়, ‘বর্তমান’ বলার একমাত্র কারণ হচ্ছে আউটসাইড ফরোয়ার্ড আসলে এখন উইং পজিশনেরই ঐতিহাসিক নাম। তবে এখনো অনেক ধারাভাষ্যকার ডান ও বাম উইং পজিশনকে ‘আউটসাইড রাইট’ ও ‘আউটসাইড লেফট’ বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধই করে। বর্তমানের উইং এবং অতীতের আউটসাইড ফরোয়ার্ডকে একই মাত্রায় বিবেচনা করলে এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য  উদাহরণ হিসেবে বলা যায় রিয়াল মাদ্রিদের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো(লেফট উইং) ও গ্যারেথ বেলের(রাইট উইং) নাম।

cristiano-ronaldo-real-madrid

ইনসাইড ফরোয়ার্ড (Inside forward)

২-৩-৫, ২-৩-২-৩ বা WM ফরমেশনে আউটসাইড ফরোয়ার্ডের পাশাপাশি ইনসাইড ফরোয়ার্ডের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল মূলত উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং বিশ শতকের প্রথম দিকে। এই ফরোয়ার্ডেরা মূলত সেন্টার ফরোয়ার্ড এবং আউটসাইড ফরোয়ার্ডদের সাহায্য করত। সেন্টার ফরোয়ার্ডকে বলের যোগান দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে সেন্টার ফরোয়ার্ডের জন্য জায়গা তৈরি করে দেওয়াসহ, মাঝমাঠে পাসিং এর  মাধ্যমে বলের দখল রেখে প্রতিপক্ষকে  ক্রমশ চাপে রাখত, সেই সাথে আউটসাইড ফরোয়ার্ডদের বল পাসের গুরুদ্বায়িত্ব বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই পালন করত ইনসাইড ফরোয়ার্ডেরা। অনেক সময়ে অবশ্য ৪-৪-২ ফরমেশনে যদি দুই জন স্ট্রাইকার খেলে থাকে তাহলে একজন স্ট্রাইকার হয়ত দেখা যায় দ্বিতীয় স্ট্রাইকার বা ‘সাপোর্টিং’ স্ট্রাইকারে পরিণত হয় মূল স্ট্রাইকারের সাপেক্ষে, সেক্ষেত্রে এটিও একটি ইনসাইড ফরোয়ার্ডের সফল প্রয়োগ বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। বর্তমানে আসলে ঐতিহাসিক শব্দ ইনসাইড ফরোয়ার্ডের  পরিবর্তিত রুপই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারেরা।

স্ট্রাইকার

সহজ ভাষায় স্ট্রাইকারের একমাত্র কাজই হল গোল করা; পজিশন, দক্ষতা, কৌশল, গোলস্কোরিং সক্ষমতার উপর ভিত্তি করে স্ট্রাইকারের বিভিন্ন শ্রেণিবিভাগ চাইলেই করা যায় তবে এটি অবশ্যই খুবই জটিল কাজ। ফুটবলের পরিবর্তনের সাথে সাথে বিভিন্ন টার্মের পরিবর্তনের পাশাপাশি অঞ্চলভেদে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে  সেন্টার ফরোয়ার্ডের সাথে মূল স্ট্রাইকার একই বিন্দুতে এসে প্রায় মিলে যায়। আগেই যেমনটা বলা হয়েছে পুঁথিগত বা প্রথাগত এমন কোন ব্যাপারই ফুটবলে ধ্রুব নয়। প্রতিপক্ষের রক্ষণ দেয়াল ভেঙ্গে, ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিয়ে জায়গা তৈরি করে নিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে গোল করাসহ দুর্দান্ত গতির সাথে নিয়ন্ত্রিত বলের দখল স্ট্রাইকারের বৈশিষ্ট্যে ভিন্নতা নিয়ে আসে। একজন ভালো স্ট্রাইকারের কথা বলতে গেলে শুরুতে চলে আসবে দুই পায়েই স্বাচ্ছন্দ্যে গোলে শুট করার ক্ষমতাসহ নিখুঁত শক্তিশালী শুটিং সক্ষমতা। দক্ষ স্ট্রাইকারের গোলস্কোরিং অবস্থান সমন্ধে সহজাত ধারণা এবং মুহূর্তে খেলোয়াড়দের গতি-প্রকৃতি বোঝার ক্ষমতা থাকতেই হয়। একই সাথে ড্রিবলিং দক্ষতা বক্সের ভিতরে একজন স্ট্রাইকারকে কতটা ভয়ংকর করে তুলতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। পাসিং, ড্রিবলিং, গতি, অসাধারণ নিখুঁত ফিনিশিং, দূরদৃষ্টি, ওয়ান-অন-ওয়ান প্রায় সব দিক বিবেচনায় সবচেয়ে পরিপূর্ণ স্ট্রাইকারদের মধ্যে অন্যতম ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি রোনালদো।

