ফিরে দেখা : সেভিয়ার ইউরোপা-জয়রথ

স্প্যানিশ লিগের কথা বলতে গেলে সবার মূলত রিয়াল-মাদ্রিদ বার্সেলোনার দ্বৈত শাসনের কথাই মনে আসে। সেই বলতে গেলে এক দশকেরও বেশী সময় আগে রাফা বেনিতেজের ভ্যালেন্সিয়া এই দ্বৈত শাসন ভাঙ্গার ঔদ্ধত্য দেখায়, এখন যেটা করছে ডিয়েগো সিমিওনির অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ। কিন্তু দৃষ্টিসীমাটা যদি স্প্যানিশ লিগ ছাড়িয়ে ইউরোপে নিয়ে যাওয়া যায় সেখানে কিন্তু বার্সা বা রিয়াল ছাড়াও আরও একটি ক্লাব ভালই দাপট দেখাচ্ছে। সেটা আর কেউ নয়, উনাই এমেরির সেভিয়া। গত মৌসুমেও ইউরোপা লীগ জিতেছে তারা, ফলে গত দশ বছরের মধ্যে তিন-তিনবার ইউরোপা লিগ জয়ের গৌরব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে তারা, যার মধ্যে ছিল আবার টানা দুটি শিরোপা জয়, ২০০৫-০৬ আর ২০০৬-০৭ মৌসুমে। আজ আমরা ফ্ল্যাশব্যাকে করে চলে যাব সেই দুই মৌসুমে, যে দুই মৌসুমে ইউরোপের মোটামুটি বড় কিছু ক্লাবকে পেছনে ফেলে চ্যাম্পিয়নস লিগের ‘ছোটভাই’ ইউয়েফা কাপ (বর্তমানে ইউরোপা লীগ) পরপর দুইবার জয় করেছিল সেভিয়া।

936177_w2

 

একনজরে দেখে নেওয়া যাক সেই দুই মৌসুমের সেভিয়া স্কোয়াড –

 

  • গোলরক্ষক : আন্দ্রেয়া পালোপ, নোটারিও, ডেভিড কোবেনো, জাভি ভারাস

 

  • ডিফেন্ডার : আদ্রিয়ানো, দানি আলভেস, আইতর ওচিও, অ্যাঞ্জেল ক্রেসপো, ডেভিড ক্যাসটেডো, ডেভিড প্রিতো, ইভিচা দ্রাগুটিনোভিচ, জুলিয়েন এসকুদে, জাভি নাভারো, ম্যানুয়েল ব্ল্যাঙ্কো, পাবলো রুইজ, ফেদেরিকো ফাজিও, অ্যান্দ্রেয়া হিঙ্কেল, লোলো

 

  • মিডফিল্ডার : আলফারো, ব্রুনো, ডিয়েগো ক্যাপেল, হেসাস নাভাস, জর্ডি লোপেজ, এঞ্জো মারেসকা, মার্তি, আন্তোনিও পুয়ের্তা, রেনাতো, ফার্নান্দো সালেস, দুদা, ক্রিস্টিয়ান পউলসেন

 

  • স্ট্রাইকার : ফ্রেডরিক কানুটে, লুইস ফাবিয়ানো, হাভিয়ের সাভিওলা, আরিজা মাকুকুলা, কেপা, কার্লিতোস, আর্নেস্তো শেভানটন, আলেক্সান্দার খেরঝাকভ

 

হুয়ান্দে রামোসের কোচিংয়ে মূল একাদশে খেলতেন মূলতঃ – আন্দ্রেয়া পালোপ, আদ্রিয়ানো, দানি আলভেস, ডেভিড ক্যাসটেডো, ইভিচা দ্রাগুটিনোভিচ, জুলিয়েন এসকুদে, জাভি নাভারো, হেসাস নাভাস, এঞ্জো মারেসকা, মার্তি, আন্তোনিও পুয়ের্তা, রেনাতো, ক্রিস্টিয়ান পউলসেন, ফ্রেডরিক কানুটে, লুইস ফাবিয়ানো, হাভিয়ের সাভিওলা, আরিজা মাকুকুলা, আর্নেস্তো শেভানটন, আলেক্সান্দার খেরঝাকভ – এদের মধ্যে যেকোন ১১ জন।