দ্বিতীয় স্ট্রাইকার (Second striker)

ফুটবল ইতিহাসে দ্বিতীয় স্ট্রাইকারের ঐতিহাসিক শুরুটা অবশ্যই ইনসাইড ফরোয়ার্ডের হাত ধরেই, ‘Deep lying’ সেন্টার ফরোয়ার্ড ভুমিকা ফুটবলে জনপ্রিয়তম একটি অংশ। যদিও বলা হয়ে থাকে দ্বিতীয় স্ট্রাইকার মূলত মূল স্ট্রাইকারের সহায়তাকারী একজন যিনি মূলত গোলের সুযোগ তৈরি করে দেয় এবং একই সাথে হারনো বল দখল করে নিজেই গোল করে অথবা গোলরক্ষকের ফিরিয়ে দেওয়া বল কিংবা ডিফেন্ডারের ভুলে পাওয়া বল থেকে গোল করে থাকে। তবে দ্বিতীয় স্ট্রাইকার হিসেবে খেলে অনেক কিংবদন্তি খেলোয়াড় দেখিয়েছেন এই পজিশনে খেলতে হলে গোল করার অসাধারণ দক্ষতার পাশাপাশি থাকতে হয় সৃজনশীলতা, যেহেতু এটি প্রায় অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের ভুমিকা। দ্বিতীয় স্ট্রাইকার সাধারণত খেলে থাকে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ও মাঝমাঠের মাঝে যেটিকে অনেক সময়ে ‘hole’ও বলা হয়ে থাকে। ১৯৪০ সালের শেষের দিকে এবং ১৯৫০ সালের মাঝামাঝিতে হাঙ্গেরির পুসকাস এই দ্বিতীয় স্ট্রাইকার পজিশনটিকে অন্য এক মাত্র দিয়েছিলেন, পরে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠে ইতালির Trequarista (Three Quarters) খেলার  ধরণের সাথে যেখানে একজন খেলোয়াড়ের ভূমিকা অনেকটা এমন ছিল যে ‘মিডফিল্ডারও নয় আবার ফরোয়ার্ডও নয়’; তবে আক্রমণে দারুণ অবদান রাখার পাশাপাশি গোল করার অসামান্য দক্ষতা সামনে নিয়ে আসে দ্বিতীয় স্ট্রাইকারের টার্মটিকেই। ইতালির মেয়াৎজা, রবার্তো বাজ্জো, হল্যান্ডের ক্রুইফ, খুলিত, পুসকাস এমনকি পেলেও এই ক্যাটাগরিতে প্রসিদ্ধ। অনেক সেন্টার ফরোয়ার্ডই কিছুটা নিচে নেমে এসে বেশি জায়গা নিয়ে খেলার সাথে সাথে আরো বেশি ভূমিকা রাখতে চাইত, এখানেই  মাঝমাঠের কিছুটা উপরে এবং স্ট্রাইকারের কিছুটা নিচে নেমে খেলত যেখান থেকে গোলের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি গোল করটাও অনেকটা সহজ হয়ে যেত। ডি স্টেফানো, ক্রুইফ, খুলিত এই কৌশলেই খেলতেই সম্ভবত স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন।