ট্যাকটিক্সের বেলায় এমন কোন হাতিঘোড়া পরিবর্তন কিন্তু করেননি রামোস
ট্যাকটিক্সের বেলায় এমন কোন হাতিঘোড়া পরিবর্তন কিন্তু করেননি রামোস

হুয়ান্দে রামোসের সাফল্যের একটা অন্যতম রেসিপি ছিল ট্রান্সফার উইন্ডোতে সাফল্য। ২০০৫ সাল থেকেই সেভিয়ার মূল একাদশের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন তিনি – সেটা গোলবারের নিচে হোক, ডিফেন্সে হোক, মাঝমাঠে হোক কিংবা আক্রমণভাগে। ভ্যালেন্সিয়া থেকে ভিয়ারিয়ালে নিজেকে হারিয়ে খোঁজা গোলরক্ষক অ্যান্দ্রেয়া পালোপকে তিনিই প্রথম সুযোগ দিয়েছিলেন সেভিয়াতে, কোচের আস্থার প্রতিদানও দিয়েছেন তিনি যথাযথ। মাত্র ১.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে আয়াক্স থেকে সেভিয়াতে আসেন ফরাসী সেন্টারব্যাক জুলিয়েন এসকুদে, সার্জিও রামোস রিয়াল মাদ্রিদে চলে যাওয়ায় তার পরিবর্ত ফুলব্যাক হিসেবে বেলজিয়ান ক্লাব স্ট্যান্ডার্ড লিগ থেকে উড়িয়ে নিয়ে আসা হয় সার্বিয়ান লেফটব্যাক ইভিচা ড্রাগুটিনোভিচকে। ওদিকে রবি কিন আর জার্মেইন ডেফোর তোপে পচতে থাকা মালিয়ান স্ট্রাইকার ফ্রেডরিক কানুটেকে টটেনহ্যাম থেকে ৬.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে নিয়ে আসেন রামোস, স্ট্রাইকিং পার্টনার হিসেবে পোর্তো থেকে আগমন ঘটে ব্রাজিলিয়ান উঠতি সুপারস্টার লুইস ফাবিয়ানোর, সাথে একসময় পরবর্তী ম্যারাডোনা হিসেবে খ্যাত স্ট্রাইকার হাভিয়ের সাভিওলাও বার্সেলোনা থেকে ধারে যোগ দেন সেভিয়ায়। জুভেন্টাস আর ফিওরেন্টিনায় নিজের প্রতিভার প্রতি সুবিচার না করতে পারা ইতালিয়ান সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার এনজো মারেসকা রামোসের রেভোল্যুশানে যোগ দেন সেভিয়ায়। মূলত ২০০৬ এর এই কয়টা ট্রান্সফারের ফলই সেভিয়া ভোগ করেছে পরের দুই মৌসুম ধরে। পরের মৌসুমে দলে আসেন উঠতি আর্জেন্টাইন সেন্টারব্যাক ফেদেরিকো ফাজিও, মোনাকো থেকে আনা হয় স্ট্রাইকার আর্নেস্তো শেভানটনকে, রাশিয়ার জেনিত থেকে আসেন স্ট্রাইকার আলেক্সান্দার খেরঝাকভ। সেন্ট্রাল মিডফিল্ডের শক্তি বাড়ানোর জন্য আসেন ড্যানিশ মিডফিল্ডার ক্রিস্টিয়ান পউলসেন।