রবার্টো ব্যাজ্জো
রবার্টো ব্যাজ্জো

অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ও দ্বিতীয় স্ট্রাইকারের মধ্যে মূল পার্থক্য হল দ্বিতীয় স্ট্রাইকার কিছুটা উপরে খেলে এবং গোল করার ব্যাপারে একটু বেশি দায়বদ্ধ থাকে। অনেক সময় দ্বিতীয় স্ট্রাইকারই মূল গোলস্কোরারে পরিণত হয়, যেমন পুসকাস। যাই হোক  এই খেলোয়াড়দের আর কষ্ট করে মাঝমাঠে সাহায্য না করলেও হয়, তবে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের এই কাজটা কিন্তু না করলেই নয়। অসাধারণ দুরদৃষ্টি, ড্রিবলিং, শর্ট পাস, বল নিয়ন্ত্রন, পাসিং ফিনিশিং এসকল প্রায় সকল দক্ষতা একজন দ্বিতীয় স্ট্রাইকারকে করে তুলে প্রায় অপ্রতিরোধ্য।

 

গোল পোচার

গোল পোচারদের ‘Fox in the box’ নামেও ডাকা হয়, সত্যি বলতে নামেই রয়েছে স্বার্থকতা। গোল পোচারেরা মূলত পেনাল্টি বক্সে এবং এমনকি ছয় গজের বক্সের মধ্যেই অপেক্ষা করতে থাকে সঠিক বলের জন্য, যখনই সঠিক সুযোগ আসে, বল পায় পোচারেরা এবং গোল করে। সত্যি বলতে মাস্টার ক্লাস পোচারেরা এই সঠিক বলের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এরবেশি সময় খেলায় যুক্ত থাকে না বললেই চলে। নিখুঁত গোল পোচারদের তালিকায় রয়েছে পিপ্পো ইনজাঘি, নিস্টলরয়, ক্রেসপো প্রমুখেরা। অন্যতম পোচার নিস্টলরয় প্রায়ই অফসাইডের নিয়ম কাজে লাগিয়ে সুযোগ নিতেন, তিনি ডিফেন্ডারদের শেষ লাইন ছাপিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন অফসাইডে, যখনই তার কোন সহযোগী খেলোয়াড় অফসাইডের ফাঁদ পেরিয়ে উইং দিয়ে বল নিয়ে তাকে পাড় হত তখনই তিনি ঐ খেলোয়াড়ের সমান্তরালে বলের জন্য দৌড় দিতেন এবং সহজেই গোল করতেন। যাই হোক পোচারেরা অনেক গোল করলেও বেশিরভাগই হয়ত দৃষ্টিনন্দন কোন গোল নয়। পেনাল্টি বক্স বা ছয় গজের বক্সে থাকা পোচারেরা প্রায় সময়েই গোল করে গোলরক্ষকের ফিরিয়ে দেওয়া বল থেকে, কিংবা গোলরক্ষকের হাতে কিংবা অন্য খেলোয়াড়ের শরীরে বা গোলবারে লেগে ফিরে আসা বল থেকে অথবা বক্সের আশেপাশে হারানো বল থেকে। ব্যাপারটি সহজ মনে হলেও তা নয়, এটি করার জন্য পোচারকে খুবই দ্রুত বলের গতি-প্রকৃতি বুঝে সাড়া দিতে হয়, মার্কারকে ফাঁকি দিয়ে বলে লাইনে যেতে হয় এবং জায়গা তৈরি করে নিতে হয় গোলে শটের জন্য। লিওনিদাস, সিমোনিয়ান, ড্যানিশ ল, জার্ড ম্যুলার, ইয়ান রাশ, রোমারিও, হুগো সানচেজ এরা ইতিহাস বিখ্যাত গোল পোচার। সময়ের সাথে সাথে গোল পোচারও আজ ইতিহাস হওয়ার পথে।

জার্ড মুলার
জার্ড মুলার

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

3 × five =