ফ্রেডরিক কানুটে
ফ্রেডরিক কানুটে

হুয়ান্দে রামোসের ট্যাকটিক্স পর্যালোচনা করলে যে জিনিসটা বুঝা যায়, তিনি ট্যাকটিক্সের বেলায় এমন কোন হাতিঘোড়া পরিবর্তন কিন্তু করেননি। প্রথাগত ফর্মেশানে কিভাবে নিজের স্কোয়াড থেকে সর্বোচ্চ ফল পাওয়া যায় সেটাই দেখিয়ে দিয়েছিলেন তিনি মূলত। চিরাচরিত ৪-৪-২ ফর্মেশানেই সেভিয়াকে খেলিয়ে গেছেন তিনি পুরো দুই মৌসুম, কখনো ফ্ল্যাট ৪-৪-২, কখনো ডায়মন্ড ৪-৪-২। দুজন প্রথাগত ওয়াইড মিডফিল্ডার, একজন টার্গেটম্যানের একটু পিছনে খেলা সাপোর্ট স্ট্রাইকার, দুজন আক্রমণাত্মক ফুলব্যাক, মাঝমাঠে একজন বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডারের পাশে একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার – সেভিয়ার সাফল্যের রহস্য বলতে গেলে এই-ই!

ফর্মেশান
ফর্মেশান

মূল একাদশে গোলরক্ষকের ভূমিকা বলতে গেলে একাই পালন করে গেছেন আন্দ্রেয়া পালোপ, রাইটব্যাকে দানি আলভেস ত বলতে গেলে একাদশের অবিচ্ছেদ্য অংশই ছিলেন। লেফটব্যাক হিসেবে আরেক ব্রাজিলিয়ান আদ্রিয়ানো, কিংবা স্প্যানিয়ার্ড ডেভিড ক্যাসকেডো, অথবা ইভিচা ড্রাগুটিনোভিচ খেলেছেন। সেন্টারব্যাকের দায়িত্ব সামলেছেন জুলিয়েন এসকুদে, অধিনায়ক জাভি নাভারো। কখনো কখনো খেলেছেন অকালপ্রয়াত ভার্সেটাইল খেলোয়াড় আন্তোনিও পুয়ের্তাও। বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার হিসেবে মাঝমাঠ থেকেই মাঝে মাঝে উপরে উঠার লাইসেন্সটা রামোস দিয়েছিলেন ইতালিয়ান মিডফিল্ডার এনজো মারেসকাকে, সাথে পাশে ডেস্ট্রয়ার হিসেবে খেলে গেছেন মার্তি। সাথে ব্যাকআপ হিসেবে ক্রিস্টিয়ান পউলসেন, ফার্নান্দো সালেস, এরা ত ছিলেনই।

দানি আলভেস
দানি আলভেস

উইং দিয়ে ত্রাস ছড়াতেন এখন সবার পরিচিত ম্যানচেস্টার সিটিতে খেলা, সেভিয়ার যুবদল থেকে উঠে আসা হেসাস নাভাস, সাথে অ্যান্তোনিও পুয়ের্তাও খেলতেন মাঝেমধ্যে উইং দিয়ে, লেফটব্যাকে ড্রাগুটিনোভিচ বা ক্যাসকেডোর কেউ খেললে লেফট মিডফিল্ডার হিসেবে আদ্রিয়ানোকেও খেলানো হত।

আদ্রিয়ানো
আদ্রিয়ানো
এনজো মারেসকা
এনজো মারেসকা

আর দুই স্ট্রাইকারের মধ্যে টার্গেটম্যান ছিলেন লুইস ফাবিয়ানো, আর তার সাপোর্ট স্ট্রাইকার হিসেবে খেলানো হত হয় ফ্রেডরিক কানুটে কে, নাহয় হাভিয়ের স্যাভিওলাকে। আপাতদৃষ্টিতে এই সাধারণ ফর্মেশানই গোলবন্যা ছুটিয়েছিলেন লুই ফাবিয়ানো, সেভিয়ার হয়ে প্রথম মৌসুমে ২৪ গোল করে প্রায় জিতে নিয়েছিলেন পিচিচি ট্রফি। আর সবচে বড় কথা ; সেভিয়াকে জিতিয়েছিলেন ইউয়েফা কাপ/ইউরোপা লীগ – পরপর দুইবার!

লুইস ফাবিয়ানো
লুইস ফাবিয়ানো

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

sixteen + twenty =